📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত যায়নাব রাযি.-এর প্রতি

📄 হযরত যায়নাব রাযি.-এর প্রতি


হযরত যায়নাব রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফুফাতো বোন ছিলেন। তিনি খুব অভিমানী ও কঠোরপ্রকৃতির ছিলেন। এজন্যই প্রথম স্বামী থেকে বিচ্ছেদ আবশ্যক হয়ে পড়ে। তা ছাড়া সম্পর্কের বিচারে অন্য সকল স্ত্রীর চেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটাত্মীয়াও ছিলেন। তাই অন্যদের তুলনায় নিজেকে অগ্রগণ্য মনে করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলতেন, সকল স্ত্রীর মধ্যে ইনিই শুধু আমার প্রতিপক্ষতা করতে চাইতেন। পবিত্র স্ত্রীগণ হযরত উম্মে সালামা রাযি.-এর পর হযরত যায়নাব রাযি.-কেই প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে অত্যন্ত জোরালোভাবে কথা বলেন। হযরত আয়েশা রাযি. চুপচাপ শুনছিলেন এবং বারবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকাচ্ছিলেন। হযরত যায়নাব রাযি. যখন কথা শেষ করলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে কিছু বলার থাকলে বলতে বললেন। রাসূলের অনুমতি পেয়ে হযরত আয়েশা রাযি. মুখ খুললেন। তিনি এত বলিষ্ঠ ও যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছিলেন যে, হযরত যায়নাব রাযি. লা-জওয়াব হয়ে গেলেন। আর কোনো আপত্তি করার সুযোগ পেলেন না। প্রতিক্রিয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু বললেন, বাব্বাহ, আবু বকরের বেটি বলে কথা।
রমযানের শেষ দশকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করতেন। হযরত আয়েশা রাযি.-ও এ সময় মসজিদের আঙিনায় তাঁবু টাঙিয়ে ইতিকাফ করতেন। প্রতিদিন সকালবেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে আসতেন। কোনো এক বছর ইতিকাফের সময় হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি নিয়ে তাঁবু টানালে হযরত হাফসা রাযি.-ও অনুমতি চেয়ে নিলেন। জানতে পেরে হযরত যায়নাব রাযি.-ও তাঁবু টানালেন। সকালবেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন, মসজিদের আঙিনায় একাধিক তাঁবু টানানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর বিষয়টি অবগত হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সবারই কি ইখলাস ও নেক নিয়ত ছিল? এ কথা বলে তিনি সবগুলো তাঁবু উঠিয়ে ফেললেন এবং সে বছর ইতিকাফের মাস বদলে ফেললেন।
একবার রাত্রিবেলা হযরত যায়নাব রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে এলেন। ঘরে বাতির ব্যবস্থা ছিল না। এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং সোজা এক দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলে উঠলেন, উনি তো যায়নাব (রাযি.)। হযরত যায়নাব রাযি. রেগে গেলেন এবং কড়া কথা বলে ফেললেন। হযরত আয়েশা রাযি.-ও যথাযথ উত্তর দিতে পিছপা হলেন না। বাইরে মসজিদে নববীতে হযরত আবু বকর রাযি. ছিলেন। তিনি আওয়াজ পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাইরে আসার অনুরোধ জানালেন। হযরত আয়েশা রাযি. পিতার অসন্তুষ্টি বুঝতে পেরে আত্মসংবরণ করলেন। নামাযের পর হযরত আবু বকর রাযি. ঘরে গেলেন এবং আপন আত্মজাকে ধমক দিলেন ও সাবধান করলেন; যদিও বাস্তবে দোষ তাঁর ছিল না।
এরকম দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে এটা ভাববার কারণ নেই যে, পবিত্র স্ত্রীগণের অন্তর পবিত্র ছিল না। কারণ এক জায়গায় দু-চারজন মানুষ থাকলে-যত মিলমিশ আর মতৈক্যই থাকুক—থেকে-থেকে সত্যি-সত্যিই অথবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে একটু আধটু মনোমালিন্য হবে, সেটাই স্বাভাবিক; বিশেষ করে যদি নারী হয়। আর সতিন হলে তো কথাই নেই। এরকম জায়গায় বিভিন্ন কারণে মনোমালিন্য হওয়া নারীর সহজাত প্রবৃত্তি। নববীসাহচর্য মানুষকে শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত করে; কিন্তু তার প্রকৃতিকে বদলায় না। স্বামীর ভালোবাসায় কোনো অংশীদার থাকবে, এটা কোনো নারীমনই মেনে নিতে পারে না। নবীপরিবারে যদি কোনো কিছুর ঘাটতি থেকে থাকে, তা হলে এটুকুই যে, একই প্রেমাগ্নির পতঙ্গ ছিলেন সবাই; কিন্তু ভালোবাসার একটি শিখাই অনির্বাণ ছিল প্রতিটি অন্তরে। তারপরও স্বাভাবিক ও সহজাত সব প্রবণতাকে ছাপিয়ে উঠে তাদের মাঝে বিরাজিত ছিল এক অনিন্দ্যসুন্দর মিল-বন্ধন।
এই হযরত যায়নাব রাযি.-কেই দেখুন, যখন পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে শামিল হলেন, তখন হযরত আয়েশা রাযি.-ই তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন সবার আগে। অপরপক্ষে যখন লোকজন হযরত আয়েশা রাযি.-এর নামে অপবাদ আরোপে জড়িয়ে পড়েছিল, তখন বোনের মায়ায় হযরত হামনা রাযি.-ও (হযরত যায়নাব রাযি.-এর বোন) নিজেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব রাযি. সততা ও সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ও প্রতিবাদী ভাষায় বলেছিলেন-
مَا عَلِمْتُ فِيْهَا إِلَّا خَيْرًا
অর্থ: আমি তো হযরত আয়েশা রাযি. সম্পর্কে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু জানি না।
তিনি চাইলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে উদ্যত হতে পারতেন। কিন্তু মহৎ সাহচর্যের গুণে তিনি সেই ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর এ মহত্ত্বের কথা স্মরণ করতেন বড় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে।
একবার হযরত যায়নাব রাযি. হযরত সাফিয়্যা রাযি.-কে ইহুদি বলে সম্বোধন করলেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হন এবং একমাস তাঁর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রাখেন। অবশেষে তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর শরণাপন্ন হন এবং অনুরোধ করেন-আপনি আমার মার্জনার ব্যবস্থা করুন। এবার একই সুযোগ হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাতেও আসে। তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিলেন এবং একপর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এমন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বললেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়নাব রাযি.-কে ক্ষমা না করে পারলেন না।
মৃত্যুর পর কারও উত্তম গুণাবলির প্রকাশ মৃতের নৈতিক জীবনকে অমর করে রাখে। হযরত আয়েশা রাযি. প্রতিপক্ষ সতিনদের এমন আবে হায়াত ও সঞ্জীবনী-প্রদানেও কার্পণ্য করেননি। তিনি বর্ণনা করেন— রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার পবিত্র স্ত্রীগণকে সম্বোধন করে বললেন, তোমাদের মধ্যে সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে সে-ই মিলিত হবে, যার হাত সবচেয়ে লম্বা হবে। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনে আমরা যার যার হাত মাপতে লাগলাম। কিন্তু সবার আগে যখন হযরত যায়নাব রাযি.-এর ইন্তেকাল হয়ে গেল, তখন বুঝতে পারলাম, হাত লম্বা হওয়ার অর্থ ছিল দানশীলতা ও বদান্যতা। হযরত যায়নাব রাযি. নিজ হাতে কাজ করতেন এবং যা-ই উপার্জন হতো, দান-খায়রাত করে ফুরিয়ে ফেলতেন।
ওপরে আলোচনা এসেছে, একটি বিষয়ে হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত যায়নাব রাযি.-এর কথোপকথন কথা কাটাকাটির পর্যায়ে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনের স্বচ্ছতা ও একনিষ্ঠতা দেখুন, সেই ঘটনাটার বিবৃতি দিতে গিয়েও তিনি হযরত যায়নাব রাযি.-এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, পরবর্তীতে হযরত যায়নাব রাযি. এলেন। পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদায় তিনিই ছিলেন আমার সমকক্ষতার দাবিদার। আমি কোনো নারীকে হযরত যায়নাব রাযি.-এর চেয়ে ধার্মিকতা, খোদাভীরুতা, সত্যভাষিতা, বদান্যতা, দানশীলতা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অগ্রবর্তিনী দেখিনি। স্বভাবে কিছুটা কঠোরতা ছিল; কিন্তু অনুতাপবোধে বিলম্ব হতো না।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: باب الاعتكاف ا
২. সহীহ মুসলিম : باب القسم بين الزوجات ا
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর : ...لا تدخلوا بيوت النبي
২. সহীহ বুখারী: ইফকের ঘটনা।
৩. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯৫।
১. সহীহ বুখারী : باب حب النساء : ١ | باب فضل عائشة رض : ١

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত উম্মে হাবিবা রাযি.-এর প্রতি

📄 হযরত উম্মে হাবিবা রাযি.-এর প্রতি


হযরত উম্মে হাবিবা রাযি.-এর সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোনো মিল-অমিলের বর্ণনা পাওয়া যায় না। শুধু আসমাউর রিজাল গ্রন্থগুলোতে আছে, মৃত্যুশয্যায় শায়িতা হযরত উম্মে হাবিবা রাযি, হযরত আয়েশা রাযি.-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে বললেন, সতিনদের মধ্যে কিছু না কিছু থেকেই থাকে। যদি আপনার আর আমার মধ্যে কিছু থেকে থাকে, তা হলে আল্লাহ যেন দুজনকেই মাফ করে দেন। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আল্লাহ যেন সব মাফ করেন এবং আপনাকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করেন। হযরত উম্মে হাবিবা রাযি. বললেন, আপনি আমাকে আনন্দিত করলেন, আল্লাহও আপনাকে আনন্দে রাখুন।

টিকাঃ
১. তাবাকাত, ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৭১।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত মাইমুনা রাযি.-এর প্রতি

📄 হযরত মাইমুনা রাযি.-এর প্রতি


হযরত মাইমুনা রাযি. সম্পর্কেও হাদীসে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। শুধু রিজালশাস্ত্রীয় গ্রন্থগুলোতে আছে, তাঁর মৃত্যুর পর হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, হযরত মাইমুনা রাযি. আমাদের মধ্যে সবচেয়ে পরহেজগার ছিলেন।

টিকাঃ
২. তাহযিবুত তাহযিব, ইবনে হাজার ১৬/৪৫৩। باب فضيلة إعتاق الأمة ثم ترويجها :ا

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর প্রতি

📄 হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর প্রতি


হযরত সাফিয়্যা রাযি. মাত্র তিন বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সাহচর্য লাভ করেছিলেন। তা ছাড়া অন্য সকল স্ত্রীর তুলনায় তাঁর অবস্থা ছিল একটু আলাদা। কেননা তিনি খায়বার এলাকার কন্যা ছিলেন; আবার বংশগতভাবে ছিলেন ইহুদি। খায়বারেই পবিত্র স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেন। খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একই হাওদায় সওয়ার ছিলেন। মদীনার কাছে এসে হাওদার রশি ছিঁড়ে গেলে হাওদা পড়ে যায়। মদীনায় সংবাদ পৌঁছলে দাসীরাও দেখতে আসে। দাসীরা ঘটনাটাকে হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর কুলক্ষণ গণ্য করে যা-তা বলতে লাগে। মদীনায় পৌঁছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর থাকার ব্যবস্থা করেন একজন আনসারি সাহাবীয়ার গৃহে। বিভিন্নভাবে তাঁর ওলিমা ও সংবর্ধনা হয়ে গিয়েছিল। অধিকাংশ নারীই তাঁকে দেখতে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-ও নেকাব পরে নারীদের ভিড়ে ঢুকে পড়লেন। কিন্তু আত্মগোপন করা সম্ভব হলো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিনে ফেললেন। হযরত আয়েশা রাযি. লজ্জা পেয়ে সরে আসতে লাগলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও উঠে এলেন। কাছে এসে বললেন, আয়েশা, বলো, তোমার কী মনে হচ্ছে? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, শুনলাম, ইহুদি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন করে বোলো না, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
হযরত সাফিয়‍্যা রাযি.-এর রান্নার হাত খুবই ভালো ছিল। স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, হযরত সাফিয়‍্যা রাযি.-এর চেয়ে ভালো রান্না করতে পারেন এমন নারী আমি দেখিনি। একদিন দুজনেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাবার রান্না করলেন। হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর রান্না খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে ছিলেন। হযরত সাফিয়‍্যা রাযি. একজন দাসীর হাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাবার পাঠিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. সহ্য করতে পারলেন না। তিনি এত জোরে হাত ঝাড়া দিলেন যে, দাসীর হাত থেকে পাত্র পড়ে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরবতার সঙ্গে টুকরোগুলো জড়ো করলেন। তিনি দাসীকে বললেন, তোমার মাতার রাগ দ্যাখো! কিছুক্ষণ পর হযরত আয়েশা রাযি. আপন কৃতকর্মের ওপর অনুতপ্ত হলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই অপরাধের মোচন কী হতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হুবহু এরকম পাত্র এবং হুবহু এরকম খাবার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী একটি নতুন পাত্র হযরত সাফিয়্যা রাযি.-কে ফেরত দেওয়া হয়।
হযরত সাফিয়্যা রাযি. কিঞ্চিৎ খর্বাকৃতির ছিলেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি. বলে ফেললেন—হে আল্লাহর রাসূল, আর কী বলবেন, সাফিয়‍্যা [রাযি.] তো এটুক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, তুমি এমন একটা কথা বললে, যদি সমুদ্রেও মেশানো হয় মিশে যাবে। আরজ করলেন—হে আল্লাহর রাসূল, আমি তো কারও বাস্তবতাই তুলে ধরেছি। ইরশাদ করলেন, যদি আমাকে এত-এত-এতও দেওয়া হয়, তবু কারও সম্পর্কে এহেন মন্তব্য করব না।
হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত সাফিয়্যা রাযি. একই পাড়ায় থাকতেন। পারস্পরিক হিতাকাঙ্ক্ষা ও পক্ষসমর্থন ছিল। মনোমালিন্যের তেমন কোনো ঘটনা নেই। আর সাময়িক দু-একটা যা পাওয়া যায়—একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসাবোধকে কখনো ব্যাহত করেনি।
পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, হযরত আয়েশা রাযি. সতিনদের সঙ্গে কতটা ভালোবাসাপূর্ণ, শ্রদ্ধাপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতেন। কতটা খোলা মনে তাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতেন। কখনো কখনো মনুষ্যবৃত্তি তাঁকে প্রভাবিত করলেও শীঘ্রই অনুতপ্ত হয়েছেন। আগে বেড়েও সতিনদের আক্রমণাত্মক কিছু বলেননি। হাঁ, কেউ বললে চুপ করেও থাকেননি। আবার সতিনদের যথাযোগ্য প্রশংসা করতেও কখনো কার্পণ্য করেননি।

টিকাঃ
১. তাবাকাত, ইবনে সাদ: তরজমাতু সাফিয়‍্যাহ রাযি.।
২. ঘটনাটি সামান্য শব্দভেদসহ প্রায় সবগুলো হাদীসগ্রন্থেই এসেছে। ফিকহ-শাস্ত্রে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মূলনীতিটি এ হাদীস থেকেই গৃহীত (বুখারী-কিতাবুল মাযালিম এবং বাবুল গাইরাহ)। মুসলিম, আবু দাউদ-এ হযরত আনাস রাযি.-এর বর্ণনায় উম্মাহাতুল মুমিনীনের নাম নেই। কিন্তু মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ ও নাসাঈ-তে স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনায় নামের উল্লেখ আছে (আবু দাউদ-কিতাবুল বুয়ু, নাসাঈ-কিতাবু ইশরাতিন নিসা-বাবুল গায়রাহ, মুসনাদে আহমদ-৬ষ্ঠ খণ্ড)। পূর্ণ চিত্রায়ন ঘটে সবগুলো বর্ণনাকে একত্র করলে। নাসাঈ-র একটি বর্ণনায়, এবং মুজামে তাবরানি (হাদীসু আলী ইবনে ইসহাক, পৃষ্ঠা : ১১৮)-তে অপর স্ত্রীর নাম : উম্মে সালামা রাযি,।
১. সহীহ বুখারী: کتاب الهدایا

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00