📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 প্রেমাবেগ ও অভিমান

📄 প্রেমাবেগ ও অভিমান


প্রেমাবেগ ও অভিমান নারীর স্বভাববৈশিষ্ট্য। ভালোবাসার অথৈ সাগরের অসংখ্য প্রেমলহরি মিশে আছে নারীমনে। কিন্তু এ ধরনের যে ঘটনাগুলোর উল্লেখ হাদীসগ্রন্থগুলোতে রয়েছে, অনেকেই সেগুলোর সমালোচনা করতে চান। তারা বলতে চান, একজন নবীর প্রতি উম্মতের এমন প্রেমাবেগ ও অভিমান কিংবা এমন আচরণ ও উচ্চারণ অশোভন। তারা ভুলে যান যে, এই আবেগ ও অনুভূতি, এই আচরণ ও উচ্চারণ একজন নবীর প্রতি উম্মতের নয়, বরং একজন প্রেমময় স্বামীর প্রতি প্রেমময়ী স্ত্রীর। সুতরাং এ ধরনের যে ঘটনাগুলো বিশুদ্ধগ্রন্থসমূহে এসেছে, এই বিবেচনাতেই এসেছে। এগুলোকে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই পড়া ও বোঝা উচিত।
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যখন এই নির্দেশ এল—যদি কোনো নারী নিজেকে রাসূলের প্রতি সমর্পণ করতে চায় (অর্থাৎ মোহর ছাড়াই স্ত্রীত্ব গ্রহণ করতে চায়), করতে পারবে—তখন আমার খুব রাগ হলো। মনে মনে বললাম, কোনো মেয়ে কি এমনও করতে পারে। কিন্তু যখন ইরজার আয়াত নাজিল হলো (যাতে রাসূলকে এই ইচ্ছাধিকার দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি যে কোনো স্ত্রীকে ইচ্ছামতো কাছে ডাকবেন কিংবা ইচ্ছামতো কাছে থাকবেন, অথবা ডাকবেন না বা থাকবেন না), তখন আমি বললাম—আপনার আল্লাহ দেখি আপনার সব ইচ্ছাই শীঘ্র পূরণ করে দেন। আল্লাহ মাফ করুন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর এই কথার অর্থ আপত্তি করা নয়; বরং একজন প্রেমময়ী স্ত্রীর অভিমান। বিশিষ্টজনেরা হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্যের আরও একটি ব্যাখ্যা করেছেন—আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের মনোবাঞ্ছা পুরা করে দেন, যাতে তাঁর আদেশ-পালন ও নির্দেশ-বাস্তবায়নে মনোযোগী থাকতে পারেন।
কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেননি; বরং অনুমতির পরও পূর্বের ন্যায়ই পালাক্রমিক গমনাগমন অব্যাহত রেখেছিলেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই হযরত খাদীজা রাযি.-এর কথা বলতেন। এতে অন্য স্ত্রীগণ কষ্ট পেতেন। একবার তিনি এভাবেই হযরত খাদীজা রাযি.-এর কথা বলছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলেন, আপনি কি ওই বুড়ির কথা ছাড়বেন? আল্লাহ তো আপনাকে আরও ভালো ভালো স্ত্রী দান করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তো ওই বুড়ির মাধ্যমেই আমাকে সন্তান দান করেছিলেন।
একই বর্ণনা মুসনাদে আহমাদে আছে এভাবে: একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খাদীজা রাযি.-এর প্রশংসা করা শুরু করলেন। অনেকক্ষণ ধরে তিনি তাঁর প্রশংসা করে চললেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আমার খুব রাগ হলো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কুরাইশের কোনো এক বুড়ির, যার ঠোঁট লাল হয়ে গিয়েছিল, যার মরার অনেক দিন পারও হয়ে গেছে, এতক্ষণ ধরে প্রশংসা করে চলেছেন; অথচ আল্লাহ আপনাকে তারচে অনেক ভালো স্ত্রী দান করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি নিজেকে সংযত রেখে বললেন, সে তো আমার এমনই একজন ছিল, যখন সকলে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন সেই আমাকে বিশ্বাস করেছিল; যখন সকলে আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, তখন সেই আমাকে সত্যবাদী বলেছিল; যখন সকলে আমাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করেছিল, তখন সেই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল; এবং আল্লাহ তাঁর মাধ্যমেই আমাকে সন্তান-সন্ততি দান করেছিলেন, যেখানে অন্য স্ত্রীদের বেলায় আমাকে বঞ্চিত রেখেছেন।
একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর মাথাব্যথা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুরোগের সূচনা হয়েছিল সেখানেই। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-কে বললেন, যদি তুমি আমার জীবদ্দশায় মারা যাও, তা হলে নিজ হাতে তোমার দাফন-কাফন দেব; এই হাতদুটো তুলে আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দুআ করব। হযরত আয়েশা রাযি. বুঝলেন না, বললেন—হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার মৃত্যু কামনা করছেন? যদি আমি মারা যাই, তা হলে এই ঘরে বুঝি নতুন স্ত্রী আনবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু হাসলেন।
কোথাও থেকে কোনো এক কয়েদিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। হযরত আয়েশা রাযি.-এর হুজরায় তাকে আটকে রাখা হয়। হযরত আয়েশা রাযি. নারীদের সঙ্গে আলোচনায় রত হলে সুযোগ বুঝে কয়েদি পালিয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে জানতে পারলে গলা ভারী করে বললেন, তোমার হাত কেটে দেওয়া হবে। তারপর বাইরে গিয়ে সাহাবা কেরامকে খবর দিলেন। কয়েদিকে ধরে আনা হলো। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলে হযরত আয়েশা রাযি. নিজের হাত দুটো সম্মুখে ধরে নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—কী করছ? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, দেখছি কোন হাত কেটে দেবেন। কথাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে দাগ কাটল। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্য হাত তুলে দুআ করলেন।
একটি বর্ণনায় আছে, হযরত আয়েশা রাযি. হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করলেন—হে আল্লাহর রাসূল, যদি এমন হয় যে, আপনাকে দুটো চারণভূমি দেওয়া হলো, একটিতে আগে উট চড়ানো হয়েছে, অপরটিতে চড়ানো হয়নি, তা হলে আপনি উট চড়ানোর জন্য কোন চারণভূমিটি বেছে নেবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যেটিতে চড়ানো হয়নি। কথাটির তাৎপর্য হলো: পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে একমাত্র আয়েশা রাযি.-ই ছিলেন কুমারী।
ইফকের ঘটনায় (আলোচনা সামনে আসবে), যখন ওহীর মাধ্যমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর পবিত্রতা ঘোষিত হলো, তখন সম্মানিতা মাতা বললেন-যাও মা, পবিত্র জীবনসঙ্গীকে কৃতজ্ঞতা জানাও। হযরত আয়েশা রাযি. অভিমান করে বললেন, যেই আল্লাহ আমার পবিত্রতার প্রমাণ দিয়েছেন, সেই আল্লাহ ছাড়া আর কারও প্রতি আমি কৃতজ্ঞ নই।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-আয়েশা, তুমি যখন আমার প্রতি নারাজ থাক, তখন আমি বুঝতে পারি। তুমি যখন নারাজ থাক, তখন বল-ইবরাহিম আলাইহিস সালামের রবের কসম। আর যখন খুশি থাক, তখন বল-মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রবের কসম। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন-হে আল্লাহর রাসূল, মুখে ত্যাগ করলেও বুকে আপনারই নাম ধারণ করি।
মার্গলিউস লাইফ অফ মুহাম্মাদ গ্রন্থে এ ঘটনাটিই লিখেছেন এভাবে: 'যখন মুহাম্মাদ তাকে (হযরত আয়েশা রাযি.-কে) কষ্ট দিতেন, তখন তিনি তাকে আল্লাহর নবী বলে অস্বীকার করতেন এবং তার ওহীর ওপর নানা রকম প্রশ্ন তুলতেন।” (নাউজুবিল্লাহ)
ইংরেজপণ্ডিতদের বর্ণনাবিকৃতি ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার এটা একটা জ্বলন্ত প্রমাণ।

টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী: তাফসীর সূরা আহযাব।
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর সূরা আহযাব।
২. সহীহ বুখারী: অধ্যায় : -ا فضل خديجة رض
৩. মুসনাদে আহমদ: মুসনাদে আয়েশা রাযি, : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৮, ১৫০।
১. সহীহ বুখারী: অধ্যায়: আল মার্য, পৃষ্ঠা: ৮৪৬। মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৮।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫০।
৩. সহীহ বুখারী: অধ্যায়: নিকাহুল আবকার, পৃষ্ঠা: ৭৭৬।
১. সহীহ বুখারী: অধ্যায় : ما يجوز من البحران , পৃষ্ঠা: ৮৯৭।
২. লাইফ অফ মুহাম্মাদ, পৃষ্ঠা: ৪৫১।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ঘরের কাজ ও সেবায়

📄 ঘরের কাজ ও সেবায়


ঘরে তো খাদেমা ছিলই, তারপরও হযরত আয়েশা রাযি. নিজের কাজ নিজেই করতেন। আটা কুটতেন নিজে। খামির করতেন নিজে। রুটি বানাতেন নিজে। খানা পাকাতেন নিজে। বিছানা বিছাতেন নিজে। ওযুর পানি আনতেন নিজে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির জন্য যে উট পাঠাতেন, সেটার দেখাশোনাও করতেন নিজে। এমনকি, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা আঁচড়ে দিতেন। শরীরে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতেন। রাসূলের কাপড় ধুতেন। শোয়ার সময় রাসূলের মেসওয়াক ও পানি ঠিক করে রাখতেন। রাসূলের মেসওয়াক পরিষ্কার করে দিতেন। ঘরে কোনো মেহমান এলে মেহমানের আপ্যায়ন করতেন। সুফফাবাসী কায়স গিফারি রাযি. বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, চলো, আয়েশার ঘরে যাই। হুজরায় পৌঁছে বললেন—আয়েশা, আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করো। তিনি আটার তৈরি এক ধরনের খাবার দিয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও কিছু চাইলে তিনি খেজুরের হারিরা দিয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানীয় জাতীয় কিছু চাইলে তিনি একটি বড় পাত্রে করে দুধ, তারপর একটি ছোট পাত্রে করে পানি দিয়ে গেলেন।

টিকাঃ
৩. আল আদাবুল মুফরাদ: ইমাম বুখারী রহ.। অধ্যায় : الا يؤذى حاره
৪. সহীহ বুখারী: ইফক।
৫. সহীহ বুখারী। আবু দাউদ।
৬. শামায়েলে তিরমিযী।
৭. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৮।
১. সহীহ বুখারী: হজ অধ্যায়।
২. সহীহ বুখারী: ইতিকাফ অধ্যায়।
৩. সহীহ বুখারী: হজ অধ্যায়।
৪. সহীহ বুখারী: ধোয়া অধ্যায়। আবু দাউদ: অধ্যায়: আল ইয়াদাতু মিনান নাজাসাতি ইয়াকুনু ফিস সাওবি।
৫. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৪।
৬. আবু দাউদ: তাহারাত গোসল।
৭. আবু দাউদ: শিষ্টাচার অধ্যায়। সম্ভবত এটা পর্দার বিধান আসার আগের ঘটনা।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আনুগত্য ও নির্দেশ-পালন

📄 আনুগত্য ও নির্দেশ-পালন


স্ত্রীর সবচেয়ে বড় গুণ স্বামীর আনুগত্য ও নির্দেশ-পালন। হযরত আয়েশা রাযি. দীর্ঘ নয় বছর সাহচর্যের কি দিনে, কি রাতে—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি নির্দেশও অমান্য করেননি। এমনকি, আকারে ইঙ্গিতেও যেটাকে অপ্রীতিকর মনে হয়েছে, সেটাকেও ত্যাগ করতে বিলম্ব করেননি। একবার তিনি খুব শখ করে দরজায় একটি ছবিওয়ালা পর্দা ঝুলিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভেতরে ঢুকতেই পর্দাটা চোখে পড়ে। রাসূলের চোখে-মুখে অসন্তোষের ছাপ ফুটে ওঠে। হযরত আয়েশা রাযি. হতভম্ব হয়ে যান। আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, ক্ষমা করবেন। আমি কী ভুল করলাম? রাসূল বললেন, যেই ঘরে ছবি থাকে সেই ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না। হযরত আয়েশা রাযি. সঙ্গে সঙ্গে পর্দা নামিয়ে ফেললেন এবং অন্য কোনো কাজে লাগালেন। জনৈক সাহাবীর ওলিমা ছিল; কিন্তু ঘরে কিছু ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—যাও, আয়েশাকে বলো, ঘরে খাবার যা আছে, যেন পাঠিয়ে দেয়। সাহাবী এসে হযরত আয়েশা রাযি.-কে সংবাদ শুনিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. খাবারের পুরো গাট্টিটাই পাঠিয়ে দিলেন। সন্ধ্যায় ঘরে আর কিছু ছিল না।
জীবদ্দশায় স্বামীর অনুগতা অনেকেই। কিন্তু প্রকৃত আনুগত্য হলো শৃঙ্খল খুলে যাবার পরও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকা, অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পরও স্বামীর কথা মেনে চলা।
পূর্বে আলোচনা এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে দানশীলতার কথা বলেছিলেন। এর প্রভাব কেমন ছিল দেখুন, আমৃত্যু তিনি এই দায়িত্বপালনে অবহেলা করেননি। পাঠক জেনেছেন, হযরত আয়েশা রাযি. জিহাদের অনুমতি চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন—হজই নারীর জিহাদ। এই নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকে তিনি এত কঠিনভাবে এর পাবন্দি করেছিলেন যে, এমন একটা বছরও নেই, যে বছর তিনি হজ করেননি।
জনৈক ব্যক্তি একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে কিছু কাপড় ও নগদ অর্থ পাঠান। তিনি প্রথমে ফিরিয়ে দেন, পরে আবার গ্রহণ করেন; তিনি বলেন, রাসূলের একটা কথা মনে পড়ে গেল, (তাই গ্রহণ করলাম)। একবার তিনি আরাফার দিন রোযা রেখেছিলেন; এত বেশি গরম পড়েছিল যে, বারবার মাথায় পানি ঢালতে হচ্ছিল। কেউ বলল— আজকে না হয় রোযা ভেঙে ফেলুন। তিনি বললেন—রাসূলের মুখে শুনেছি, আরাফার দিন রোযা রাখলে সারা বছরের গোনাহ মাফ হয়, তা হলে কেমন করে রোযা ভাঙি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চাশতের নামায পড়তে দেখে তিনিও নিয়মিত চাশতের নামায পড়া আরম্ভ করেছিলেন। তিনি বলতেন—যদি আমার পিতাও কবর থেকে উঠে আসেন আর এই নামায পড়তে নিষেধ করেন, তবু আমি মানব না। একবার জনৈকা মহিলা এসে আরজ করলেন—উম্মুল মুমিনীন, মেহেদি ব্যবহার করা কেমন হবে? তিনি উত্তর দিলেন—আমার প্রিয়তম (নারীদের জন্য) রঙ পছন্দ করতেন, কিন্তু ঘ্রাণ পছন্দ করতেন না; হারাম নয়, ব্যবহার করতে পারো।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুল লিবাস, বাবুত তাসাবীর।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৫৭।
৩. সহীহ বুখারী: হাজ্জুন নিসা।
৪. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৯।
১. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৮।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৮।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 অভাবেরীণ ধর্ম ও জীবন

📄 অভাবেরীণ ধর্ম ও জীবন


হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘর ছিল একজন পয়গম্বরের ঘর। এখানে না অর্থপ্রাচুর্য ছিল, না অর্থপ্রাচুর্যের বাসনা ছিল। ইসলাম দীন ও দুনিয়ার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা যে জীবন্ত আদর্শ দেখে এসেছি তা ছিল মানবীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সমাহার; এখন নবীপরিবারের ঘর ও ঘরের মানুষকে বাস্তব জীবনের প্রেক্ষিতে দেখা যাক। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র অভ্যাস ছিল—যখনই ঘরে আসতেন, উচ্চস্বরে এই কথাগুলো বলতেন:
لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لَابْتَغَى وَادِيًا ثَالِثًا وَ لَا يَمْلَأَ فَاهُ إِلَّا التُّرَابُ وَمَا جَعَلْنَا الْمَالَ إِلَّا لِإِقَامِ الصَّلَوةِ وإِيتَاءِ الزَّكَوةِ وَيَتُوْبُ اللَّهُ عَلَى مَن تَابَ
অর্থ: আদমসন্তান যদি দুটো সম্পদপূর্ণ ময়দানের মালিক হয়ে যায়, তবে সে তৃতীয় আরও একটির কামনা করবে; মাটি ছাড়া কিছুই তার মুখ ভরাবে না। (আল্লাহ বলেছেন) আমি তো সম্পদ দিয়েছি শুধুমাত্র আমার স্মরণের জন্য এবং অভাবীকে সাহায্য করার জন্য। যে তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।
এই কথাগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন বলতেন, বারবার বলতেন—যাতে নবীপরিবারের কারও মনে দুনিয়ার মায়া ও সম্পদের মোহ না জাগে।
এশার নামায পড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করতেন। মেসওয়াক করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তেন। পরবর্তী প্রহরেই উঠে যেতেন এবং তাহাজ্জুদে রত হতেন। রাতের শেষ প্রহরে হযরত আয়েশা রাযি.-কেও উঠিয়ে দিতেন। তিনিও উঠে নামাযে শরীক হতেন এবং বিতর আদায় করতেন।
ভোরের শুভ্রতা প্রকাশ পেলে তিনি ফজরের সুন্নত পড়ে নিতেন, তারপর কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে সামান্য কাত হতেন এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে গল্প করতেন। কিছুক্ষণ পর ফজরের ফরজ আদায়ের জন্য মসজিদে বের হতেন। কখনো সারারাত দুজনে মিলে আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হতেন আর আয়েশা রাযি. মুক্তাদি হতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা বাকারা, সূরা আল-ইমরান, সূরা নিসা এবং এ জাতীয় লম্বা-লম্বা সূরা পড়তেন। যখন ভয় ও ভীতির কোনো আয়াত আসত, তখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন; যখন দয়া ও করুণার কোনো আয়াত আসত, তখন আল্লাহর কাছে তা কামনা করতেন। নবীপরিবারে এমনই ক্রিয়াশীল, প্রাণবন্ত, অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য বিরাজ করত সারারাত ধরে। অনিয়মিতভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে নামাযগুলো পড়তেন, যেমন সূর্যগ্রহণের নামায, তাতেও হযরত আয়েশা রাযি. শরীক হতেন। এমনকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে নামায পড়ানোর জন্য যখন দাঁড়াতেন, তখন তিনিও ঘরের ভেতর নামাযের নিয়ত করতেন।
হযরত আয়েশা রাযি. পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও তাহাজ্জুদ তো পড়তেনই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে চাশতের নামাযও ছাড়তেন না। প্রায়শই রোযা রাখতেন। কখনো দুজনে মিলে একসঙ্গে। রমযানের শেষ দশকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করতেন। কখনো হযরত আয়েশা রাযি.-ও ইতিকাফে শরীক হতেন। তিনি মসজিদের আঙিনায় একপাশে তাঁবু টানিয়ে নিতেন। ফজরের নামাযের পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেখানে আসতেন। একাদশ হিজরীতে হজের জন্যও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বের হয়েছিলেন তিনি। এবং হজ ও উমরা উভয়েরই নিয়ত করেছিলেন। কিন্তু মজবুরির কারণে তাওয়াফে অপারগ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য তাঁর অনেক দুঃখ হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পেরে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং মাসআলা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ভাই আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রাযি.-এর সঙ্গে হজের অবশিষ্ট আমল সম্পন্ন করেছিলেন।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫।
৩. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫২।
৪. সহীহ মুসলিম: সালাতুল লাইল। সহীহ বুখারী : من تحدث بعد الركعتين ا
৫. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫১।
১. সহীহ বুখারী: কুসুফের নামায।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫১।
৩. সহীহ বুখারী: নারীর ইতিকাফ।
৪. সহীহ বুখারী: হজ অধ্যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00