📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 তৃতীয় অধিকার: কুরআন ও সুন্নায় যে তাদের মর্যাদার যে ক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে সে হিসেবে তাদের পারস্পরিক মর্যাদা প্রদান করা ও এ বিশ্বাস রাখা

📄 তৃতীয় অধিকার: কুরআন ও সুন্নায় যে তাদের মর্যাদার যে ক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে সে হিসেবে তাদের পারস্পরিক মর্যাদা প্রদান করা ও এ বিশ্বাস রাখা


কেননা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মতে, সাহাবীগণ সাধারণ মর্যাদার ক্ষেত্রে সকলেই সমান, তবে মর্যাদার স্তরের বিবেচনায় তারা বিভিন্ন স্তরের। তাদের কিছু সংখ্যক অন্যদের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান, তবে এতে কাউকে অমর্যাদা করা যাবে না।
সাধারণভাবে সর্বোত্তম সাহাবী হলেন জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবী। আর তারা হলেন, চার খোলাফায়ে রাশেদীন; তথা আবু বকর, উমার, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এবং অবশিষ্ট ছয়জন সাহাবী। তাদের সমষ্টি ইবন আবু দাউদ তার ‘হায়িয়্যাহ’ তে এভাবে উল্লেখ করেছেন, وَعَامِرُ فَهْرٍ وَالزُّبَيْرُ الْمَدَّحُ سَعِيدٌ وَسَعْدٌ وَابْنُ عَوْفٍ وَطَلْحَةُ অর্থাৎ সা‘ঈদ, সা‘দ, ইবন ‘আউফ, তালহা, ফাহর এবং আ‘মের ও প্রশংসিত যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম।39 জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত উক্ত দশজনের মধ্যে চার খলীফার মর্যাদা সবার উপরে। তারা চারজন আবার খিলাফতের ধারাবাহিকতা অনুসারে এক অন্যের চেয়ে মর্যাদাবان।40 কবি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সাহাবী ও তাঁর পরিবারের মর্যাদা ও গুণাবলী ধারণ করো ও প্রচার করো। অন্তরের গভীরে তা স্থাপন করো, সমস্ত সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে আবু বকর ও উমারকে অগ্রাধিকার দাও, তাদের পরে উসমান অতঃপর যুদ্ধের ময়দানে বীর সেনানী আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু।41
নিঃসন্দেহে ইসলামে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার মর্যাদা সবার উপরে। এ উম্মতের নবীর পরে তাদের মর্যাদা; বরং সমস্ত নবীদের পরে সৃষ্টিকুলের মধ্যে তারা সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তাদের দুজনের মধ্যে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবার শ্রেষ্ঠে অগ্রগামী।
আহলে বাইতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম আবু জা‘ফর আল- বাকির রহ. এর বাণীটি এখানে প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার মর্যাদা জানে না সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত সম্পর্কে অজ্ঞ।’ 42
শা‘বী রহ. বলেছেন, ‘আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমকে ভালোবাসা ও তাদের মর্যাদা জানা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।’ 43
আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার পরে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণের মর্যাদা, অতঃপর উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, অতঃপর বাই‘আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণের মর্যাদা।
এ ধারাবাহিকতা কতিপয় আলেম উল্লেখ করেছেন। যেমন, ইবন কাসীর রহ.44, ইবনুস সালাহ 45 ও নাওয়াওয়ী রহ.46।
কতিপয় আলেম বাই‘আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণকে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।47 আবার কেউ কেউ উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের পরের স্তরে রেখেছেন আহযাবের যুদ্ধে অটলভাবে অংশ গ্রহণকারীদেরকে, অতঃপর বাই'আতে রিদওয়ানের সাহাবীগণকে আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত (সামষ্টিকভাবে) আনসারগণ ওপরে মর্যাদায় মুহাজিরগণকে অগ্রাধিকার দেন। ৪৯ এমনিভাবে যারা আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদেরকে যারা পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের ওপরে অগ্রাধিকার দেন।
মহিলা সাহাবীগণের মধ্যে তিনজন সর্বোত্তম। তারা হলেন, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা, ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা ও ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা।
শাইখুল ইসলাম আবুল আব্বাস ইবন তাইমিয়াহ রহ. বলেছেন, ‘এ উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম নারী হচ্ছেন, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা, ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা ও ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা। তাদের একজনের ওপর আরেক জনের অগ্রাধিকারের ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য ও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।৫০
এখানে একটু বিষয় উল্লেখ করা জরুরী যে, জমহুর আলিমদের ঐকমত্যে, সমস্ত সাহাবীরা তাদের পরে আগত সব লোকদের চেয়ে উত্তম।৫১ এ ব্যাপারে কিতাবে মতামৈক্য বা সন্দেহ পোষণ করা সম্ভব! তারা তো এমন সৌভাগ্যবান যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত্ লাভে ধন্য হয়েছেন, তারা তো এমনিই মর্যাদাবান ছিলেন যাদের সমকক্ষ কেউ হবেন না, যদিও সে উহুদ পাহাড় সমান স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও তাদের একমুদ বা অর্ধমুদ-এর সমপরিমাণ সাওয়াবের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। তদুপরি যদি তাদের সালাত, জিহাদ ও অন্যান্য আমলসমূহ হিসেব করা হয় তবে তাদের মর্যাদা কোন স্তরে গিয়ে ঠেকবে? _____________ ⁵⁰ মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২/২৮১। ⁵¹ দেখুন, ফাতহুল বারী, ৭/৭১।
তাদের এ মর্যাদার ব্যাপারে কীভাবে কেউ মতানৈক্য করবে? তারা তো এমন লোক যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [الحجرات: ٧]
“তারাই তো সত্য পথপ্রান্ত।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৭]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,
وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى [الحديد: ١٠]
“আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ১০] তাদের মর্যাদার ব্যাপারে কীভাবে সন্দেহ পোষণ করা যায় যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي
“আমার যুগের লোকেরাই হচ্ছে সর্বোত্তম লোক।”৫২
মু'আফি ইবন ইমরান রহ. কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয ও মু'আবিয়া ইবন আবূ সুফইয়ান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য কেমন? (অর্থাৎ কার মর্যাদা বেশি?) তিনি এ প্রশ্নের কারণে অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের সাথে কাউকে তুলনা করা যাবে না। আর মু'আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, তাঁর শ্বশুরদিকের আত্মীয়, অহী লেখক এবং আল্লাহর অহীর আমীন তথা আমানতদার।’ ৫৩
ইমাম আহমাদ রহ. কে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের সাথে কাউকে কী তুলনা করা যাবে? তিনি বললেন, মা'আযাল্লাহ (আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, মু'আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কী উমার ইবন আব্দুল আযীয রহ. থেকে উত্তম? তিনি বললেন, অবশ্যই, অবশ্যই তিনি উত্তম; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي
“আমার যুগের লোকেরাই হচ্ছে সর্বোত্তম লোক।”৫৪ ৫৫
ইমাম আহমাদ রহ. আরও বলেছেন, 'অতএব, তাদের মধ্যে যারা ক্ষণিকের জন্য হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য পেয়েছেন তারাও তাদের পরবর্তী যুগের লোকদের চেয়ে উত্তম; যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেন নি; যদিও তারা সব ধরণের আমল করে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে (যারা মারা যায়)।' ⁵⁶
প্রশ্ন: কেউ যদি এ প্রশ্ন করেন যে, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়োজিত বানীর কী ব্যাখ্যা হবে? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “فَإِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامًا الصَّبْرُ فِيهِنَّ مِثْلُ قَبْضٍ عَلَى الْجَمْرِ، لِلْعَامِلِ فِيهِنَّ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلًا تَعْمَلُونَ مِثْلَ عَمَلِهِ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْهُمْ؟ قَالَ خَمْسِينَ مِنْكُمْ”
“তোমাদের পরবর্তী এমন যুগ আসবে যে যুগে (দীনের উপর) ধৈর্য ধরে থাকা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতে রাখার মত যন্ত্রণাদায়ক হবে। ঐ যুগে যে দীনের উপর আমল করবে তার প্রতিদান হবে তার মতো আমলকারী পঞ্চাশ লোকের অনুরূপ। একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাদের পঞ্চাশ জনের মতো সাওয়াব হবে? তিনি বললেন: না, তোমাদের পঞ্চাশ জনের সমান তার সাওয়াব হবে।” ⁵⁷
জবাব: এ হাদীসে নির্দিষ্ট একটি ব্যাপারে মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, সাধারণ মর্যাদার কথা বলা হয় নি। আর তা হলো, সে সময়ে ধৈর্য ধারণ করলে পঞ্চাশ জন সাহাবীগণের ধৈর্য ধারণের প্রতিদান পাবে। তাহলে এখানে একটি নির্দিষ্ট আমলের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, সব কাজের মর্যাদা নয়। ইবন হাজার রহ. বলেছেন, উপরোক্ত হাদীস “তোমাদের পঞ্চাশ জনের আমলের সমান তার সাওয়াব হবে।” এর ব্যাখ্যায় বলা যায়, হাদীসটি সাহাবী নয় এমন লোকদেরকে সাহাবীগণের উপর মর্যাদা দেওয়া বুঝায় না। কেননা শুধু প্রতিদান বেশি হওয়া সাধারণভাবে অধিক মর্যাদাবান হওয়া প্রমাণ করে না। তাছাড়া যে আমলের ব্যাপারে তুলনা করে প্রতিদানের কথা বলা হয় সেটি শুধু সে আমলের সদৃশ প্রতিদানই পাওয়া যায়। অন্যদিকে সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দর্শন লাভে যে অতিরিক্ত মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন তাতে কেউ তাদের সমকক্ষ হবেন না। ⁵⁸

টিকাঃ
39 মানযুমাতু ইবন আবু দাউদ ‘আল-হায়িয়্যাহ’ মা‘আ শারহিহা ‘আত-তুহফাতুস সানিয়্যাহ’ পৃষ্ঠা ৯।
40 এ ব্যাপারটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের কাছে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত মতামত। দেখুন, মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ৩/১৫২; আল-ইসতী‘আব, ৩/১১৬৭-১১৬৮।
41 কালীদাতু আবু মারওয়ান আব্দুল মালিক ইবন ইদরীস আল-জায়ায়ারী ফীল আদাবি ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৫৭, পংক্তি নং ১১৫-১১৬।
42 আল-হুজজাতু ফি বায়ানিল মুহাজ্জাতু এবং শরহু আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ, ২/৫৮০।
43 আল-হুজজাতু ফি বায়ানিল মুহাজ্জাতু এবং শরহু আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ, ২/৬৩৭।
44 আল-বাই‘ইসিল-হাসীস, পৃষ্ঠা ১৮০।
45 মুকাদামাতু ইবনিল সালাহ, ১/২৮৪-২৮৫।
46 আত-তাক্বরীব ওয়া আত-তাইসীর লিমারিফাতিন সুন্নাতিল বাশীরিন নাযীর, পৃষ্ঠা ১৩।
47 যেমন, সাফারিনী রহ. তার ‘লাওয়ামি‘উল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ’ ১/৩৭২-৩৭৩ তে উল্লেখ করেছেন।
⁴⁹ লাওয়ামি’উল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ, ২/৩১২।
⁵⁰ মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২/২৮১।
⁵¹ দেখুন, ফাতহুল বারী, ৭/৭১।
⁵² সহীহ বুখারী, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও তাদের সহচরদের (তাবেয়ী) মর্যাদা, যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করেছেন বা মুসলিমদের মধ্যে যারা তাঁকে দেখেছেন তারাই তাঁর সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত, ৩/৬, হাদীস নং ৩৬৫৪; সহীহ মুসলিম, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: সাহাবী ও যারা তাদের পরবর্তীকালে ও যারা তাদের পরবর্তীতে আসবেন তাদের মর্যাদা, ৪/১৯৬৩, হাদীস নং ২৫৩৩। হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।
⁵³ দেখুন, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৯/২০১।
⁵⁴ সহীহ বুখারী, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও তাদের সহচরদের (তাবেয়ী) মর্যাদা, যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করেছেন বা মুসলিমদের মধ্যে যারা তাঁকে দেখেছেন তারাই তাঁর সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত, ৩/৬, হাদীস নং ৩৬৫৪; সহীহ মুসলিম, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: সাহাবী ও যারা তাদের পরবর্তীতে ও যারা তাদের পরবর্তীতে আসবেন তাদের মর্যাদা, ৪/১৯৬৩, হাদীস নং ২৫৩৩।
⁵⁵ দেনুন, খাল্লাল, আস-সুন্নাহ ২/৪০৫।
⁵⁶ শরহু উসূলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালকা'য়ী, ১/১১০।
⁵⁷ তিরমিযী, কিতাব: তাফসীরুল কুরআন, বাব: সূরা আল-মায়েদ, ৫/২৫৭, হাদীস নং ৩০৮৬, তিনি হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন। আবু দাউদ, কিতাব: আল-মাল্লাহিম, বাব: আল-আমর ওয়ান নাহী, ৪/৪৬২, হাদীস নং ৪৩৪৩; ইবন মাজাহ, পৃষ্ঠা ১০৩১, হাদীস নং ৪০১৪; আলবানী রহ. হাদীসটি তার সিলসিলা আস- সহীহাতে ১/৬৯২-৬৯৩, হাদীস নং ৪৬৪, এটিকে সহীহ বলেছেন। জ্ঞাতব্য, এ হাদীসটির পুরো অংশকে আলবানী রহ. সহীহ বলেন নি; বরং তিনি বলেছেন, হাদীসটি দা'ঈফ, তবে এর কিছু অংশ সহীহ। দেখুন মিশকাত, হাদীস নং ৫১৪৪; সহীহ আবু দাউদ, সংক্ষিপ্ত সনদে, হাদীস নং ১৪৪৪-২০৭৬; সিলসিলা আস-সাহীহা, হাদীস নং ৫৯৪; দ’ঈফুল জামে’ আস-সাগীর, হাদীস নং ২০৪৪।— অনুবাদক।
⁵⁸ ফাতহুল বারী, ৭/৭১

📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 চতুর্থ অধিকার: ভালো ও কল্যাণের সাথে তাদের নাম স্মরণ করা, তাদের প্রশংসা করা ও তাদের সুন্দর আখলাক প্রচার-প্রসার করা অত্যাবশ্যক

📄 চতুর্থ অধিকার: ভালো ও কল্যাণের সাথে তাদের নাম স্মরণ করা, তাদের প্রশংসা করা ও তাদের সুন্দর আখলাক প্রচার-প্রসার করা অত্যাবশ্যক


কবি বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো, তাদের সবার সুন্দর ব্যাপার গুণগুলো প্রচার করো ও প্রসার করো। ⁵⁹ নিঃসন্দেহে তাদেরকে ভালোবাসাই তাদের সুন্দর আখলাকসমূহ প্রচার করা। যার অন্তর তাদের ভালোবাসায় সিক্ত ও ভরপুর, সে তাদের প্রশংসা ও সুনাম প্রচারে নিবেদিত ও অটল থাকবে। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত সকলেই একমত এবং তাদের কিতাবসমূহে এ ব্যাপারে তাদের আক্বীদা লিপিবন্ধ করেছেন। যেমন, ইমাম মুযানী রহ. বলেছেন, ‘তাদের মর্যাদার কথা প্রচার করা হবে এবং তাদেরকে সুন্দর কাজসমূহের মাধ্যমে স্মরণ করা হবে (প্রচার করা হবে)'।⁶⁰
ইবন আবি ইয়ামীমান রহ. বলেছেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মত হচ্ছে, সকলে যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে এবং তাদের সুন্দর কাজসমূহ ও তাদের মর্যাদার প্রচার-প্রসার করে।'⁶¹
ইবন আবি দাউদ বলেছেন, ‘সকল সাহাবীর ব্যাপারে উত্তম কথা বলো; তাদের ব্যাপারে কোনো অপবাদ দিও না, যা তাদেরকে দোষযুক্ত ও নিন্দিত করে।'⁶²

টিকাঃ
⁵⁹ কালীদাআবু মারওয়ান আব্দুল মালিক ইবন ইদ্রীস আল- জায়ায়েরী ফিল আদাবি ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৫৭, পংক্তি ১১৬।
⁶⁰ শরহুস সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৮৭।
⁶¹ উসূলুস সুন্নাহ, ইবন আবু ইয়ামীম, পৃষ্ঠা ২৮৩।
⁶² মানুসুমা’তু ইবন আবু দাউদ ‘আল-হাফিজ্বইয়াহ’ মা’আ শরাহিহা ‘আত-তুহফাতুস সানিয়্যাহ’ পৃষ্ঠা ১০, লেখক, আব্দুর রাযযাক আল-বদর।

📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 পঞ্চম অধিকার: তাদের সকলের ব্যাপারে আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হওয়া ও জান্নাত লাভের সাক্ষ্য দেওয়া এবং যাদের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে নির্দিষ্টভাবে জান্নাতের সুসংবাদ এসেছে তাদের ব্যাপারে সে সাক্ষ্য দেওয়া

📄 পঞ্চম অধিকার: তাদের সকলের ব্যাপারে আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হওয়া ও জান্নাত লাভের সাক্ষ্য দেওয়া এবং যাদের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে নির্দিষ্টভাবে জান্নাতের সুসংবাদ এসেছে তাদের ব্যাপারে সে সাক্ষ্য দেওয়া


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব সাহাবী (সম্মিলিতভাবে) জান্নাতী।⁶³
আল-কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে যা এ ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ﴿وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾ [التوبة: ١٠٠]
“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসফল্য”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন, ﴿وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ﴾ [الحديد: ١٠]
“আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের জন্যেই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ১০]
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত কুরআন ও সুন্নায় নির্দিষ্টভাবে যাদের ব্যাপারে জান্নাতের সুসংবাদ এসেছে, যেমন সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবী, আব্দুল্লাহ ইবন সালাম⁶⁴, কায়েস ইবন সাবিত⁶⁵, উকাশা ইবন মিহসান⁶⁶, এ ছাড়াও অন্যান্য বহু সাহাবী যাদের ব্যাপারে জান্নাতের সুসংবাদ এসেছে তাদের সবার ব্যাপারে তারা জান্নাত লাভের সাক্ষ্য দেন।⁶⁷
আবু উসমান আস-সাবু’নী রহ. বলেছেন, ‘যে সব সাহাবীগণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাত লাভের সাক্ষ্য দিয়েছেন, মুহাদ্দিসগণও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর সত্যায়ন ও তাঁর ওয়াদার সত্যতার কারণে তাদের জান্নাত লাভের সাক্ষ্য প্রদান করেন। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে না জানলে জানাতেন না। আল্লাহ তা‘আলা গায়েবের যে সংবাদ তাঁর রাসূলকে জানাতে চেয়েছেন তা তিনি তাকে জানিয়েছেন।⁶⁸

টিকাঃ
⁶³ দেখুন, আল-ফাসল, ৪/২২৫-২২৬; আশ-শারী‘আহ, ৪/১৫৩৩; লাওয়ামি‘উল আনওয়ার, ২/৩৫১।
⁶⁴ যেমন, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮৯৯, সা’দ ইবন আবু ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
⁶⁵ যেমন, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫৮১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৯, আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
⁶⁶ যেমন, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৮৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৪, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
⁶⁷ শাইখ আব্দুল আযীয আস-সালমান তার ‘কাওয়াশিফুল জালিয়্যাহ ‘আন মা’আলিদ ওয়াসিফিয়্যাহ’ (পৃষ্ঠা ৬৪৯-৬৯৪) কিতাবে একচল্লিশ জন সাহাবীদের জান্নাতের সুসংবাদের প্রমাণ পেশ করেছেন।
⁶⁸ আক্বীদাতুস সালাফ ওয়া আসহাবুল হাদীস, পৃষ্ঠা ২৮৭; মাজমু‘উল ফাতাওয়া (আল-ওয়াসিফিয়্যাহ) ৩/১৮৩।

📘 উম্মতের ওপর সাহাবীদের অধিকারসমূহ > 📄 ষষ্ঠ অধিকার: তাদের জন্য দো‘আ, ইসতিগফার ও রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম বলা

📄 ষষ্ঠ অধিকার: তাদের জন্য দো‘আ, ইসতিগফার ও রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম বলা


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত এ ব্যাপারে একমত যে, সাহাবীগণের প্রশংসা করা, তাদের জন্য ইসতিগফার করা, তাদের জন্য রহমতের দো‘আ করা এবং তাদের নাম শুনে রাদিয়াল্লাহ ‘আনহুম বলা ওয়াজিব।⁶⁹
মুসলিমের অন্তর যখন মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের (রাদিয়াল্লাহ ‘আনহুম) ভালোবাসা ও সম্মানে পরিপূর্ণ হয়, তখন তাদের মুখের ভাষায় তাদের জন্য দো‘আ প্রকাশ পায় এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করে।
ইবনুল মুবারক রহ. বলেছেন, আমি সর্বদা তাদের (সাহাবীগণের) জন্য মাগফিরাত কামনা করি, যেভাবে আমি প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের জন্য মাগফিরাত কামনায় আদিষ্ট।⁷⁰
এমনকি তাদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম’ বলে দো‘আ করা ‘উরফী ইজমা তথা আহলে ইলম এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।⁷¹
সাহাবীগণের কারো নাম উল্লেখ করা হলেই ‘রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ বলে তার সাথে যুক্ত করে তার জন্য দো‘আ করা হয়। এ ব্যাপারে মুসলিমগণ একমত। কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তাদের ওপর রাযী ও সন্তুষ্ট হয়েছেন, ﴿رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ [المجادلة: ٢٢]
“আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।” [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ২২]
শওকানী রহ. বলেছেন, ‘এ উম্মতের পূর্বের ও পরের জমহুর মুসলিমের মাঝে এ ব্যাপারটি প্রচলিত হয়ে আসছে যে, তারা সাহাবীগণের নাম উল্লেখ করেই তাদের জন্য “রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু” বলে দো‘আ করেন, তাদের পরে আগত মুসলিমগণ তাদের পূর্বে আগত সাহাবীগণের জন্য আল্লাহ্র রহমত কামনা করে ‘রাহিমাহুল্লাহ্’ বলেন, আল্লাহ্র মাগফিরাত ও ক্ষমার দো‘আ করেন, যেভাবে আল্লাহ্ আমাদেরকে বলার নির্দেশ দিয়েছেন।’ আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেন,
﴿وَالَّذِينَ جَاؤُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا﴾ [الحشر: ١٠]
“আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না।’” [সূরা : আল-হাশর: ১০]

টিকাঃ
⁶⁹ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ১০৮৫।
⁷⁰ দিওয়ান ইবনুল মুবারক, পৃষ্ঠা ২১, তাহকীক, সাআদ আল-ফাকী।
⁷¹ দেখুন, সিলসিলাতুদ দঈফাহ, আলবানী রহ., ১১/৭৭৫। উল্লেখ্য যে, এখানে ‘উরফী’ তথাসূত্র তথা আলিমদের খাস পরিভাষা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে আহলে ইলম ও মুসলিমগণ একমত হয়েছেন, যা সকলের কাছেই পরিচিত ও জানা। অন্যদিকে ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ অন্যদের ব্যাপারেও বলা জায়েয। দেখুন, আল- মাজমু’, ইমাম নাওওয়ী রহ., ৬/১৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00