📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 দরসে নববী থেকে উপকৃত হওয়া

📄 দরসে নববী থেকে উপকৃত হওয়া


ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না। স্বয়ং ধর্মগুরুই তো ঘরের মনিব। প্রাণপ্রিয় পরম শ্রদ্ধেয় জীবনসঙ্গীর মোবারক সোহবত সবসময়ই তিনি লাভ করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তালীম ও ইরশাদের যাবতীয় মজলিস অনুষ্ঠিত হতো মসজিদে নববীতে, যা তাঁর ঘরের সঙ্গে লাগানো। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের বাইরেও সাহাবায়ে কেরামকে যা শিক্ষা দিতেন, হযরত আয়েশা রাযি. সেগুলোতেও শরীক থাকতেন। দূরত্বের কারণে কোনো কথা বুঝতে অসুবিধা হলে পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে ভালোভাবে বুঝে নিতেন। কখনো উঠে মসজিদের কাছে চলে যেতেন। তা ছাড়া সপ্তাহে সাহাবিয়াগণের তালীম তালকীনের জন্য নির্ধারিত দিনটি তো ছিলই।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আয়েশা রাযি., পৃষ্ঠা: ৭৭।
২. মুসনাদে আয়েশা রাযি, পৃষ্ঠা: ১৫৭১।
৩. সহীহ বুখারী: কিতাবুল ইলম।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আমলী সাওয়ালত ও বাস্তবভিত্তিক জিজ্ঞাসা

📄 আমলী সাওয়ালত ও বাস্তবভিত্তিক জিজ্ঞাসা


দিন-রাত অসংখ্য ইলমী আলোচনা হযরত আয়েশা রাযি.-এর কর্ণগোচর হতো। তাঁর অভ্যাস ছিল, তিনি যে কোনো মাসআলা নির্দ্বিধায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করতেন। স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হতেন না। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
مَنْ حُوْسِبَ فَقَدْ عُذِّبَ
অর্থ: যার হিসাব নেওয়া হবে তার শাস্তি হবেই।
হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ তো বলেছেন,
فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا
অর্থ: অচিরেই হিসাব নেওয়া হবে, বড় সহজ হিসাব। (সূরা ইনশিকাক, আয়াত: ৮)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ তো হিসাব হবে- সেই কথা; কিন্তু যার হিসাব হবে, সে তো গেল।
একবার হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ বলেছেন, يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
অর্থ: যেদিন আসমান জমিন বদলে দেওয়া হবে। আর তারা মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে। (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪৮)
অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি এই আয়াত উল্লেখ করেছিলেন, وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِيْنِه
অর্থ: কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী তাঁর মুঠোয় হবে। আসমান তাঁর হাতের মধ্যে গুটিয়ে যাবে। (সূরা যুমার, আয়াত: ৩৯)
তাঁর প্রশ্ন ছিল, যদি আসমান জমিন কিছুই না থাকে, তা হলে মানুষ থাকবে কোথায়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুলসিরাতে।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়ান করছিলেন। তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন বিবস্ত্র অবস্থায় মানুষের উত্থান হবে। পরে হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, নারী পুরুষ একসঙ্গে? তবে কি একে অপরের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে বড় নাজুক মুহূর্ত হবে। কারও কোনো খবর থাকবে না।
একবার হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কিয়ামতের দিন কেউ কাউকে স্মরণ করবে কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনটি জায়গায় কেউ কাউকে স্মরণ করবে না, কারও কথা কারও মনেও পড়বে না: এক. যখন আমল ওজন করা হবে; দুই. যখন আমলনামা বণ্টিত হবে; তিন, যখন জাহান্নাম গর্জন শুরু করবে আর বলতে থাকবে-আমি তিন ধরনের মানুষের জন্য তৈরি হয়েছি...'
একবার জিজ্ঞেস করার ছিল, কাফের মুশরিক যদি নেক আমল করে তবে তার সওয়াব পাবে কি না? মক্কায় আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন নামক একজন মুশরিক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ ও মহৎ মানুষ ছিলেন। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে কুরাইশের আত্মকলহ-নিরসনে নেতৃবর্গকে একত্র করে তিনি একটি সন্ধি স্থাপন করেছিলেন। স্বয়ং হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেই মহৎ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন জাহেলি যুগেও মানুষের প্রতি সহমর্মিতা করতেন, অভাবীকে সহায়তা করতেন। তার আমল কি কোনো উপকারে আসবে না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-না, আয়েশা। তিনি তো কোনোদিনই এ কথা বলেননি-হে আমার প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন।
জিহাদ ইসলামের অন্যতম ফরজ। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ধারণা ছিল, যেহেতু অন্যান্য ফরজে নারী-পুরুষে ব্যবধান নেই, সেহেতু জিহাদও নারীর ওপর ফরজ হবে। একদিন বিষয়টি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, নারীর জন্য হজই জিহাদ।
বিবাহে নারীর সম্মতি শর্ত। কিন্তু কুমারী মেয়ে তো মুখ ফুটে বলতে পারে না। তাই হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, বিবাহে নারীর সম্মতি নিতেই হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, কুমারী তো নীরব থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নীরবতাই তার সম্মতি নির্দেশ করবে।
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অনেক বেশি। আর এ ধরনের ক্ষেত্রগুলো সবচেয়ে বেশি নারীকেই সামলাতে হয়। কিন্তু সমস্যা এই যে, একাধিক প্রতিবেশী হলে প্রাধান্য দেবে কাকে? হযরত আয়েশা রাযি. বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, যার ঘর তোমার ঘরের সবচেয়ে কাছে হবে, তাকেই বেশি মূল্য দেবে।
একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর দুধচাচা দেখা করতে এলেন। হযরত আয়েশা রাযি. প্রথমে দেখা করলেন না। তিনি মনে করলেন, আমি দুধ পান করেছি ঠিকই, কিন্তু একজন স্ত্রীলোকের; তার দেবরের সঙ্গে নিশ্চয় আমার কোনো সম্পর্ক নেই। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে উত্থাপন করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি তোমার চাচা বলেই গণ্য হবেন, তাকে ভেতরে নিয়ে এসো।
কুরআন মাজীদে একটি আয়াত আছে,
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ
অর্থ : ...আর যারা আমল করে এমতাবস্থায় যে, তাদের অন্তর এই কারণে ভীতসন্ত্রস্ত যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।... (সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৬০)
হযরত আয়েশা রাযি.-এর সন্দেহ ছিল—যারা চোর, বদমাশ, মদখোর—আবার অন্তরে আল্লাহর ভয়ও আছে, তারাও কি এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে দিলেন—না, বরং যারা নামাযী, রোযাদার এবং খোদাভীরু আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আল্লাহর সাক্ষাৎ চায়, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ চান। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ চায় না, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ চান না। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো কেউই মৃত্যু চাই না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর অর্থ এটা নয়; এর অর্থ হলো-যখন মুমিন বান্দা আল্লাহর রহমত, রেজামন্দি ও জান্নাতের কথা শোনে, তখন তার অন্তর আল্লাহর সাক্ষাৎ ও দীদার পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। সে অবস্থায় আল্লাহ তাআলাও সেই বান্দার সাক্ষাৎ চাইতে থাকেন। পক্ষান্তরে যখন কোনো কাফের আল্লাহর আজাব-গজবের কথা শোনে, তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতকে ঘৃণা করে, আল্লাহও তাকে ঘৃণা করেন।
হাদীসগ্রন্থগুলো হযরত আয়েশা রাযি. কর্তৃক এরকম অসংখ্য জিজ্ঞাসা, অসংখ্য ভাবনা, অসংখ্য আলোচনাকে ধারণ করে আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, এগুলো তাঁর জীবনমুখী শিক্ষার প্রতিদিনের বিচিত্র পাঠ।
বাহ্যিকভাবে যেসব ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পাওয়ার বা অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা, হযরত আয়েশা রাযি. সেসব ক্ষেত্রেও প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতেন না। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এতে মনঃক্ষুণ্ণ হতেন না। একবার কোনো বিষয়ে কষ্ট পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈলা করেছিলেন (অর্থাৎ শপথ করেছিলেন, এক মাস পবিত্র স্ত্রীগণের কাছে যাবেন না)। তাই উনত্রিশ দিন ওপরতলায় অবস্থান করেছিলেন। সহধর্মিনীগণ বিচলিত ছিলেন। ঘটনাক্রমে মাসটি ছিল উনত্রিশ দিনের। যাই হোক, ত্রিশতম দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওপরতলা থেকে নেমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. আনন্দে সবকিছু ভুলে যাওয়ার কথা ছিল। উপরন্তু একে কেন্দ্র করে কোনো প্রশ্ন তোলা বাহ্যিকভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরেকবার কষ্ট দেওয়ার মতোই ছিল। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. যেহেতু নববী-চরিত্রের মাধুরী সম্পর্কে অবগত ছিলেন, সেহেতু সবকিছুর ওপর শরীয়তের বিধি-নিষেধকেই প্রাধান্য দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বলেছিলেন, একমাস আমাদের কাছে আসবেন না। তা হলে এক দিন আগে—ঊনত্রিশ দিন পূর্ণ করে—কী করে এলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, চন্দ্রমাস কখনো ঊনত্রিশ দিনেও হয়।
একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আসার অনুমতি চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আসতে দাও, আপনজনদের সঙ্গে সে ভালো ব্যবহার করে না। লোকটা যখন ভেতরে এসে বসল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি মনোযোগী হলেন এবং খুবই কোমল ও প্রীতভাবে কথা বললেন। হযরত আয়েশা রাযি. অবাক হলেন। লোকটা চলে গেলে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তো লোকটাকে ভালো মনে করেন না; অথচ তার সঙ্গে এত কোমল ও প্রীতভাবে কথা বললেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আয়েশা, নিকৃষ্ট তো সে-ই, যার ব্যবহারে মানুষ দূরে সরে যায়।
পল্লী আরবের বর্বর বেদুইনরা ছিল বেপরোয়া মনোভাবের। ইসলামের বিধিনিষেধ সম্পর্কে এদের পূর্ণ ধারণা ছিল না। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের খাদ্যসামগ্রীগ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করতেন। একবার উম্মে সুম্বুলা নাম্নী জনৈকা মহিলা এলেন হাদিয়াস্বরূপ দুধ নিয়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করলেন। হযরত আবু বকর রাযি. সঙ্গে ছিলেন, তিনিও পান করলেন। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এদের খাবার খাওয়া পছন্দ করতেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, এরা ওরকম নয়। এদের ডাকা হলে এরা আসে। তাই শরীয়তের বিধি-নিষেধ সম্পর্কে এদের ধারণা আছে।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কাজে কর্মে মধ্যমতা অবলম্বন করো, মানুষকে ডেকে সুসংবাদ দাও যে, মানুষের আমল মানুষকে জান্নাতে নেবে না; বরং আল্লাহর রহমত তাদেরকে জান্নাতে নেবে। শেষ উক্তিটি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে অস্বাভাবিক মনে হলো। তিনি ভাবলেন, যারা নিষ্পাপ তাদের কথা নিশ্চয় আলাদা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকেও কি আপনার আমল জান্নাতে নেবে না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, বরং আমার আল্লাহ আমাকে আপন ক্ষমা ও করুণা দ্বারা ঢেকে নেবেন।
একবার তাহাজ্জুদের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর না পড়ে শুতে চাইলেন। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, বিতর না পড়েই শুয়ে পড়ছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, আমার চোখদুটো ঘুমায়; কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না।
বাহ্যিকভাবে এ ধরনের বেশ কিছু প্রশ্ন হযরত আয়েশা রাযি.-এর শানে অশোভন মনে হয়। কিন্তু তিনি যদি স্ত্রীসুলভ সৎসাহসটুকু না দেখাতেন, তা হলে মুসলিম উম্মাহ অবশ্যই নবুওয়াতের প্রকৃতি ও স্বরূপ সম্পর্কে অনবগত থেকে যেত।

টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী: কিতাবুল ইলম, পৃষ্ঠা: ২১।
৫. সহীহ বুখারী: কিতাবুল ইলম।
১. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৩৫।
২. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ২১০।
৩. সহীহ বুখারী, হাশরের অবস্থা, পৃষ্ঠা: ৯৬৬।
১. মুসনাদে আয়েশা রাযি. পৃষ্ঠা: ৯৩।
২. মুসনাদে আয়েশা রাযি.. পৃষ্ঠা: ৯৩।
৩. সহীহ বুখারী: মহিলাদের হজ।
৪. সহীহ মুসলিম: বিবাহ অধ্যায়।
১. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ১৭৫।
২. সহীহ বুখারী, পৃষ্ঠা: ৯০৯।
১. জামে তিরমিযী: জানাযার অধ্যায়।
১. সহীহ বুখারী : باب الفرقة
২. সহীহ বুখারী : باب الغيبة
৩. মুসনাদে আয়েশা রাযি., পৃষ্ঠা: ১৩৩।
১. সহীহ বুখারী: باب القشد والمداومة على العمل
২. সহীহ বুখারী : افضل من قام رمضان

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সংশোধন, শিষ্টাচার ও মহত্ত্বের দীক্ষা

📄 সংশোধন, শিষ্টাচার ও মহত্ত্বের দীক্ষা


এ তো গেল হযরত আয়েশা রাযি.-কর্তৃক স্বতঃপ্রণোদিত কিছু জিজ্ঞাসা ও প্রয়োজনীয় আলোচনার কথা। এগুলো ছাড়াও স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হযরত আয়েশা রাযি.-এর আচার- ব্যবহার, কথাবার্তা, চলা-বলা লক্ষ রাখতেন; কোনো ত্রুটি পেলে শুধরে দিতেন, কিছু শেখানোর থাকলে শিখিয়ে দিতেন—এমন অনেক উদাহরণ আছে হাদীসগ্রন্থের পাতায় পাতায়।
একবার কিছু ইহুদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এল। তারা (السّلامُ عَلَيْكَ )আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) না বলে বলল, السامُ عَلَيْكَ )আপনার ওপর মৃত্যু আপতিত হোক); রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তকণ্ঠে উত্তর দিলেন, وَعَلَيْكُمْ )এবং আপনাদের ওপর)। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. ধৈর্য ধরতে পারলেন না; তিনি বলে উঠলেন, عَلَيْكُمْ السَّامُ وَالَّعْنَةِ )আর তোমাদের ওপর মৃত্যু ও অভিশাপ নেমে আসুক)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, নম্র হও, আল্লাহ সর্ব বাক্যে নম্রতা পছন্দ করেন।
একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোনো জিনিস চুরি হলো। তখনকার রীতি অনুসারে হযরত আয়েশা রাযি. চোরকে অভিশাপ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, لَا تَسْتَبْحِي عَنْهُ অর্থাৎ অভিশাপ করে নিজের নেকি আর পরের বদি কমিয়ো না। একবার সফরে হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে উটে সওয়ার ছিলেন। হঠাৎ উট কিছুটা তেজ দেখাতে লাগল। সাধারণ নারীর মতো হযরত আয়েশা রাযি.-এর মুখেও অভিশাপের বাক্য এসে পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন, এই উটকে ফিরিয়ে নেওয়া হোক; কোনো অভিশপ্ত বস্তু আমার সঙ্গে থাকতে পারে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিল এটা শিক্ষা দেওয়া যে, কোনো প্রাণীকেও মন্দ বলা অনুচিত।
সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, ছোটখাটো গুনাহর পরোয়া করে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে সম্বোধন করে বলেন, ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি থেকেও বেঁচে থেকো, এগুলোরও হিসাব হবে। একবার হযরত আয়েশা রাযি. রাসূলের কাছে জনৈকা মহিলার অবস্থা ব্যক্ত করছিলেন; কথা প্রসঙ্গে বললেন, সে বেঁটে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আয়েশা, এও গীবত।
হযরত সাফিয়্যা রাযি. কিছুটা খর্বাকৃতির ছিলেন। একদিন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আর কী বলবেন, সাফিয়‍্যা তো এটুক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এমন কথা বললে, যদি সমুদ্রের পানিতে মেশানো হয়, মিশে যাবে (অর্থাৎ তোমার এ কথা এতই লোনা যে যদি সমুদ্রে মেশানো হয় তা হলে সমুদয় পানি লোনা হয়ে যাবে)। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আমি তো কারও সম্পর্কে বাস্তবতাই তুলে ধরেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি এত-এত-এতও আমাকে দেওয়া হয়, তবু এ ধরনের কথা বলব না (অর্থাৎ যত লোভই আমাকে দেখানো হোক, কারও সম্পর্কে এহেন মন্তব্য করব না)।
একবার এক ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইল। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ইশারায় দাসী কিছু দান নিয়ে এগিয়ে এল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, গুনে গুনে দান কোরো না, তা হলে আল্লাহও তোমাকে গুনে গুনে দান করবেন। আরেক জায়গায় বলেন, আয়েশা, এক টুকরো শুকনো খেজুরও যদি থাকে, তাও ভিক্ষুককে দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষা করো। এক টুকরো শুকনো খেজুর যদি ক্ষুধার্ত আহার করে তাও কাজে লাগবে। অপ্রয়োজনে নিজের পেটে দিয়ে কী এমন লাভ হবে?
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করলেন, আয় আল্লাহ, আমাকে মিসকিনভাবে জীবিত রাখুন, মিসকিনভাবে মৃত্যু দান করুন, মিসকিনদের সঙ্গেই হাশর করান। হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এমন দুআ কেন করছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, মিসকিনরা ধনীদের চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে যাবে। আয়েশা, কখনো কোনো মিসকিনকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। এক টুকরো শুকনো খেজুর হলেও দিয়ো। আয়েশা, মিসকিনদের ভালোবেসো, তাদেরকে কাছে আসার সুযোগ দিয়ো।
এরকম অনেক নৈতিক উপদেশ ছাড়াও ইবাদত-বন্দেগী, দুআ-জিকির ও ধর্ম-কর্মের অধিকাংশ বিষয়ই স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে শিক্ষা দিতেন। হযরত আয়েশা রাযি. খুবই আগ্রহের সঙ্গে সেগুলো শিখতেন এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে একেকটা নির্দেশ পালন করতেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ا باب الرفق في الأمر كله
২. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৪৫।
৩. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৭২।
৪. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৭০।
১. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ২০৬।
২. মুসনাদে আহমদ, পৃষ্ঠা: ৭০।
৩. আবু দাউদ, কিতাবুল আদব।
৪. মুসনাদে আয়েশা রাযি., পৃষ্ঠা: ৭৯।
১. জামে তিরমিযী: আবওয়াবুয যুহদ।
২. মুসনাদে আয়েশা রাযি, পৃষ্ঠা: ১৮৩, ১৪৭, ১৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00