📄 কাফেলা চলে গেল
এদিকে হাওদাবাহকগণ নিয়মমাফিক হাওদা উটের পিঠে চড়ালেন এবং কাফেলার সঙ্গে চলতে লাগলেন। হযরত আয়েশা রাযি. অবশ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই হারটি পেয়ে গেলেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখলেন কেউ নেই, আছে শুধু নির্জনতা-নিস্তব্ধতা। হযরত আয়েশা রাযি. বাধ্য হয়ে সেখানেই চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে রইলেন। ভাবলেন, যখন কাফেলা বুঝতে পারবে, তখন নিশ্চয়ই এখানে ফিরে আসবে।
📄 হযরত সাফওয়ান রাযি. এলেন
সাফওয়ান ইবনে মুআত্তল রাযি. অত্যন্ত বড় মাপের সাহাবী ছিলেন। এই সফরে তিনি সাকাহ হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন অর্থাৎ কাফেলা চলাকালে বা যাত্রাবিরতির স্থানে যদি কাফেলার ছোটখাটো কোনো জিনিস পড়ে যায় বা ভুল করে ফেলে যায়, তা হলে সেগুলো দেখেশুনে নেওয়া এবং সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব তাঁর। এজন্য তিনি অনেক পেছনে ছিলেন। কাফেলার পেছনে থেকে যাত্রাপথের সর্বত্র সজাগ দৃষ্টি দিয়ে খোঁজ করছিলেন আর আসছিলেন। তিনি ভোরের দিকে আলোচ্য স্থানে পৌঁছে গেলেন। দূর থেকে কালো কিছু দেখা যাচ্ছিল। উল্লেখ্য, পর্দার বিধান নাজিল হয়েছে সে বছরই। ইতিপূর্বে তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-কে দেখেছেন। তাই একটু কাছে আসতেই বুঝতে পারলেন, ইনি আর কেউ নন, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.। হযরত আয়েশা রাযি. কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। তাঁকে সজাগ করার জন্য হযরত সাফওয়ান রাযি. উচ্চস্বরে আওয়াজ দিলেন— ইন্না লিল্লাহ! হযরত আয়েশা রাযি. সজাগ ও সতর্ক হলে হযরত সাফওয়ান রাযি. তাঁর উটকে বসালেন এবং অন্যমুখ হয়ে দূরে সরে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. উটে সওয়ার হলেন। হযরত সাফওয়ান রাযি. এসে উটের রশি ধরে মদীনার পথে চলতে লাগলেন। দুপুরবেলা যাত্রাবিরতি হওয়ায় হযরত সাফওয়ান রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-কে নিয়ে কাফেলায় পৌঁছে গেলেন। তখন হযরত সাফওয়ান রাযি. উটের রশি ধরে ছিলেন আর হযরত আয়েশা রাযি. উটের হাওদায় বসা ছিলেন। ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। প্রায় সফরেই এমনটা ঘটে। আজকের রেলগাড়ি-তেলগাড়ির যুগেও এমন ঘটনার সংখ্যা কম নয়।
📄 মুনাফিকদের চক্রান্ত ও অপবাদ
হিন্দুদের সীতার ওপর এবং বনী ইসরাইলের মারইয়াম আ.-এর ওপর যে অগ্নিপরীক্ষা নেমে এসেছিল, ইতিহাসে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটল মাত্র। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ষড়যন্ত্রের জের তখনো কাটেনি। আল্লাহর পানাহ, সে উম্মুল মুমিনীনের পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল। যেখানে-সেখানে যার-তার কাছে অবান্তর সব কথা বলতে লাগল। পবিত্রহৃদয় মুসলিমগণ শোনামাত্রই হতভম্ভ হয়ে কানে আঙ্গুল দিয়ে বলতে লাগলেন—
سُبْحَانَ اللَّهِ! هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ!
আল্লাহ চিরপবিত্র! এ সুস্পষ্ট অপবাদ ছাড়া কিছু নয়।
হযরত আবু আইয়ুব রাযি. তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, উম্মে আইয়ুব, যদি তোমার ব্যাপারে কেউ এমন মন্তব্য করত, তবে কি তুমি মেনে নিতে? তিনি বললেন, আল্লাহ মাফ করুন, কোনো অভিজাত নারীই তা মেনে নিতে পারেন না। হযরত আবু আইয়ুব রাযি. বললেন, হযরত আয়েশা রাযি. তোমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি অভিজাত। তা হলে তাঁর পক্ষে এটা মেনে নেওয়া কী করে সম্ভব?
📄 সাফওয়ান রাযি. বনাম হাসসান রাযি. এবং অন্যান্য
মদীনায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছাড়াও আরও তিনজন এই কুচক্রে জড়িয়ে পড়ে : হাসান ইবনে সাবিত রাযি., হামনা বিনতে জাহশ রাযি. এবং মিসতাহ ইবনে আসাসাহ রাযি.। অথচ প্রথম দুজন সফরে ছিলেনই না।
হযরত হাসসান রাযি.-কে আল্লাহ মাফ করুন, ঘটনার শুদ্ধ্যশুদ্ধি নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা ছিল না; বরং হযরত সাফওয়ান রাযি.-এর বদনামই ছিল তার উপভোগ্য বস্তু। কেননা তিনি ঈর্ষান্বিত ছিলেন—উড়ে এসে জুড়ে বসে কেউ তার চেয়ে অধিক সম্মানী হয় কী করে! তাঁর একটি কবিতায়ও সেই মাতমই মেলে:
أَمْسَى الْجَلَابِيبُ قَدْ عَزُّوا وَقَدْ كَثُرُوا * ابْنُ الْفَرِيعَةِ أَمْسَى بَيْضَةَ الْبَلَدِ
অর্থ: উড়ে এসে জুড়ে বসে নামধামের শেষ নেই ফারিয়া-তনয় ঘরের ছেলে ভ্রুক্ষেপেরও লেশ নেই।
হযরত হামনা রাযি. উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব রাযি.-এর ভগ্নি ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এভাবে জল আরও ঘোলা হলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জায়গাটা তার বোনই দখল করবেন। অবশ্য হযরত মিসতাহ রাযি.-এর বিষয়টি আশ্চর্যজনক। কেননা প্রথমত তিনি হযরত আবু বকর রাযি.-এর ঘনিষ্টজন ছিলেন, দ্বিতীয়ত হযরত আবু bকর রাযি.- এর দান-দক্ষিণায়ই ছিল তার জীবিকা-নির্বাহের বাহ্যিক উপায়।
পৃথিবীতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বস্তু হলো সম্ভ্রম। এ তো সেই অমূল্য হিরে, যাতে পাথর ছুঁড়তে হয় না; পাথর ছুঁলেও টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
যদি কোনো দুষ্টচরিত্র লোক কোনো সম্মানী ব্যক্তির ওপর চরম মিথ্যাও আরোপ করে, তবু তিনি লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা পান না। তিনি হয়তো লজ্জায় পানি হয়ে যান, নয়ত ক্রোধে আগুন হয়ে জ্বলে ওঠেন।
ইসলাম ও মুসলমানদের মারইয়াম (হযরত আয়েশা) তখনো ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অনবহিত ছিলেন। ঘটনাক্রমে কোনো এক রাত্রিতে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে হযরত মিসতাহ রাযি.-এর সম্মানিতা মাতাকে সঙ্গে নিয়ে লোকালয়ের বাইরে চলে যান। পথিমধ্যে মিসতাহ রাযি.-এর মা কিছুতে হোঁচট খান। অবচেতন মনে মুখ ফসকে নিজ পুত্রের জন্য বদদুআ বের হয়। হযরত আয়েশা রাযি. বলে ওঠেন-আশ্চর্য, আপনি একজন সম্মানিত সাহাবীকে গালি দিচ্ছেন! মিসতাহ রাযি.-এর মা সব খুলে বললেন। শোনামাত্রই হযরত আয়েশা রাযি.-এর মাথা ঘুরে উঠল। মুহূর্তেই তাঁর পবিত্র হৃদয় যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তিনি অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়লেন। ইস্তিঞ্জার প্রয়োজনও ভুলে গেলেন। একেবারে স্তব্ধ হয়ে ঘরে ফিরে এলেন। এত বড় ভয়ঙ্কর কথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল, এ কোনো দুঃস্বপ্ন হবে। ... অবশেষে মায়ের কাছে গেলেন। মা সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক আনসারি সাহাবিয়া এসে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ফেলল। আর সন্দেহের অবকাশ কোথায়? হযরত আয়েশা রাযি. কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মাতা-পিতা বুঝিয়েসুঝিয়ে কোনোভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে রেখে গেলেন। এখানে এসে কষ্টের অনুভূতি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। মানুষের মনে এরকম সময়ে অনেক কল্পনা-জল্পনার উদয় হয়। একটুতেই অনেক কিছু ভেবে ফেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইরে থেকে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞেস করেই চলে যেতেন। হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনে হলো, তাঁর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগের সেই স্নেহানুভূতি, প্রেমাবেগ, গুরুত্ববোধ আর নেই। তিনি অনুমতি নিয়ে পিতৃগৃহে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং চলেও গেলেন। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা শুধু কাঁদতেন আর কাঁদতেন। তিনি বলেন—না চোখের পানি বাঁধ মানত, না চোখে এক ফোঁটাও ঘুম আসত। সম্মানিত পিতা অত্যন্ত স্নেহ ও মমতার সঙ্গে বোঝাতেন—এত কাঁদলে তোমার কলজে ফেটে যাবে যে! মা সান্ত্বনা দিতেন আর বলতেন—বেটি, যে নারী স্বামীসোহাগা হয়, তাকে এরকম অনেক কষ্টই স্বীকার করতে হয়।
একবার তো অভিমানে তিনি কসম করে বসলেন যে, কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবেন।
হযরত সাফওয়ান রাযি. যখন হযরত হাসান রাযি.-এর নিন্দাকবিতা সম্পর্কে অবগত হলেন, তখন ক্ষোভে আক্ষেপে কসম করে বললেন, আল্লাহর কসম, আমি জীবনে কখনো কোনো নারীকে স্পর্শও করিনি। তিনি ধৈর্য ধারণ করতে পারলেন না। উন্মুক্ত তরবারি হাতে বের হলেন হযরত হাসান রাযি.-এর খোঁজে। তাকে পেলেই হয়। তিনি ছুটছিলেন আর আবৃত্তি করছিলেন—
تَلَقَّ ذُبَابَ السَّيْفِ مِنِّي فَإِنَّنِي * غُلَامٌ إِذَا هُجِيْتُ لَسْتُ بِشَاعِرِ
অর্থ: কথার ছল নয়, বাহুর বল দিয়ে আমার মোকাবেলা করো। আমি বীরযোদ্ধা, কোনো মিথ্যুক-নিন্দুক কপট-কবি নই।
হযরত সাফওয়ান রাযি.-এর উন্মত্ততা দেখে সাহাবা কেরাম তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ধরে নিয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মার্জনার ব্যবস্থা করেন এবং বিনিময়ে হযরত হাসান রাযি.-কে একটি জায়গির প্রদান করেন।
টিকাঃ
১. ইবনে হিশাম: ইফকের আলোচনা ও দিওয়ানে হাসান রাযি.।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম: ইফকের আলোচনা।