📄 রাসুলের ভাষণ এবং আওস-খাযরাজ দ্বন্দ্ব
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সাহাবীকে মসজিদে নববীতে একত্র করে সংক্ষেপে নবীপরিবারের পবিত্রতা তুলে ধরলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নীচতা ও নিকৃষ্টতার কথাও স্মরণ করালেন। এরপর বললেন-হে আমার মুসলমান ভাইয়েরা, এহেন ইতরকে আমার পক্ষ থেকে কে শায়েস্তা করতে পারে, যার ব্যাপারে আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, সে আমার পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ করে? আওসের গোত্রপতি হযরত সাদ ইবনে মুআয রাযি. দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বজ্রকণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন-আমি, হে আল্লাহর রাসূল। যদি সে ইতর আমাদের আওস গোত্রের হয়, তা হলে এখনই তার গর্দান উড়িয়ে দেব। আর যদি আমাদের মিত্র খাযরাজ গোত্রেরও হয়, তবু আপনি শুধু আদেশ দিন, আপনার আদেশ শিরোধার্য।
আওস ও খাযরাজের পারস্পরিক বিদ্বেষ ও কথায় কথায় যুদ্ধপ্রবণতা ছিল বংশপরম্পরাগত। ইসলাম সেই অনভিপ্রেত অগ্নিকে নির্বাপিত করেছিল ঠিকই; কিন্তু ছাইয়ের নিচে চাপাপড়া জ্বলন্ত অঙ্গার তখনো ছিল। সামান্য ফুৎকারেও সে অঙ্গার দাউদাউ করে জ্বলে উঠত। খাযরাজের গোত্রপতি সাদ ইবনে উবাদা রাযি. আওসের গোত্রপতির উৎসাহকে ধৃষ্টতা জ্ঞান করলেন। তিনি ভাবলেন, আওস গোত্রপতি নিজ গোত্রের ব্যাপারে যা-তা করতে পারেন, বলতে পারেন; কিন্তু অন্য গোত্রের ব্যাপারে নাক গলানোর অধিকার তার নেই। খাযরাজের ব্যাপারে যা বলার খাযরাজ গোত্রপতিই বলবেন, তিনি এ ব্যাপারে কথা বলার কে? তা ছাড়া ঘটনাচক্রে সেই ইতর খাযরাজ গোত্রের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল। আর হযরত হাসান ইবনে সাবিত রাযি.-এর মামলা তো মিটেই গেছে। তাই তিনি হযরত সাদ ইবনে মুআয রাযি.-কে সম্বোধন করে বললেন-কিন্তু আপনি তো হত্যা করতে পারবেন না, কারণ সে অধিকার আপনার নেই। সঙ্গে সঙ্গে ইবনে মুআয রাযি.-এর চাচাতো ভাই উসায়েদ ইবনে হুযায়ের রাযি. কথা ধরলেন। তিনি বলে উঠলেন-হে সাদ, এ তো মুনাফিকি! আপনি মুনাফিকদের পক্ষ নিচ্ছেন কী করে? ... ব্যস, গোলমাল পাকিয়ে গেল! তুমুল বাগ্বিতণ্ডা থেকে অস্ত্র ধারণের উপক্রম হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে চুপ করালেন। আলোচনা এভাবেই সমাপ্তি পেল।
📄 জীবনের সঙ্কটময় মুহূর্তে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে গেলেন। তিনি উপুড় হয়ে বিছানায় পড়ে থেকে কাঁদছিলেন। নিষ্কলঙ্ক মাতৃমুখ অশ্রুজলে একাকার হয়ে আছে। ডানে-বামে পিতা-মাতা সান্ত্বনার ভাব ও ভাষাপ্রয়োগে ব্যর্থ হয়ে কাঠ হয়ে গেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর পাশে বসলেন। সান্ত্বনার শীতল প্রলেপ বুলিয়ে অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বললেন—আয়েশা, যদি ভুল করে থাক তা হলে তওবা করো, আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি নির্দোষ হও তা হলে আল্লাহই তোমার পবিত্রতা প্রমাণ করবেন।
হযরত আয়েশা রাযি. আশা করলেন, হয়তো মা-বাবা তাঁর হয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু তারা কিছুই বললেন না। তিনি বলেন—এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে হঠাৎ আমার অশ্রু থেমে গেল। চোখে এক ফোঁটা জলও নেই। নিজের পবিত্রতার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসে হৃদয় ও আত্মা শান্ত হয়ে গেল। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায় অভিমান করে জবাব দিলেন এভাবে—যদি অপরাধ স্বীকার করে নিই, অথচ আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ; তা হলে এই মিথ্যা অপবাদের সত্যতা নিয়ে কে সন্দেহ করবে? আর যদি অস্বীকার করি তবে কে-ইবা বিশ্বাস করবে? আমার অবস্থা তো এখন ইউসুফের বাপের মতো (তিনি বলেন—ওই সময় চেষ্টা করেও হযরত ইয়াকুব আ.-এর নাম মনে করতে পারিনি), যিনি বলেছিলেন—
فَصَبْرٌ جَمِيلٌ
এখন ধৈর্যই আমার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন।
📄 মুনাফিকরা মূলত কী চেয়েছিল
মৌলিকভাবে যে স্বার্থগুলো চরিতার্থ করার জন্য কপটশ্রেণি আলোচ্য ফেতনার পাঁয়তারা করেছিল সেগুলো হলো : ১. নবী ও সিদ্দীক—এই মহিমান্বিত নামগুলোর অপমান করা। ২. নবীপরিবারে বিভেদ সৃষ্টি করা। ৩. ইসলামের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক শক্তিকে খর্ব করা।
এত দিনে মুনাফিরা তাদের উদ্দেশ্যে অনেকটা সফলও হয়েছে। তাদের বিধ্বংসী প্রচেষ্টাগুলো পরিস্থিতিকে যৎপরনাস্তি ঘোলাটে করে দিয়েছে।
📄 পবিত্রতা ঘোষিত হলো পবিত্র কুরআনে
সত্যিই, অদৃশ্য জগতের নিয়ন্তা যিনি, তাঁর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ ছাড়া সঙ্কট থেকে উত্তরণের আর কোনো উপায় ছিল না। এবার সময় হয়েছে—তিনিই কিছু বলার, সাত আসমানের ওপার থেকে উম্মুল মুমিনীনের পবিত্রতা ঘোষণা করার। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ওহী অবতরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর মাথা তুললেন। ললাটে মুক্তো দানার মতো ঘাম চকচক করছিল। তিনি এই আয়াতে কারীমাগুলো তেলাওয়াত করলেন:
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: নিঃসন্দেহে যারা অপবাদ আরোপ করেছে, তারা তোমাদেরই একটি ক্ষুদ্র দল। বিষয়টিকে তোমরা অনিষ্ট জ্ঞান কোরো না; বরং এ তোমাদের জন্য কল্যাণ। প্রত্যেকের পাপ তার নিজেরই ওপর বর্তাবে। কিন্তু যে হোতা ছিল, তার জন্য রয়েছে মহা শান্তি। মুমিন-মুমিনারা অপবাদ শুনে নিজেদের ব্যাপারে যদি ভালো ধারণা করত, তবে কত ভালো হতো! কত ভালো হতো, যদি তারা বলত, এ তো সুস্পষ্ট অপবাদ। যারা অপবাদ আরোপ করেছে, তারা অন্তত চারজন সাক্ষী আনুক! তারা তো কোনো সাক্ষী আনতে পারেনি। পারবেও না। কেননা, আল্লাহ জানেন, তারা মিথ্যাবাদী। যদি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ না হতো, তা হলে তোমরা যে দোষচর্চা করেছ তাতে বিরাট আজাবে পাকড়াও হতে। যে ব্যাপারে তোমাদের বাস্তবতা জানা নেই, শুধু কানে শুনেই বলে বেড়াতে লাগলে! তোমরা একে তুচ্ছ ভাবলেও আল্লাহর কাছে এটা বিরাট অপরাধ। তোমরা যখন অপবাদটা শুনলে অন্তত এটুকু বলতে পারতে, এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলা যাবে না। আল্লাহ চিরপবিত্র। এটা একটা মহা অপবাদ। আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, যদি মুমিন হয়ে থাক, তা হলে আর কখনো এমন কোরো না। যারা মুমিনদের মধ্যে পাপাচার ছড়াতে চায়, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। আল্লাহ জানেন। তোমরা জানো না। (সূরা নূর, আয়াত: ১১-১৯)
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থ: নিঃসন্দেহে যারা সতীসাধ্বী ভোলাভালা মুমিনাদের ওপর অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়াতেও অভিশপ্ত, আখেরাতেও অভিশপ্ত। তাদের জন্য রয়েছে বিরাট আজাব। যেদিন তাদের হস্তপদ, তাদের জিহ্বা তাদের বিরুদ্ধে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। (সূরা নূর, আয়াত : ২৩-২৪)
জনমদুখিনী মায়ের বুক ভরে গেল, আনন্দে অশ্রুসজল হলেন, বললেন-যাও মা, পবিত্র জীবনসঙ্গীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। হযরত আয়েশা রাযি. নারীসুলভ অভিমানের সঙ্গে বললেন-আমি কেবল আমার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারি, অন্য কারও অনুগ্রহের পাত্রী আমি নই।
এরপর অপবাদআরোপকারী ওই তিন অপরাধীকে ঐশী বিধান মোতাবেক আশিটা করে চাবুকাঘাত করা হলো। পরবর্তীতে হযরত হাসান রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর সম্মানে বেশ কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন-বলা যায়, কাফফারাস্বরূপ। ইবনে ইসহাক সীরাতে সেই কবিতা-পঙ্ক্তিগুলোর উল্লেখ করেছেন। বুখারী শরীফে এসেছে হযরত হাসান রাযি. স্বরচিত কয়েকটি পঙ্ক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-কে শুনিয়েছিলেন। তিনি যখন নিম্নোক্ত পঙক্তিটি বলেছিলেন-
حَصَانٌ رَزَانٌ مَا تُزَلُّ بِرِيْبَةٍ * وَتُصْبِحُ غَرْثَى مِنْ لُحُوْمِ الْغَوَافِلِ
অর্থ: তিনি পবিত্র, ধৈর্যশীলা, নিষ্কলঙ্ক-নির্দোষ। সরলা নারীকে দোষারোপ করা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
তখন হযরত আয়েশা রাযি. বলেছিলেন—সত্য বলেছ, কিন্তু তুমি এমন মানুষ ছিলে না। অপবাদ আরোপের ক্ষেত্রে তার জড়িত থাকার বিষয়ে ইঙ্গিত করতেই হযরত আয়েশা রাযি. কথাটি বলেছিলেন।
টিকাঃ
১. সবগুলো ঘটনা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-তাওবা অধ্যায়ে সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। ইমাম বুখারী রহ. বিশদ ও সংক্ষিপ্তাকারে বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনাগুলোকে তুলে ধরেছেন। কিতাবুশ শাহাদাহ, কিতাবুল জিহাদ, তাফসীর-সূরা নুর, গাযওয়ায়ে বনু মুসতালিক ইত্যাদি অংশে বিশদ বিবরণ আছে। অতিরিক্ত তথ্য যেগুলো অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে এসেছে, ফাতহুল বারী-সূরা নূরের তাফসীর থেকে নেওয়া হয়েছে। বাহ্যত স্ববিরোধী তথ্যোপাত্তের সমন্বয়, ঘটনাপ্রবাহের ধারাবিন্যাস, অর্থ ও মর্মের শুদ্ধ্যশুদ্ধি-ইত্যাদি বিষয়ে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ.-এর অনুসরণ করা হয়েছে।
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুত তাফসীর, ক্রম: ৪৭৫৫।