📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হলেন

📄 রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হলেন


একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সঙ্কটময় পরিস্থিতি হলো বৈধব্য। হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স মাত্র আঠারো বছর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পরপারের যাত্রী। এই দুই মানব-মানবীর মধ্যে যে প্রেম আর ভালোবাসা ছিল তা সূর্যের আলোর মতোই স্বচ্ছ। সর্বত্র প্রকট। সফর ১১ হিজরী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে এলেন। তিনি তখন মাথার ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তুমি আমার উপস্থিতিতে মৃত্যুবরণ করতে, তা হলে নিজ হাতে তোমার কাফন দাফনের ব্যবস্থা করতাম। এই হাত দুটো তুলে তোমার জন্য দুআ করতাম। হযরত আয়েশা রাযি. তৎক্ষণাত বলে উঠলেন, এমন দরদ বুঝি এজন্য যে, এই ঘরে কোনো নতুন বিবি আসবে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মাথার যন্ত্রণার কথা জানালেন, নিজের মাথায় হাত রাখলেন এবং বললেন, না আয়েশা, বরং আমার মাথায়ই প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। ওহ, আমার মাথাটা গেল! ... রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হলেন। এবং এটাই ছিল তাঁর মৃত্যুরোগ।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহে

📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহে


হযরত মাইমুনা রাযি.-এর ঘরে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিছানাগত হয়ে পড়লেন। এহেন পরিস্থিতিতেও তিনি স্ত্রীদের মনযোগানো ভুললেন না। নিয়মমাফিক একদিন একদিন করে সকলের ঘরে থাকা অব্যাহত রাখলেন। কিন্তু সবসময় জিজ্ঞেস করতেন, আগামীকাল কোথায় থাকব? পবিত্র স্ত্রীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনোবাঞ্ছা বুঝতে পারলেন। সবার সম্মতিতে তাঁকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহে আনা হলো। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনোবাঞ্ছার কারণ অনেকেই ভাববেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু না, বিষয়টি এমন নয়। পূর্বে আলোচিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা হযরত আয়েশা রাযি. -কে স্বভাবগতভাবেই একরকম পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতা দান করেছিলেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তির প্রখরতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ছিল সবার থেকে আলাদা। ফিকীহ ইজতিহাদ, ইসতিদাদ ও ইসতিমবাত-ই তা প্রমাণ করে। যদি বলা হয়—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তের কথা, কাজ ও দিক- নির্দেশনাগুলো, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুষঙ্গগুলো তাঁর উম্মতের জন্য হুবহু সংরক্ষিত হোক, তা হলে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। বাস্তবতাও তা-ই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু-সম্পর্কিত অধিকাংশ বিশুদ্ধ বর্ণনাই উম্মত পর্যন্ত পৌঁছেছে এই মহীয়সী মানবীর কল্যাণেই।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত আবু বকর রাযি.-এর ইমামতি

📄 হযরত আবু বকর রাযি.-এর ইমামতি


দিন দিন অসুস্থতা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকল। এমনকি ইমামতির জন্য মসজিদে আসাও সম্ভব হলো না। পবিত্র স্ত্রীগণ প্রিয়তম জীবনসঙ্গীর সেবাযত্নকে পরম সৌভাগ্য জ্ঞান করলেন। কিছু দুআ ছিল, যেগুলো পড়ে পড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তির গায়ে ফুঁক দিতেন। হযরত আয়েশা রাযি.-ও দুআগুলো পড়ে পড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ফুঁক দিচ্ছিলেন।
ফজরের জামাতের জন্য সাহাবা কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপেক্ষায় ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকবার উঠে আসার চেষ্টা করলেন; কিন্তু পারলেন না। অবশেষে হযরত আবু বকর রাযি.-কে ইমামতি করার নির্দেশ দিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আমার মনে হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জায়গায় যে ব্যক্তি দাঁড়াবে লোকে তাকে অপয়া বলবে। তাই আরজ করলাম-হে আল্লাহর রাসূল, আবু বকর (রাযি.) খুবই নরম প্রকৃতির।’ তাঁকে দিয়ে হবে না। তিনি কাঁদবেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় একই নির্দেশ দিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. উপায় না পেয়ে হযরত হাফসা রাযি.-এর দিকে তাকালেন, তিনি যদি রাসূলকে বোঝাতে পারেন-এ আশায়। হযরত হাফসা রাযি.-ও যখন অনুরোধ করলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা নারীরাই ভ্রাতা ইউসুফকে ফাঁসাতে চেয়েছিলে না! বলে দাও, যেন আবু বকরই ইমামতি করেন। শেষমেশ হযরত আবু বকর রাযি.-ই ইমামতি করলেন।
অসুস্থ হবার পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু আশরাফি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে রেখে ভুলে গিয়েছিলেন। মনে পড়ামাত্রই বললেন, আয়েশা, আশরাফিগুলো কোথায়? ওগুলো আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দাও। মুহাম্মাদ কি গাফেল অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে আশরাফিগুলো ওই মুহূর্তেই সদকা করে দেওয়া হলো।

টিকাঃ
১. হযরত আবু বকর রাযি. এমনিতেই নামাযে খুব কাঁদতেন। আর এরকম কঠিন মুহূর্তে কান্না আসা আরও স্বাভাবিক। সুতরাং এমন মন্তব্য অনর্থক নয়। সহীহ বুখারী: হিজরত অংশটি দ্রষ্টব্য।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬২।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোলে মাথা রেখে

📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোলে মাথা রেখে


একেবারে শেষ মুহূর্তের কথা। হযরত আয়েশা রাযি. বসা ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর সিনায় হেলান দিয়ে বসানো হয়েছে। এরই মধ্যে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হযরত আবদুর রহমান রাযি. মেসওয়াক নিয়ে ভেতরে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেসওয়াকের দিকে তাকালেন। হযরত আয়েশা রাযি. বুঝতে পারলেন যে, রাসূল মেসওয়াক করতে চাইছেন। তিনি ভ্রাতার হাত থেকে মেসওয়াকটি নিলেন এবং নিজের দাঁত দিয়ে চিবিয়ে নরম করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষের মতো মেসওয়াক করলেন। হযরত আয়েশা রাযি. গর্ব করে বলতেন—পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে শুধু আমারই এই সৌভাগ্য হয়েছে যে, জীবনের শেষ মুহূর্তটিতেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মুখের ঝুটা নিজের মুখে লাগিয়েছিলেন।
হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্থতার জন্য দুআ করছিলেন। রাসূলের হাত তাঁর হাতের মধ্যে ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হঠাৎ হাত সরিয়ে নিলেন এবং বললেন— اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَاجْعَلْنِي مَعَ الرَّقِيقِ الْأَعْلَىঅর্থ : হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে মিলিত করুন।
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, সুস্থ থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, মৃত্যুর সময় নবীদের দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের উচ্চারিত শব্দগুলো শুনে আমি ভেঙে পড়লাম। কেননা আমি নিশ্চিত হলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে বিদায় নিতে চলেছেন।
হযরত আয়েশা রাযি. অল্পবয়স্কা ছিলেন। তখন পর্যন্ত কাউকে নিজের চোখে মারা যেতে দেখেননি। তিনি আরজ করলেন—হে আল্লাহর রাসূল, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—কষ্ট যত সওয়াবও তত। তখন পর্যন্ত হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধরে থাকতে পেরেছেন। তেমন ভারী লাগেনি। কিন্তু হঠাৎ খুব ভার মনে হলো। চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি খুব ধীরস্থিরভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মস্তক মোবারক কোলে রাখলেন। তিনি বাকরুদ্ধ হলেন। বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা মোচড় মেরে উঠল। ব্যর্থ হলেন অশ্রুঢলকে বাঁধ মানাতে।

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম : কিতাবুস সালাম, বাব ইস্তিখবাব রুকইয়াতিল মারীদ ক্রম : ৫৭07। মুসনাদে আহমদ : খণ্ড, পৃষ্ঠা : ১৬২।
২. মুসনাদে আহমদ : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২৭৪। যে অংশগুলোর সূত্র দেওয়া হয়নি সেগুলো সহীহ বুখারী— (বাব ওয়াফাতি ন্নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে নেওয়া।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00