📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সং সন্তানগণ

📄 সং সন্তানগণ


হযরত খাদীজা রাযি.-এর গর্ভে হযরত আয়েশা রাযি.-এর চারজন সৎ সন্তানের জন্ম হয়েছিল। তাঁরা হলেন-হযরত যায়নাব রাযি., হযরত রুকাইয়া রাযি., হযরত উম্মে কুলসুম রাযি. ও হযরত ফাতেমা রাযি.। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর রোখসতের পূর্বেই হযরত ফাতেমা রাযি. ছাড়া বাকি সবার বিবাহ ও রোখসত হয়ে যায়। তা ছাড়া দ্বিতীয় হিজরীতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর রোখসতের এক বছর পরই হযরত রুকাইয়া রাযি.-এর ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছিল। আর হযরত যায়নাব রাযি. ও হযরত উম্মে কুলসুম রাযি. যথাক্রমে অষ্টম ও নবম হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁরা মোটামুটি সাত আট বছর নবীপরিবারে হযরত আয়েশা রাযি.-এর উপস্থিতিতে জীবিত ছিলেন। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়কালে তাদের মধ্যে পারস্পরিক মনোমালিন্যের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত যায়নাব রাযি.-এর প্রতি

📄 হযরত যায়নাব রাযি.-এর প্রতি


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্যেষ্ঠ কন্যা ছিলেন হযরত যায়নাব রাযি.। তিনি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবৃতি দিয়ে বলেন: সে আমার সবচেয়ে সুপুত্রী ছিল। আমার কারণে সে অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। হযরত যায়নাব রাযি.-এর কলিজার টুকরা ছিলেন হযরত উমামা রাযি.। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে খুবই ভালোবাসতেন। তাঁকে কোলে নিতেন। কাঁধে নিতেন। কোলে নিয়ে মসজিদে যেতেন এবং নামায পড়াতেন। হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণনা করেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে খুবই ভালোবাসতেন। একবার একটি হার উপহার এলে সবাই বলাবলি করল, এটা হযরত আয়েশা রাযি.-ই পাবেন; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারটি হযরত উমামা রাযি.-কে দিয়েছিলেন।

টিকাঃ
১. যুরকানি (তহাবি ও হাকেমের উদ্ধৃতি অবলম্বনে)।
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুস সালাহ।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১০১।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত ফাতেমা রাযি.-এর প্রতি

📄 হযরত ফাতেমা রাযি.-এর প্রতি


হযরত আয়েশা রাযি. যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সান্নিধ্যে এলেন, তখন হযরত ফাতেমা রাযি. কুমারী ছিলেন। তাঁদের বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র পাঁচ ছয় বছরের। আনুমানিক এক বছর বা তারচে কম সময়কাল মা-মেয়ে একসঙ্গে থেকে থাকবেন। দ্বিতীয় হিজরীর ভেতরেই হযরত আলী রাযি.-এর সঙ্গে হযরত ফাতেমা রাযি.- এর বিবাহ হয়। মাতৃসম যে নারীগণ বিবাহের বন্দোবস্ত করেছিলেন, হযরত আয়েশা রাযি. ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তা ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের কারণে তাঁর দায়ভার ও গুরুত্বারোপ ছিল বেশি। নিজ হাতে ঘর লেপন করেছিলেন, বিছানা সাজিয়েছিলেন, খেজুরছাল ধুনে বালিশ বানিয়েছিলেন, ওলিমায় শুকনো খেজুর ও আঙ্গুরের ব্যবস্থা করেছিলেন, পানির মশক ও কাপড় লটকানোর জন্য লাকড়ির আলনা বানিয়েছিলেন। তিনি স্বয়ং বলেন: হযরত ফাতেমা [রাযি.]-এর বিবাহের চেয়ে সুন্দর বিবাহ আর দেখিনি। বিবাহের পর হযরত ফাতেমা রাযি. যেই ঘরে গিয়েছিলেন, সেই ঘর আর হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরের মধ্যে ব্যবধান ছিল শুধু একটি দেয়ালের। মাঝখানে একটি ছোট দরজাও ছিল। ওই দরজা দিয়ে মাঝেমধ্যে কথাবার্তাও হতো।
হাদীসের গ্রন্থসম্ভারে বিশুদ্ধ সনদে একটি ঘটনাও এমন নেই, যা প্রমাণ করে যে, মা-মেয়ের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য ছিল। বরং সকল হাদীস এ কথারই সাক্ষ্য বহন করে যে, তাদের মধ্যে সবসময়ই মিল- মহব্বতের সম্পর্ক ছিল। হযরত ফাতেমা রাযি. স্বামীসংসারে নিজ হাতে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই কোনো দাসীর আবদার নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসেন। কিন্তু সম্মানিত পিতার দেখা না পেয়ে সম্মানিতা মাতাকেই প্রয়োজনের কথা জানিয়ে চলে গেলেন।
পবিত্র স্ত্রীগণ হযরত ফাতেমা রাযি.-কে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিরুদ্ধে বলার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন। তিনি পবিত্র স্ত্রীগণের পক্ষ থেকে আবেদন করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু বলেছিলেন-প্রিয় পুত্রী, আমি যাকে ভালোবাসি, তুমি তাকে ভালোবাসবে না! রাসূলের কথায় হযরত ফাতেমা রাযি. খুবই লজ্জিত হয়েছিলেন। কালক্ষেপণ না করে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসেন। পবিত্র স্ত্রীগণের বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও পুনরায় তাঁদের আবেদন নিয়ে রাসূলের দরবারে যেতে কিছুতেই সম্মত হননি।
মেয়ের প্রশংসা করে মা বলছেন-আমি ফাতেমার চেয়ে ভালো মানুষ আর দেখিনি; অবশ্য তাঁর পিতার কথা আলাদা। জনৈক তাবেঈ হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলেন-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসতেন? হযরত আয়েশা রাযি. উত্তর দিলেন—হযরত ফাতেমা রাযি.-কে। তিনি আরও বলেন—আমি ওঠা-বসা ও চাল-চলনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ফাতেমা রাযি.-এর চেয়ে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ আর কাউকে দেখিনি। যখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আসতেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ দাঁড়িয়ে যেতেন, কপালে চুমু খেতেন এবং নিজের জায়গায় বসতে দিতেন। একইভাবে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে তাশরিফ আনতেন, তখন তিনিও পিতার সৌজন্যে দাঁড়িয়ে যেতেন, পিতাকে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসতে দিতেন। যেই বিশেষ বিশেষ হাদীসগুলোতে হযরত ফাতেমা রাযি.-এর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা এসেছে, সেগুলো হযরত আয়েশা রাযি.-এর সূত্রেই বর্ণিত।
হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণনা করেন, একদিন আমরা পবিত্র স্ত্রীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বসা ছিলাম। এমন সময় হযরত ফাতেমা রাযি. এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই মহব্বতের সঙ্গে তাঁকে ডেকে নিলেন এবং কাছে বসালেন। তারপর কানে কানে কী যেন বললেন। তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁর কান্নাকাতরতা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার কানে কানে কী যেন বললেন। এবার তিনি হাসতে লাগলেন। আমি বললাম, ফাতেমা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্ত্রীকে ছেড়ে আপনাকে তাঁর গোপন কথা বলছেন আর আপনি কাঁদছেন?-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন উঠে গেলেন তখন বিষয়টি জানতে চাইলাম। তিনি বললেন-আমি আমার পিতার গোপন কথা রাষ্ট্র করতে পারি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর আমি আবার কথাটি তুললাম-ফাতেমা, আপনার ওপর আমার যে অধিকার আছে, তার দোহাই দিয়ে বলছি, সেদিনের বিষয়টি আমাকে বলুন। তিনি বললেন-হ্যাঁ, এখন বলতে বাধা নেই। আমার কান্নার কারণ এই ছিল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর আসন্ন মৃত্যুর কথা বলেছিলেন। আর হাসার কারণ এই ছিল যে, তিনি বলেছিলেন- ফাতেমা, তুমি কি এটা চাও না যে, সারা পৃথিবীর সকল নারীর নেত্রী হবে তুমি?
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, মা মেয়ের সম্পর্কটা কত গভীর ও মধুর ছিল। এটা হযরত ফাতেমা রাযি.-এর শেষ জীবনের ঘটনা। সুতরাং এও প্রমাণিত হয় যে, না উত্তরাধিকার ও বিষয়সম্পর্কিত কিছু তাঁদের পবিত্র হৃদয়কে একটুও প্রভাবিত করেছে, না পরিবারজীবনের অন্য কোনো কষ্ট তাঁদের অন্তরকে মলিন করেছে।

টিকাঃ
৩. ইবনে মাজাহ: বাবুল ওয়ালিমা।
৪. খুলাসাতুল অফা: চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
১. সহীহ বুখারী: كتاب الجهاد وباب عمل المرأة في بيت زوجه | মুসনাদ। আবু দাউদ। তয়ালিসি: মুসনাদে আলি রাযি.।
২. সহীহ বুখারী।
٣. معجم الأوسط، الطبراني، على شرط الشيخين .
১. জামে তিরমিযী: বাবুল মানাকিব।
২. সহীহ মুসলিম: কিতাবুল ফাজায়েল।
৩. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম : ا باب من ناجي بين أيدي الندى

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 কয়েকটি বর্ণনা-পর্যালোচনা

📄 কয়েকটি বর্ণনা-পর্যালোচনা


যারা বর্ণনা করেছেন, কোনো এক রাত্রিতে হযরত উম্মে সালামা রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কিঞ্চিৎ কথা কাটাকাটি হয়েছিল, তাঁদের থেকেই মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে, এরপর হযরত উম্মে সালামা রাযি. উঠে হযরত ফাতেমা রাযি.-এর ঘরে যান এবং বলেন—হযরত আয়েশা [রাযি.] তোমার সম্পর্কে এই-সেই বলে। তখন হযরত আলী রাযি.-এর পরামর্শে হযরত ফাতেমা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যান এবং জানান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আল্লাহর কসম, সে তোমার পিতার প্রিয় পাত্রী। হযরত আলী রাযি. বললেন, হযরত আয়েশা [রাযি.] পূর্বে যা বলেছেন, তা যথেষ্ট হয়নি; যখন তিনি এ কথাও বলে দিলেন যে, আল্লাহর কসম, সে তোমার পিতার প্রিয়পাত্রী।
হাদীসটি বাহ্যত হযরত আয়েশা রাযি.-এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করার জন্য আনা হয়েছে। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, অবিবেচক রাবী পবিত্র স্ত্রীগণের চরিত্রমাধুরীতে কী কালিমা লেপন করে ফেলেছেন। আসলে এই লোনা পানির মূল উৎস আলী ইবনে যায়েদ তামিমী—যিনি হাদীসশাস্ত্রের পরিভাষায় যঈফ (দুর্বল), ওয়াহি (অথর্ব), অগ্রহণযোগ্য। শুধু তাই নয়, চিন্তা-চেতনায় তিনি রাফেযিও।
ইয়াহইয়া মুসনাদে ঈসা ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত ফাতেমা রাযি.-এর ঘরের মধ্যে একটি ছোট্ট দরজা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই দরজা থেকে হযরত ফাতেমা রাযি.-এর খোঁজখবর নিতেন। কোনো এক রাত্রিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহে ছিলেন না। হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত ফাতেমা রাযি.-এর মধ্যে একটু কথা কাটাকাটি হয়ে যায়। পরে হযরত ফাতেমা রাযি.-এর আবেদনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরজাটি বন্ধ করে দেন।
ইবনে আবদুল হামিদ ও ঈসা ইবনে আবদুল্লাহ দুজনই এই ঘটনার বর্ণনাকারী। সার্বিক বিবেচনায় তারা যে 'পতিত-রহিত' তা তো আছেই; উপরন্তু শিয়াও বটে। যদিও শাস্ত্রজ্ঞদের নিকট শিয়া হওয়া হাদীস যঈফ হওয়ার কারণ নয়, তবুও এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, অন্তত হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিরুদ্ধে তাদের সাক্ষ্য কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩০।
২. তাহযিবুত তাহযিব। মিযানুল ইতিদাল।
১. খুলাসাতুল অফা: চতুর্থ পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা: ১২৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00