📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোলে মাথা রেখে
একেবারে শেষ মুহূর্তের কথা। হযরত আয়েশা রাযি. বসা ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর সিনায় হেলান দিয়ে বসানো হয়েছে। এরই মধ্যে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হযরত আবদুর রহমান রাযি. মেসওয়াক নিয়ে ভেতরে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেসওয়াকের দিকে তাকালেন। হযরত আয়েশা রাযি. বুঝতে পারলেন যে, রাসূল মেসওয়াক করতে চাইছেন। তিনি ভ্রাতার হাত থেকে মেসওয়াকটি নিলেন এবং নিজের দাঁত দিয়ে চিবিয়ে নরম করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষের মতো মেসওয়াক করলেন। হযরত আয়েশা রাযি. গর্ব করে বলতেন—পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে শুধু আমারই এই সৌভাগ্য হয়েছে যে, জীবনের শেষ মুহূর্তটিতেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মুখের ঝুটা নিজের মুখে লাগিয়েছিলেন।
হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্থতার জন্য দুআ করছিলেন। রাসূলের হাত তাঁর হাতের মধ্যে ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হঠাৎ হাত সরিয়ে নিলেন এবং বললেন— اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَاجْعَلْنِي مَعَ الرَّقِيقِ الْأَعْلَىঅর্থ : হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে মিলিত করুন।
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, সুস্থ থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, মৃত্যুর সময় নবীদের দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের উচ্চারিত শব্দগুলো শুনে আমি ভেঙে পড়লাম। কেননা আমি নিশ্চিত হলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে বিদায় নিতে চলেছেন।
হযরত আয়েশা রাযি. অল্পবয়স্কা ছিলেন। তখন পর্যন্ত কাউকে নিজের চোখে মারা যেতে দেখেননি। তিনি আরজ করলেন—হে আল্লাহর রাসূল, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—কষ্ট যত সওয়াবও তত। তখন পর্যন্ত হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধরে থাকতে পেরেছেন। তেমন ভারী লাগেনি। কিন্তু হঠাৎ খুব ভার মনে হলো। চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি খুব ধীরস্থিরভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মস্তক মোবারক কোলে রাখলেন। তিনি বাকরুদ্ধ হলেন। বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা মোচড় মেরে উঠল। ব্যর্থ হলেন অশ্রুঢলকে বাঁধ মানাতে।
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম : কিতাবুস সালাম, বাব ইস্তিখবাব রুকইয়াতিল মারীদ ক্রম : ৫৭07। মুসনাদে আহমদ : খণ্ড, পৃষ্ঠা : ১৬২।
২. মুসনাদে আহমদ : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২৭৪। যে অংশগুলোর সূত্র দেওয়া হয়নি সেগুলো সহীহ বুখারী— (বাব ওয়াফাতি ন্নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে নেওয়া।
📄 বিশ্বনবীর সমাধি : সেই স্মৃতিময় ঘর
হযরত আয়েশা রাযি.-এর ফাজায়েল ও মানাকেবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে, তাঁর স্মৃতিময় ঘরটিই বিশ্বনবীর সমাধি হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল এবং প্রিয় নবীর মোবারক দেহ এই মাটির কোলেই গচ্ছিত রাখা হয়েছিল।
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
হযরত আয়েশা রাযি. স্বপ্নে দেখেছিলেন—তাঁর হুজরা মোবারকে আকাশ থেকে তিনটি চাঁদ খসে পড়ল। তিনি স্বপ্নের কথা হযরত আবু বকর রাযি.-কে বলেছিলেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেখানে সমাহিত করা হলো, তখন তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-কে বললেন—পুত্রী, তোমার দেখা তিনটি চাঁদের একটি চাঁদ ইনি। এবং ইনিই শ্রেষ্ঠ। পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করেছে, অন্য দুটো চাঁদ ছিলেন সিদ্দীকে আকবর রাযি. এবং ফারুকে আযম রাযি.।
হযরত আয়েশা রাযি. বিধবা হলেন। এবং এভাবেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা মোবারকের বাসিন্দা হয়ে। তিনি ঘুমাতেনও রাসূলের কবরের পাশেই। কিন্তু যেদিন তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন, সেদিন থেকে সেখানে ঘুমানো ছেড়ে দিলেন।
এরপর তেরো বছর, হযরত উমর রাযি. সমাহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত, তিনি হিজাব ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযায় আসা-যাওয়া করেছেন। কেননা, একজন স্বামী, অন্যজন পিতা। কিন্তু হযরত উমর রাযি. সমাহিত হওয়ার পর হযরত আয়েশা রাযি. বলতেন—এখন সেখানে যেতে হলে হিজাবসহই যেতে হবে।
টিকাঃ
১. মুআত্তা মালেক রহ: ا ما جاء في دفن الميت
২. তাবাকাত, ইবনে সাদ, ২/২/৮৫।
📄 পবিত্র স্ত্রীগণের দ্বিতীয় বিবাহ নিষিদ্ধ কেন?
পবিত্র স্ত্রীগণের জন্য আল্লাহ তাআলা অন্য স্বামী গ্রহণ হারাম করে দিয়েছেন। জনৈক আরব-নেতা মন্তব্য করেছিলেন-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর হযরত আয়েশা রাযি.-কে বিবাহের প্রস্তাব দেবেন।
যেহেতু এটা ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক, আবার শানে নবুওয়াতেরও খেলাফ, তাই আল্লাহ তাআলা আগেই ইরশাদ করে দিলেন-
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ
অর্থ: নবী মুমিনদের কাছে তাদের জীবনের চেয়েও দামি। আর নবীর স্ত্রীবর্গ তাদের মাতৃতুল্য। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬)
مَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمًا
অর্থ: কখনোই তোমাদের এই অধিকার থাকবে না যে, তোমরা আল্লাহর রাসূলকে কোনোভাবে কষ্ট দেবে। কখনোই তোমাদের এই অধিকার থাকবে না যে, তার মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীগণকে বিবাহ করবে। এটা অবশ্যই মহান আল্লাহর কাছে বিরাট অপরাধ। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৫৩)
প্রকৃতপক্ষে, পবিত্র স্ত্রীগণ কিছুকাল এমন একজন মানবের একান্ত সান্নিধ্য লাভ করেছেন, যিনি ছিলেন নবুওয়াতের ধারক। ইলমে নববীর অসংখ্য বিষয়ের প্রকৃত প্রতিনিধি তাঁরাই। সুতরাং তাঁদের বাকি জীবনের একমাত্র কাজ হবে— যতদিন বাঁচবেন, পবিত্র জীবনসঙ্গীর জীবন্ত শিক্ষা ও কার্যত দীক্ষা উম্মতের মাঝে বাস্তবায়ন করে যাবেন, উম্মতকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাবেন। তাঁদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়োজিত থাকবে এই সুমহান দায়িত্ব-পালনে। তাঁরা যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মা! মায়ের ভূমিকা সন্তানের লালনপালন। তাই মহান আল্লাহ স্বয়ং তাদের করণীয় নির্ধারণ করে দিলেন আগেই :
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ مَنْ يَأْتِ مِنْكُنَّ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ يُضَاعَفْ لَهَا الْعَذَابُ ضِعْفَيْنِ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا وَمَنْ يَقْنُتْ مِنْكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ وَتَعْمَلْ صَالِحًا نُؤْتِهَا أَجْرَهَا مَرَّتَيْنِ وَأَعْتَدْنَا لَهَا رِزْقًا كَرِيمًا
অর্থ: হে নবীপত্নীগণ, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অন্যায় করে, তবে তার শাস্তি হবে দ্বিগুণ। আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ। কিন্তু যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাকবে, নেক আমল করবে আমি তাকে পুরস্কৃতও করব দ্বিগুণভাবে। আমি তার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি সম্মানজনক জীবিকা। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৩০-৩১)
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا
অর্থ: হে নবীপত্নীগণ, তোমরা আর দশটা সাধারণ নারীর মতো নও। তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তা হলে কথায় নমনীয়তা বর্জন করো। কেননা, এতে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা (অর্থাৎ মুনাফিকরা) লালায়িত হয়। তবে তোমরা অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত কথা বলো। তোমরা তোমাদের ঘরেই স্থিরচিত্তে অবস্থান করো। জাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শনে বের হয়ো না। সালাত কায়েম করো। যাকাত আদায় করো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থেকো। হে নবীপরিবার, আল্লাহ তো এটাই চান যে, তিনি তোমাদের থেকে অকল্যাণ রোধ করবেন এবং তোমাদের রাখবেন পবিত্র। তোমাদের ঘরে ঘরে আল্লাহর যে বাণীগুলো এবং জ্ঞানের যে কথাগুলো আলোচনা করা হয়, সেগুলো স্মরণ রেখো। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী ও মহাপ্রজ্ঞাবান। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৩২-৩৪)
নিঃসন্দেহে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর পুরো জীবন ছিল কুরআনের এই আয়াতগুলোর জীবন্ত তাফসীর।