📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ঘরেও নবুয়াতের দায়িত্ব-পালন

📄 ঘরেও নবুয়াতের দায়িত্ব-পালন


দাম্পত্যজীবনের সর্বশেষ অনুষঙ্গ এটি। পারস্পরিক ভালোবাসার যে বর্ণনাগুলো আগে গিয়েছে তাতে কারও মনে ধারণা জন্মাতে পারে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এসে বুঝি নবুওয়াতের গুরুদায়িত্বের কথা ভুলে যেতেন। কিন্তু না, স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনা নিশ্চয় শুনে থাকবেন, তিনি কী বলেছেন? তিনি বলেছেন প্রায়ই এমন হতো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সঙ্গে গল্প করছেন, হঠাৎ আজান হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর একটুও বিলম্ব করলেন না, উঠে চলে গেলেন। অবস্থা দেখে মনে হতো, যেন রাসূল আমাকে চেনেনই না।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গাযওয়ায়ে তাবুক থেকে বিজয়ীবেশে ফিরে এলেন, তখন হযরত আয়েশা রাযি. তাঁকে বরণ করার জন্য একটি চিত্রিত নকশাবিশিষ্ট পর্দার ব্যবস্থা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরজায় কদম মোবারক রাখতে না রাখতেই তাঁর চেহারা মোবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন- ক্ষমা করবেন, হে আল্লাহর রাসূল! কী ভুল হলো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-আয়েশা, আল্লাহ আমাদের ইট-পাথরের সাজসজ্জার জন্য ধনসম্পদ দেননি।
কোনো এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে এলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে উঠে চুপচাপ একদিকে চলে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-ও পেছন-পেছন চললেন, কিন্তু গোপনে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকির গোরস্তানে পৌঁছে হাত তুলে দুআয় মশগুল হলেন। হযরত আয়েশা রাযি. গোপনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিন্তু ফিরে আসার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখে ফেললেন হযরত আয়েশা রাযি. চুপিসারে ঘরে ঢুকছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন-আয়েশা, এ কী? যেহেতু বিষয়টা গুপ্তচরির শামিলযা নিষিদ্ধ, তাই হযরত আয়েশা রাযি. বললেন- আমার মা বাবা আপনার প্রতি কোরবান হোক, ঘটনাটা এই ছিল... তিনি সব খুলে বললেন।
একবার হযরত আয়েশা রাযি. একজন ইহুদিকে যে রাসূল সাল্লাল্লাম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অভিশাপ করেছিল-দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিলেন। কিন্তু দয়ার নবী বলেছিলেন-আল্লাহ কোমল, কোমলতা পছন্দ করেন। কোমলতায় তিনি এমনভাবে দান করেন, যা কঠোরতায় করেন না।
যদিও রেশম ও স্বর্ণের ব্যবহার ইসলামে নারীর জন্য বৈধ, কিন্তু পার্থিব সুখ-শোভার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবগত ঘৃণা ও অনীহা ছিল। তাই নিজ ঘরে পরিবারের বেশি সাজসজ্জা ও আড়ম্বরতা পছন্দ করতেন না। একবার হযরত আয়েশা রাযি. একটি স্বর্ণালঙ্কার পরলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাকে এরচে বেশি কিছু বলব না; তুমি স্বর্ণালঙ্কার ছাড়ো এবং চাঁদির দুটো দুল বানিয়ে তাতে জাফরানের রঙ লাগাও।
হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণনা করেন—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের পাঁচটি জিনিস থেকে দূরে থাকতে বলেছেন: রেশমি কাপড়, স্বর্ণালঙ্কার, সোনা-চাঁদির বরতন, লাল মোলায়েম গদি, কারুকার্য খচিত রেশমি কাপড়। আমি আরজ করলাম, যদি মশক বাঁধার মতো সামান্য পরিমাণ স্বর্ণ হয়, তা হলে কি সমস্যা আছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—না, চাঁদিতে সামান্য জাফরান রঙ মিশ্রিত করো।
ঘরে-পরিবারে সবসময়ই নৈতিক ও চারিত্রিক উপদেশাবলির তালীম দিতে থাকতেন এমন অনেক উদাহরণ আগে গিয়েছে। একবার হযরত আয়েশা রাযি. নিজ হাতে আটা কুটলেন এবং টিকিয়া বানালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইরে থেকে এসে নামাযে রত হলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘুম ধরে গেল। এমন সময় প্রতিবেশীর বকরি এসে সব খেয়ে ফেলল। হযরত আয়েশা রাযি. দৌড় দিয়ে বকরিকে মারতে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাধা দিলেন, বললেন—আয়েশা, প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়ো না।
আরবে শুশুক খাওয়ার প্রথা ছিল। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পছন্দ করতেন না। একবার কেউ শুশুকের গোশত পাঠাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেলেন না। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন—হে আল্লাহর রাসূল, গরীবদের খাইয়ে দিই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—যা তুমি নিজে খাওয়া পছন্দ করো না, তা অন্যকে খাওয়াবে কেন?

টিকাঃ
১. ঘটনাটি সামান্য ভিন্নতাসহ সবগুলো হাদীসগ্রন্থেই এসেছে। এখানে নাসাঈ: আল ইস্তিগফার লিল মুমিনীন অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১. সহীহ মুসলিম: নম্রতার ফজিলত।
২. নাসাঈ: সজ্জা অধ্যায়।
৩. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৩। নারীদের জন্য রেশমি কাপড়, স্বর্ণালঙ্কার অন্যান্য হাদীসের আলোকে বৈধ। কিন্তু পবিত্র স্ত্রীগণের জন্য এগুলোকে অশোভন গণ্য করা হয়েছে—অধিক প্রত্যাশায় যেন দুনিয়ার প্রতি সামান্যও মোহ না জন্মে।
১. আল আদাবুল মুফরাদ: ইমাম বুখারী রহ.।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00