📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 ষষ্ঠ অধিকার: তাদের জন্য দো‘আ, ইসতিগফার ও রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম বলা

📄 ষষ্ঠ অধিকার: তাদের জন্য দো‘আ, ইসতিগফার ও রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম বলা


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত এ ব্যাপারে একমত যে, সাহাবীগণের প্রশংসা করা, তাদের জন্য ইসতিগফার করা, তাদের জন্য রহমতের দো‘আ করা এবং তাদের নাম শুনে রাদিয়াল্লাহ ‘আনহুম বলা ওয়াজিব।⁶⁹
মুসলিমের অন্তর যখন মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের (রাদিয়াল্লাহ ‘আনহুম) ভালোবাসা ও সম্মানে পরিপূর্ণ হয়, তখন তাদের মুখের ভাষায় তাদের জন্য দো‘আ প্রকাশ পায় এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করে।
ইবনুল মুবারক রহ. বলেছেন, আমি সর্বদা তাদের (সাহাবীগণের) জন্য মাগফিরাত কামনা করি, যেভাবে আমি প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের জন্য মাগফিরাত কামনায় আদিষ্ট।⁷⁰
এমনকি তাদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম’ বলে দো‘আ করা ‘উরফী ইজমা তথা আহলে ইলম এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।⁷¹
সাহাবীগণের কারো নাম উল্লেখ করা হলেই ‘রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ বলে তার সাথে যুক্ত করে তার জন্য দো‘আ করা হয়। এ ব্যাপারে মুসলিমগণ একমত। কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তাদের ওপর রাযী ও সন্তুষ্ট হয়েছেন, ﴿رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ [المجادلة: ٢٢]
“আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ২২]
শওকানী রহ. বলেছেন, ‘এ উম্মতের পূর্বের ও পরের জমহুর মুসলিমের মাঝে এ ব্যাপারটি প্রচলিত হয়ে আসছে যে, তারা সাহাবীগণের নাম উল্লেখ করেই তাদের জন্য “রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু” বলে দো‘আ করেন, তাদের পরে আগত মুসলিমগণ তাদের পূর্বে আগত সাহাবীগণের জন্য আল্লাহ্র রহমত কামনা করে ‘রাহিমাহুল্লাহ্’ বলেন, আল্লাহ্র মাগফিরাত ও ক্ষমার দো‘আ করেন, যেভাবে আল্লাহ্ আমাদেরকে বলার নির্দেশ দিয়েছেন।’ আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেন,
﴿وَالَّذِينَ جَاؤُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا﴾ [الحشر: ١٠]
“আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না।’” [সূরা : আল-হাশর: ১০]

টিকাঃ
⁶⁹ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ১০৮৫।
⁷⁰ দিওয়ান ইবনুল মুবারক, পৃষ্ঠা ২১, তাহকীক, সাআদ আল-ফাকী।
⁷¹ দেখুন, সিলসিলাতুদ দঈফাহ, আলবানী রহ., ১১/৭৭৫। উল্লেখ্য যে, এখানে ‘উরফী’ তথাসূত্র তথা আলিমদের খাস পরিভাষা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে আহলে ইলম ও মুসলিমগণ একমত হয়েছেন, যা সকলের কাছেই পরিচিত ও জানা। অন্যদিকে ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ অন্যদের ব্যাপারেও বলা জায়েয। দেখুন, আল- মাজমু’, ইমাম নাওওয়ী রহ., ৬/১৭১।

📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 সপ্তম অধিকার: তাদের ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা এবং এ ব্যাপারে কিছু মনে আসলে চক্ষু অবনত করে এড়িয়ে যাওয়া

📄 সপ্তম অধিকার: তাদের ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা এবং এ ব্যাপারে কিছু মনে আসলে চক্ষু অবনত করে এড়িয়ে যাওয়া


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত শরী‘আত অনুমোদিত পদ্ধতিতে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। তারা অতি বাড়াবাড়ি, কঠোরতা, ছাড়াছাড়ি ও নানা দলে বিভক্ত হওয়া থেকে সর্বোচ্চ দূরে অবস্থানকারী মানুষ। এ কারণেই তারা বিশ্বাস করেন যে, সাহাবীগণের উচ্চ মর্যাদা হওয়া মানে এটা নয় যে, তারা গুনাহ থেকে মুক্ত; তাদের ন্যায়পরায়ণতা সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি তাদের ভুল- ত্রুটিতে পতিত হওয়ার সাথে সাযর্থক নয়।
তা সত্ত্বেও তাদের ভুল-ত্রুটিগুলো অন্যদের ভুলের সাথে তুলনা করা যাবে না। তাদের ও অন্যদের জীবন চরিত যারা জানেন তারা এ দুয়ের মধ্যকার পার্থক্য ভালোভাবেই বুঝতে পারেন।
তাছাড়া তাদের মধ্যকার যেসব ভুল বা অপরাধ ধারণা করা হয়ে থাকে তার অধিকাংশই বাড়তি কিংবা কমতি বর্ণনা থেকে মুক্ত নয় অথবা এসব বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন। বরং এসব বর্ণনার অধিকাংশেই অনুদ্রূপ। ৭২ সুতরাং নির্ধিদ্বায় এসব বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত ও নিশ্চিহ্ন।
আবার কিছু বর্ণনার সূত্র সঠিক হলেও সে সব বর্ণনার সুন্দর ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সুন্দর ব্যাখ্যাটি নির্দিষ্টভাবে কর্তব্য হবে।
যেহেতু মুসলিম ব্যক্তিকে অন্যান্য সাধারণ মুসলিমের ব্যাপারে সুন্দর ধারণা পোষণ করতে আদেশ করা হয়েছে, তাহলে মুমিনদের সর্বোত্তম ও নেতৃবর্গের ব্যাপারে (সাহাবীগণের ব্যাপারে) তাদের কীরূপ ধারণা পোষণ করা উচিত; একটু চিন্তা করে দেখুন।
দুর্বলতম ঈমানের অধিকারিগণও তাদের ব্যাপারে এ ধারণা করবে যে, তাদের থেকে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তা তাদের নিজস্ব গ্রহণযোগ‍্য ব্যাখ্যা অথবা ভুল ও অসচেতনতা বশত; হয়েছে অথবা সেটি তাদের ইজতিহাদ ছিল, যাতে ব্যক্তি সঠিকতায় পৌঁছলে দুটি সাওয়াব আর ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলে একটি সাওয়াবের অধিকারী হয়। ৭৩
যা হোক, তাদের থেকে যে সব ভুল-ত্রুটি ও গুনাহ সংঘটিত হয়েছে তা পাঁচ ভাগে সীমাবদ্ধ: ৭৪
প্রথমত: সেসব ভুলের ব্যাপারে তারা তাওবা করেছেন। আর একথা কারোই অজানা নয় যে, ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে সাহাবীরা সবচেয়ে দ্রুত তাওবাকারী। আর সকলেই জানে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «اَلتَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَّا ذَنْبَ لَهُ» “গুনাহ থেকে তাওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তি তুল্য। ”৭৫
আর আল্লাহর কাছে অন্যাদের তুলনায় তাদের উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের কারণে তাদের তাওবা সবচেয়ে বেশি কবুল হওয়ার যোগ্য।
দ্বিতীয়ত: তাদের অপরিসীম সৎকাজের কারণে তাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। সৎকাজসমূহ গুনাহসমূহকে মোচন করে দেয়। সাহাবীগণের সৎকাজসমূহের (পূর্বের যা আলোচনা করা হয়েছে) পরিমাণ অনেক বেশি ও এর প্রতিদানও অনেক বড়। এ ব্যাপারে আগে আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয়ত: ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জিহাদে শরিক হওয়ার কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে বলেছেন, «مَا يُدْرِيْكَ، لَعَلَّ اللهَ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ: اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ» “তুমি জান কি? অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা আহলে বদর সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত রয়েছেন এবং তাদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা যেমন ইচ্ছা আমল করো।’”৭৬
চতুর্থত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশের কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর শাফা‘আত তাওহীদবাদীরা প্রাপ্ত হবেন, যারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শিরক করেন না, ৭৭ তাহলে যারা সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ তাওহীদবাদী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাধিক নিকটবর্তী লোক তাদের ব্যাপারে আপনার ধারণা কীরূপ হতে পারে? নিঃসন্দেহে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ প্রাপ্তিতে সর্বোত্তম ও সর্বাধিক অগ্রগামী মানুষ।
পঞ্চমত: দুনিয়াতে তারা যে সব বালা-মুসিবত ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন সে কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। আর শরী‘আতের নিয়মানুযায়ী বালা- মুসিবতও গুনাহ মোচনকারী।
উপরোক্ত আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা বর্ণনা করা যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মূলনীতি হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের ব্যাপারে তাদের অন্তর ও মুখের ভাষা পবিত্র ও নিরাপদ রাখতে হবে। ৭৮ সুতরাং এখানে একটি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে যে, মুসলিমের অন্তর ও তার মুখের ভাষা সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত ব্যাপারে সমালোচনা ও নিন্দা করা থেকে মুক্ত ও পবিত্র থাকবে। আর অন্তর কলুষিত সে ব্যতীত এ সরল সঠিক পথ থেকে কেউ বিমুখ হয় না।
সুফইয়ান ইবন উয়াইনা রহ. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের কোনো ব্যাপারে মুখ খুলবে (সমালোচনা করবে) সে প্রবৃত্তি পূজারীদের অন্তর্ভুক্ত।’৭৯
ইমাম আহমাদ রহ. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সাহাবীর ব্যাপারে সমালোচনা করবে, অথবা তাদের কোনো ঘটনার কারণে তাদের কাউকে অপছন্দ করবে অথবা দোষ-ত্রুটি ও অসৌজন্যতার সাথে তাদের কারো নাম উল্লেখ করবে, সে ব্যক্তি বিদ‘আতী; যতক্ষণ না সে সাহাবীদের সকলের জন্য আল্লাহ্র রহমতের দো‘আ না করবে। আর এর মাধ্যমে তার অন্তর তাদের (সাহাবীগণের) ব্যাপারে পবিত্র ও নিরাপদ হবে।’৮০

টিকাঃ
৭২ দেখুন, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১০/৯৩।
৭৩ মাজমুউল ফাতাওয়া (আল-ওয়াসিতিয়্যাহ), ৩/১৫৫।
৭৪ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. পূর্বোক্ত কিতাবে এ পাঁচটি বিষয়ে সংক্ষিপ্তাকারে ইঙ্গিত করেছেন।
৭৫ ইবন মাজাহ মারফূ’ সূত্রে তার সুনানে বর্ণনা করেছেন, ২/১৪১৬, হাদীস নং ৪২৫০, হাদীসটি ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। ইবন হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী ১০/৪৭১ এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
৭৬ সহীহ বুখারী, কিতাব: ফাযায়েলুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, বাব: আল- জাসুস, ২/৩০৩, হাদীস নং ৩০০৭; সহীহ মুসলিম, কিতাব: ফাযায়েলুস সাহাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম, বাব: ফাযায়েলু আহলি বদর, ৪/১৮৯৬, হাদীস নং ৬৪৮৪, হাদীসটি আলী ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
৭৭ যেমন, সহীহ মুসলিমের আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এ ব্যাপারে হাদীস বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিম, ১/১৮৯, হাদীস নং ১৯৯।
৭৮ মাজমুউল ফাতাওয়া ‘আল-ওয়াসিতিয়্যাহ’, ৩/১৫২।
৭৯ শারহিস সুন্নাহ, বারবারহারী, পৃষ্ঠা ৭৮।
৮০ শারহি উসূলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালকাঈ, ১/১৩৬।

📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 অষ্টম অধিকার: তাদের মধ্যকার ঘটিত বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করা এবং এ ব্যাপারে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা

📄 অষ্টম অধিকার: তাদের মধ্যকার ঘটিত বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করা এবং এ ব্যাপারে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা


সাহাবীগণের মধ্যে যে সব ফিতনা, জিহাদ, ঝগড়া-ঝাঁটি ও বিতর্ক সংঘটিত হয়েছিল সে ব্যাপারে প্রত্যেক মুমিনের উচিৎ সেসব ব্যাপার থেকে মুখ ফিরিয়ে নীরব থাকা, এড়িয়ে যাওয়া ও সেগুলো নিয়ে বেশি মাতামাতি না করা। কবির ভাষায়, ‘তাদের মধ্যে যা ঘটেছিল সে ব্যাপারে আমরা নীরব থাকব, ‘ইজতিহাদের সাওয়াব তাদের জন্য আমরা সাব্যস্ত করব।’৮১ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত বিরোধপূর্ণ ব্যাপারে অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হতে নিষেধ করা হয়েছে। সাথে সাথে এ বিশ্বাস রাখার কথা বলা হয়েছে যে, এগুলো ছিল তাদের ইজতিহাদ, যাতে ভুল হলে ব্যক্তি একটি সাওয়াব আর সঠিক হলে দুটি সাওয়াবের অধিকারী হয়। কবি বলেছেন, ‘বাস্তব কথা হলো সাহাবীগণের মধ্যকার ঘটিত ফিতনার ব্যাপারে নীরব থাকা, কেননা এ সব কিছু ছিল তাদের ইজতিহাদ।’৮২ বস্তুত নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয় আমাদেরকে উক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে নির্দেশনা দিচ্ছে। তা হলো:
প্রথমতঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মান্য করা ও সে অনুযায়ী আমল করা। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «وَإِذَا ذُكِرَ أَصْحَابِي فَأَمْسِكُوا».
“যখন তোমাদের সম্মুখে আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে কোনো সমালোচনা করা হবে তখন তোমরা সমালোচনা থেকে বিরত থাকবে।”৮৩ দ্বিতীয়তঃ এ সব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় কোনো ফায়দা নেই, ইলমী দিকেও কোনো উপকার লাভ হয় না, আমলের বিবেচনাও কোনো উপকার অর্জিত হয় না। আর ব্যক্তির সুন্দর ইসলাম হচ্ছে অনর্থক বিষয় পরিহার করা।৮৪ কেননা সাহাবীগণের মধ্যে যে সব যুদ্ধ ও ফিতনা সংঘটিত হয়েছিল তা মূলত তাদের ইজতিহাদ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। প্রত্যেকেই তাদের মতানুযায়ী হকের উপরে ছিলো এবং সত্যের বিজয় করতে লড়েছেন। এতে তারা কেউ কারো ওপর হিংসা- হানাহানি, প্রতিশোধ বা সমালোচনা করতে লড়েন নি। এর উপমা এমন যে, বিচারক কাউকে আদাব শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রহার করেছে। সে সব ঘটনার পরে তাদের মধ্যকার বিদ্বেষ দূর হয়ে গেছে বলেই ধারণা করা উচিৎ। তাদের পরে যারা এসেছে তাদের সাথে এসব ঘটনার কী সম্পর্ক? তারা তো এ ঘটনার ব্যাপারে ‘বানিজ্য কাফেলাও নন, যুদ্ধে আগত বাহিনীও নন’।৮৫ এ ব্যাপারে উমার ইবন আব্দুল আযীয রহ. এর কথাটি সর্বাধিক সুন্দর। তিনি বলেছেন, ‘সে রক্তপাত থেকে আল্লাহ্ আমাদের হাতকে পবিত্র রেখেছেন। অতএব, আমি আমার যবানকে (মুখের ভাষাকে) এ ব্যাপারে সমালোচনা করতে রঞ্জিন করতে (কলুষিত করতে) চাই না।’ ⁸⁶
তৃতীয়ত: এ সব বিষয়ে গভীর আলোচনা কেউ করলে তা সে ব্যক্তিকে নিন্দনীয় পরিণামে নিয়ে যায়। ফলে দুষ্কৃ ফ হওয়া পর ও তার পদস্খলন ঘটে। এতে তার অন্তরে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সাহাবীর ব্যাপারে খারাপ ধারণা জন্মায়। এ হচ্ছে এক মহা বিপর্যয়। এর চেয়ে মারাত্মক সঙ্কট আর কী হতে পারে? আর কোনো খারাপ পরিণতির পথ্য শুরু থেকেই বন্ধ করে দেওয়া ইসলামী শরী‘আতের অন্যতম একটি মূলনীতি।
বারবাহারী রহ. বলেছেন, সাহাবীগণের কোনো প্রকার পদস্খলন, তাদের কোনো যুদ্ধ, আর যে বিষয়ের জ্ঞান তোমার কাছে অনুপস্থিত, সেসবের কোনো কিছুই আলোচনা করবে না। এ সব দোষ-ত্রুটি কেউ বর্ণনা করলেও শুনবে না। কেননা এসব ব্যাপার শুনলে ব্যক্তির অন্তরে তাদের ব্যাপারে খারাপ ধারণা জন্মতে পারে।’ ⁸⁷ কবি বলেছেন, তাদের মধ্যকার সংঘটিত ব্যাপারে সমালোচনা থেকে সাবধান থাকো, যা তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। কেননা সেগুলো তাদের ইজতিহাদ থেকে নির্গত হয়েছে, এর মাধ্যমে তুমি নিজেকে নিরাপদ রাখ; যে কেউ তাদেরকে পরিত্যাগ করবে আল্লাহ্ তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।’ ⁸⁸
চতুর্থত: মিথ্যাবাদী, মুনাফিক ও বিদ‘আতীরা এসব ব্যাপারে অনেক বানোয়াট তথ্য ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে।
তাহলে আপনি সেসব ব্যাপারে কীভাবে বিশুদ্ধ হুকুম দিবেন, যে সব বর্ণনার অধিকাংশই মিথ্যাবাদী ও দুর্বল লোকদের মাধ্যমে এসেছে? যেহেতু ইতিহাসের গ্রন্থুই সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত ফিতনা বর্ণনার উৎস। আর এ কথা সকলেরই জানা যে, ইতিহাসের কিতাব ভালো-মন্দ, সহীহ-দুর্বল সব ধরনের ঘটনাই বর্ণনা করে থাকে। আর তাদের অভ্যাস হচ্ছে মানুষের কাছে যা কিছু পায় তা বিচার বিবেচনা ছাড়াই যোগ করে দেয়। তাহলে এ ধরণের স্পর্শকাতর ঘটনায় কীভাবে প্রবৃত্তি পূজারীদের লালসার শিকার হওয়া তথ্যে বিশ্বাস করা যেতে পারে? এ ছাড়া যে সামান্য কিছু বর্ণনা সহীহ সূত্রে এসেছে তা তাদের সম্মান ও মর্যাদা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা যায়। ইতোপূর্বে সে ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। ইবন দাকীক আল-ঈদ রহ. বলেছেন, সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত বিভেদসমূহ সম্পর্কে যে সব বর্ণনা এসেছে আর তাতে তারা বিভিন্ন ধরনের মত দিয়েছে, সেসব বর্ণনার অধিকাংশই বাতিল ও মিথ্যা। এগুলোর দিকে তাকানোই যাবে না। আর যে সব ঘটনা সহীহ সেগুলোকে আমরা তাদের মর্যাদা অনুযায়ী সুন্দর ব্যাখ্যা করব। কেননা তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ আইনের প্রশংসা এ সব ঘটনার আগেই সন্দেহাতীতভাবে বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে তাদের ব্যাপারে পরবর্তীতে যে সব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলোতে ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। আর নিয়ম হচ্ছে যে, সন্দেহযুক্ত ও ধারণানির্ভর কিছু দ্বারা অকাট্য ও সঠিকভাবে জ্ঞাত বিষয়কে বাতিল করা যায় না।’ ⁸⁹
পঞ্চমত: তাদের মধ্যে যা সংঘটিত হয়েছিল সেগুলোর বাস্তবতা জানা কষ্টসাধ্য; কেননা সে সময়টি ছিলো ফিতনা ও যুদ্ধ-বিগ্রহের সময়। এ ধরণের অবস্থায় যে কোনো ব্যাপার ভালো-মন্দে মিশ্রিত হয়ে যায় এবং সঠিক ব্যাপার হুবহু জানা যায় না। অতএব, এ ধরণের ব্যাপার সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম।
সুতরাং যে ব্যক্তি তার দীনের ব্যাপারে দোষ-ত্রুটি মুক্ত থাকতে চায় সে যেন এ সব বিষয়ের সমালোচনায় নিজেকে নিমজ্জিত করা থেকে দূরে রাখে; বরং তাদের ভালোবাসা দ্বারা যেন তার অন্তর পরিপূর্ণ করে নেয়, তাদের পক্ষ থেকে ওযর (ইখতিয়ার) পেশ করে এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। রাদিয়াল্লাহু আনহুম (আল্লাহ্ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হোন)।

টিকাঃ
৮১ আদ-লুবাবু ফী ফিক্বহিশ শাফিঈ, ইবনু রুসলান, পৃষ্ঠা ৯,
৮২ আল-জাওয়াহিরুল ফারীদাহ ফি তাহক্বীকিল আক্বীদাহ, পৃষ্ঠা ৪৩, পংক্তি ২৩৯।
৮৩ আল-মুজামুল-কাবীর, তাবারানী, ২/৯৮, হাদীস নং ১৪২৭, ইবন মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস; ইরাকী রহ. ইহ্ইয়া উলূমুদ্দীনে (১/৮০, মুদ্রণ: আস-সাকাফাহ আল-ইসলামিয়াহ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; সিলসিলাতুস সহীহাহ, ১/৮৭, হাদীস নং ৩৪।
৮৪ ইমাম আহমাদ রহ. তার মুসনাদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, ২/৩৫২, হাদীস নং ৮৭৩৭। এ হাদীসটি সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে অনেক দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। হাদীসটির হুকুমের ব্যাপারে সবচেয়ে সুন্দর কথা একত্রিত করেছেন ইবন রজব হাম্বলী রহ. তার জামে‘উল ‘উলূম ওয়াল হিকাম’ ১/১১৩ কিতাবে।
৮৫ তাহির ইবন আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর, ২৮/১৮।
⁸⁶ আবু নু‘আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৯/১১৪।
⁸⁷ শরহিস সুন্নাহ, বারবাহারী, পৃষ্ঠা ১১২-১১৩; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১০/৯২।
⁸⁸ আদ-দুরারুল মুদিয়্যাহ -মা‘আ শারহেই লাওয়া‘মিয়্যিল আনওয়ার, ১/৩৮৫।
⁸⁹ মূসা ‘আলী ক্বারী রহ. তার ‘শরহুল ফিক্বহিল আকবার’ কিতাবে পৃষ্ঠা ১০১ এ উল্লেখ করেছেন।

📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 নবম অধিকার: যারা তাদেরকে অপছন্দ ও ঘৃণা করে তাদেরকেও অপছন্দ ও ঘৃণা করা, তাদের ওপর মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করা ও তাদের প্রতি শত্রুতা রুখে দাঁড়ানো

📄 নবম অধিকার: যারা তাদেরকে অপছন্দ ও ঘৃণা করে তাদেরকেও অপছন্দ ও ঘৃণা করা, তাদের ওপর মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করা ও তাদের প্রতি শত্রুতা রুখে দাঁড়ানো


এটি তাদের প্রতি ভালোবাসার আরেকটি প্রকার ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সত্যবাদী হওয়ার প্রমাণ। রাদিয়াল্লাহু আনহুম। কবি বলেছেন, 'আহলে বাইত তথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার ও সমস্ত সাহাবীগণের থেকে আমরা অপবাদ প্রতিহত করব, তাদের সকলকে ভালোবাসায় আমরা বিশ্বাস করব।'৯0
ইমাম যাহাবী রহ. বলেছেন, ‘আর আমরা তাদেরকে অপছন্দ করব, যারা সাহাবীগণকে অপছন্দ করে এবং অকল্যাণের সাথে তাদেরকে স্মরণ করে।'৯1 এ কথার দলীল হলো নিম্নোক্ত হাদীস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَوْثَقُ عُرَى الْإِيمَانِ الْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ. “ঈমানের সবচেয়ে মজবুত রশি হচ্ছে কাউকে আল্লাহ্ ওয়াস্তে ভালোবাসা আবার কাউকে আল্লাহ্র জন্যই ঘৃণা করা।”৯2 নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র জন্য কাউকে ঘৃণা করার সর্বাধিক উপযুক্ত ক্ষেত্র হলো তাদেরকে ঘৃণা করা যারা সাহাবীগণকে অপবাদ দেয়। রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
অন্যদিকে সাহাবীগণের শত্রুদের প্রতিহত করা, তাদের বিরুদ্ধে আনীত অপবাদের জবাব দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে আনীত দ্বিধা-সংশয়ের নিরসন করা আল্লাহ্র রাস্তায় সর্বোত্তম জিহাদের অন্যতম।

টিকাঃ
৯0 আল-জাওয়াহিরুল ফারিদাহ ফি তাহকীকিল আকীদাহ, পৃষ্ঠা ৪৩, পরিচ্ছেদ ১০৮।
৯1 প্রান্তক্ত।
৯2 মু'জামুল কাবীর, তাবারানী, ১/৩৩২-৩৩৪, হাদীস নং ৬২৪। আলবানী রহ. হাদীসটির অনেক সনদের সমন্বয়ে ‘সিলসিলাতুস সাহীহা’ ১/৬৬৬ তে হাসান বলেছেন, হাদীস নং ৯৯৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00