📄 অষ্টম অধিকার: তাদের মধ্যকার ঘটিত বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করা এবং এ ব্যাপারে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা
সাহাবীগণের মধ্যে যে সব ফিতনা, জিহাদ, ঝগড়া-ঝাঁটি ও বিতর্ক সংঘটিত হয়েছিল সে ব্যাপারে প্রত্যেক মুমিনের উচিৎ সেসব ব্যাপার থেকে মুখ ফিরিয়ে নীরব থাকা, এড়িয়ে যাওয়া ও সেগুলো নিয়ে বেশি মাতামাতি না করা। কবির ভাষায়, ‘তাদের মধ্যে যা ঘটেছিল সে ব্যাপারে আমরা নীরব থাকব, ‘ইজতিহাদের সাওয়াব তাদের জন্য আমরা সাব্যস্ত করব।’৮১ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত বিরোধপূর্ণ ব্যাপারে অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হতে নিষেধ করা হয়েছে। সাথে সাথে এ বিশ্বাস রাখার কথা বলা হয়েছে যে, এগুলো ছিল তাদের ইজতিহাদ, যাতে ভুল হলে ব্যক্তি একটি সাওয়াব আর সঠিক হলে দুটি সাওয়াবের অধিকারী হয়। কবি বলেছেন, ‘বাস্তব কথা হলো সাহাবীগণের মধ্যকার ঘটিত ফিতনার ব্যাপারে নীরব থাকা, কেননা এ সব কিছু ছিল তাদের ইজতিহাদ।’৮২ বস্তুত নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয় আমাদেরকে উক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে নির্দেশনা দিচ্ছে। তা হলো:
প্রথমতঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মান্য করা ও সে অনুযায়ী আমল করা। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «وَإِذَا ذُكِرَ أَصْحَابِي فَأَمْسِكُوا».
“যখন তোমাদের সম্মুখে আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে কোনো সমালোচনা করা হবে তখন তোমরা সমালোচনা থেকে বিরত থাকবে।”৮৩ দ্বিতীয়তঃ এ সব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় কোনো ফায়দা নেই, ইলমী দিকেও কোনো উপকার লাভ হয় না, আমলের বিবেচনাও কোনো উপকার অর্জিত হয় না। আর ব্যক্তির সুন্দর ইসলাম হচ্ছে অনর্থক বিষয় পরিহার করা।৮৪ কেননা সাহাবীগণের মধ্যে যে সব যুদ্ধ ও ফিতনা সংঘটিত হয়েছিল তা মূলত তাদের ইজতিহাদ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। প্রত্যেকেই তাদের মতানুযায়ী হকের উপরে ছিলো এবং সত্যের বিজয় করতে লড়েছেন। এতে তারা কেউ কারো ওপর হিংসা- হানাহানি, প্রতিশোধ বা সমালোচনা করতে লড়েন নি। এর উপমা এমন যে, বিচারক কাউকে আদাব শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রহার করেছে। সে সব ঘটনার পরে তাদের মধ্যকার বিদ্বেষ দূর হয়ে গেছে বলেই ধারণা করা উচিৎ। তাদের পরে যারা এসেছে তাদের সাথে এসব ঘটনার কী সম্পর্ক? তারা তো এ ঘটনার ব্যাপারে ‘বানিজ্য কাফেলাও নন, যুদ্ধে আগত বাহিনীও নন’।৮৫ এ ব্যাপারে উমার ইবন আব্দুল আযীয রহ. এর কথাটি সর্বাধিক সুন্দর। তিনি বলেছেন, ‘সে রক্তপাত থেকে আল্লাহ্ আমাদের হাতকে পবিত্র রেখেছেন। অতএব, আমি আমার যবানকে (মুখের ভাষাকে) এ ব্যাপারে সমালোচনা করতে রঞ্জিন করতে (কলুষিত করতে) চাই না।’ ⁸⁶
তৃতীয়ত: এ সব বিষয়ে গভীর আলোচনা কেউ করলে তা সে ব্যক্তিকে নিন্দনীয় পরিণামে নিয়ে যায়। ফলে দুষ্কৃ ফ হওয়া পর ও তার পদস্খলন ঘটে। এতে তার অন্তরে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সাহাবীর ব্যাপারে খারাপ ধারণা জন্মায়। এ হচ্ছে এক মহা বিপর্যয়। এর চেয়ে মারাত্মক সঙ্কট আর কী হতে পারে? আর কোনো খারাপ পরিণতির পথ্য শুরু থেকেই বন্ধ করে দেওয়া ইসলামী শরী‘আতের অন্যতম একটি মূলনীতি।
বারবাহারী রহ. বলেছেন, সাহাবীগণের কোনো প্রকার পদস্খলন, তাদের কোনো যুদ্ধ, আর যে বিষয়ের জ্ঞান তোমার কাছে অনুপস্থিত, সেসবের কোনো কিছুই আলোচনা করবে না। এ সব দোষ-ত্রুটি কেউ বর্ণনা করলেও শুনবে না। কেননা এসব ব্যাপার শুনলে ব্যক্তির অন্তরে তাদের ব্যাপারে খারাপ ধারণা জন্মতে পারে।’ ⁸⁷ কবি বলেছেন, তাদের মধ্যকার সংঘটিত ব্যাপারে সমালোচনা থেকে সাবধান থাকো, যা তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। কেননা সেগুলো তাদের ইজতিহাদ থেকে নির্গত হয়েছে, এর মাধ্যমে তুমি নিজেকে নিরাপদ রাখ; যে কেউ তাদেরকে পরিত্যাগ করবে আল্লাহ্ তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।’ ⁸⁸
চতুর্থত: মিথ্যাবাদী, মুনাফিক ও বিদ‘আতীরা এসব ব্যাপারে অনেক বানোয়াট তথ্য ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে।
তাহলে আপনি সেসব ব্যাপারে কীভাবে বিশুদ্ধ হুকুম দিবেন, যে সব বর্ণনার অধিকাংশই মিথ্যাবাদী ও দুর্বল লোকদের মাধ্যমে এসেছে? যেহেতু ইতিহাসের গ্রন্থুই সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত ফিতনা বর্ণনার উৎস। আর এ কথা সকলেরই জানা যে, ইতিহাসের কিতাব ভালো-মন্দ, সহীহ-দুর্বল সব ধরনের ঘটনাই বর্ণনা করে থাকে। আর তাদের অভ্যাস হচ্ছে মানুষের কাছে যা কিছু পায় তা বিচার বিবেচনা ছাড়াই যোগ করে দেয়। তাহলে এ ধরণের স্পর্শকাতর ঘটনায় কীভাবে প্রবৃত্তি পূজারীদের লালসার শিকার হওয়া তথ্যে বিশ্বাস করা যেতে পারে? এ ছাড়া যে সামান্য কিছু বর্ণনা সহীহ সূত্রে এসেছে তা তাদের সম্মান ও মর্যাদা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা যায়। ইতোপূর্বে সে ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। ইবন দাকীক আল-ঈদ রহ. বলেছেন, সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত বিভেদসমূহ সম্পর্কে যে সব বর্ণনা এসেছে আর তাতে তারা বিভিন্ন ধরনের মত দিয়েছে, সেসব বর্ণনার অধিকাংশই বাতিল ও মিথ্যা। এগুলোর দিকে তাকানোই যাবে না। আর যে সব ঘটনা সহীহ সেগুলোকে আমরা তাদের মর্যাদা অনুযায়ী সুন্দর ব্যাখ্যা করব। কেননা তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ আইনের প্রশংসা এ সব ঘটনার আগেই সন্দেহাতীতভাবে বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে তাদের ব্যাপারে পরবর্তীতে যে সব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলোতে ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। আর নিয়ম হচ্ছে যে, সন্দেহযুক্ত ও ধারণানির্ভর কিছু দ্বারা অকাট্য ও সঠিকভাবে জ্ঞাত বিষয়কে বাতিল করা যায় না।’ ⁸⁹
পঞ্চমত: তাদের মধ্যে যা সংঘটিত হয়েছিল সেগুলোর বাস্তবতা জানা কষ্টসাধ্য; কেননা সে সময়টি ছিলো ফিতনা ও যুদ্ধ-বিগ্রহের সময়। এ ধরণের অবস্থায় যে কোনো ব্যাপার ভালো-মন্দে মিশ্রিত হয়ে যায় এবং সঠিক ব্যাপার হুবহু জানা যায় না। অতএব, এ ধরণের ব্যাপার সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম।
সুতরাং যে ব্যক্তি তার দীনের ব্যাপারে দোষ-ত্রুটি মুক্ত থাকতে চায় সে যেন এ সব বিষয়ের সমালোচনায় নিজেকে নিমজ্জিত করা থেকে দূরে রাখে; বরং তাদের ভালোবাসা দ্বারা যেন তার অন্তর পরিপূর্ণ করে নেয়, তাদের পক্ষ থেকে ওযর (ইখতিয়ার) পেশ করে এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। রাদিয়াল্লাহু আনহুম (আল্লাহ্ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হোন)।
টিকাঃ
৮১ আদ-লুবাবু ফী ফিক্বহিশ শাফিঈ, ইবনু রুসলান, পৃষ্ঠা ৯,
৮২ আল-জাওয়াহিরুল ফারীদাহ ফি তাহক্বীকিল আক্বীদাহ, পৃষ্ঠা ৪৩, পংক্তি ২৩৯।
৮৩ আল-মুজামুল-কাবীর, তাবারানী, ২/৯৮, হাদীস নং ১৪২৭, ইবন মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস; ইরাকী রহ. ইহ্ইয়া উলূমুদ্দীনে (১/৮০, মুদ্রণ: আস-সাকাফাহ আল-ইসলামিয়াহ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; সিলসিলাতুস সহীহাহ, ১/৮৭, হাদীস নং ৩৪।
৮৪ ইমাম আহমাদ রহ. তার মুসনাদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, ২/৩৫২, হাদীস নং ৮৭৩৭। এ হাদীসটি সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে অনেক দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। হাদীসটির হুকুমের ব্যাপারে সবচেয়ে সুন্দর কথা একত্রিত করেছেন ইবন রজব হাম্বলী রহ. তার জামে‘উল ‘উলূম ওয়াল হিকাম’ ১/১১৩ কিতাবে।
৮৫ তাহির ইবন আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর, ২৮/১৮।
⁸⁶ আবু নু‘আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৯/১১৪।
⁸⁷ শরহিস সুন্নাহ, বারবাহারী, পৃষ্ঠা ১১২-১১৩; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১০/৯২।
⁸⁸ আদ-দুরারুল মুদিয়্যাহ -মা‘আ শারহেই লাওয়া‘মিয়্যিল আনওয়ার, ১/৩৮৫।
⁸⁹ মূসা ‘আলী ক্বারী রহ. তার ‘শরহুল ফিক্বহিল আকবার’ কিতাবে পৃষ্ঠা ১০১ এ উল্লেখ করেছেন।
📄 নবম অধিকার: যারা তাদেরকে অপছন্দ ও ঘৃণা করে তাদেরকেও অপছন্দ ও ঘৃণা করা, তাদের ওপর মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করা ও তাদের প্রতি শত্রুতা রুখে দাঁড়ানো
এটি তাদের প্রতি ভালোবাসার আরেকটি প্রকার ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সত্যবাদী হওয়ার প্রমাণ। রাদিয়াল্লাহু আনহুম। কবি বলেছেন, 'আহলে বাইত তথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার ও সমস্ত সাহাবীগণের থেকে আমরা অপবাদ প্রতিহত করব, তাদের সকলকে ভালোবাসায় আমরা বিশ্বাস করব।'৯0
ইমাম যাহাবী রহ. বলেছেন, ‘আর আমরা তাদেরকে অপছন্দ করব, যারা সাহাবীগণকে অপছন্দ করে এবং অকল্যাণের সাথে তাদেরকে স্মরণ করে।'৯1 এ কথার দলীল হলো নিম্নোক্ত হাদীস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَوْثَقُ عُرَى الْإِيمَانِ الْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ. “ঈমানের সবচেয়ে মজবুত রশি হচ্ছে কাউকে আল্লাহ্ ওয়াস্তে ভালোবাসা আবার কাউকে আল্লাহ্র জন্যই ঘৃণা করা।”৯2 নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র জন্য কাউকে ঘৃণা করার সর্বাধিক উপযুক্ত ক্ষেত্র হলো তাদেরকে ঘৃণা করা যারা সাহাবীগণকে অপবাদ দেয়। রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
অন্যদিকে সাহাবীগণের শত্রুদের প্রতিহত করা, তাদের বিরুদ্ধে আনীত অপবাদের জবাব দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে আনীত দ্বিধা-সংশয়ের নিরসন করা আল্লাহ্র রাস্তায় সর্বোত্তম জিহাদের অন্যতম।
টিকাঃ
৯0 আল-জাওয়াহিরুল ফারিদাহ ফি তাহকীকিল আকীদাহ, পৃষ্ঠা ৪৩, পরিচ্ছেদ ১০৮।
৯1 প্রান্তক্ত।
৯2 মু'জামুল কাবীর, তাবারানী, ১/৩৩২-৩৩৪, হাদীস নং ৬২৪। আলবানী রহ. হাদীসটির অনেক সনদের সমন্বয়ে ‘সিলসিলাতুস সাহীহা’ ১/৬৬৬ তে হাসান বলেছেন, হাদীস নং ৯৯৮।
📄 দশম অধিকার: তাদের অনুসরণ করা ও তাদের পথে চলা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের পদ্ধতি নিম্নোক্ত এ মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যে, ‘সর্বোত্তম ইলম তা হলো যা সাহাবীগণের ইলম অনুসরণ করে অর্জিত হয়েছে, আর সর্বোত্তম আমল হলো যা সাহাবীগণের আমল অনুসরণ করে করা হয়েছে। তারা মনে করেন, সাহাবীগণ সব ফযীলত ও মর্যাদার ক্ষেত্রে সবার উপরে।'৯3 কবি বলেছেন, 'দীনের ব্যাপারে তাদের (সাহাবীগণের) অনুসরণ করা ফরয (অত্যাবশ্যকীয়), অতএব, তাদের অনুসরণ করো, আর অনুসরণ করো কুরআনের আয়াত ও সূরার।'৯4 ইমাম আহমাদ রহ. বলেছেন, সুন্নাতের উসূল বা মূলনীতি হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ যা আমল করেছেন তা আঁকড়ে ধরা এবং তাদের অনুসরণ করা।'৯5 ন্যায়পরায়ণ ইমাম উমার ইবন আব্দুল আযীয রহ. বলেছেন, ‘সাহাবীগণ তাদের নিজেদের ব্যাপারে যে সব বিষয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন তুমিও সে সব বিষয়ে নিজেকে সন্তুষ্ট রাখো অর্থাৎ তাদের পথ অনুসরণ করো। কেননা তারা দীনের গভীর ইলম অনুযায়ীই কোনো অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং দিব্যদৃষ্টি হারাই কোনো কাজ করা থেকে বিরত থেকেছেন।'৯6 আর আল্লাহ্ তা'আলা শ্রেষ্ঠতম সাহাবীগণের অনুসরণ করার ব্যাপারে লোকদের প্রশংসা করে বলেছেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴾ [التوبة: ١٠٠] “আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফাল্য”। [সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০]
আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অনুসরণ করতে আরও বলেছেন, ﴿ وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ﴾ [لقمان: ١٥] “আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়।” [সুরা লুকমান, আয়াত: ১৫] নিঃসন্দেহে নবীদের পরে তারা এ গুণের বেশি হকদার ছিলেন (অর্থাৎ নবীদের পরে তারাই সবচেয়ে বেশি আল্লাহ অভিমুখী লোক ছিলেন)।
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন, ﴿ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ ﴾ [التوبة: ١١٩] “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।” [সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৯] দাহহাক রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘তোমরা আবু বকর, উমার ও এতদোভয়ের সাথীদের (সাহাবীগণের) সাথে থাকো।’৯৭ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন নাজাতপ্রাপ্ত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দলটির বর্ণনা জিজ্ঞেস করা হলো তখন তিনি বললেন, «مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي» “আমি এবং আমার সাহাবীরা যার উপর প্রতিষ্ঠিত।”৯৮
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘হে কারীগণ, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো, তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের (সাহাবীগণের) পথে চলো, নিঃসন্দেহে তোমরা যদি তাদের পথ অনুসরণ করো তাহলে তোমরা মহা সফলকাম হবে, আর যদি তাদের পথ থেকে সামান্য পরিমাণ এদিক সেদিক চলে যাও তবে তোমরা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হবে।’৯৯
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবীগণের পথে চলা হলো হিদায়াত এবং এ পথই নাজাতের।
ইবন কাসীর রহ. এর নিম্নোক্ত আয়াতের সুন্দর তাফসীর দ্বারা আমার আলোচনা শেষ করব, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ﴿وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ ءَامَنُوا لَوْ كَانَ خَيْرًا مَا سَبَقُونَا إِلَيْهِ﴾ [الأحقاف: ١١] “আর যারা কুফুরী করেছে তারা যারা ঈমান এনেছে তাদের সম্পর্কে বলে, যদি এটা ভালো হতো তবে তারা আমাদের থেকে অগ্রণী হতে পারত না।” [সুরা আল- আহকাফ, আয়াত: ১১] তিনি বলেছেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতও বলেন যে, যে সব কাজ ও কথা সাহাবীগণের থেকে সাব্যস্ত নয় তা বিদ্‘আত। কেননা কাজটি ভালো হলে সাহাবীগণ আমাদের থেকে অগ্রণী হতেন। কেননা এমন কোনো উত্তম কাজ ছিলো না যে কাজে তারা দ্রুত অগ্রণী ছিলেন না।’১০০
টিকাঃ
৯৩ শরহুল আকীদাতিল আসফাহানিয়্যাহ, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১২৮।
৯৪ দীওয়ানে ইবন মুশাররফ, পৃষ্ঠা ২০।
৯৫ উসূলুস সুন্নাহ, আবদুস ইবন মালিকের বর্ণনা- পৃষ্ঠা ২৯; ইমাম আহমাদ রহ. থেকে লালকায়ী ও শরহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ১/৬৬৬ তে বর্ণনা করেছেন।
৯৬ আবু দাউদ, ৬/৫৮, হাদীস নং ৪৬১২; আলবানী রহ সহীহ সুনানে আবু দাউদ ৫/১২২-১২৫, হাদীস নং ৪৬১২ তে হাদীসটিকে সহীহ মাকূ' বলেছেন।
৯৭ তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৭/৩১৪।
৯৮ তিরমিযী, কিতাবুল ঈমান, বাব: এ উম্মতের বিভক্তি সম্পর্কে, ৫/২৫, হাদীস নং ২৬৪১, ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি মুফাস্সার ও গরীব, বর্ণনার এ সূত্র ব্যতীত অন্য কোনো সূত্রে জানা যায় নি। আলবানী রহ. সহীহুত তিরমিযীতে ৩/৫৪, হাদীস নং ২৬৪১ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
৯৯ ইবনু আব্দুল বার তার জামে'উ বায়ুনিল ইলম ওয় ফাযলিহি, ২/৯৮৭ তে বর্ণনা করেছেন। আসরটি কাছাকাছি শব্দে সহীহ বুখারীতে ১০/১২২ রয়েছে।
১০০ তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১০/১৯২।