📄 জীবনের সঙ্কটময় মুহূর্তে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে গেলেন। তিনি উপুড় হয়ে বিছানায় পড়ে থেকে কাঁদছিলেন। নিষ্কলঙ্ক মাতৃমুখ অশ্রুজলে একাকার হয়ে আছে। ডানে-বামে পিতা-মাতা সান্ত্বনার ভাব ও ভাষাপ্রয়োগে ব্যর্থ হয়ে কাঠ হয়ে গেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর পাশে বসলেন। সান্ত্বনার শীতল প্রলেপ বুলিয়ে অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বললেন—আয়েশা, যদি ভুল করে থাক তা হলে তওবা করো, আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি নির্দোষ হও তা হলে আল্লাহই তোমার পবিত্রতা প্রমাণ করবেন।
হযরত আয়েশা রাযি. আশা করলেন, হয়তো মা-বাবা তাঁর হয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু তারা কিছুই বললেন না। তিনি বলেন—এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে হঠাৎ আমার অশ্রু থেমে গেল। চোখে এক ফোঁটা জলও নেই। নিজের পবিত্রতার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসে হৃদয় ও আত্মা শান্ত হয়ে গেল। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায় অভিমান করে জবাব দিলেন এভাবে—যদি অপরাধ স্বীকার করে নিই, অথচ আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ; তা হলে এই মিথ্যা অপবাদের সত্যতা নিয়ে কে সন্দেহ করবে? আর যদি অস্বীকার করি তবে কে-ইবা বিশ্বাস করবে? আমার অবস্থা তো এখন ইউসুফের বাপের মতো (তিনি বলেন—ওই সময় চেষ্টা করেও হযরত ইয়াকুব আ.-এর নাম মনে করতে পারিনি), যিনি বলেছিলেন—
فَصَبْرٌ جَمِيلٌ
এখন ধৈর্যই আমার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন।
📄 মুনাফিকরা মূলত কী চেয়েছিল
মৌলিকভাবে যে স্বার্থগুলো চরিতার্থ করার জন্য কপটশ্রেণি আলোচ্য ফেতনার পাঁয়তারা করেছিল সেগুলো হলো : ১. নবী ও সিদ্দীক—এই মহিমান্বিত নামগুলোর অপমান করা। ২. নবীপরিবারে বিভেদ সৃষ্টি করা। ৩. ইসলামের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক শক্তিকে খর্ব করা।
এত দিনে মুনাফিরা তাদের উদ্দেশ্যে অনেকটা সফলও হয়েছে। তাদের বিধ্বংসী প্রচেষ্টাগুলো পরিস্থিতিকে যৎপরনাস্তি ঘোলাটে করে দিয়েছে।
📄 পবিত্রতা ঘোষিত হলো পবিত্র কুরআনে
সত্যিই, অদৃশ্য জগতের নিয়ন্তা যিনি, তাঁর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ ছাড়া সঙ্কট থেকে উত্তরণের আর কোনো উপায় ছিল না। এবার সময় হয়েছে—তিনিই কিছু বলার, সাত আসমানের ওপার থেকে উম্মুল মুমিনীনের পবিত্রতা ঘোষণা করার। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ওহী অবতরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর মাথা তুললেন। ললাটে মুক্তো দানার মতো ঘাম চকচক করছিল। তিনি এই আয়াতে কারীমাগুলো তেলাওয়াত করলেন:
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: নিঃসন্দেহে যারা অপবাদ আরোপ করেছে, তারা তোমাদেরই একটি ক্ষুদ্র দল। বিষয়টিকে তোমরা অনিষ্ট জ্ঞান কোরো না; বরং এ তোমাদের জন্য কল্যাণ। প্রত্যেকের পাপ তার নিজেরই ওপর বর্তাবে। কিন্তু যে হোতা ছিল, তার জন্য রয়েছে মহা শান্তি। মুমিন-মুমিনারা অপবাদ শুনে নিজেদের ব্যাপারে যদি ভালো ধারণা করত, তবে কত ভালো হতো! কত ভালো হতো, যদি তারা বলত, এ তো সুস্পষ্ট অপবাদ। যারা অপবাদ আরোপ করেছে, তারা অন্তত চারজন সাক্ষী আনুক! তারা তো কোনো সাক্ষী আনতে পারেনি। পারবেও না। কেননা, আল্লাহ জানেন, তারা মিথ্যাবাদী। যদি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ না হতো, তা হলে তোমরা যে দোষচর্চা করেছ তাতে বিরাট আজাবে পাকড়াও হতে। যে ব্যাপারে তোমাদের বাস্তবতা জানা নেই, শুধু কানে শুনেই বলে বেড়াতে লাগলে! তোমরা একে তুচ্ছ ভাবলেও আল্লাহর কাছে এটা বিরাট অপরাধ। তোমরা যখন অপবাদটা শুনলে অন্তত এটুকু বলতে পারতে, এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলা যাবে না। আল্লাহ চিরপবিত্র। এটা একটা মহা অপবাদ। আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, যদি মুমিন হয়ে থাক, তা হলে আর কখনো এমন কোরো না। যারা মুমিনদের মধ্যে পাপাচার ছড়াতে চায়, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। আল্লাহ জানেন। তোমরা জানো না। (সূরা নূর, আয়াত: ১১-১৯)
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থ: নিঃসন্দেহে যারা সতীসাধ্বী ভোলাভালা মুমিনাদের ওপর অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়াতেও অভিশপ্ত, আখেরাতেও অভিশপ্ত। তাদের জন্য রয়েছে বিরাট আজাব। যেদিন তাদের হস্তপদ, তাদের জিহ্বা তাদের বিরুদ্ধে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। (সূরা নূর, আয়াত : ২৩-২৪)
জনমদুখিনী মায়ের বুক ভরে গেল, আনন্দে অশ্রুসজল হলেন, বললেন-যাও মা, পবিত্র জীবনসঙ্গীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। হযরত আয়েশা রাযি. নারীসুলভ অভিমানের সঙ্গে বললেন-আমি কেবল আমার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারি, অন্য কারও অনুগ্রহের পাত্রী আমি নই।
এরপর অপবাদআরোপকারী ওই তিন অপরাধীকে ঐশী বিধান মোতাবেক আশিটা করে চাবুকাঘাত করা হলো। পরবর্তীতে হযরত হাসান রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর সম্মানে বেশ কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন-বলা যায়, কাফফারাস্বরূপ। ইবনে ইসহাক সীরাতে সেই কবিতা-পঙ্ক্তিগুলোর উল্লেখ করেছেন। বুখারী শরীফে এসেছে হযরত হাসান রাযি. স্বরচিত কয়েকটি পঙ্ক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-কে শুনিয়েছিলেন। তিনি যখন নিম্নোক্ত পঙক্তিটি বলেছিলেন-
حَصَانٌ رَزَانٌ مَا تُزَلُّ بِرِيْبَةٍ * وَتُصْبِحُ غَرْثَى مِنْ لُحُوْمِ الْغَوَافِلِ
অর্থ: তিনি পবিত্র, ধৈর্যশীলা, নিষ্কলঙ্ক-নির্দোষ। সরলা নারীকে দোষারোপ করা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
তখন হযরত আয়েশা রাযি. বলেছিলেন—সত্য বলেছ, কিন্তু তুমি এমন মানুষ ছিলে না। অপবাদ আরোপের ক্ষেত্রে তার জড়িত থাকার বিষয়ে ইঙ্গিত করতেই হযরত আয়েশা রাযি. কথাটি বলেছিলেন।
টিকাঃ
১. সবগুলো ঘটনা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-তাওবা অধ্যায়ে সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। ইমাম বুখারী রহ. বিশদ ও সংক্ষিপ্তাকারে বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনাগুলোকে তুলে ধরেছেন। কিতাবুশ শাহাদাহ, কিতাবুল জিহাদ, তাফসীর-সূরা নুর, গাযওয়ায়ে বনু মুসতালিক ইত্যাদি অংশে বিশদ বিবরণ আছে। অতিরিক্ত তথ্য যেগুলো অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে এসেছে, ফাতহুল বারী-সূরা নূরের তাফসীর থেকে নেওয়া হয়েছে। বাহ্যত স্ববিরোধী তথ্যোপাত্তের সমন্বয়, ঘটনাপ্রবাহের ধারাবিন্যাস, অর্থ ও মর্মের শুদ্ধ্যশুদ্ধি-ইত্যাদি বিষয়ে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ.-এর অনুসরণ করা হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুত তাফসীর, ক্রম: ৪৭৫৫।
📄 উহুলিয়াম যেইবারের বক্তব্য এবং কিছু কথা
স্যার উইলিয়াম মেইবার লাইফ অব মুহাম্মাদ গ্রন্থে ইফকের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আশ্চর্য ও অদ্ভুত সব ঐতিহাসিক ও সাহিত্যগত ভুলের শিকার হয়েছেন। আমার এ গ্রন্থের সঙ্গে যেসব ভুলের কোনো সম্পর্ক নেই, সেগুলোর সমালোচনা করারও প্রয়োজন নেই। তবে দু-একটি ভুলের উদাহরণ উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি বর্ণনা করেছেন:
'বনু মুসতালিকের বিরুদ্ধে প্রেরিত অভিযান মদীনায় ফিরে এলে হযরত আয়েশার হাওদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে মসজিদে নববীর দরজা বরাবর অধিষ্ঠিত করা হয়। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে হাওদা উন্মুক্ত করে দেখা গেল ভেতরে কেউ নেই। একটু পরেই সাফওয়ান নামক জনৈক মুহাজির লোকসম্মুখে এলেন। উটের ওপর ছিলেন আয়েশা আর আগে আগে আসছিলেন সাফওয়ান।'
স্যার উইলিয়াম মেইবার আরও আগে বেড়ে লিখেছেন: 'সাফওয়ান অনেক তড়িঘড়ি করেও কাফেলাকে ধরতে অসমর্থ হয়েছিলেন। তাই কাফেলা অবতরণের পর তাঁবু গেড়ে ফেললে আয়েশা সাফওয়ানের পথ-নির্দেশে জনসমক্ষে মদীনায় প্রবেশ করেন।'
উপর্যুক্ত দুটো বর্ণনাই হাদীস ও সিয়ারের সমস্ত গ্রন্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি যে চিত্রটি তুলে ধরতে চেয়েছেন তাতে তার অসৎ উদ্দেশ্যই প্রতীয়মান হয়। কেননা সকল প্রামাণ্যগ্রন্থ প্রমাণ করে যে, হযরত সাফওয়ান রাযি. কয়েক ঘণ্টা পর দুপুরের দিকে কাফেলাকে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। বস্তুত এ মদীনার কথাই নয়।
অপবাদ আরোপের বিষয়ে হযরত হাসান রাযি.-এর অতি উৎসাহ সাহাবা কেরামকে মর্মাহত করেছিল। তাঁরা হযরত হাসান রাযি.-কে সর্বদা ঘৃণা ও নিন্দার সঙ্গে স্মরণ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. তাকে কখনোই কিছু বলতে যাননি। অগোচরেও কিছু বলে ফেলেননি; বরং কেউ মন্দ কিছু বললে তিনি বাধা দিতেন।
এর কারণও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বিবৃত হয়েছে। হযরত হাসান রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কাফেরদের নিন্দাকবিতার সক্ষম জবাব দিতে পারতেন। এটাই ছিল তাঁর প্রতি হযরত আয়েশা রাযি.-এর ধৈর্য ও ঔদার্যপ্রদর্শনের একমাত্র কারণ। কিন্তু তেরোশো বছর পর নতুন যুগে নতুন ঐতিহাসিক ও নতুন গবেষক বের হয়েছেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে! স্যার উইলিয়াম মেইবার লিখেছেন:
'হাসান অবস্থা প্রতিকূল বুঝে কাব্যের গতি পাল্টালেন। তিনি অতি চমৎকার কবিতা রচনা করলেন। তাতে আয়েশার পবিত্রতা, সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা, নিখুঁত কমনীয় দেহের প্রশংসা ছিল। তোষামোদে ভরা স্তুতিকাব্য আয়েশা ও হাসানের মনোমালিন্য দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করল।'
যদি বৃটেনের 'মহামতি' প্রাচ্যবিদ দয়া করে আমাদেরকে বলতেন যে, স্তুতিকাব্যের কোন পঙক্তিতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও নিখুঁত কমনীয় দেহের কথা আছে! হয়তো নতুন যুগের নতুন গবেষকের এও জানা নেই যে, হযরত আয়েশা রাযি.-কে যখন হযরত হাসান রাযি.-এর স্তুতিকাব্য শোনানো হয়েছিল, তখন তাঁর বয়স প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গিয়েছিল। তখন তাঁর শরীর নিখুঁত কমনীয় কেমন করে হয়? পনেরো-ষোলো বছর বয়সেই তো তাঁর শরীর ভারী হয়ে গিয়েছিল!
স্যার উইলিয়াম মেইবারের প্রাচ্য-পণ্ডিতি ও আরবী ভাষাজ্ঞানের আরও অদ্ভুত ও হাস্যকর উদাহরণ আছে। তিনি লিখেছেন: 'আলোচ্য পঙক্তিতে হযরত আয়েশার দেহসৌষ্ঠব স্তাবকতা লাভ করেছে। নিখুঁত কমনীয় দেহের প্রতি যেহেতু তার ভীষণ গর্ব ছিল, সেহেতু পঙ্ক্তিটি শুনে তিনি অতিমাত্রায় উৎসাহিত হয়ে পড়েন। এমনকি উৎসাহের আতিশয্যে কবিকে থামিয়ে গর্ব করে বলেন—‘কিন্তু তুমি তো এমন নও।’
আমরা ইসলামের ইতিহাসের নথিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ একটিও ঘাঁটা বাকি রাখিনি। কিন্তু কোথাও হযরত আয়েশা রাযি.-এর এমন মানসিকতার পরিচয় পাইনি। তাঁর দেহসৌষ্ঠব স্তাবকতা লাভ করেছে এমন উদাহরণও খুঁজে বের করা আমাদের জন্য অসম্ভব প্রমাণিত হয়েছে। অগত্যা স্বয়ং স্যার উইলিয়ামের লিখিত বক্তব্য নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। শেষমেশ দেখা গেল, ভুত সর্ষের ভেতরই। আসলে এ কোনো আরব্য বিবরকের বর্ণনাগত ত্রুটি নয়; বরং ইউরোপের শ্রেষ্ঠ আরবী- ভাষাবিজ্ঞানী স্যার উইলিয়ামের জ্ঞানগত ত্রুটি। গোলমাল পাকিয়েছে হযরত হাসান রাযি.-এর স্তুতিকাব্যের একটি পঙক্তি:
وَتُصْبِحُ غَرْثَى مِنْ لُحُومِ الْغَوَافِلِ
অর্থ: তিনি সরলা নারীর ‘গোশত খান না’।’
আরবী বাগধারায় ‘কারও গোশত ভক্ষণ করা’ কথাটি পশ্চাতে তার গীবত করা, সমালোচনা করা, দোষচর্চা করা, অপবাদ আরোপ করা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত। হযরত হাসান রাযি.-এর উদ্দেশ্য ছিল এ কথা বলা যে, হযরত আয়েশা রাযি. কখনো কোনো নারীর গীবত ও দোষচর্চা করতেন না। এ কথা শুনে হযরত আয়েশা রাযি. দুঃখ করে বলেছিলেন—কিন্তু হে হাসান, তুমি তো এমন নও। অর্থাৎ তুমি ভোলাভালা সহজ সরল নারীর গীবত ও দোষচর্চায় লিপ্ত হয়েছিলে। তিনি ইফকের ঘটনায় হযরত হাসান-এর জড়িত থাকার প্রতি ইঙ্গিত করার জন্য এ কথা বলেছিলেন। এতে উম্মুল মুমিনীনের মনের কোণে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত ব্যথা ও বেদনাই ফুটে উঠেছে। তাঁর কথার অর্থ আদৌ এটা ছিল না, আমি চিকন-চাকন সুন্দর; কিন্তু তুমি মোটাসোটা অসুন্দর— নাউজুবিল্লাহ। এমন মুর্খসুলভ অদ্ভুত পণ্ডিতি ইউরোপের আজব দেশের আজব লোকেরা দেখাতেই পারেন!
কিন্তু তারপরও স্যার উইলিয়াম মেইবারের প্রতি আমাদের এজন্য কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর প্রতি যে অপবাদ আরোপিত হয়েছিল তার অসারতা তিনি নিজেও অস্বীকার করতে পারেননি। আলোচনার যবনিকায় তিনিও লিখেছেন—
‘হযরত আয়েশার পূর্বাপরের জীবনচরিত আমাদের আশ্বস্ত করে যে, তিনি সম্পূর্ণই নির্দোষ ছিলেন।’
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর—সূরা নুর। মানাকিবে হাসান রাযি.।
২. সুনানে আবু দাউদ : باب السبق على الرجل
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুত তাফসীর।