📄 মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রের মানসিকতা
অভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মুনাফিকরা ইতোমধ্যে একাধিকবার কূটচক্রে লিপ্ত হয়। এমনকি, তাদের চক্রান্তে আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণ একপর্যায়ে একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণেরও উপক্রম হয়। শেষমেশ অনেক কষ্টে সমাধান আসে। এই দুষ্টচক্রই আনসার সাহাবীগণকে ইসলামের পক্ষে আর্থিক সমর্থন প্রত্যাহার করতে প্ররোচিত করেছিল। দুষ্টচক্রের হোতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের-কুরআনে বর্ণিত-ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য দেখুন:
لَئِنْ رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ
অর্থ: এবার যদি আমরা মদীনায় ফিরে যেতে পারি তা হলে মদীনার শ্রেষ্ঠজন নিকৃষ্টজনকে বিতাড়িত করবেই করবে। (সূরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৮)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার সাহাবীগণকে একত্র করে বিষয়টি অবহিত করেন। যদিও তারা অপরাধে অংশ নেননি, তবু অনুতপ্ত হলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের প্রতি তাদের অন্তরে ঘৃণার উদ্রেক হলো। স্বয়ং তার পুত্রই ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ছুটে গেলেন এবং পিতার ঘোড়ার লাগাম ধরে পিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-যতক্ষণ আপনি এ কথা স্বীকার না করছেন যে, আপনিই নিকৃষ্টজন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই শ্রেষ্ঠজন, ততক্ষণ আপনার নিস্তার নেই।
টিকাঃ
১. ইবনে সাদ: মাগাযি, পৃষ্ঠা: ৪৫। সহীহ বুখারী ও ফাতহুল বারী: তাফসীর-সূরা মুনাফিকুন। নাসাঈ-র বক্তব্য অনুযায়ী এটা গাযওয়ায়ে তাবুকের ঘটনা। কিন্তু সহীহ বুখারী-তে হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীস-ওই সময় আনসারের চেয়ে মুহাজির কম ছিলেন থেকে মতটির খণ্ডন হয়। ইবনে আবি হাতেম-সহ সকল মাগাযি গবেষক একমত যে, এটা গাযওয়ায়ে মুরাইসির ঘটনা। ফাতহুল বারী: ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৪০৪।
📄 গলার হারটি হারিয়ে গেল
রাত্রিবেলা একটি অজ্ঞাত জায়গায় যাত্রাবিরতি হয়। রাতের শেষভাগে আবার কাফেলা চলতে আরম্ভ করবে করবে—এমন সময় হযরত আয়েশা রাযি. প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দূরে চলে গেলেন। প্রয়োজন সারার পর যখন উঠলেন, তখন হঠাৎ গলায় হাত পড়ল। দেখলেন প্রিয় ভগ্নির কাছ থেকে কর্জ নেওয়া হারটি নেই। তিনি চমকে গেলেন। প্রথমত বয়স কম, দ্বিতীয়ত কর্জ করা জিনিস। হযরত আয়েশা রাযি, হতভম্ব হয়ে হারটি খুঁজতে লাগলেন। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল না বললেই চলে। উপরন্তু তিনি ভেবেছিলেন, যাত্রা আরম্ভের পূর্বেই হারটি খুঁজে পাবেন এবং সময়মতো হাওদায় পৌঁছে যাবেন। তাই কাউকে কিছু বলার প্রয়োজনও মনে করলেন না। তিনি না কাউকে ঘটনাটা জানালেন, না তাঁর জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে গেলেন।
📄 কাফেলা চলে গেল
এদিকে হাওদাবাহকগণ নিয়মমাফিক হাওদা উটের পিঠে চড়ালেন এবং কাফেলার সঙ্গে চলতে লাগলেন। হযরত আয়েশা রাযি. অবশ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই হারটি পেয়ে গেলেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখলেন কেউ নেই, আছে শুধু নির্জনতা-নিস্তব্ধতা। হযরত আয়েশা রাযি. বাধ্য হয়ে সেখানেই চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে রইলেন। ভাবলেন, যখন কাফেলা বুঝতে পারবে, তখন নিশ্চয়ই এখানে ফিরে আসবে।
📄 হযরত সাফওয়ান রাযি. এলেন
সাফওয়ান ইবনে মুআত্তল রাযি. অত্যন্ত বড় মাপের সাহাবী ছিলেন। এই সফরে তিনি সাকাহ হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন অর্থাৎ কাফেলা চলাকালে বা যাত্রাবিরতির স্থানে যদি কাফেলার ছোটখাটো কোনো জিনিস পড়ে যায় বা ভুল করে ফেলে যায়, তা হলে সেগুলো দেখেশুনে নেওয়া এবং সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব তাঁর। এজন্য তিনি অনেক পেছনে ছিলেন। কাফেলার পেছনে থেকে যাত্রাপথের সর্বত্র সজাগ দৃষ্টি দিয়ে খোঁজ করছিলেন আর আসছিলেন। তিনি ভোরের দিকে আলোচ্য স্থানে পৌঁছে গেলেন। দূর থেকে কালো কিছু দেখা যাচ্ছিল। উল্লেখ্য, পর্দার বিধান নাজিল হয়েছে সে বছরই। ইতিপূর্বে তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-কে দেখেছেন। তাই একটু কাছে আসতেই বুঝতে পারলেন, ইনি আর কেউ নন, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.। হযরত আয়েশা রাযি. কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। তাঁকে সজাগ করার জন্য হযরত সাফওয়ান রাযি. উচ্চস্বরে আওয়াজ দিলেন— ইন্না লিল্লাহ! হযরত আয়েশা রাযি. সজাগ ও সতর্ক হলে হযরত সাফওয়ান রাযি. তাঁর উটকে বসালেন এবং অন্যমুখ হয়ে দূরে সরে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. উটে সওয়ার হলেন। হযরত সাফওয়ান রাযি. এসে উটের রশি ধরে মদীনার পথে চলতে লাগলেন। দুপুরবেলা যাত্রাবিরতি হওয়ায় হযরত সাফওয়ান রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-কে নিয়ে কাফেলায় পৌঁছে গেলেন। তখন হযরত সাফওয়ান রাযি. উটের রশি ধরে ছিলেন আর হযরত আয়েশা রাযি. উটের হাওদায় বসা ছিলেন। ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। প্রায় সফরেই এমনটা ঘটে। আজকের রেলগাড়ি-তেলগাড়ির যুগেও এমন ঘটনার সংখ্যা কম নয়।