📄 কয়েকটি বর্ণনা এবং সমালোচনা
সাধারণভাবে সারা পৃথিবীতে সতিনদের মধ্যে আন্তরিক ভালোবাসা থাকে না বললেই চলে। কিন্তু নবীপরিবারের অন্তঃপুরিকাগণের কাছে যে নৈতিক গুণাবলি ও চারিত্রিক সৌন্দর্যমাধুরী আশা করা যায়, আল্লাহর প্রশংসা, তাঁরা তাতে অসফল নন। বিভিন্ন ঘটনায় কোথাও কোথাও যে অপ্রিয়তা ও অসুন্দরতা দেখা যায়, তা মূলত কপটাচারীদের বানোয়াটি অথবা অপরিণামদর্শীদের মুর্খসুলভ প্রচেষ্টা। যেমন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে একজন মহিলা ছিল। সিয়ার ও রিজালগ্রন্থগুলোতে তার বৈশিষ্ট্য লেখা হয়েছে: كَانَتْ تُحَرِّشُ بَيْنَ أَزْوَاجِ النِّسَاءِ — সে পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে বিবাদের উস্কানি দিয়ে বেড়াত। কিন্তু নিজের পাপের স্বীকারোক্তিও করত নিজেই। লোকে জিজ্ঞেস করত, তখনকার মানুষ তোমার কথা বিশ্বাস করত কীভাবে? সে বলত, যদি বিশ্বাসই না করত, তা হলে বলতাম কী করে?
এ কথা ঠিক যে, ওপরে যে বর্ণনাগুলো প্রদত্ত হয়েছে অধিকাংশই সিহাহগ্রন্থগুলো থেকেই গৃহীত; তারপরও যেখানে যেখানে সামান্যতম মন্দেরও অবকাশ আছে, যদি সনদ-মতনের গোড়ায় হাত দেওয়া হয়, তা হলে সেগুলোও নড়বড়ে প্রমাণিত হবে। পাত্র ভাঙার ঘটনাটা প্রায় সবগুলো হাদীসগ্রন্থেই আছে। কিন্তু বুখারী ও মুসলিমের কোথাও হযরত আয়েশা রাযি.-এর নাম নেই। আবু দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ এবং আরও বেশ কিছু সাধারণ কিতাবে বর্ণনাকারী হযরত আয়েশা রাযি.-এর নাম উল্লেখ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, সেগুলো স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এরই মৌখিক বর্ণনা হিসেবে গৃহীত। আলোচ্য সূত্রের প্রথম রাবী: জাসরা বিনতে দুজানা। প্রখ্যাত হাদীসবিশারদ আজালি এবং ইবনে হিব্বান তাকে বিশ্বস্ত বললেও ইমাম বুখারীর মন্তব্য: عِنْدَ جَسْرَة عَجَائِبُ —অর্থ : জাসরার বর্ণনায় অদ্ভুত সব কথা পাওয়া যায় (তাহযিব)। ইবনে হাযম জাসরার বর্ণনাকে বলেছেন: بَاطِلٌ —অর্থ : অনর্থক বা অগ্রহণযোগ্য (তাহযিব)।
আলোচ্য সূত্রের দ্বিতীয় রাবী : أفلت عامري বা فليت عامري । দু-একজন হাদীসবিশারদ তাকে বিশ্বস্ত জ্ঞান করলেও অধিকাংশের মন্তব্য দেখুন—
ইমাম আহমাদ : لَا بَأْسَ به-অর্থ : তেমন সমস্যা নেই, চলতে পারে (অর্থাৎ দুর্বল)।
ইমাম আহমাদ : (খাত্তাবি ও বাগাবির বর্ণনানুসারে) مجهول / مجهول لحال। (হাদীসের জগতে অজ্ঞাত)/(হাদীসের জগতে তার অবস্থা পরিজ্ঞাত নয়)।
ইবনে হাযম : অপ্রসিদ্ধ। তার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে তেমন কিছু জানা যায় না। তার একটি বিশেষ হাদীস বাতিল (অনর্থক বা অগ্রহণযোগ্য) বলে গণ্য।
রাত্রিবেলা হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত যায়নাব রাযি.-এর মধ্যে সংঘটিত কথা কাটাকাটির হাদীসটি এসেছে সহীহ মুসলিমে। কিন্তু বাস্তবতা বিচার করুন স্বয়ং নিজেই। হাদীসটির প্রথম রাবী হযরত আনাস রাযি.। পঞ্চম হিজরীর পর থেকে উম্মাহাতুল মুমিনীনের ঘরে যাওয়ার অবকাশ তাঁর ছিল না; অথচ ঘটনাটা পঞ্চম হিজরীর পরের। আবার ঘটেছিল ঘরের ভেতর। নিঃসন্দেহে ঘরের ভেতর হযরত আনাস রাযি. ছিলেন না। এজন্য বর্ণনার ইত্তিসাল বা সংলগ্নতা ও ধারাবাহিকতা শেষ রাবী পর্যন্ত পৌঁছে না। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে তিনি মসজিদে নববীতে ছিলেন আর ঘরের আওয়াজ বাইরে চলে আসছিল বলে তিনি শুনতে পেয়েছিলেন, তা হলে রাতের অন্ধকারে—যেখানে তিনি নিজে অনুপস্থিত, আবার ঘরে আলোরও ব্যবস্থা নেই—তিনি কীভাবে দেখতে পেলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন দিকে হাত বাড়িয়েছেন? আর বাস্তবিকই কী ঘটেছে? সবচেয়ে বড় কথা, হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনের কথাই বা তিনি কী করে বুঝলেন যে, পিতা এসে আমাকে নিশ্চয় ধমক দেবেন? সব মিলিয়ে আলোচ্য বর্ণনায় হাদীস বর্ণনার জন্য যে সাবধানতার অপরিহার্যতা ছিল, তা নেই।
তিরমিযী শরীফে আছে, একবার হযরত সাফিয়্যা রাযি. কাঁদছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন : আমি জানতে পেরেছি, হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত হাফসা রাযি. বলেছেন, তারাই নাকি আপনার কাছে অধিক মর্যাদার; তারা আপনার নিকটাত্মীয়াও বটে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সান্ত্বনা জানালেন এবং বললেন, তুমি বললে না যে, আপনারা আমার চেয়ে অধিক মর্যাদার হন কী করে? আমার স্বামী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমার পিতা হযরত হারুন আলাইহিস সালাম। আমার চাচা হযরত মুসা আলাইহিস সালাম। হাদীসটিকে প্রায় সকল সিয়ারগ্রন্থে আনা হয়েছে। কিন্তু শেষে স্বয়ং ইমাম তিরমিযীর মন্তব্যটি আনা হয়নি:
هَذَا حَدِيثٌ غَرِيْبٌ لَا نَعْرِفُهُ إِلَّا مِنْ حَدِيْثِ هَاشِمِ الْكُوفِي وَلَيْسَ إِسْنَادُه بِذَاكَ
অর্থ : হাদীসটি গরিব (একেবারেই অপরিচিত)। হাশেম কুফির সনদ ছাড়া এর কোনো গোড়া পাওয়া যায় না। আর তার সনদ গ্রহণযোগ্যও নয়।
হাশেম কুফি সম্পর্কে প্রখ্যাত হাদীসবিশারদগণের মন্তব্য-
ইমাম আহমাদ : لا تغرفه-অর্থ: আমি তাকে চিনি না।
ইবনে মাঈন : لَيْسَ بِشَيْئ -অর্থ: ইনি তো গোনায় আসেন না।
আবু হাতিম : ضَعِيفُ الْحَدِيثِঅর্থ: তার হাদীস যঈফ।
ইবনে আদঈ : مِقْدَارُ مَا يَرْوِيهِ لَا يُتَابَعُ عَلَيْهِ অর্থ: তার সাথীরাও তাকে সমর্থন করেননি।
মুসনাদে আহমাদে আছে, একবার রাত্রিবেলা হযরত উম্মে সালামা রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে বসা ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনলেন। তিনি হযরত উম্মে সালামা রাযি.-কে চিনতে পারলেন না। হযরত আয়েশা রাযি. চুপিচুপি ইশারা করছিলেন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারছিলেন না। অবশেষে যখন বুঝতে পারলেন, তখন হযরত উম্মে সালামা রাযি. রেগে গেলেন এবং হযরত আয়েশা রাযি.-কে যা-তা বলে দিলেন। তারপর উঠে হযরত ফাতেমা রাযি.-এর কাছে গেলেন এবং বললেন, আয়েশা [রাযি.] তোমাকে এই-সেই বলে। এই হাদীসের দ্বিতীয় রাবী আলী ইবনে যায়েদ তামিমী। তার ব্যাপারে হাদীসশাস্ত্রবিদগণের মন্তব্য লক্ষ করুন—
ইবনে সাদ : فِيهِ ضُعْفٌ وَلَا يُحْتَجُ بِهِ অর্থ: তার মধ্যে যু'ফ (দুর্বলতা) আছে, তার হাদীস প্রামাণ্য নয়।
ইমাম আহমাদ : لَيْسَ بِالْقَوِيِّ অর্থ : তিনি মজবুত নন। لَيْسَ بِشَيْءٍ অর্থ : তিনি কিছুই নন। ضَعِيفُ الْحَدِيثِ অর্থ : তার হাদীস দুর্বল।
ইমাম ইয়াহইয়া : ضَعِيفٌ ضَعِيفٌ فِي كُلِّ شَيْءٍ অর্থ : তিনি যঈফ, সর্বক্ষেত্রে যঈফ।
ইমাম জাওযানী : وَاهِي الْحَدِيثِ অর্থ : দুর্বল।
ইমাম হাকেম : لَيْسَ بِالْمُعَيْنِ عِنْدَهُمْ অর্থ : হাদীসবিশারদগণের কাছে তিনি শক্তিশালী নন।
ইমাম আবু যুরআ : لَيْسَ بِالْقَوِيِّ অর্থ : তিনি মজবুত নন।
ইমাম বুখারী : لَا يُحْتَجُ بِهِ অর্থ: তার হাদীস কোনো প্রমাণ হতে পারে না।
এ ধরনের দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য অন্যান্য ইমামও করেছেন। তার এক শাগরেদ বলেছেন: তিনি আমাদের একেকদিন একেকরকম বলতেন।
সাধারণ সিয়ারগ্রন্থগুলোতে এ ধরনের আরও অনেক ঘটনা আছে। অধিকাংশই ওয়াকিদী ও কালবির বানোয়াট গল্প থেকে নেওয়া। উদাহরণস্বরূপ এখানে একটি ঘটনা দেওয়া হচ্ছে:
বিভিন্ন হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক গোত্রপতির কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। তিনি মদীনায় এসে যখন বাসরঘরে যান, তখন ওই স্ত্রীলোক বলেন, একজন গোত্রপতির কন্যা কীভাবে নিজেকে একজন সাধারণ প্রজার কাছে অর্পণ করতে পারে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার মাথায় হাত রাখতে চাইলে তিনি বলে ওঠেন, আমি আপনার কাছ থেকে পানাহ চাইছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যথাযথ মানুষের কাছেই পানাহ চেয়েছ। তিনি এ কথা বলে চলে গেলেন এবং তাকে তালাক দিয়ে মুক্ত করে দিলেন।
এটা সহীহ বুখারীরই বর্ণনা। কিন্তু ইবনে সাদ হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত আছে, হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত হাফসা রাযি. ওই মহিলাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে, তুমি এভাবে বলবে... তা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হবেন। এই হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ কে? এ তো সে—পৃথিবীবাসী যাকে কালবি বলে জানে। যার বিশেষ পরিচয়: মাতরুক (বর্জনীয়), গায়রে সিকাহ, রাফেযি ইত্যাদি।
إِنَّهُ كَانَ صَاحِبَ سَمَرٍ وَنَسَبٍ مَا ، مَا ظَنَنتُ أَنَّ أَحَدًا : ইমাম আহমদ বলেন يُحَدِّثُ عَنْهُ [ميزان] অর্থ: ইনি তো একজন বংশবিদ ও গল্পকার ছিলেন। কেউ তার থেকেও হাদীস বর্ণনা করবে—এটা কাম্য নয়।
সহীহ বুখারীতে স্পষ্টত উল্লেখ আছে, ওই স্ত্রীলোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতেন না। সেজন্যই এমনটা করেছিলেন। কিন্তু পরে যখন জানতে পেরেছিলেন যে, ইনিই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তখন তার আফসোসের কোনো শেষ ছিল না। স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-ও এই হতভাগ্য নারীর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি কোথাও একথা বলেননি, এটা আমার শেখানো ছিল। অথচ তিনি যে স্বাধীনভাবে কথা বলতেন এবং অপরাধ করে ফেললে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিতেন—হাদীসের জগতে তা কে না জানেন?
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ, ইবনে হাজার রহ: ১. ذكر أم حبيبة رض
১. তাহযিবুত তাহযিব এবং মিযানুল ইতিদাল দ্রষ্টব্য।
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুত তালাক।
২. সহীহ বুখারী : آخر كتاب الأثرية ا
৩. সহীহ বুখারী: কিতাবুত তালাক।
৪. হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনন ও স্বভাববৈশিষ্ট্য আলোচ্য বর্ণনার অধ্যায়েও ফুটে ওঠে।