📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 জীবনসঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা

📄 জীবনসঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা


সিহাহগ্রন্থে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكُمُلْ مِنَ النِّسَاءِ غَيْرُ مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَآسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَ إِنَّ فَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
অর্থ: পুরুষদের মধ্যে অনেকেই কামেল হয়েছিলেন; কিন্তু নারীদের মধ্যে কামেল হয়েছিলেন শুধু ইমরানপুত্রী মারইয়াম ও ফেরাউনপত্নী আসিয়া। নিঃসন্দেহে সকল খাদ্যের ভেতর সারিদ যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি সকল নারীর ওপর আয়েশা শ্রেষ্ঠ।
এই হাদীস থেকেই বোঝা যায়, এই ভক্তি-ভালোবাসার প্রকৃত কারণ কী? বাহ্যিক সৌন্দর্য-শোভা, নাকি সুপ্ত জ্ঞানের আভা। সুপ্ত প্রতিভা ও জ্ঞানে-গুণে হযরত আয়েশা রাযি.-এর পর হযরত উম্মে সালামা রাযি.- এর অবস্থান। তিনিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন; অথচ তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধা। হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকাল হয়েছিল পঁয়ষট্টি বছর বয়সে; কিন্তু তাঁর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা এমন ছিল যে, হযরত আয়েশা রাযি.-ও ঈর্ষা করতেন। একবার তিনি মন্দভাবে হযরত হযরত খাদীজা রাযি.-এর নাম নেওয়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন।
হযরত আয়েশা রাযি.-ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক ভালোবাসতেন। শুধু তাই নয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁর ভীষণ অনুরাগ ও আসক্তি ছিল। অন্য কেউ রাসূলকে ভালোবাসার কথা বললে তাঁর খুব কষ্ট হতো। পবিত্র স্ত্রীগণের প্রতি তাঁর খুব নজর থাকত। কখনো এমন হতো যে, রাতে ঘুম ভেঙে গেছে, দেখেন—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাশে নেই; তিনি অস্থির হয়ে যেতেন। একবার রাতে ঘুম ভেঙে গেলে রাসূলকে পেলেন না। ঘর অন্ধকার। এদিক-সেদিক হাতড়াতে লাগলেন। অবশেষে রাসূলের কদম মোবারকে হাত পড়ল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদারত অবস্থায় আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করছেন। আরও একবার একই ঘটনা ঘটলে তিনি ভেবেছিলেন—রাসূল হয়তো অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে গেছেন। উঠে এদিক-সেদিক দেখতে লাগলেন। পরে বুঝতে পারলেন, তিনি তাসবিহ-তাহলিলে রত আছেন। হযরত আয়েশা রাযি. মনে-মনে লজ্জিত হলেন। অবচেতন মনে বলে ফেললেন—আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কোরবান হোন; আমি কোন ধ্যানে ছিলাম, আর আপনি কোন ধ্যানে ছিলেন।
আরেক রাতের ঘটনা। ঘুম ভাঙলে দেখলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেই। প্রায় অর্ধেক রাত অতিবাহিত হয়েছে। এদিক-সেদিক খুঁজলেন, কিন্তু প্রিয়তমের কোনো সাড়াশব্দ নেই; খুঁজতে-খুঁজতে গোরস্তানে পৌঁছে গেলেন, দেখলেন—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ ও ইস্তিগফারে মশগুল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে এলেন। সকালে রাসূলের কাছে ঘটনাটি ব্যক্ত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রাতে কারও ছায়া লক্ষ করেছিলাম; তা হলে তুমিই ছিলে?
কোনো এক সফরে হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত হাফসা রাযি. রাসূলের সঙ্গে ছিলেন। প্রতি রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাওদায় তাশরিফ আনতেন। যখন কাফেলা চলত, তখন কথাবার্তাও চলত। একদিন হযরত হাফসা রাযি. বললেন— আয়েশা, চলো, আমরা হাওদা বদলাবদলি করি। হযরত আয়েশা রাযি. উদারতা ও সরলতার পরিচয় দিলেন। রাতে আগের মতোই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাওদায় এলেন; কিন্তু সেখানে হযরত হাফসা রাযি.-কে দেখতে পেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম দিয়ে বসে পড়লেন। এদিকে হযরত আয়েশা রাযি. অধীর আগ্রহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতীক্ষা করছেন। যখন কাফেলা থামল, তখন আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। হাওদা থেকে নেমে পড়লেন, দুই পা ঘাসের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বললেন—আল্লাহ, আমি তো ওনাকে কিছু বলতে পারব না; কিন্তু তুমি তো একটা সাপ বা বিচ্ছু পাঠাতে পারো! একটা সাপ বা বিচ্ছু পাঠাও, এসে আমার পায়ে কামড় দিক। দেখুন, এই কথাটায় নারীমনের কেমন তীব্র ভালোবাসা ও বিরহ জ্বলে উঠেছে!
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈলা করেছিলেন। অর্থাৎ একমাস পবিত্র স্ত্রীগণের কাছে যাবেন না, শপথ করেছিলেন। বাইরে হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহের সঙ্গে লাগানো একটি ওপরতলা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস এখানেই অবস্থান করেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণ শোকাচ্ছন্ন ছিলেন। আবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাবেন তাও সম্ভব ছিল না। হযরত আয়েশা রাযি.-এর অবস্থা ছিল—তিনি শুধু দিন গোনেন, কবে মাস পুরবে। মাস পূর্ণ হবার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরেই এসেছিলেন।
পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের নারী ছিলেন। আমীর-ওমরা ও নেতৃবর্গের কন্যাও ছিলেন। তাঁরা এমন অভাবের জীবন মেনে নিতে চাইতেন না। এ কারণে ইচ্ছাধিকার প্রদান করে আয়াত নাজিল হয়: যে চায় সে নবীস্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে তুষ্ট থাকুক, আর যে না চায় সে নবীপরিবার থেকে পৃথক হয়ে যাক। নবীপরিবারে এমন হতভাগী কেউই ছিলেন না, যিনি এই ভূষণ ত্যাগ করবেন। সবাই নবীস্ত্রী হয়ে থাকাকেই প্রাধান্য দিলেন। তবে এই সিদ্ধান্তগ্রহণে সর্বাগ্রে থাকলেন হযরত আয়েশা রাযি.। তিনিই সর্বপ্রথম নিজের সিন্ধান্ত জানিয়ে রাসূলকে মিনতি করেছিলেন— রাসূল, আমার নির্ণয় দয়া করে কাউকে জানাবেন না। এই কথায়ও তাঁর নারী-স্বভাবের আলোকিত বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে।
টানাপোড়েনের শেষ পরিণতিতে ইরজার আয়াত নাজিল হয়—যেই স্ত্রীকে ইচ্ছা রাখবেন, যাকে ইচ্ছা ত্যাগ করবেন। দয়ার নবী কাউকে ত্যাগ করেননি। কিন্তু ইচ্ছাধিকার তাঁর বলবৎ ছিল। হযরত আয়েশা রাযি. বলতেন—হে আল্লাহর রাসূল, যদি ক্ষমতাটা আমাকে দেওয়া হতো, তা হলে এ মর্যাদায় অন্য কাউকে প্রাধান্য দিতাম না।
গাযওয়ায়ে মুতায় হযরত জাফর তাইয়্যার রাযি.-এর শাহাদাতের খবর এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনঃকষ্টে আচ্ছন্ন ছিলেন। ইসলামে বিলাপ করা নিষিদ্ধ। কেউ এসে সংবাদ দিল, হযরত জাফরের গৃহে নারীগণ বিলাপ করছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—নিষেধ করো। লোকটা ঘুরে এসে বলল—আমার কথা শুনছে না। রাসূল বললেন—ওদের মুখে মাটি পড়ুক। লোকটা ঘুরে এসে আবার কিছু বলতে লাগল। হযরত আয়েশা রাযি. দরজার ওপাশ থেকে অস্থির হয়ে যাচ্ছিলেন; লোকটা না রাসূলের কথা মানছে, না রাসূলকে ছাড়ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়শই হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার ঠিক এভাবেই বিশ্রাম করছিলেন। হঠাৎ হযরত আবু বকর রাযি. কোনো কারণে রাগান্বিত অবস্থায় ভেতরে এলেন, এবং মেয়েকে সজোরে খোঁচা মারলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন—আমি শুধু এজন্য নড়ে উঠিনি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে।

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম : باب فضل عائشة رض : فضائل الصحابة رض. ক্রমিক: ৬২৯৯।
২. সহীহ বুখারী : كتاب أحاديث الأنبياء، باب قول الله تعالى : وضرب الله مثلا للذين آمنوا : 0833 ।
৩. সহীহ মুসলিম: -ا باب فضل خدیجه رض
৪. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম: ا باب فضل خديجة رض
১. সহীহ বুখারী : باب التطوع خلف المرأة মুয়াত্তা মালিক : ا باب صلاة الليل
২. মুআত্তা মালিক: ا باب ما جاء في الدعاء
৩. নাসাঈ : ا باب الغيرة و باب الدعاء في السجود
৪. সামান্য ভিন্নতাসহ ঘটনাটি বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে এসেছে। বিশুদ্ধ গ্রন্থগুলোই দ্রষ্টব্য। বিশেষত নাসাঈ : ا باب الغيرة 3 باب الاستغفار للمؤمنين
১. সহীহ বুখারী, পৃষ্ঠা : ৭৮৫ باب القرعة بين النساء
২. সহীহ বুখারী : باب هجرة النبي صلى الله عليه وسلم ৯৮৫ ক্রমিক : ৭৮৫।
৩. সহীহ বুখারী : كتاب المظالم باب الغرفة ক্রমিক : ২৪৬৮।
১. সহীহ বুখারী: বাবুল ঈলা (আয়েশা রাযি.-এর রেওয়ায়েত)।
২. সহীহ বুখারী: তাফসীর—সূরা আহযাব। মুসনাদে আহমদ: ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৬।
৩. সহীহ বুখারী: জানাযা অধ্যায়।
৪. সহীহ বুখারী: তায়াম্মুম অধ্যায়।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 স্ত্রীর মন রক্ষা করা

📄 স্ত্রীর মন রক্ষা করা


নবীজীবন মানবজীবনের সর্বোত্তম আদর্শ। তাই স্ত্রীর মন রক্ষা করারও শিক্ষা দিয়ে গেছেন প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মাঝেমধ্যে স্ত্রীর মন-রক্ষার্থে তিনি এমন এমন কথা বলতেন, এমন এমন কাজ করতেন, যা একটু অস্বাভাবিকই লাগে। যেমন দেখা যায়, তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেলাধুলায় থেকে-থেকে আনন্দ প্রকাশ করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. এক আনসারি কন্যার প্রতিপালন করেছিলেন। তিনি যখন অত্যন্ত সাদামাটা ও অনাড়ম্বরভাবে পুষ্যিকন্যার বিবাহ দিচ্ছিলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মন যোগাতে বলেছিলেন—একি আয়েশা, গানবাজনা তো হলোই না!
একবার ঈদের দিন। হাবশিরা উৎসবের জন্য হেলেদুলে বর্শা উঁচিয়ে পালোয়ানি প্রদর্শন করছিল। হযরত আয়েশা রাযি. দেখার আগ্রহ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে এবং হযরত আয়েশা রাযি. পেছনে দাঁড়িয়ে গেলেন। যতক্ষণ হযরত আয়েশা রাযি. নিজে সরে না গেলেন, ততক্ষণই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা দাঁড়িয়ে থাকলেন।
একবার হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আগে বেড়ে-বেড়ে কথা বলছিলেন। ঘটনাক্রমে হঠাৎ আবু বকর রাযি. এসে পড়লেন। এই অবস্থা দেখে তিনি এতটাই ক্রোধান্বিত হলেন যে, হযরত আয়েশা রাযি.-কে থাপ্পড় মারতে গেলেন; সঙ্গে-সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত ধরে নিলেন। হযরত আবু বকর রাযি. চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—দেখলে, তোমাকে কীভাবে বাঁচালাম?
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শিশুকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন—আয়েশা, একে চেন? আরজ করলেন, জি না, হে আল্লাহর রাসূল। বললেন—এ অমুকের দাসী; তুমি এর গান শুনবে? হযরত আয়েশা রাযি. ইচ্ছা প্রকাশ করলে মেয়েটি কয়েক মুহূর্ত গান গাইল। গান শোনার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, গায়িকাদের নথের মধ্যে শয়তান বাঁশি বাজায়। বোঝা গেল, এ ধরনের গানকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদম অপছন্দ করেছেন।’

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৯। সহীহ বুখারী: كتاب النکاح, فاتھ الباری।
২. সহীহ বুখারী : باب حسن المعاشرة ا الادب، باب ما جاء في المزاح : 727764
১. মুসনাদে আহমদ : মুসনাদে আয়েশা রাযি.।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 স্ত্রীকে আনন্দ দেওয়া

📄 স্ত্রীকে আনন্দ দেওয়া


স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝেমধ্যে গল্পও বলতেন। একবার কথা প্রসঙ্গে খুরাফার নাম উঠল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—জানো, খুরাফা কে? খুরাফা উষরা গোত্রের এক নামকরা লোক ছিল। খুরাফাকে ভুতেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ভূতের দেশে গিয়ে যেসব আশ্চর্য জিনিস দেখেছিল, ফিরে এসে লোকজনকে সেগুলো বলত। এজন্যই লোকেরা আশ্চর্য কিছু শুনলে বলে—এ তো খুরাফার গল্প’ (উর্দু ভাষায় 'খুরাফা'-র বহুবচন 'খুরাফাত'। শব্দটি 'অলীক' অর্থে ব্যবহৃত)।
একবার হযরত আয়েশা রাযি. গল্প বলা শুরু করলেন। গল্পের ভাষাসৌন্দর্য ও মর্ম আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। এখানে শুধু গল্পের অনুবাদটা দেওয়া হচ্ছে:
'একদিন এগারো জন সখী মিলে এক জায়গায় বসে গল্প করছিল। তারা ঠিক করল—প্রত্যেকে যার যার স্বামী সম্পর্কে বলবে, কিন্তু একদম ঠিকঠাক; এদিক-সেদিক করবে না। প্রথমজন বলল, আমার বর পাহাড়ের চূড়ায় রাখা উটের গোশতের মতো; না সেখানে কারও উঠে যাওয়ার সাধ্য হবে, আর না কারও তা উঠিয়ে নেওয়ার সাধ হবে। দ্বিতীয়জন বলল, আমি আমার বরের কথা বলব না, বাবা। যদি বলি, তা হলে এত কথা আছে যে, ভয় হয়, কিছু ছেড়ে দেব; কিংবা গোপন-অগোপন সব ঝেড়ে দেব। তৃতীয়জন বলল, আমার বরের কথা বলব না; খুব রোখা-কিছু বললে বিয়ের গিঠই খুলে যাবে; আর না বললে জীবনটাই ঝুলে যাবে।
চতুর্থজন বলল, আমার বর হেজাজের রাতের মতো নাতিশীতোষ্ণ; কাঁপায়ও না, খ্যাপায়ও না। পঞ্চমজন : আমার বর ঘরে এলে চিতা, বাইরে গেলে বাঘ; কথা দিলে রাখবেই, দ্বিতীয়বার আর বলতে হবে না।
ষষ্ঠজন: আমার বর — খেলে, একাই সব গিলে ফেলে; পিলে, একাই সব শুকিয়ে ফেলে; আর শুলে বিছানা-বালিশ সব তার; ভেতরে হাত দিয়ে দেখার বালাই নেই। সপ্তমজন বলল, আমারটা তো মাথামোটা; রোগাটেও, বখাটেও — কখন ধরে যে ঘাড় মটকায় বা হাড় মচকায়, ঠিক- ঠিকানা নেই। অষ্টমজন বলল, আমার বর — ছোঁবে, তো খরগোশকোমল; শুঁকবে, তো কুসুমসঙ্কাশ! নবমজন বলল, আমার বর — যেমন বড় শরীর, তেমন বড় মন। বিশাল বাড়ির চালা। ১ ব্যস্ত বাড়ির চুলা। ২ ব্যাপ্ত হাতের হাতিয়ার। ৩ দশমজন বলল, আমার বর — মালিক! মালিক কী বোঝ? আরে না, এর চেয়েও বেশি কিছু। বিশাল তার উটের পাল; বাড়িতেই থাকে পড়ে, মাঠে চড়ে কী করে? অতিথি আসে যদি, আপ্যায়নে দেরি হবে না? সানাই বাজলে আর মানায় কে? উট জবাই হবেই হবে। শেষ জন বড় লম্বা কাহিনী জুড়ে দিল : আমার বর — আমার বরের নাম আবু যারা। আবু যারা কে, ভেবেছ কী? আমার কত গহনা জানো? শরীরে আমার চর্বি ধরিয়ে দিয়েছে। আদরে আদরে মনও ভরিয়ে দিয়েছে। আরে, বকরিওয়ালার বাড়ি থেকে তুলে এনে উট-ঘোড়া আর সেবক-ভরা বাড়িতে আমার সে কী যত্ন! যাই বলি — মন্দ নয়। খাবে, তো যত পারো, খাও। ঘুমাবে, তো যত খুশি ঘুমাও। আবু যারার মা — আবু যারার মায়ের কথা বলছ? তার সিন্দুকের কাপড়চোপড় দেখেছ! জিনিসপত্তরের জাঁকজমক দেখেছ! আবু যারার ছেলে — আবু যারার ছেলে কেমন? যেন খোলা তলোয়ার! কচি ছাগের ভুনা না খেলে তার তৃপ্তিই হয় না। আবু যারার মেয়ে—আবু যারার মেয়ে কেমন? মা-বাপের নয়নমণি, ময়মুরব্বির অনুগতা, সতিনের ঈর্ষা, সখীদের খুশি। আবু যারার দাসী—আবু যারার দাসী কেমন? ঘরের কথা পরের কাছে কয় না, একটুও খাবার নষ্ট করে না, ঘরদোর অগোছালো রাখে না।"...
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্য ধরে দীর্ঘক্ষণ কাহিনী শুনলেন। এরপর বললেন—আয়েশা, আবু যারা উম্মে যারার জন্য যেমন ছিল, আমি তোমার জন্য তেমনই। তাই না?
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এরকম অন্তরঙ্গ মুহূর্তেও আজান হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর দেরি করতেন না। সঙ্গে সঙ্গে উঠে চলে যেতেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন—তখন মনে হতো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের চেনেনই না।

টিকাঃ
২. শামাইলে তিরমিযী: باب حديث خرافة। মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫৭।
৩. ইমাম নাসাঈ গল্পটিকে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন।
১. ধনাঢ্যতা বোঝাতে।
২. দানশীলতা বোঝাতে।
৩. পরোপকার বোঝাতে।
৪. সহীহ বুখারী, ৭৮০ পৃষ্ঠা। আবু হুসনিল মুআশারা।
১. ইমাম গাযালি রহ. ইহইয়াউল উলুম গ্রন্থে ইশতিরাতুল খুযু অধ্যায়ে ঘটনাটি এনেছেন। সহীহ বুখারী كيف يكون الرجل في أهله অধ্যায়েও এর কাছাকাছি একটি হাদীস আছে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পানাহার

📄 স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পানাহার


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই হযরত আয়েশা রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে এক দস্তরখানে বরং এক বাসনে খাবার খেতেন। এভাবেই একবার একসঙ্গে খাবার খাচ্ছিলেন। এমন সময় হযরত উমর রাযি. এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকেও ডেকে নিলেন এবং তিনজন একসঙ্গে খাবার খেলেন’ (তখনও পর্দার বিধান আসেনি)। খেতে খেতেও ভালোবাসার প্রকাশার্থে হযরত আয়েশা রাযি. যেই হাড্ডি মুখে নিতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেই হাড্ডিই মুখে নিতেন। পেয়ালায় যেই অংশে হযরত আয়েশা রাযি. মুখ লাগাতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেই অংশেই মুখ লাগাতেন। একবার তাঁরা একসঙ্গে খাবার খাচ্ছিলেন। এমন সময় হযরত সাওদা রাযি. অভিযোগ নিয়ে এলেন—হযরত উমর রাযি. প্রয়োজনেও তাঁকে বের হতে দেন না।’ আরও বর্ণিত আছে, রাতের অন্ধকারে ঘরে বাতি থাকত না। তাই অনেক সময় দুজনের হাত একই খাবারের ওপর পড়ে যেত।
একবার এক পারসিক প্রতিবেশী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আয়েশাও যাবে। তিনি বললেন—না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—তাহলে আমিও যাব না। লোকটি পরপর দুবার এলেন এবং একই প্রশ্নোত্তরের পর ফিরে গেলেন। তৃতীয়বার আবার এলেন, এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আয়েশাকেও দাওয়াত দিচ্ছ তো? শেষমেষ লোকটি বললেন—জি হাঁ। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আয়েশা রাযি. দুজনেই তার ঘরে গেলেন।

টিকাঃ
২. মুজাম তাবরানি, ৪৫ পৃষ্ঠা। আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী রহ. : باب أكل الرجل مع امرأته ا
৩. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৪। সুনানে আবি দাউদ, অধ্যায়: مواكلة الحائض ا
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুন নিকাহ, বাবু খুরুজিন নিসা।
২. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩৭।
৩. ঘটনাটি খুব সম্ভব হিজরী সনের শুরুর দিকের। হাদীসবিশারদগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক একাকী নিমন্ত্রণগ্রহণে অসম্মত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : তখন নবীপরিবারে ভীষণ অভাব ছিল। বিশেষ করে সেদিন ঘরে আহার্য কিছু ছিল না। ঘরে স্ত্রী অনাহারে থাকবেন, আর বাইরে তিনি তৃপ্তিসহকারে আহার করবেন—এটা তাঁর পছন্দ হয়নি। অপরপক্ষে প্রতিবেশী যে মুখের ওপর দুই দুইবার অনিচ্ছা ব্যক্ত করেছেন—তার কারণ, তার ঘরেও অভাব ছিল। ব্যবস্থা ছিল একজন মেহমানেরই। কিন্তু বিষয়টির গুরুতরতা বুঝতে পেরে তৃতীয়বার তিনি আরও কিছু খাবার যোগাড় করেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আসেন। ...ফিকহবিদগণ এই হাদীসকে সামনে রেখে বলেন—কোনোরকম ভনিতা, কৃত্রিমতা বা অজুহাত ছাড়াই বন্ধু-বান্ধবের নিমন্ত্রণ গ্রহণ না করা বা নিমন্ত্রণে আরও কাউকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া জায়েয। হাদীসটি সহীহ মুসলিম, الأطعمه অধ্যায়ে এসেছে। নববীও দ্রষ্টব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00