📄 উম্মুল মুমিনিনের প্রতি হযরত উমর রাযি.-এর সদাচার
হযরত উমর রাযি.-এর শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রশাসনিক অবকাঠামো ছিল আলাদা বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। অন্যান্য বিষয়গুলোর মতো অর্থনৈতিক সংস্কারও এসেছিল ব্যাপকভাবে। তিনি মুসলমানদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতা হিসেবে নগদ অর্থ নির্ধারণ করেছিলেন। কাজি আবু ইউসুফ রহ. কিতাবুল খারাজে দুটো রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন: এক. হযরত উমর রাযি.-এর শাসনামলে পবিত্র স্ত্রীগণের প্রত্যেকের বার্ষিক ভাতা ছিল বারো হাজার দিরহাম। দুই. প্রত্যেকের দশ হাজার দirহাম; কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর বারো হাজার দিরহাম। ইমাম হাকেম রহ. দ্বিতীয় বর্ণনাটিকে শুদ্ধতার ক্ষেত্রে বুখারী ও মুসলিমের সমপর্যায়ের বলে মূল্যায়ন করেছেন। অগ্রাধিকার প্রদানের কারণ উল্লেখ করে হযরত উমর রাযি. বলেন—তাঁর জন্য অধিক নির্ধারণ করেছি এজন্য যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক প্রিয় ছিলেন।
পবিত্র স্ত্রীগণের সংখ্যা অনুযায়ী হযরত উমর রাযি. নয়টি পাত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। কোনো উপঢৌকন এলে এক-একটা পাত্রে করে এক-একজনের খেদমতে সেসব পাঠিয়ে দিতেন। বণ্টনের ক্ষেত্রেও হযরত আয়েশা রাযি.-কে অধিক গুরুত্ব দিতেন। এমনকি, কোনো জন্তু জবেহ করা হলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ইচ্ছানুযায়ী মাথা পা ইত্যাদি পর্যন্ত তাঁর খেদমতে পাঠিয়ে দিতেন। ইরাক-অভিযানে বিজয়-লাভের ফলে মুসলমানদের যে অর্থসম্পদ হস্তগত হয়, তাতে মূল্যবান একটি মোতির ডিব্বা ছিল। এটা সকলকে বণ্টন করে দেওয়া ছিল কঠিন। তাই হযরত উমর রাযি. বললেন—যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে, তা হলে এটা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে পাঠাতে চাই। কেননা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় ছিলেন। সাহাবা কেরام রাযি. সানন্দে অনুমতি দিলেন। ডিব্বাটি হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে পাঠানো হলো। হযরত আয়েশা রাযি. ডিব্বাটি খুলে দেখলেন, এরপর বললেন—ইবনে খাত্তাব [রাযি.], রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবর্তমানে আমাকে অনেক অনুগ্রহ করেছেন। হে আল্লাহ, তাঁর অনুগ্রহ গ্রহণের জন্য আমাকে আর বেশিদিন বাঁচিয়ে রেখো না।
টিকাঃ
১. কিতাবুল খারাজ, কাজি আবু ইউসুফ রহ., পৃষ্ঠা: ২৫।
২. মুসতাদরাকে হাকেম, সাহাবিয়া অংশ, জিকরু আয়েশা রাযি.।
৩. ইমাম মালেক, বাবু জিযয়াতি আহলিল কিতাব।
১. মুয়াত্তা, ইমাম মুহাম্মাদ রহ.: বাবুয যুহদ।
২. মুসতাদরাকে হাকেম রহ.।
📄 হযরত উমর রাযি.-এর অন্তিম ইচ্ছা
হযরত উমর রাযি.-এর তামান্না ছিল, তিনিও মৃত্যুর পর হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কদম মোবারকের নিচে শায়িত হবেন। কিন্তু মুখ খুলে কোনোদিন এ কথা বলতে পারেননি। কেননা, যদিও শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কবরে শায়িত মৃত ব্যক্তি থেকে পর্দা করা জরুরি নয়; তথাপি শিষ্টাচারের কথা ভেবে— মৃত্যুর পরও উম্মুল মুমিনীনের সম্মানে নিজেকে তিনি গায়রে মাহরাম ভেবেছেন। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই ব্যাকুলতা তাঁকে ঘিরে ধরে। অবশেষে আপন পুত্রকে পাঠান—উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা [রাযি.]-কে আমার সালাম বোলো, এবং আবেদন কোরো, উমর [রাযি.]- এর অন্তিম ইচ্ছা—আপনার অনুমতি হলে তিনি তাঁর বন্ধুদের পাশে সমাহিত হবেন।
📄 এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর ত্যাগ
হযরত আয়েশা রাযি. বললেন—এতদিন মনে-মনে ওই জায়গাটি নিজের জন্যই সংরক্ষণ করেছিলাম; কিন্তু আজ হযরত উমর [রাযি.]-কে আপন ইচ্ছেতেই অগ্রাধিকার প্রদান করছি।
অনুমতি পাওয়ার পরও হযরত উমর রাযি.-এর দ্বিধা কাটল না। তিনি পুত্রকে ওসিয়ত করলেন—আমার মৃত্যুর পর আমার শবাধার উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর দুয়ারে নিয়ে যাবে এবং পুনরায় অনুমতি প্রার্থনা করবে। এবারও যদি তিনি সন্তুষ্টচিত্তে অনুমতি ব্যক্ত করেন, তবেই আমাকে ভেতরে নিয়ে যাবে। অন্যথায় মুসলমানদের গণকবরেই আমাকে দাফন করবে। তা-ই করা হলো। হযরত আয়েশা রাযি. এবারও সন্তুষ্টচিত্তে অনুমতি দিলেন। অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী হযরত উমর রাযি.-কে তাঁর প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে দাফন করা হলো। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে নববী খেলাফতের আরও একটি চন্দ্র চিরতরে চোখের আড়াল হয়ে গেল।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুল জানাইয-এ বিস্তারিত আছে।