📄 রোকসত
হযরত আয়েশা রাযি.-এর পরিবার বনু হারিস ইবনে খাযরাজের পাড়ায় অবতরণ করেন। প্রায় সাত-আট মাস তিনি মাতার সঙ্গে সেখানেই থাকেন। অধিকাংশ মুহাজিরই নতুন জায়গার নতুন আবহাওয়া সহজে মানিয়ে নিতে পারলেন না। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আবু বকর রাযি.-ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন। পিতার শুশ্রূষার দায়িত্ব নিলেন হযরত আয়েশা রাযি.। তিনি বলেন, আমি আমার পিতার কাছে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলে তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করতেন-
كُلُّ امْرِئٍ مُصَبَّحْ فِي أَهْلِهِ - والمَوْتُ أَدْنَى مِن شِرَاكِ نَعْلِهِ
অর্থ: নিজ বাসভূমেও রোগের আক্রমণ। মৃত্যুর শমন-সে তো ছায়ার মতন।
হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে আবু বকর রাযি.-এর অবস্থা ব্যক্ত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সুস্থতার জন্য দুআ করলেন। আবু বকর রাযি. তো সুস্থ হলেন; কিন্তু অচিরেই হযরত আয়েশা রাযি.-ও অসুস্থ হলেন। এবার যেন পিতার পালা পুত্রীর দেখাশোনা করার। নয়নমণির করুণ অবস্থা হযরত আবু বকর রাযি.-কে ভীষণ পীড়া দিত। অবস্থার এত অবনতি হয়েছিল যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর সমস্ত চুল পড়ে গিয়েছিল।
সুস্থ হলে আবু বকর রাযি. রাসূলের কাছে এসে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার স্ত্রীকে ঘরে আনছেন না কেন? প্রিয়নবী বললেন, এই মুহূর্তে মোহর পরিশোধ করার মতো পয়সা কাছে নেই। আবু বকর রাযি.-এর বিনীত নিবেদন—যদি আমার পয়সা কবুল করতেন! প্রিয়নবী আবু বকর রাযি. থেকে বারো উকিয়া এক নশ কর্জরূপে গ্রহণ করে আয়েশা রাযি.-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন।’ যারা মোহর পরিশোধ করা অনাবশ্যক জ্ঞান করি, তারা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। মোহর তো স্ত্রীর অধিকার। সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে বঞ্চিত করা অন্যায়।
মদীনা যেন হযরত আয়েশা রাযি.-এর শ্বশুরালয়। আনসারি মহিলাগণ কনেকে বরণ করার জন্য আবু বকর রাযি.-এর গৃহে এলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তখন সখীদের সঙ্গে দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন। হযরত উম্মে রুমান রাযি. মেয়েকে ডাক দিলেন। মায়ের ডাক শুনে মেয়ে ছুটে এলেন। মা হাত-মুখ ধুইয়ে দিলেন, মাথা আঁচড়ে দিলেন, তারপর আনসারি অতিথিনীদের অপেক্ষাগারে নিয়ে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-কে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে তারা অভ্যর্থনা জানালেন; বললেন—
عَلَى الْخَيْرِ وَالْبَرَكَةِ وَعَلَى خَيْرٍ طَائِرٍ
তোমার আগমন শুভ হোক, কল্যাণকর হোক, বরকতময় হোক।
তারা হযরত আয়েশা রাযি.-কে সাজিয়ে নিলেন। একটু পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন হলো।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আপ্যায়ন করার মতো এক পেয়ালা দুধ ছাড়া হযরত আবু বকর রাযি.-এর গৃহে কিছুই ছিল না। হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ হযরত আয়েশা রাযি.-এর ছোটবেলার সখী ছিলেন। তিনি বলেন, আমি সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্য দুধ পান করে আয়েশা রাযি.-এর দিকে এগিয়ে দিলেন। তিনি খুব লজ্জা পাচ্ছিলেন। আমি বললাম, রাসূলের উপহার, ফিরিয়ে দিয়ো না। হযরত আয়েশা রাযি. অত্যন্ত লাজুকভাবে পেয়ালা হাতে নিলেন এবং একটু মুখে দিয়েই রেখে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার সখীদেরও দাও। আমরা বললাম, আমাদের ইচ্ছে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মিথ্যা বোলো না, মানুষের সব মিথ্যাই লেখা হয়ে থাকে।’
সঠিক বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আয়েশা রাযি.-এর রোখসত হয় শাওয়াল ১ম হিজরী, দিনের বেলা। আল্লামা সুয়ূতি রহ. উমদাতুল কারী গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর রোখসত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরী, বদর যুদ্ধের পর; কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা এ হিসাব অনুযায়ী হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স তখন দশ বছর হয়ে যায়; যেখানে হাদীস ও ইতিহাসের সমস্ত প্রামাণ্যগ্রন্থ একমত যে, রোখসতের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ছিল নয় বছর।
টিকাঃ
১. তাবাকাতুন নিসা, ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৪৩।
২. আবু দাউদ, শিষ্টাচার অধ্যায়।
৩. সহীহ বুখারী, ক্রমিক নং: ৫৬৫৪।
৪. সহীহ বুখারী, হিজরত অধ্যায়ে সবগুলো ঘটনা আছে।
১. তাবাকাত, ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৪৩।
২. সহীহ বুখারী, হযরত আয়েশা রাযি. এর বিবাহ, পৃষ্ঠা: ৫৫১। সহীহ মুসলিম, বিবাহ অধ্যায়।
📄 কুসংস্কারের অপনোদন
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে কারও বুঝতে বাকি থাকে না যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ, মোহর, রোখসত কতটা সাদামাটাভাবে হয়েছিল। অপচয়, আড়ম্বরতার লেশ পর্যন্ত ছিল না। وَفِي ذَالِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ (প্রতিযোগিতা করতেই হয়, তো এতেই করা উচিত)।
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের কল্যাণে আরবে বিরাজিত অসংখ্য কুসংস্কারের অপনোদন ঘটে। আরবরা মুখে-বলা ভাইয়ের মেয়েকেও বিয়ে করত না। হযরত খাওলা রাযি. যখন আবু বকর রাযি.-এর কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন তখন আবু বকর রাযি. বলেছিলেন, এ কী করে সম্ভব? আয়েশা তো রাসূলের ভাতিজি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিয়েছিলেন, أَنْتَ أَخٌ فِي الْإِسْلام অর্থ : তুমি আমার ভাই; কিন্তু ধর্মের সূত্রে।
আরবরা শাওয়াল মাসে বিবাহ করত না। কোনো এককালে এ মাসে আরবে মহামারী দেখা দিয়েছিল। তাই এ মাস তাদের দৃষ্টিতে ছিল অশুভ।’ হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ, রোখসত উভয়ই শাওয়াল মাসে হয়েছিল। এ জন্য তিনি শাওয়াল মাসেই এসব অনুষ্ঠান পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, আমার বিবাহ রোখসত উভয়ই শাওয়াল মাসে হয়েছে। জীবনসঙ্গীর বিচারে আমার চেয়ে ভাগ্যবতী কে আছে?
আরবে পূর্ব থেকেই রীতি ছিল যে, কন্যার সামনে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত থাকতে হবে। এও রীতি ছিল যে, স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ হবে পালকির ভেতর। ইমাম বুখারী রহ. এবং ইমাম কসতলানি রহ. লিখেছেন—এই সব কুসংস্কার হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের মধ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ, মুসনাদে আয়েশা রাযি.।
২. উমদাতুল কারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৫।
৩. সূরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ২৬।
১. তাবাকাত, ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৪১।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম, বিবাহ অধ্যায়।
৩. সহীহ বুখারী, বিবাহ অধ্যায়।