📄 প্রথম অধিকার: সাহাবীগণকে ভালোবাসা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে আল্লাহর ওয়াজহে ও আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার জন্যই ভালোবাসেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, যারা তাদেরকে ভালোবাসবেন, তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবেন, তাদের অধিকার সংরক্ষণ করবেন ও তাদের মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হবেন তারাই সফলকামী দলের অন্তর্ভুক্ত হবেন। আর যারা তাদেরকে অপছন্দ করবেন, তাদেরকে গাল-মন্দ করবেন, শত্রুদের দলে তাদেরকে সম্পূর্ণ করবেন ও তাদের মর্যাদার বিপরীত কিছু বলবেন তারা ধ্বংসপ্রাপ্তদের দলে অন্তর্ভুক্ত হবেন।
এ কথার দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿الحشر: ١٠﴾
“যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, «آيَةُ الإِيمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الْأَنْصَارِ».
“ঈমানের নিদর্শন হলো আনসারগণকে ভালোবাসা এবং মুনাফিকীর আলামত হলো আনসারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা।”¹⁷
এখানে যেহেতু আনসারগণের ভালোবাসা প্রমাণিত হয়েছে, তাহলে মুহাজিরগণের প্রতি ভালোবাসা আরও অধিক অধিকারপ্রাপ্ত। যেহেতু তারা সর্বাধিক বিবেচনায় তাদের (আনসারদের) চেয়ে উত্তম। এছাড়া তারাও আল্লাহকে সাহায্য করেছেন যেমন আনসারগণ করেছেন; সেহেতু তারাও আনসার হিসেবে গণ্য।¹⁸
কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর ওয়াজহে কাউকে ভালোবাসার যেসব মর্যাদা কথা উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসার দ্বারা যে কেউ সেসব মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত হবে; যেহেতু তারা হলেন সর্বোত্তম মানুষ।
ইমাম যাহাবী রহ. তার আক্বীদার কিতাবে বলেছেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসি, তাদের কাউকে ভালোবাসায় আমরা বাড়াবাড়ি করি না, আবার কারও থেকে ভালোবাসা ছিন্নিও করি না (সবাইকে ভালোবাসি)। আমরা তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করি ও তাদের ঘৃণা করি যারা সাহাবীগণের সাথে শত্রুতা-বিদ্বেষপোষণ করবে এবং তাদেরকে খারাপভাবে উল্লেখ করবে। সাহাবীগণকে ভালোবাসা দীন, ঈমান ও ইহসান। আর তাদেরকে অপছন্দ করা কুফুরী, নিফাকী, পাপ ও অবাধ্যতা।’¹⁹
ইমাম মালেক রহ. এর বাণীটি এখানে উল্লেখযোগ্য সবচেয়ে সুন্দর কথা। তিনি বলেছেন, ‘সালাফ তথা সৎপূর্বসূরীরা তাদের সন্তানদেরকে আবূ বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার ভালোবাসা শিক্ষা দিতেন, যেমনিভাবে তারা তাদের সন্তানদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতেন।’²⁰
আবু নু‘আইম তার “হিলইয়াহ্”²¹ গ্রন্থে বিশর ইবন হারিস রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘আমার অন্তরে যে আমলটি সবচেয়ে বেশি মজবুত ও কার্যকর মনে হচ্ছে তা হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের ভালোবাসা’।
আবু নু‘আইম তার “হিলইয়াহ্”²² গ্রন্থে শু‘আইব ইবন হারব রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “আসিম ইবন মুহাম্মাদের কাছে সুফইয়ান আস-সাওরী রহ. এর গুণাবলী বর্ণনা করা হলো। তারা তার পনেরোটি মানাকিব তথা উত্তম গুণ উল্লেখ করলেন। তখন ‘আসিম ইবন মুহাম্মদ তাদেরকে বললেন, তোমরা কি তার গুণাবলী বর্ণনা করা সমাপ্ত করেছ? আমি তার এমন একটি গুণের কথা জানি যা তোমাদের বর্ণিত গুণাবলীর চেয়ে উত্তম। তা হলো, তার অন্তর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের ব্যাপারে পরিচ্ছন্ন ছিল।' (দোষ-ত্রুটি বর্ণনা থেকে মুক্ত ছিল।)
টিকাঃ
¹⁷ মুস্তাফাকুন ‘আলাইহি, সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকিবুল আনসার, বাব হুব্বুল আনসার মিনাল ঈমান, ৩/৩৫, হাদীস নং ৩৭৮৪; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, বাব আনসার ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ভালোবাসা ঈমানের আলামত আর তাদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ মুনাফিকীর আলামত, ১/৪৬, হাদীস নং ৭৪। হাদীসটি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
¹⁸ আল-জাওয়াবুস সহীহ, ২/২৬৭।
¹⁹ আক্বীদাতুত ত্বহাবীয়া মা‘আ শরহে ইবন আবিল ইয্য, পৃষ্ঠা ৪৬৭।
²⁰ শরহু উসূলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ, ৭/১১৯০, আসার নং ২০২৮; তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৪৪/৩৮৩; আল-জুজআবু ফি বায়ানিল মাহাজ্জাহ্, ২/৩৮৯।
²¹ হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৮/৩৮৮।
²² হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৮/৩৮৮।
📄 দ্বিতীয় অধিকার: তাদের মর্যাদা ও ন্যায়পরায়ণতার বিশ্বাস করা, তারা উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ মানুষ, হক ও সঠিকতায় তারা সর্বাধিক নিকটতম এ বিশ্বাস রাখা
উম্মতের মধ্যে সম্মান-মর্যাদা, সততা ও বিশ্বস্ততায় সাহাবীগণের মতো আর কেউ নেই। এ ব্যাপারে মুসলিমদের মধ্যে একাটা ইজমা সংঘটিত হয়েছে। এ মতের সাথে কিছু বিদ্‘আতীদের একমত না হওয়া অসংগত হবে না।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তার ‘নুনিয়্যাহ’ কিতাবে বলেছেন, ‘যেহেতু আলেমগণ ঐকমত্য যে, সাহাবীগণ (নবীর পরে) মানব জাতির মধ্যে সর্বোত্তম মানব। এটি অকাট্য ভাবে প্রমাণিত, এতে কারো কোনো মতানৈক্য নেই।
সাহাবীগণের মর্যাদার ব্যাপারে অসংখ্য দলীল-প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন তাদের মহিমান্বিত প্রশংসা বর্ণনায় ভরপুর। যেহেতু আল্লাহ তাদের সততা, বিশুদ্ধ ঈমান, প্রকৃত ভালোবাসা, পরিপূর্ণ জ্ঞান, পরিপক্ক মতামত, পূর্ণাঙ্গ উপদেশ ও স্পষ্ট আমানত সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন।
তাদের ফযীলতের সেসব আয়াতের মধ্য থেকে নিম্নে কয়েকটি বর্ণনা করা হলো:
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿١٠٠﴾ [التوبة: 100]
“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফাল্য”। [আত-তাওবা, আয়াত: ১০০]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন, إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوا وَّنَصَرُوا أُولَٰئِكَ bَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ [الأنفال: ٧٢]
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং নিজেদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে আর যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সহায়তা করেছে, তারা একে অপরের বন্ধু।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭২]
এ আয়াত থেকে পরবর্তী আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ তাদের মর্যাদা বর্ণনা করে বলেছেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوا وَّنَصَرُوا أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا ۚ لَّهُمْ مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ ﴿٧٤﴾ [الأنفال: ٧٤]
“আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযিক।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭৪]
সাহাবীগণের মর্যাদা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন, لَقَد تَّابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُم فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ ۚ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿١١٧﴾ [التوبة: ١١٧]
“অবশ্যই আল্লাহ নবী, মুহাজিরিন ও আনসারদের তাওবা কবুল করলেন, যারা তাঁর অনুসরণ করেছে সংকটপূর্ণ মুহূর্তে। তাদের মধ্যে এক দলের হৃদয় সত্যচ্যুত হওয়ার উপক্রম হবার পর। তারপর আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন। নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” [আত-তাওবা, আয়াত: ১১৭]
আল্লাহ তা‘আলা তাদের সম্পর্কে আরও বলেছেন, مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ۚ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي ٱلْإِنْجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْئَهُ فَتَآزَرَهُ فَٱسْتَغْلَظَ فَٱسْتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِۦ يُعْجِبُ ٱلزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ ٱلْكُفَّارَ ۗ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا ﴾ [الفتح: ٢٩] “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকুককারী, সাজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সাজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মত, যে তার কচিচারা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কাণ্ডের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানএর ওয়াদা করেছেন।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন,
﴿ يَوْمَ لَا يُخْزِي ٱللَّهُ ٱلنَّبِيَّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَعَهُۥ ۖ نُورُهُمْ يَسْعَىٰ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَٰنِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَآ أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَٱغْفِرْ لَنَآ ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴾ [التحريم: ٨] “সেদিন নবী ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না। তাদের আলো তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবেন, হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।” [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৮]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন,
﴿ وَٱعْلَمُوٓاْ أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ ٱللَّهِ ۚ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِّنَ ٱلْأَمْرِ لَعَنِتُّمْ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ ٱلْإِيمَٰنَ وَزَيَّنَهُۥ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ ٱلْكُفْرَ وَٱلْفُسُوقَ وَٱلْعِصْيَانَ ۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلرَّٰشِدُونَ فَضْلًا مِّنَ ٱللَّهِ وَنِعْمَةً ۚ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴾ [الحجرات: ٧-٨] “আর তোমরা জেনে রাখো যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন। তিনি যদি অধিকাংশ বিষয়ে তোমাদের কথা মেনে নিতেন, তাহলে তোমরা অবশ্যই কষ্টে পতিত হতে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন। আর তোমাদের কাছে কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত। আল্লাহর পক্ষ থেকে করুণা ও নি'আমত স্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৭-৮]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন,
﴿ لَا يَسْتَوِى مِنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ ٱلْفَتْحِ وَقَٰتَلَ ۚ أُوْلَٰٓئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ ٱلَّذِينَ أَنفَقُواْ مِن بَعْدُ وَقَٰتَلُواْ ۚ وَكُلًّا وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلْحُسْنَىٰ ۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ﴾ [الحديد: ١٠] “তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যেই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ১০]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন,
﴿ قُلِ ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ وَسَلَٰمٌ عَلَىٰ عِبَادِهِ ٱلَّذِينَ ٱصْطَفَىٰٓ ۗ ءَآللَّهُ خَيْرٌ أَم مَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [النمل: ٥٩] “বলুন, সব প্রশংসাই আল্লাহর জন্য। আর শান্তি তাঁর বান্দাদের প্রতি যাদের তিনি মনোনীত করেছেন। আল্লাহই শ্রেষ্ঠ।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৫৯]
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ও সাওরী রহ, এর মতে, ‘তারা হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীরা।’ 25
আল্লাহ তা'আলা সাহাবীগণের সম্পর্কে আরও বলেছেন,
﴿ كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ ۗ ﴾ [آل عمران: ١١٠] “তোমরা হলে সর্বোত্তম উম্মাত, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০]
এ আয়াত দ্বারা সাহাবীগণের মর্যাদা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এ আয়াত হতেও তাদের কথাই নির্দিষ্টভাবে বুঝিয়েছে অথবা সর্বোত্তম উম্মত বলে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব উম্মতকে বুঝানো হয়েছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব উম্মত বুঝালে সাহাবীরা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
এ ছাড়াও আল্লাহ তা'আলা তাদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন,
﴿ وَكَذَٰلِكَ جَعَلۡنَٰكُمۡ أُمَّةٗ وَسَطٗا لِّتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيۡكُمۡ شَهِيدٗا ۗ ﴾ [البقرة: ١٤٣] “আর এভাবেই আমরা তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৪৩] পূর্বোক্ত আয়াতের মতোই উপরিউক্ত আয়াতের দ্বারাও দলীল দেওয়া হয়েছে; বরং কুরআন ও হাদীসের যত আয়াত ও হাদীস এ উম্মতের সম্মান ও মর্যাদা প্রমাণ করে তা সবই অগ্রাধিকারে ভিত্তিতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে অন্তর্ভুক্ত করে।
অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদীস সাহাবীগণের মর্যাদার কথা বলেছে। তন্মধ্যে নিচে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «النُّجُومُ أَمَنَةٌ لِلسَّمَاءِ، فَإِذَا ذَهَبَتِ النُّجُومُ أَتَى السَّمَاءَ مَا تُوعَدُ، وَأَنَا أَمَنَةٌ لِأَصْحَابِي، فَإِذَا ذَهَبْتُ أَتَى أَصْحَابِي مَا يُوعَدُونَ، وَأَصْحَابِي أَمَنَةٌ لِأُمَّتِي، فَإِذَا ذَهَبَ أَصْحَابِي أَتَى أُمَّتِي مَا يُوعَدُونَ».
“তারকারাজি আসমানের জন্য নিরাপত্তা রক্ষাকারী। যখন তারকারাজি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তখন আসমানের জন্য প্রতিশ্রুত বিপদ আসন্ন হবে (অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হবে)। আর আমি আমার সাহাবীগণের জন্য নিরাপত্তা প্রদানকারী স্বরূপ। যখন আমি বিদায় নেব তখন আমার সাহাবীগণের উপর প্রতিশ্রুত সময় উপস্থিত হবে (অর্থাৎ ফিতনা-ফাসাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয়ে যাবে)। আর আমার সাহাবীগণ সমগ্র উম্মতের জন্য নিরাপত্তা প্রদানকারী স্বরূপ। যখন আমার সাহাবীগণ বিদায় হয়ে যাবে তখন আমার উম্মতের উপর প্রতিশ্রুত সময় উপস্থিত হবে (অর্থাৎ কিয়ামতের আলামত প্রকাশ পাবে। যেমন, শির্ক, বিদ‘আত ছড়িয়ে পড়বে, ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হবে, শয়তানের শিং উদয় হবে, খ্রিস্টানদের রাজত্ব কায়েম হবে, মক্কা ও মদীনার অবমাননা করা হবে ইত্যাদি)।²⁶
আবুল আব্বাস আল-কুরতুবী রহ. উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ যতদিন জমিনে জীবিত থাকবেন ততদিন জমিনে দীন কায়েম থাকবে, হক প্রকাশ্যে থাকবে, শত্রুর উপর বিজয় অর্জিত হবে। আর যখন তাঁর সাহাবীরা মারা যাবেন, তখন পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ শুরু হবে, শত্রুর বিজয় অর্জিত হবে। এভাবেই দীন কমতে থাকবে। দীন কমতে কমতে এক সময় এমন অবস্থা হবে যে, জমিনে আল্লাহ্, আল্লাহ্ বলার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। (আর তখনই কিয়ামত সংঘটিত হবে)। এ কথাই উপরোক্ত হাদীসে এ উম্মতের সাথে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।²⁷
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ، ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ، وَلَا نَصِيفَهُ».
“তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ করো না। তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় সমান স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবে তাদের একমুদ বা অর্ধমুদ-এর সমপরিমাণেও পৌঁছাতে পারবে না।”²⁸
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় শাওকানী রহ. খুব সুন্দর একটি মন্তব্য পেশ করেছেন, তিনি বলেছেন, ‘পরবর্তী সাহাবীগণ যদি উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেও পূর্ববর্তী সাহাবীগণের এক মুদ বা অর্ধ মুদ পরিমাণ ব্যয়ের মত সাওয়াবের অধিকারী না হয়, তবে আমাদের পক্ষ থেকে উহুদ পরিমাণ দানও তাদের এক খঞ্জা পরিমাণ বা তার অর্ধেক বায়ের কাছে পৌঁছাতে পারবে বলে আমি মনে করি না।’²⁹
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, «خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ».
“আমার যুগের লোকেরাই হচ্ছে সর্বোত্তম লোক, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী যুগের।”³⁰
সাহাবীগণের সর্বোত্তম হওয়ার এ সাক্ষ্য ও বিবরণ স্বয়ং এমন এক মহান ব্যক্তি দিয়েছেন যিনি মনগড়া কোনো কথা বলেন না। তাহলে এর চেয়ে উত্তম সত্যায়ন আর কী হতে পারে?!
আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের মর্যাদা বর্ণনায় বলেছেন, (এ ধরণের বর্ণনা ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ৩১ ও হাসান বসরী রহ. ৩২ এর থেকে ও বর্ণিত আছে) ‘যে ব্যক্তি কারো অনুসরণ করতে চায় সে যেন মৃত ব্যক্তির অনুসরণ করে; কেননা জীবিত ব্যক্তি কখনও ফিতনায় নিপতিত হওয়া থেকে নিরাপদ নয়। তারাই (অর্থাৎ সেসব মৃত ব্যক্তি) হচ্ছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ। আল্লাহর শপথ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ হচ্ছেন এ উম্মতের সর্বোত্তম মানুষ, অন্তরের দিক থেকে সর্বাধিক পবিত্র, গভীর ইলমের অধিকারী আর সবচেয়ে কম লৌকিকতা প্রদর্শনকারী। আল্লাহ তাদেরকে তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী হিসেবে ও তাঁর দীন প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচিত করেছেন। অতএব, তাদের সম্মান ও মর্যাদা জানো ও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো, তাদের আখলাক ও দীনের যতটুকু সম্ভব আঁকড়ে ধরো; কেননা তারা সঠিক হিদায়াতের পথে ছিলেন।'৩৩ আবু উমার আদ-দানী রহ. বলেছেন, ‘সাহাবীরা উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম, সর্বাধিক নেককার ও তারা আল্লাহর নির্বাচিত ছিলেন। আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অপরিসীম নি'আমত দান করে সম্মানিত করেছেন এবং তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া দ্বারা তাদেরকে বিশেষায়িত করেছেন।'৩৪ সাহাবীগণের সুন্দর গুণাবলি ও মর্যাদা সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে দেখলে বুঝতে পারবেন যে, তারা ইলম, ন্যায়পরায়ণতা, জিহাদ ও অন্যান্য সব কল্যাণকর কাজে সর্বাধিক অগ্রগামী ছিলেন। ফলে তারা তাদের পূর্ববর্তীদেরকে ছাড়িয়ে গেছেন আর পরবর্তীদেরকে হারিয়ে দিয়েছেন, অভীষ্ট লক্ষ্য অধিপতি হয়েছিলেন, সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেছিলেন। তারাই ছিলেন আমাদের পর্যন্ত ইসলাম পৌঁছানোর এবং সব ধরণের কল্যাণ ও হিদায়াতের মাধ্যম। তাদের মাধ্যমেই আমরা সৌভাগ্য ও নাজাতও লাভ করেছি। কিয়ামত পর্যন্ত উম্মত তাদের ইলম, ন্যায়পরায়ণতা ও জিহাদের অবশিষ্ট কল্যাণ প্রাপ্ত হবেন। তাদের মাধ্যম ব্যতীত কেউ কোনো কল্যাণকর ইলমপ্রাপ্ত হবে না। তাদের মাধ্যমেই আমরা ইলম পেয়েছি। তাদের জিহাদ ও বিজয় ব্যতীত আমরা পৃথিবীর বুকে নিরাপদ বসবাস করতে পারতাম না। ন্যায়পরায়ণ ও হিদায়াতের ওপর অধিষ্ঠিত কোনো ইমাম বা শাসক তাদের দ্বারা প্রাপ্ত মাধ্যম ব্যতীত শাসন কার্য পরিচালনা করতে পারতো না। তারাই তরবারীর দ্বারা দেশ জয় করেছেন, দৃঢ় ঈমানের দ্বারা মানুষের হৃদয় উন্মুক্ত করেছেন, ন্যায়পরায়ণতার দ্বারা দেশ আবাদ করেছেন এবং ইলম ও হিদায়াতের দ্বারা অন্তর জয় করেছেন। তাদের কৃত আমল ছাড়াও কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতের আমলের একটি অংশ তারা প্রাপ্ত হবেন। অতএব, সে মহান আল্লাহর তাসবীহ বর্ণনা করছি যিনি তাঁর দয়া ও রহমতে যাকে ইচ্ছা তাকে নির্বাচিত করেন।'৩৫ ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. তাদের হকের ব্যাপারে কতই না সুন্দর কথা বলেছেন! তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিজ্ঞ ও সচেতনতার সাথে তাদের সীরাত (জীবনী পড়েন) দেখেন, আল্লাহ তাদেরকে যে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন তা अवलोकन করেন, তাহলে তিনি নিশ্চিত ভাবে জানতে পারবেন যে, নবী রাসূলদের পরে তারাই সর্বোত্তম সৃষ্টি, তাদের মতো পূর্বে কেউ ছিলেন না এবং পরবর্তীতেও কেউ আসবেন না। এ উম্মতের মধ্যে তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম যে উম্মাতকে আল্লাহ সমস্ত উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেছেন।'৩৬
তাদের এ সুমহান মর্যাদা ও সুউচ্চ পবিত্রতম সম্মানের কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত সকল সাহাবীকে ন্যায়পরায়ণ মনে করেন, তারা কেউ মাজরূহ তথা দোষ-ত্রুটি নন। আল্লাহ তাদেরকে অপবাদ থেকে মুক্ত রেখেছেন এবং দোষ-ত্রুটি থেকে রক্ষা করেছেন। তারা সকলেই মুসলিমদের সম্মানিত ইমাম ও নেতা। আর আল্লাহ তাদেরকে নির্বাচন করেছেন ও তাদের পবিত্রতার সংবাদ সকলেরই জানা। তারা সর্বোত্তম যুগের মানুষ, সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ যাদেরকে তাঁর নবীর সাহচর্য ও সাহায্যের জন্য নির্বাচিত করে যাদের ওপর তিনি সন্তুষ্ট, এর চেয়ে উত্তম ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষ্য হতে পারে না, এর চেয়ে উত্তম প্রশংসা হতে পারে না, আর এর চেয়ে পরিপূর্ণ ন্যায়পরায়ণতা সাব্যস্ত করার আর কী পন্থা হতে পারে? ইবন আব্দুল বার রহ. বলেছেন, সমস্ত সাহাবীগণের অবস্থা ও জীবন চরিত নিয়ে গবেষণা করে আহলে হক তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ইজমা তথা ঐকমত্য হয়েছেন যে, তারা সকলেই ন্যায়পরায়ণ।' 37
‘তারা সকলেই সৎকাজ ও তাকওয়ার অধিকারী এবং সর্বাধিক যোগ্য ছিলেন, আর সব ভালো কাজের তারাই ছিলেন অগ্রগামী।’ 38
টিকাঃ
২৩ আদ-দুররাতুল মুদিয়্যাহ ফি আকীদাতিব ফিরকাতিল মারদিয়্যাহ মা’আ শারহিহা লাওয়া’ইমিল আনওয়ার, ২/৩৭৭।
২৪ নুনিয়্যাহ ইবনুল কাইয়্যিম মা’আ শারহিহা তাওদীহুল মাকাসিদ, লি ইবনু উস্সা, ১/৪৮১।
25 তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ইবন কাসীর, ১০/৪৮৬; ফাতহুল কাদীর, ৪/১৯৫।
²⁶ সহীহ মুসলিম, কিতাব: ফাযায়েলে সাহাবাহ, বাব: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে বাণী: أَصْحَابِي أَمَانٌ لِأُمَّتِي، وَمَنْ سَلَّمَ أَمَانٌ لِأَصْحَابِهِ وَفِقَهُنَّ بَابَ بَيَانِ أَنْ بَقَاءُ إِلَخْ, ৪/১৯৬৬, হাদীস নং ২৫৩১।
²⁷ আল-মুফহিম, ৬/৬৯৫।
²⁸ সহীহ বুখারী, কিতাব: ফাযায়েলে সাহাবাহ, বাব: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে বাণী: আমি যদি কাউকে খলীল বানাতাম, ৩/১২২, হাদীস নং ৩৬৭১; সহীহ মুসলিম, কিতাব: ফাযায়েলে সাহাবাহ, বাব: সাহাবীদেরকে গাল-মন্দ করা হারাম, ৪/১৯৬৭- ১৯৬৮, হাদীস নং ২৫৩১, হাদীসটি আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।
²⁹ ইরশাদুস সায়িল ইলা দালায়েলিল মাসায়েল মা‘আর রাসাইলুস সালাফিয়া, পৃষ্ঠা ৪১।
³⁰ সহীহ বুখারী, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও তাদের সহচরদের (তাবেয়ী) মর্যাদা, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করেছেন বা মুসলিমদের মধ্যে যারা তাঁকে দেখেছেন তারাই তাঁর সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত, ৩/৬, হাদীস নং ৩৬৫১; সহীহ মুসলিম, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: সাহাবী ও যারা তাদের পরবর্তীতে ও যারা তাদের পরবর্তীতে আসবেন তাদের মর্যাদা, ৪/১৯৬০, হাদীস নং ২৫৩৩। হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।
৩১ আবু নু'আইম রহ. হিলইয়াতুল আউলিয়াতে ১/৩০৫ বর্ণনা করেছেন।
৩২ ইবন আব্দুল বার জামে'উ বায়ানিল ইলম ও ফাদ্বলিহি ২/৯৯৫ তে বর্ণনা করেছেন।
৩৩ ইবন আব্দুল বার জামে'উ বায়ানিল ইলম ও ফাদ্বলিহি ২/৯৯৫-৯৯৬ তে বর্ণনা করেছেন।
৩৪ আল-আরজুয়াহুল মুনাফিক্বা ‘আলা আসমাইহিল কুররা ওয়ায়া রুওয়াত ওয়ায়া উসুলিল কিরাআত', পৃষ্ঠা ১৮৯, কবিতা নং ৫৭১-৫৭২।
৩৫ ইবনুল কাইয়্যিম, তরীকুল হিজরাতাইন, পৃষ্ঠা ৬৪৮।
৩৬ মাজমূ'উল ফাতাওয়া, (আল-ওয়াসিতিয়্যাহ) ৩/১৫০।
37 আল-ইসতী‘আব, ১/১৯।
38 কালীদাতু আবু মারওয়ান আব্দুল মালিক ইবন ইদরীস আল-জায়ায়ারী ফীল আদাবি ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৫৮, পংক্তি নং ১২৪।
📄 তৃতীয় অধিকার: কুরআন ও সুন্নায় যে তাদের মর্যাদার যে ক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে সে হিসেবে তাদের পারস্পরিক মর্যাদা প্রদান করা ও এ বিশ্বাস রাখা
কেননা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মতে, সাহাবীগণ সাধারণ মর্যাদার ক্ষেত্রে সকলেই সমান, তবে মর্যাদার স্তরের বিবেচনায় তারা বিভিন্ন স্তরের। তাদের কিছু সংখ্যক অন্যদের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান, তবে এতে কাউকে অমর্যাদা করা যাবে না।
সাধারণভাবে সর্বোত্তম সাহাবী হলেন জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবী। আর তারা হলেন, চার খোলাফায়ে রাশেদীন; তথা আবু বকর, উমার, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এবং অবশিষ্ট ছয়জন সাহাবী। তাদের সমষ্টি ইবন আবু দাউদ তার ‘হায়িয়্যাহ’ তে এভাবে উল্লেখ করেছেন, وَعَامِرُ فَهْرٍ وَالزُّبَيْرُ الْمَدَّحُ سَعِيدٌ وَسَعْدٌ وَابْنُ عَوْفٍ وَطَلْحَةُ অর্থাৎ সা‘ঈদ, সা‘দ, ইবন ‘আউফ, তালহা, ফাহর এবং আ‘মের ও প্রশংসিত যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম।39 জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত উক্ত দশজনের মধ্যে চার খলীফার মর্যাদা সবার উপরে। তারা চারজন আবার খিলাফতের ধারাবাহিকতা অনুসারে এক অন্যের চেয়ে মর্যাদাবان।40 কবি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সাহাবী ও তাঁর পরিবারের মর্যাদা ও গুণাবলী ধারণ করো ও প্রচার করো। অন্তরের গভীরে তা স্থাপন করো, সমস্ত সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে আবু বকর ও উমারকে অগ্রাধিকার দাও, তাদের পরে উসমান অতঃপর যুদ্ধের ময়দানে বীর সেনানী আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু।41
নিঃসন্দেহে ইসলামে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার মর্যাদা সবার উপরে। এ উম্মতের নবীর পরে তাদের মর্যাদা; বরং সমস্ত নবীদের পরে সৃষ্টিকুলের মধ্যে তারা সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তাদের দুজনের মধ্যে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবার শ্রেষ্ঠে অগ্রগামী।
আহলে বাইতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম আবু জা‘ফর আল- বাকির রহ. এর বাণীটি এখানে প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার মর্যাদা জানে না সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত সম্পর্কে অজ্ঞ।’ 42
শা‘বী রহ. বলেছেন, ‘আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমকে ভালোবাসা ও তাদের মর্যাদা জানা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।’ 43
আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার পরে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণের মর্যাদা, অতঃপর উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, অতঃপর বাই‘আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণের মর্যাদা।
এ ধারাবাহিকতা কতিপয় আলেম উল্লেখ করেছেন। যেমন, ইবন কাসীর রহ.44, ইবনুস সালাহ 45 ও নাওয়াওয়ী রহ.46।
কতিপয় আলেম বাই‘আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণকে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।47 আবার কেউ কেউ উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের পরের স্তরে রেখেছেন আহযাবের যুদ্ধে অটলভাবে অংশ গ্রহণকারীদেরকে, অতঃপর বাই'আতে রিদওয়ানের সাহাবীগণকে আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত (সামষ্টিকভাবে) আনসারগণ ওপরে মর্যাদায় মুহাজিরগণকে অগ্রাধিকার দেন। ৪৯ এমনিভাবে যারা আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদেরকে যারা পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের ওপরে অগ্রাধিকার দেন।
মহিলা সাহাবীগণের মধ্যে তিনজন সর্বোত্তম। তারা হলেন, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা, ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা ও ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা।
শাইখুল ইসলাম আবুল আব্বাস ইবন তাইমিয়াহ রহ. বলেছেন, ‘এ উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম নারী হচ্ছেন, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা, ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা ও ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা। তাদের একজনের ওপর আরেক জনের অগ্রাধিকারের ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য ও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।৫০
এখানে একটু বিষয় উল্লেখ করা জরুরী যে, জমহুর আলিমদের ঐকমত্যে, সমস্ত সাহাবীরা তাদের পরে আগত সব লোকদের চেয়ে উত্তম।৫১ এ ব্যাপারে কিতাবে মতামৈক্য বা সন্দেহ পোষণ করা সম্ভব! তারা তো এমন সৌভাগ্যবান যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত্ লাভে ধন্য হয়েছেন, তারা তো এমনিই মর্যাদাবান ছিলেন যাদের সমকক্ষ কেউ হবেন না, যদিও সে উহুদ পাহাড় সমান স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও তাদের একমুদ বা অর্ধমুদ-এর সমপরিমাণ সাওয়াবের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। তদুপরি যদি তাদের সালাত, জিহাদ ও অন্যান্য আমলসমূহ হিসেব করা হয় তবে তাদের মর্যাদা কোন স্তরে গিয়ে ঠেকবে? _____________ ⁵⁰ মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২/২৮১। ⁵¹ দেখুন, ফাতহুল বারী, ৭/৭১।
তাদের এ মর্যাদার ব্যাপারে কীভাবে কেউ মতানৈক্য করবে? তারা তো এমন লোক যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [الحجرات: ٧]
“তারাই তো সত্য পথপ্রান্ত।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৭]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,
وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى [الحديد: ١٠]
“আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ১০] তাদের মর্যাদার ব্যাপারে কীভাবে সন্দেহ পোষণ করা যায় যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي
“আমার যুগের লোকেরাই হচ্ছে সর্বোত্তম লোক।”৫২
মু'আফি ইবন ইমরান রহ. কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয ও মু'আবিয়া ইবন আবূ সুফইয়ান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য কেমন? (অর্থাৎ কার মর্যাদা বেশি?) তিনি এ প্রশ্নের কারণে অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের সাথে কাউকে তুলনা করা যাবে না। আর মু'আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, তাঁর শ্বশুরদিকের আত্মীয়, অহী লেখক এবং আল্লাহর অহীর আমীন তথা আমানতদার।’ ৫৩
ইমাম আহমাদ রহ. কে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের সাথে কাউকে কী তুলনা করা যাবে? তিনি বললেন, মা'আযাল্লাহ (আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, মু'আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কী উমার ইবন আব্দুল আযীয রহ. থেকে উত্তম? তিনি বললেন, অবশ্যই, অবশ্যই তিনি উত্তম; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي
“আমার যুগের লোকেরাই হচ্ছে সর্বোত্তম লোক।”৫৪ ৫৫
ইমাম আহমাদ রহ. আরও বলেছেন, 'অতএব, তাদের মধ্যে যারা ক্ষণিকের জন্য হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য পেয়েছেন তারাও তাদের পরবর্তী যুগের লোকদের চেয়ে উত্তম; যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেন নি; যদিও তারা সব ধরণের আমল করে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে (যারা মারা যায়)।' ⁵⁶
প্রশ্ন: কেউ যদি এ প্রশ্ন করেন যে, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়োজিত বানীর কী ব্যাখ্যা হবে? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “فَإِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامًا الصَّبْرُ فِيهِنَّ مِثْلُ قَبْضٍ عَلَى الْجَمْرِ، لِلْعَامِلِ فِيهِنَّ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلًا تَعْمَلُونَ مِثْلَ عَمَلِهِ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْهُمْ؟ قَالَ خَمْسِينَ مِنْكُمْ”
“তোমাদের পরবর্তী এমন যুগ আসবে যে যুগে (দীনের উপর) ধৈর্য ধরে থাকা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতে রাখার মত যন্ত্রণাদায়ক হবে। ঐ যুগে যে দীনের উপর আমল করবে তার প্রতিদান হবে তার মতো আমলকারী পঞ্চাশ লোকের অনুরূপ। একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাদের পঞ্চাশ জনের মতো সাওয়াব হবে? তিনি বললেন: না, তোমাদের পঞ্চাশ জনের সমান তার সাওয়াব হবে।” ⁵⁷
জবাব: এ হাদীসে নির্দিষ্ট একটি ব্যাপারে মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, সাধারণ মর্যাদার কথা বলা হয় নি। আর তা হলো, সে সময়ে ধৈর্য ধারণ করলে পঞ্চাশ জন সাহাবীগণের ধৈর্য ধারণের প্রতিদান পাবে। তাহলে এখানে একটি নির্দিষ্ট আমলের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, সব কাজের মর্যাদা নয়। ইবন হাজার রহ. বলেছেন, উপরোক্ত হাদীস “তোমাদের পঞ্চাশ জনের আমলের সমান তার সাওয়াব হবে।” এর ব্যাখ্যায় বলা যায়, হাদীসটি সাহাবী নয় এমন লোকদেরকে সাহাবীগণের উপর মর্যাদা দেওয়া বুঝায় না। কেননা শুধু প্রতিদান বেশি হওয়া সাধারণভাবে অধিক মর্যাদাবান হওয়া প্রমাণ করে না। তাছাড়া যে আমলের ব্যাপারে তুলনা করে প্রতিদানের কথা বলা হয় সেটি শুধু সে আমলের সদৃশ প্রতিদানই পাওয়া যায়। অন্যদিকে সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দর্শন লাভে যে অতিরিক্ত মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন তাতে কেউ তাদের সমকক্ষ হবেন না। ⁵⁸
টিকাঃ
39 মানযুমাতু ইবন আবু দাউদ ‘আল-হায়িয়্যাহ’ মা‘আ শারহিহা ‘আত-তুহফাতুস সানিয়্যাহ’ পৃষ্ঠা ৯।
40 এ ব্যাপারটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের কাছে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত মতামত। দেখুন, মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ৩/১৫২; আল-ইসতী‘আব, ৩/১১৬৭-১১৬৮।
41 কালীদাতু আবু মারওয়ান আব্দুল মালিক ইবন ইদরীস আল-জায়ায়ারী ফীল আদাবি ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৫৭, পংক্তি নং ১১৫-১১৬।
42 আল-হুজজাতু ফি বায়ানিল মুহাজ্জাতু এবং শরহু আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ, ২/৫৮০।
43 আল-হুজজাতু ফি বায়ানিল মুহাজ্জাতু এবং শরহু আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ, ২/৬৩৭।
44 আল-বাই‘ইসিল-হাসীস, পৃষ্ঠা ১৮০।
45 মুকাদামাতু ইবনিল সালাহ, ১/২৮৪-২৮৫।
46 আত-তাক্বরীব ওয়া আত-তাইসীর লিমারিফাতিন সুন্নাতিল বাশীরিন নাযীর, পৃষ্ঠা ১৩।
47 যেমন, সাফারিনী রহ. তার ‘লাওয়ামি‘উল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ’ ১/৩৭২-৩৭৩ তে উল্লেখ করেছেন।
⁴⁹ লাওয়ামি’উল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ, ২/৩১২।
⁵⁰ মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২/২৮১।
⁵¹ দেখুন, ফাতহুল বারী, ৭/৭১।
⁵² সহীহ বুখারী, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও তাদের সহচরদের (তাবেয়ী) মর্যাদা, যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করেছেন বা মুসলিমদের মধ্যে যারা তাঁকে দেখেছেন তারাই তাঁর সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত, ৩/৬, হাদীস নং ৩৬৫৪; সহীহ মুসলিম, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: সাহাবী ও যারা তাদের পরবর্তীকালে ও যারা তাদের পরবর্তীতে আসবেন তাদের মর্যাদা, ৪/১৯৬৩, হাদীস নং ২৫৩৩। হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত।
⁵³ দেখুন, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৯/২০১।
⁵⁴ সহীহ বুখারী, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও তাদের সহচরদের (তাবেয়ী) মর্যাদা, যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করেছেন বা মুসলিমদের মধ্যে যারা তাঁকে দেখেছেন তারাই তাঁর সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত, ৩/৬, হাদীস নং ৩৬৫৪; সহীহ মুসলিম, কিতাব: সাহাবীদের মর্যাদা, বাব: সাহাবী ও যারা তাদের পরবর্তীতে ও যারা তাদের পরবর্তীতে আসবেন তাদের মর্যাদা, ৪/১৯৬৩, হাদীস নং ২৫৩৩।
⁵⁵ দেনুন, খাল্লাল, আস-সুন্নাহ ২/৪০৫।
⁵⁶ শরহু উসূলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালকা'য়ী, ১/১১০।
⁵⁷ তিরমিযী, কিতাব: তাফসীরুল কুরআন, বাব: সূরা আল-মায়েদ, ৫/২৫৭, হাদীস নং ৩০৮৬, তিনি হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন। আবু দাউদ, কিতাব: আল-মাল্লাহিম, বাব: আল-আমর ওয়ান নাহী, ৪/৪৬২, হাদীস নং ৪৩৪৩; ইবন মাজাহ, পৃষ্ঠা ১০৩১, হাদীস নং ৪০১৪; আলবানী রহ. হাদীসটি তার সিলসিলা আস- সহীহাতে ১/৬৯২-৬৯৩, হাদীস নং ৪৬৪, এটিকে সহীহ বলেছেন। জ্ঞাতব্য, এ হাদীসটির পুরো অংশকে আলবানী রহ. সহীহ বলেন নি; বরং তিনি বলেছেন, হাদীসটি দা'ঈফ, তবে এর কিছু অংশ সহীহ। দেখুন মিশকাত, হাদীস নং ৫১৪৪; সহীহ আবু দাউদ, সংক্ষিপ্ত সনদে, হাদীস নং ১৪৪৪-২০৭৬; সিলসিলা আস-সাহীহা, হাদীস নং ৫৯৪; দ’ঈফুল জামে’ আস-সাগীর, হাদীস নং ২০৪৪।— অনুবাদক।
⁵⁸ ফাতহুল বারী, ৭/৭১
📄 চতুর্থ অধিকার: ভালো ও কল্যাণের সাথে তাদের নাম স্মরণ করা, তাদের প্রশংসা করা ও তাদের সুন্দর আখলাক প্রচার-প্রসার করা অত্যাবশ্যক
কবি বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো, তাদের সবার সুন্দর ব্যাপার গুণগুলো প্রচার করো ও প্রসার করো। ⁵⁹ নিঃসন্দেহে তাদেরকে ভালোবাসাই তাদের সুন্দর আখলাকসমূহ প্রচার করা। যার অন্তর তাদের ভালোবাসায় সিক্ত ও ভরপুর, সে তাদের প্রশংসা ও সুনাম প্রচারে নিবেদিত ও অটল থাকবে। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত সকলেই একমত এবং তাদের কিতাবসমূহে এ ব্যাপারে তাদের আক্বীদা লিপিবন্ধ করেছেন। যেমন, ইমাম মুযানী রহ. বলেছেন, ‘তাদের মর্যাদার কথা প্রচার করা হবে এবং তাদেরকে সুন্দর কাজসমূহের মাধ্যমে স্মরণ করা হবে (প্রচার করা হবে)'।⁶⁰
ইবন আবি ইয়ামীমান রহ. বলেছেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মত হচ্ছে, সকলে যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসায় বিশ্বাস করে এবং তাদের সুন্দর কাজসমূহ ও তাদের মর্যাদার প্রচার-প্রসার করে।'⁶¹
ইবন আবি দাউদ বলেছেন, ‘সকল সাহাবীর ব্যাপারে উত্তম কথা বলো; তাদের ব্যাপারে কোনো অপবাদ দিও না, যা তাদেরকে দোষযুক্ত ও নিন্দিত করে।'⁶²
টিকাঃ
⁵⁹ কালীদাআবু মারওয়ান আব্দুল মালিক ইবন ইদ্রীস আল- জায়ায়েরী ফিল আদাবি ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৫৭, পংক্তি ১১৬।
⁶⁰ শরহুস সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৮৭।
⁶¹ উসূলুস সুন্নাহ, ইবন আবু ইয়ামীম, পৃষ্ঠা ২৮৩।
⁶² মানুসুমা’তু ইবন আবু দাউদ ‘আল-হাফিজ্বইয়াহ’ মা’আ শরাহিহা ‘আত-তুহফাতুস সানিয়্যাহ’ পৃষ্ঠা ১০, লেখক, আব্দুর রাযযাক আল-বদর।