📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সংশোধন, শিষ্টাচার ও মহত্ত্বের দীক্ষা

📄 সংশোধন, শিষ্টাচার ও মহত্ত্বের দীক্ষা


এ তো গেল হযরত আয়েশা রাযি.-কর্তৃক স্বতঃপ্রণোদিত কিছু জিজ্ঞাসা ও প্রয়োজনীয় আলোচনার কথা। এগুলো ছাড়াও স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হযরত আয়েশা রাযি.-এর আচার- ব্যবহার, কথাবার্তা, চলা-বলা লক্ষ রাখতেন; কোনো ত্রুটি পেলে শুধরে দিতেন, কিছু শেখানোর থাকলে শিখিয়ে দিতেন—এমন অনেক উদাহরণ আছে হাদীসগ্রন্থের পাতায় পাতায়।
একবার কিছু ইহুদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এল। তারা (السّلامُ عَلَيْكَ )আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) না বলে বলল, السامُ عَلَيْكَ )আপনার ওপর মৃত্যু আপতিত হোক); রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তকণ্ঠে উত্তর দিলেন, وَعَلَيْكُمْ )এবং আপনাদের ওপর)। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. ধৈর্য ধরতে পারলেন না; তিনি বলে উঠলেন, عَلَيْكُمْ السَّامُ وَالَّعْنَةِ )আর তোমাদের ওপর মৃত্যু ও অভিশাপ নেমে আসুক)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, নম্র হও, আল্লাহ সর্ব বাক্যে নম্রতা পছন্দ করেন।
একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোনো জিনিস চুরি হলো। তখনকার রীতি অনুসারে হযরত আয়েশা রাযি. চোরকে অভিশাপ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, لَا تَسْتَبْحِي عَنْهُ অর্থাৎ অভিশাপ করে নিজের নেকি আর পরের বদি কমিয়ো না। একবার সফরে হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে উটে সওয়ার ছিলেন। হঠাৎ উট কিছুটা তেজ দেখাতে লাগল। সাধারণ নারীর মতো হযরত আয়েশা রাযি.-এর মুখেও অভিশাপের বাক্য এসে পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন, এই উটকে ফিরিয়ে নেওয়া হোক; কোনো অভিশপ্ত বস্তু আমার সঙ্গে থাকতে পারে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিল এটা শিক্ষা দেওয়া যে, কোনো প্রাণীকেও মন্দ বলা অনুচিত।
সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, ছোটখাটো গুনাহর পরোয়া করে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে সম্বোধন করে বলেন, ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি থেকেও বেঁচে থেকো, এগুলোরও হিসাব হবে। একবার হযরত আয়েশা রাযি. রাসূলের কাছে জনৈকা মহিলার অবস্থা ব্যক্ত করছিলেন; কথা প্রসঙ্গে বললেন, সে বেঁটে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আয়েশা, এও গীবত।
হযরত সাফিয়্যা রাযি. কিছুটা খর্বাকৃতির ছিলেন। একদিন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আর কী বলবেন, সাফিয়‍্যা তো এটুক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এমন কথা বললে, যদি সমুদ্রের পানিতে মেশানো হয়, মিশে যাবে (অর্থাৎ তোমার এ কথা এতই লোনা যে যদি সমুদ্রে মেশানো হয় তা হলে সমুদয় পানি লোনা হয়ে যাবে)। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আমি তো কারও সম্পর্কে বাস্তবতাই তুলে ধরেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি এত-এত-এতও আমাকে দেওয়া হয়, তবু এ ধরনের কথা বলব না (অর্থাৎ যত লোভই আমাকে দেখানো হোক, কারও সম্পর্কে এহেন মন্তব্য করব না)।
একবার এক ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইল। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ইশারায় দাসী কিছু দান নিয়ে এগিয়ে এল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, গুনে গুনে দান কোরো না, তা হলে আল্লাহও তোমাকে গুনে গুনে দান করবেন। আরেক জায়গায় বলেন, আয়েশা, এক টুকরো শুকনো খেজুরও যদি থাকে, তাও ভিক্ষুককে দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষা করো। এক টুকরো শুকনো খেজুর যদি ক্ষুধার্ত আহার করে তাও কাজে লাগবে। অপ্রয়োজনে নিজের পেটে দিয়ে কী এমন লাভ হবে?
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করলেন, আয় আল্লাহ, আমাকে মিসকিনভাবে জীবিত রাখুন, মিসকিনভাবে মৃত্যু দান করুন, মিসকিনদের সঙ্গেই হাশর করান। হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এমন দুআ কেন করছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, মিসকিনরা ধনীদের চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে যাবে। আয়েশা, কখনো কোনো মিসকিনকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। এক টুকরো শুকনো খেজুর হলেও দিয়ো। আয়েশা, মিসকিনদের ভালোবেসো, তাদেরকে কাছে আসার সুযোগ দিয়ো।
এরকম অনেক নৈতিক উপদেশ ছাড়াও ইবাদত-বন্দেগী, দুআ-জিকির ও ধর্ম-কর্মের অধিকাংশ বিষয়ই স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে শিক্ষা দিতেন। হযরত আয়েশা রাযি. খুবই আগ্রহের সঙ্গে সেগুলো শিখতেন এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে একেকটা নির্দেশ পালন করতেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ا باب الرفق في الأمر كله
২. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৪৫।
৩. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৭২।
৪. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৭০।
১. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ২০৬।
২. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৭০।
৩. আবু দাউদ, কিতাবুল আদব।
৪. মুসনাদে আয়েশা রাযি., পৃষ্ঠা: ৭৯।
১. জামে তিরমিযী: আবওয়াবুয যুহদ।
২. মুসনাদে আয়েশা রাযি, পৃষ্ঠা: ১৮৩, ১৪৭, ১৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00