📄 চতুর্থ অধিকার: ভালো ও কল্যাণের সাথে তাদের নাম স্মরণ করা, তাদের প্রশংসা করা ও তাদের সুন্দর আখলাক প্রচার-প্রসার করা অত্যাবশ্যক
কবি বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো, তাদের সবার সুন্দর ব্যাপার গুণগুলো প্রচার করো ও প্রসার করো। ⁵⁹ নিঃসন্দেহে তাদেরকে ভালোবাসাই তাদের সুন্দর আখলাকসমূহ প্রচার করা। যার অন্তর তাদের ভালোবাসায় সিক্ত ও ভরপুর, সে তাদের প্রশংসা ও সুনাম প্রচারে নিবেদিত ও অটল থাকবে। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত সকলেই একমত এবং তাদের কিতাবসমূহে এ ব্যাপারে তাদের আক্বীদা লিপিবন্ধ করেছেন। যেমন, ইমাম মুযানী রহ. বলেছেন, ‘তাদের মর্যাদার কথা প্রচার করা হবে এবং তাদেরকে সুন্দর কাজসমূহের মাধ্যমে স্মরণ করা হবে (প্রচার করা হবে)'।⁶⁰
ইবন আবি ইয়ামীমান রহ. বলেছেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মত হচ্ছে, সকলে যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে এবং তাদের সুন্দর কাজসমূহ ও তাদের মর্যাদার প্রচার-প্রসার করে।'⁶¹
ইবন আবি দাউদ বলেছেন, ‘সকল সাহাবীর ব্যাপারে উত্তম কথা বলো; তাদের ব্যাপারে কোনো অপবাদ দিও না, যা তাদেরকে দোষযুক্ত ও নিন্দিত করে।'⁶²
টিকাঃ
⁵⁹ কালীদাআবু মারওয়ান আব্দুল মালিক ইবন ইদ্রীস আল- জায়ায়েরী ফিল আদাবি ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৫৭, পংক্তি ১১৬।
⁶⁰ শরহুস সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৮৭।
⁶¹ উসূলুস সুন্নাহ, ইবন আবু ইয়ামীম, পৃষ্ঠা ২৮৩।
⁶² মানুসুমা’তু ইবন আবু দাউদ ‘আল-হাফিজ্বইয়াহ’ মা’আ শরাহিহা ‘আত-তুহফাতুস সানিয়্যাহ’ পৃষ্ঠা ১০, লেখক, আব্দুর রাযযাক আল-বদর।
📄 পঞ্চম অধিকার: তাদের সকলের ব্যাপারে আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হওয়া ও জান্নাত লাভের সাক্ষ্য দেওয়া এবং যাদের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে নির্দিষ্টভাবে জান্নাতের সুসংবাদ এসেছে তাদের ব্যাপারে সে সাক্ষ্য দেওয়া
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব সাহাবী (সম্মিলিতভাবে) জান্নাতী।⁶³
আল-কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে যা এ ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ﴿وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾ [التوبة: ١٠٠]
“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসফল্য”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন, ﴿وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ﴾ [الحديد: ١٠]
“আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের জন্যেই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ১০]
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত কুরআন ও সুন্নায় নির্দিষ্টভাবে যাদের ব্যাপারে জান্নাতের সুসংবাদ এসেছে, যেমন সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবী, আব্দুল্লাহ ইবন সালাম⁶⁴, কায়েস ইবন সাবিত⁶⁵, উকাশা ইবন মিহসান⁶⁶, এ ছাড়াও অন্যান্য বহু সাহাবী যাদের ব্যাপারে জান্নাতের সুসংবাদ এসেছে তাদের সবার ব্যাপারে তারা জান্নাত লাভের সাক্ষ্য দেন।⁶⁷
আবু উসমান আস-সাবু’নী রহ. বলেছেন, ‘যে সব সাহাবীগণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাত লাভের সাক্ষ্য দিয়েছেন, মুহাদ্দিসগণও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর সত্যায়ন ও তাঁর ওয়াদার সত্যতার কারণে তাদের জান্নাত লাভের সাক্ষ্য প্রদান করেন। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে না জানলে জানাতেন না। আল্লাহ তা‘আলা গায়েবের যে সংবাদ তাঁর রাসূলকে জানাতে চেয়েছেন তা তিনি তাকে জানিয়েছেন।⁶⁸
টিকাঃ
⁶³ দেখুন, আল-ফাসল, ৪/২২৫-২২৬; আশ-শারী‘আহ, ৪/১৫৩৩; লাওয়ামি‘উল আনওয়ার, ২/৩৫১।
⁶⁴ যেমন, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮৯৯, সা’দ ইবন আবু ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
⁶⁵ যেমন, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫৮১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৯, আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
⁶⁶ যেমন, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৮৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৪, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
⁶⁷ শাইখ আব্দুল আযীয আস-সালমান তার ‘কাওয়াশিফুল জালিয়্যাহ ‘আন মা’আলিদ ওয়াসিফিয়্যাহ’ (পৃষ্ঠা ৬৪৯-৬৯৪) কিতাবে একচল্লিশ জন সাহাবীদের জান্নাতের সুসংবাদের প্রমাণ পেশ করেছেন।
⁶⁸ আক্বীদাতুস সালাফ ওয়া আসহাবুল হাদীস, পৃষ্ঠা ২৮৭; মাজমু‘উল ফাতাওয়া (আল-ওয়াসিফিয়্যাহ) ৩/১৮৩।
📄 ষষ্ঠ অধিকার: তাদের জন্য দো‘আ, ইসতিগফার ও রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম বলা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত এ ব্যাপারে একমত যে, সাহাবীগণের প্রশংসা করা, তাদের জন্য ইসতিগফার করা, তাদের জন্য রহমতের দো‘আ করা এবং তাদের নাম শুনে রাদিয়াল্লাহ ‘আনহুম বলা ওয়াজিব।⁶⁹
মুসলিমের অন্তর যখন মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের (রাদিয়াল্লাহ ‘আনহুম) ভালোবাসা ও সম্মানে পরিপূর্ণ হয়, তখন তাদের মুখের ভাষায় তাদের জন্য দো‘আ প্রকাশ পায় এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করে।
ইবনুল মুবারক রহ. বলেছেন, আমি সর্বদা তাদের (সাহাবীগণের) জন্য মাগফিরাত কামনা করি, যেভাবে আমি প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের জন্য মাগফিরাত কামনায় আদিষ্ট।⁷⁰
এমনকি তাদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম’ বলে দো‘আ করা ‘উরফী ইজমা তথা আহলে ইলম এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।⁷¹
সাহাবীগণের কারো নাম উল্লেখ করা হলেই ‘রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ বলে তার সাথে যুক্ত করে তার জন্য দো‘আ করা হয়। এ ব্যাপারে মুসলিমগণ একমত। কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তাদের ওপর রাযী ও সন্তুষ্ট হয়েছেন, ﴿رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ [المجادلة: ٢٢]
“আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ২২]
শওকানী রহ. বলেছেন, ‘এ উম্মতের পূর্বের ও পরের জমহুর মুসলিমের মাঝে এ ব্যাপারটি প্রচলিত হয়ে আসছে যে, তারা সাহাবীগণের নাম উল্লেখ করেই তাদের জন্য “রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু” বলে দো‘আ করেন, তাদের পরে আগত মুসলিমগণ তাদের পূর্বে আগত সাহাবীগণের জন্য আল্লাহ্র রহমত কামনা করে ‘রাহিমাহুল্লাহ্’ বলেন, আল্লাহ্র মাগফিরাত ও ক্ষমার দো‘আ করেন, যেভাবে আল্লাহ্ আমাদেরকে বলার নির্দেশ দিয়েছেন।’ আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেন,
﴿وَالَّذِينَ جَاؤُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا﴾ [الحشر: ١٠]
“আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না।’” [সূরা : আল-হাশর: ১০]
টিকাঃ
⁶⁹ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ১০৮৫।
⁷⁰ দিওয়ান ইবনুল মুবারক, পৃষ্ঠা ২১, তাহকীক, সাআদ আল-ফাকী।
⁷¹ দেখুন, সিলসিলাতুদ দঈফাহ, আলবানী রহ., ১১/৭৭৫। উল্লেখ্য যে, এখানে ‘উরফী’ তথাসূত্র তথা আলিমদের খাস পরিভাষা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে আহলে ইলম ও মুসলিমগণ একমত হয়েছেন, যা সকলের কাছেই পরিচিত ও জানা। অন্যদিকে ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ অন্যদের ব্যাপারেও বলা জায়েয। দেখুন, আল- মাজমু’, ইমাম নাওওয়ী রহ., ৬/১৭১।
📄 সপ্তম অধিকার: তাদের ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা এবং এ ব্যাপারে কিছু মনে আসলে চক্ষু অবনত করে এড়িয়ে যাওয়া
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত শরী‘আত অনুমোদিত পদ্ধতিতে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। তারা অতি বাড়াবাড়ি, কঠোরতা, ছাড়াছাড়ি ও নানা দলে বিভক্ত হওয়া থেকে সর্বোচ্চ দূরে অবস্থানকারী মানুষ। এ কারণেই তারা বিশ্বাস করেন যে, সাহাবীগণের উচ্চ মর্যাদা হওয়া মানে এটা নয় যে, তারা গুনাহ থেকে মুক্ত; তাদের ন্যায়পরায়ণতা সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি তাদের ভুল- ত্রুটিতে পতিত হওয়ার সাথে সাযর্থক নয়।
তা সত্ত্বেও তাদের ভুল-ত্রুটিগুলো অন্যদের ভুলের সাথে তুলনা করা যাবে না। তাদের ও অন্যদের জীবন চরিত যারা জানেন তারা এ দুয়ের মধ্যকার পার্থক্য ভালোভাবেই বুঝতে পারেন।
তাছাড়া তাদের মধ্যকার যেসব ভুল বা অপরাধ ধারণা করা হয়ে থাকে তার অধিকাংশই বাড়তি কিংবা কমতি বর্ণনা থেকে মুক্ত নয় অথবা এসব বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন। বরং এসব বর্ণনার অধিকাংশেই অনুদ্রূপ। ৭২ সুতরাং নির্ধিদ্বায় এসব বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত ও নিশ্চিহ্ন।
আবার কিছু বর্ণনার সূত্র সঠিক হলেও সে সব বর্ণনার সুন্দর ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সুন্দর ব্যাখ্যাটি নির্দিষ্টভাবে কর্তব্য হবে।
যেহেতু মুসলিম ব্যক্তিকে অন্যান্য সাধারণ মুসলিমের ব্যাপারে সুন্দর ধারণা পোষণ করতে আদেশ করা হয়েছে, তাহলে মুমিনদের সর্বোত্তম ও নেতৃবর্গের ব্যাপারে (সাহাবীগণের ব্যাপারে) তাদের কীরূপ ধারণা পোষণ করা উচিত; একটু চিন্তা করে দেখুন।
দুর্বলতম ঈমানের অধিকারিগণও তাদের ব্যাপারে এ ধারণা করবে যে, তাদের থেকে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তা তাদের নিজস্ব গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা অথবা ভুল ও অসচেতনতা বশত; হয়েছে অথবা সেটি তাদের ইজতিহাদ ছিল, যাতে ব্যক্তি সঠিকতায় পৌঁছলে দুটি সাওয়াব আর ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলে একটি সাওয়াবের অধিকারী হয়। ৭৩
যা হোক, তাদের থেকে যে সব ভুল-ত্রুটি ও গুনাহ সংঘটিত হয়েছে তা পাঁচ ভাগে সীমাবদ্ধ: ৭৪
প্রথমত: সেসব ভুলের ব্যাপারে তারা তাওবা করেছেন। আর একথা কারোই অজানা নয় যে, ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে সাহাবীরা সবচেয়ে দ্রুত তাওবাকারী। আর সকলেই জানে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «اَلتَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَّا ذَنْبَ لَهُ» “গুনাহ থেকে তাওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তি তুল্য। ”৭৫
আর আল্লাহর কাছে অন্যাদের তুলনায় তাদের উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের কারণে তাদের তাওবা সবচেয়ে বেশি কবুল হওয়ার যোগ্য।
দ্বিতীয়ত: তাদের অপরিসীম সৎকাজের কারণে তাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। সৎকাজসমূহ গুনাহসমূহকে মোচন করে দেয়। সাহাবীগণের সৎকাজসমূহের (পূর্বের যা আলোচনা করা হয়েছে) পরিমাণ অনেক বেশি ও এর প্রতিদানও অনেক বড়। এ ব্যাপারে আগে আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয়ত: ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জিহাদে শরিক হওয়ার কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে বলেছেন, «مَا يُدْرِيْكَ، لَعَلَّ اللهَ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ: اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ» “তুমি জান কি? অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা আহলে বদর সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত রয়েছেন এবং তাদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা যেমন ইচ্ছা আমল করো।’”৭৬
চতুর্থত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশের কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর শাফা‘আত তাওহীদবাদীরা প্রাপ্ত হবেন, যারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শিরক করেন না, ৭৭ তাহলে যারা সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ তাওহীদবাদী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাধিক নিকটবর্তী লোক তাদের ব্যাপারে আপনার ধারণা কীরূপ হতে পারে? নিঃসন্দেহে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ প্রাপ্তিতে সর্বোত্তম ও সর্বাধিক অগ্রগামী মানুষ।
পঞ্চমত: দুনিয়াতে তারা যে সব বালা-মুসিবত ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন সে কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। আর শরী‘আতের নিয়মানুযায়ী বালা- মুসিবতও গুনাহ মোচনকারী।
উপরোক্ত আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা বর্ণনা করা যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মূলনীতি হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের ব্যাপারে তাদের অন্তর ও মুখের ভাষা পবিত্র ও নিরাপদ রাখতে হবে। ৭৮ সুতরাং এখানে একটি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে যে, মুসলিমের অন্তর ও তার মুখের ভাষা সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত ব্যাপারে সমালোচনা ও নিন্দা করা থেকে মুক্ত ও পবিত্র থাকবে। আর অন্তর কলুষিত সে ব্যতীত এ সরল সঠিক পথ থেকে কেউ বিমুখ হয় না।
সুফইয়ান ইবন উয়াইনা রহ. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের কোনো ব্যাপারে মুখ খুলবে (সমালোচনা করবে) সে প্রবৃত্তি পূজারীদের অন্তর্ভুক্ত।’৭৯
ইমাম আহমাদ রহ. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সাহাবীর ব্যাপারে সমালোচনা করবে, অথবা তাদের কোনো ঘটনার কারণে তাদের কাউকে অপছন্দ করবে অথবা দোষ-ত্রুটি ও অসৌজন্যতার সাথে তাদের কারো নাম উল্লেখ করবে, সে ব্যক্তি বিদ‘আতী; যতক্ষণ না সে সাহাবীদের সকলের জন্য আল্লাহ্র রহমতের দো‘আ না করবে। আর এর মাধ্যমে তার অন্তর তাদের (সাহাবীগণের) ব্যাপারে পবিত্র ও নিরাপদ হবে।’৮০
টিকাঃ
৭২ দেখুন, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১০/৯৩।
৭৩ মাজমুউল ফাতাওয়া (আল-ওয়াসিতিয়্যাহ), ৩/১৫৫।
৭৪ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. পূর্বোক্ত কিতাবে এ পাঁচটি বিষয়ে সংক্ষিপ্তাকারে ইঙ্গিত করেছেন।
৭৫ ইবন মাজাহ মারফূ’ সূত্রে তার সুনানে বর্ণনা করেছেন, ২/১৪১৬, হাদীস নং ৪২৫০, হাদীসটি ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। ইবন হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী ১০/৪৭১ এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
৭৬ সহীহ বুখারী, কিতাব: ফাযায়েলুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, বাব: আল- জাসুস, ২/৩০৩, হাদীস নং ৩০০৭; সহীহ মুসলিম, কিতাব: ফাযায়েলুস সাহাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম, বাব: ফাযায়েলু আহলি বদর, ৪/১৮৯৬, হাদীস নং ৬৪৮৪, হাদীসটি আলী ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
৭৭ যেমন, সহীহ মুসলিমের আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এ ব্যাপারে হাদীস বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিম, ১/১৮৯, হাদীস নং ১৯৯।
৭৮ মাজমুউল ফাতাওয়া ‘আল-ওয়াসিতিয়্যাহ’, ৩/১৫২।
৭৯ শারহিস সুন্নাহ, বারবারহারী, পৃষ্ঠা ৭৮।
৮০ শারহি উসূলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালকাঈ, ১/১৩৬।