📄 হযরত যায়নাব রাযি.-এর সাক্ষ্যপ্রদান
পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে একমাত্র হযরত যায়নাব রাযি.-ই হযরত আয়েশা রাযি.-এর সমকক্ষতার দাবি করতেন। আবার কুৎসা-রটকদের মধ্যে তাঁর ছোটবোন হযরত হামনা রাযি.-ও ছিলেন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকেও বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনিও প্রশ্ন শোনামাত্রই কানে আঙুল দিলেন; যেন এমন কথা শোনাও পাপ। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিলেন—আল্লাহর কসম, আয়েশা [রাযি.]-এর ব্যাপারে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু আমি জানি না।
📄 রাসুলের ভাষণ এবং আওস-খাযরাজ দ্বন্দ্ব
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সাহাবীকে মসজিদে নববীতে একত্র করে সংক্ষেপে নবীপরিবারের পবিত্রতা তুলে ধরলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নীচতা ও নিকৃষ্টতার কথাও স্মরণ করালেন। এরপর বললেন-হে আমার মুসলমান ভাইয়েরা, এহেন ইতরকে আমার পক্ষ থেকে কে শায়েস্তা করতে পারে, যার ব্যাপারে আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, সে আমার পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ করে? আওসের গোত্রপতি হযরত সাদ ইবনে মুআয রাযি. দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বজ্রকণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন-আমি, হে আল্লাহর রাসূল। যদি সে ইতর আমাদের আওস গোত্রের হয়, তা হলে এখনই তার গর্দান উড়িয়ে দেব। আর যদি আমাদের মিত্র খাযরাজ গোত্রেরও হয়, তবু আপনি শুধু আদেশ দিন, আপনার আদেশ শিরোধার্য।
আওস ও খাযরাজের পারস্পরিক বিদ্বেষ ও কথায় কথায় যুদ্ধপ্রবণতা ছিল বংশপরম্পরাগত। ইসলাম সেই অনভিপ্রেত অগ্নিকে নির্বাপিত করেছিল ঠিকই; কিন্তু ছাইয়ের নিচে চাপাপড়া জ্বলন্ত অঙ্গার তখনো ছিল। সামান্য ফুৎকারেও সে অঙ্গার দাউদাউ করে জ্বলে উঠত। খাযরাজের গোত্রপতি সাদ ইবনে উবাদা রাযি. আওসের গোত্রপতির উৎসাহকে ধৃষ্টতা জ্ঞান করলেন। তিনি ভাবলেন, আওস গোত্রপতি নিজ গোত্রের ব্যাপারে যা-তা করতে পারেন, বলতে পারেন; কিন্তু অন্য গোত্রের ব্যাপারে নাক গলানোর অধিকার তার নেই। খাযরাজের ব্যাপারে যা বলার খাযরাজ গোত্রপতিই বলবেন, তিনি এ ব্যাপারে কথা বলার কে? তা ছাড়া ঘটনাচক্রে সেই ইতর খাযরাজ গোত্রের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল। আর হযরত হাসান ইবনে সাবিত রাযি.-এর মামলা তো মিটেই গেছে। তাই তিনি হযরত সাদ ইবনে মুআয রাযি.-কে সম্বোধন করে বললেন-কিন্তু আপনি তো হত্যা করতে পারবেন না, কারণ সে অধিকার আপনার নেই। সঙ্গে সঙ্গে ইবনে মুআয রাযি.-এর চাচাতো ভাই উসায়েদ ইবনে হুযায়ের রাযি. কথা ধরলেন। তিনি বলে উঠলেন-হে সাদ, এ তো মুনাফিকি! আপনি মুনাফিকদের পক্ষ নিচ্ছেন কী করে? ... ব্যস, গোলমাল পাকিয়ে গেল! তুমুল বাগ্বিতণ্ডা থেকে অস্ত্র ধারণের উপক্রম হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে চুপ করালেন। আলোচনা এভাবেই সমাপ্তি পেল।
📄 জীবনের সঙ্কটময় মুহূর্তে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে গেলেন। তিনি উপুড় হয়ে বিছানায় পড়ে থেকে কাঁদছিলেন। নিষ্কলঙ্ক মাতৃমুখ অশ্রুজলে একাকার হয়ে আছে। ডানে-বামে পিতা-মাতা সান্ত্বনার ভাব ও ভাষাপ্রয়োগে ব্যর্থ হয়ে কাঠ হয়ে গেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর পাশে বসলেন। সান্ত্বনার শীতল প্রলেপ বুলিয়ে অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বললেন—আয়েশা, যদি ভুল করে থাক তা হলে তওবা করো, আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি নির্দোষ হও তা হলে আল্লাহই তোমার পবিত্রতা প্রমাণ করবেন।
হযরত আয়েশা রাযি. আশা করলেন, হয়তো মা-বাবা তাঁর হয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু তারা কিছুই বললেন না। তিনি বলেন—এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে হঠাৎ আমার অশ্রু থেমে গেল। চোখে এক ফোঁটা জলও নেই। নিজের পবিত্রতার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসে হৃদয় ও আত্মা শান্ত হয়ে গেল। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায় অভিমান করে জবাব দিলেন এভাবে—যদি অপরাধ স্বীকার করে নিই, অথচ আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ; তা হলে এই মিথ্যা অপবাদের সত্যতা নিয়ে কে সন্দেহ করবে? আর যদি অস্বীকার করি তবে কে-ইবা বিশ্বাস করবে? আমার অবস্থা তো এখন ইউসুফের বাপের মতো (তিনি বলেন—ওই সময় চেষ্টা করেও হযরত ইয়াকুব আ.-এর নাম মনে করতে পারিনি), যিনি বলেছিলেন—
فَصَبْرٌ جَمِيلٌ
এখন ধৈর্যই আমার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন।
📄 মুনাফিকরা মূলত কী চেয়েছিল
মৌলিকভাবে যে স্বার্থগুলো চরিতার্থ করার জন্য কপটশ্রেণি আলোচ্য ফেতনার পাঁয়তারা করেছিল সেগুলো হলো : ১. নবী ও সিদ্দীক—এই মহিমান্বিত নামগুলোর অপমান করা। ২. নবীপরিবারে বিভেদ সৃষ্টি করা। ৩. ইসলামের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক শক্তিকে খর্ব করা।
এত দিনে মুনাফিরা তাদের উদ্দেশ্যে অনেকটা সফলও হয়েছে। তাদের বিধ্বংসী প্রচেষ্টাগুলো পরিস্থিতিকে যৎপরনাস্তি ঘোলাটে করে দিয়েছে।