📄 নবীপরিবারের বাসগৃহের চিত্র
হযরত আয়েশা রাযি. পিতৃগৃহ ত্যাগ করে যে ঘরে এসেছিলেন তা কোনো সুউচ্চ শানদার অট্টালিকা ছিল না; বরং বনু নিযারের মহল্লায় মসজিদে নববীর পাশে ছোট-ছোট অনেক হুজরা ছিল, এগুলোরই একটি ছিল হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাসস্থান। হযরত আয়েশা রাযি.-এর হুজরার অবস্থান ছিল মসজিদে নববীর পূর্ব দিকে। হুজরার একটি দরজা মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দিকে এমনভাবে ছিল যে, মনে হতো— মসজিদে নববীই হুজরার আঙিনা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দরজা দিয়েই মসজিদে নববীতে প্রবেশ করতেন। ইতিকাফরত অবস্থায় হুজরার দিকে মাথা এগিয়ে দিতেন আর হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর কেশ মোবারক আঁচড়ে দিতেন। কখনো কখনো মসজিদে বসেই হুজরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কোনো কিছু চেয়ে নিতেন।
হুজরার প্রশস্ততা ছিল ছয়-সাত হাতের মতো। দেয়াল ছিল মাটির। ছাউনি ছিল খেজুরপাতা ও খেজুরডালের। বৃষ্টির পানি এড়ানোর জন্য ওপর থেকে কম্বলজাতীয় মোটা কাপড় বিছানো থাকত। উচ্চতা এটুকু ছিল যে, কেউ দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালে ছাউনিতে হাত ঠেকে যেত। দরজার কপাট ছিল এক পাটের।’ তাও সারা জীবনে কখনো বন্ধ হয়নি।
পর্দাস্বরূপ কাপড় ঝোলানো থাকত। হুজরার সঙ্গে লাগানো একটি ওপরতলা ছিল। ঈলার দিনগুলোতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস এখানেই অবস্থান করেছিলেন।’
টিকাঃ
১. খুলাসাতুল অফা বি আখবারি দারিল মুসতফা, চতুর্থ অধ্যায়, চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
২. সহীহ বুখারী: ইতিকাফ অধ্যায়। মুসনাদে আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩১।
৩. সহীহ বুখারী: হায়েয অধ্যায়।
৪. মুসনাদে আহমদ, ইবনে সাদ। আল আদাবুল মুফরাদ, বুখারী: কিতাবুন নিসা। খুলাসাতুল অফা।
১. খুলাসাতুল ওফা, চতুর্থ অধ্যায়।
📄 ঘরের আসবাবপত্র
ঘরে সব মিলিয়ে যা ছিল : একটা চকি, একটা চাটাই, একটা বিছানা, একটা ছালের বালিশ, খেজুর ও জব রাখার দু-একটা পাত্র, একটা জগ, একটা মগ। এর বেশি কিছু ছিল না। সত্যিকার অর্থে যেই ঘরটা ছিল পৃথিবী ও পৃথিবীবাসীর আলোর উৎস—সেই ঘরেই আলো জ্বালানোর সামর্থ্য ঘরওয়ালার ছিল না। রাতের পর রাত পার হয়ে যেত, কিন্তু ঘরে আলো জ্বলত না।
সদস্যসংখ্যা মাত্র দুজন : হযরত আয়েশা রাযি. ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কয়দিন পর হযরত বারীরাহ রাযি. নাম্নী দাসীও যোগ হলো।’ যতদিন পর্যন্ত হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত সাওদা রাযি. কেবল দুজনই পবিত্র স্ত্রীর মর্যাদায় ভূষিত ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন পরপর হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে যখন আরও অনেক মহীয়সী এই বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টতা লাভ করেন, তখন বার্ধক্যজনিত কারণে হযরত সাওদা রাযি. তাঁর অধিকার হযরত আয়েশা রাযি. এর অনুকূলে ছেড়ে দেন। সুতরাং নয় দিনে দুই দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে অবস্থান করতেন।
টিকাঃ
২. আবু দাউদ : উপবিষ্ট অবস্থায় ইমামের নামায অধ্যায়।
৩. হাদীসগ্রন্থসমূহে বিভিন্ন প্রসঙ্গে এগুলোর নাম এসেছে। দেখুন— ة حلوة الليل، الحيض، الطهارةত্যাদি অধ্যায়গুলো।
৪. সহীহ বুখারী, ا باب التطوع خلف المرأة
৫. মুসনাদে তয়ালিসি, পৃষ্ঠা : ২০৭।
৬. সহীহ বুখারী, পৃষ্ঠা : ৩৪৮ | ا باب الصدقة، الإفك، باب استغاثة المكاتب
📄 অভাব-অনটন
ঘরের কাজ বেশি ছিল না। খানা পাকানোর সুযোগও কম হতো। স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, একটানা তিন দিন ঠিকমতো আহার জুটেছে—নবীপরিবারে কখনো এমন হয়নি। তিনি আরও বলেন, মাসের পর মাস চুলোয় আগুন জ্বলত না। শুকনো খেজুর ও পানিতেই দিন কাটত। অবশ্য খায়বার বিজয়ের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণের খোরপোশস্বরূপ বার্ষিক ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন—আশি অসক শুকনো খেজুর, বিশ অসক জব। কিন্তু সেসব তাঁরা দান-খয়রাত করে শেষ করে ফেলতেন। অভাব-অনটন সবসময় লেগেই থাকত।
সাহাবা কেরام রাযি. মহব্বত করে মাঝেমধ্যে হাদিয়া-তোহফা পাঠাতেন—বিশেষ করে, যেদিন হযরত আয়েশা রাযি.-এর হুজরায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থাকার কথা থাকত, সেদিন তাঁরা হাদিয়া পাঠানোর চেষ্টা করতেন বেশি। প্রায়ই এমন হতো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইরে থেকে এসে জিজ্ঞেস করতেন, আয়েশা, ঘরে খাবার কিছু আছে? হযরত আয়েশা রাযি. উত্তর দিতেন, হে আল্লাহর রাসূল, ঘরে কিছু নেই। আর কী! দুজনেই উপোস। কখনো-কখনো কোনো আনসারি সাহাবী দুধ পাঠিয়ে দিতেন। নবীপরিবার তুষ্ট।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: معيشة النبي صلى الله عليه وسلم। মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ২৫৫।
২. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ২১৭, ২৩৭। মুসনাদে তয়ালিসি, পৃষ্ঠা: ২০৭। সহীহ বুখারী, পানাহার অধ্যায়ে আছে—একমাস। ا كيف كان عيش النبي صلى الله عليه وسلم ..
৪. আবু দাউদ, ا حكم أرض الخيبر
৫. সহীহ বুখারী, افضل عائشة رض
৬. মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৯।
৭. মুসনাদে আহমদ, ২৪৪ পৃষ্ঠা।
📄 নিজ হাতে খানা পাকানো
আল্লাহপ্রদত্ত এমন বিবেক, বুদ্ধি ও চেতনা সত্ত্বেও—বিশেষ করে বয়স যেহেতু খুবই কম ছিল—ভুল-ত্রুটি করে ফেলতেন। আটা পিষে রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন, আর বকরি এসে খেয়ে ফেলত। একদিনের ঘটনা—হযরত আয়েশা রাযি. নিজ হাতে আটা পিষে রুটি বানিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপেক্ষায় আছেন। রাতের বেলা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং নামাযে দাঁড়ালেন। হযরত আয়েশা রাযি. একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন। পাশের বাড়ির বকরি এসে সব খেয়ে চলে গেল। অন্য স্ত্রীগণের তুলনায় হযরত আয়েশা রাযি. ভালো রান্না করতে পারতেন না।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, الإنك
২. আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী, ... ا باب لا يؤذى جاره
৩. আবু দাউদ, ... ا باب من أفد شيئنا