📄 ভূমিকা
بسم الله الرحمن الرحيم
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, আর সালাত ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি, যাঁর পর কোনো নবী নেই এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথীদের সকলের প্রতি।
অতঃপর.....
আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সৃষ্টিকুলের জন্য উপহারস্বরূপ প্রদত্ত রহমত এবং উপকারী নি‘আমত। তাঁর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন এবং আমাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন, আর আমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যের দরজাসমূহ খুলে দিয়েছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বে আমরা কারা বা কী পরিচয় ছিল আমাদের? তাঁর দীন ও শরী‘আত ব্যতীত কী মূল্যই বা ছিল আমাদের? আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِٱلْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ١٢٨﴾ [التوبة: ١٢٨] “অবশ্যই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হইতেই একজন রাসূল এসেছেন, তোমাদের যে দুঃখ-কষ্ট থাকে তা তার জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি করুণাশীল ও অতি দয়ালু।” [সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৮]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: ﴿لَقَدْ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُواْ عَلَيْهِمْ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلْكِتَٰبَ وَٱلْحِكْمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَٰلٍ مُّبِينٍ ١٦٤﴾ [آل عمران: ١٦٤] ‘‘আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের কাছে রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাঁর আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন, যদিও তারা আগে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল।” [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪]
সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত বড় মহান অনুগ্রহ! আর তাঁর আগমন ও রিসালাত কত বড় শ্রেষ্ঠ উপহার!
নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক অধিকার রয়েছে তাঁর উম্মতের ওপর। ইসলামের অনুসারী মুসলিমগণের দায়িত্ব হলো সে অধিকারগুলো আদায় ও সংরক্ষণ করা, আর সে অধিকারগুলো নষ্ট করা বা সেগুলোকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করা থেকে সতর্ক ও সাবধান হওয়া। আর এসব অধিকারের অন্যতম কিছু অধিকার নিম্নরূপ:
📄 প্রথমত: নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনয়ন
উম্মতের ওপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকারগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম ও প্রধান অধিকার হলো তাঁর ওপর ঈমান আনয়ন করা এবং তাঁর রিসালাতকে সত্য বলে মেনে নেওয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি সর্বশেষ নবী হিসেবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনতে পারে না, সে ব্যক্তি কাফির, যদিও সে তাঁর পূর্বে আগত সকল নবী ও রাসূলদের ওপর ঈমান আনয়ন করে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করা মানে আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। আর তিনি যে কিতাব নাযিল করেছেন এবং যে রাসূল প্রেরণ করেছেন, তা অস্বীকার করা।
আর আল-কুরআন পরিপূর্ণ হয়ে আছে এমন কতগুলো আয়াত দ্বারা, যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনয়ন করা, তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য করার জন্য নির্দেশ করে, আরও নির্দেশ করে তাঁর পথ ও নিয়মীতিগুলো থেকে বিচ্যুতির ব্যাপারে সতর্ক ও সাবধান থাকার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿فََٰامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلنُّورِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلْنَاْ ۚ﴾ [التغابن: ٨] “অতএব, তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও যে নূর আমরা নাযিল করেছি তাতে ঈমান আন।” [সুরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ৮]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: ﴿إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُواْ﴾ [الحجرات: ١٥] “তারাই তো মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনেছে, তারপর সন্দেহ পোষণ করে নি।” [সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৫]
আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনয়নের বিষয়টিকে আল্লাহ তা‘আলা শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার কারণ বলে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং তিনি বলেন: ﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ ﴿﴾ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ .....﴾ [الصف: ١٠-١١] “হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনবে .....।” [সূরা আস-সাফ, আয়াত: ১০-১১]
আর আল্লাহ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবিশ্বাস এবং তাঁদের বিরোধিতা করার বিষয়টি ধ্বংস ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির কারণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ شَآقُّواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥۚ وَمَن يُشَآقِّ ٱللَّهَ فَإِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ﴾ [الانفال: ١٣] “এটি এ জন্যে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করেছে। আর কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করলে আল্লাহ তো শান্তি দানে কঠোর।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১৩]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: ﴿ ٱسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ أَوۡ لَا تَسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ إِن تَسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ سَبۡعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغۡفِرَ ٱللَّهُ لَهُمۡۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ كَفَرُواْۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَٰسِقِينَ ﴾ [التوبة: ٨٠] “আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করুন একই কথা। আপনি সত্তর বার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না। এটি এ জন্যে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফুরী করেছে। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৮০]
আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিয়েছেন যে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই জাহান্নামের অধিবাসী হবে, যে ব্যক্তি তাঁর আগমনের কথা শুনেছে, অথবা তাঁর রিসালাতের ওপর ঈমান আনে নি। (আ'উযুবিল্লাহ)। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ﴿ وَٱلَّذِي نَفۡسُ مُحَمَّدِۢ بِيَدِهِۦ، لَا يَسۡمَعُ بِيٓ أَحَدٞ مِّنۡ هَٰذِهِ ٱلۡأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلَا نَصۡرَانِيٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمۡ يُؤۡمِنۢ بِٱلَّذِيٓ أُرۡسِلۡتُ بِهِۦٓ إِلَّا كَانَ مِنۡ أَصۡحَٰبِ ٱلنَّارِ ﴾ “যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন তাঁর নামে শপথ করে বলছি! এ উম্মতের (জাতির) যে কেউ আমার ব্যাপারে শুনল চায় সে ইয়াহূদী ইউক, খ্রিস্টান হউক। অতঃপর যে রিসালাত দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে তার ওপর ঈমান না এনেই সে মারা গেল, সে ব্যক্তি জাহান্নামের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”¹
আর এটি এ জন্য যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের বিষয়টি সকল মানুষের জন্য আবশ্যকীয়ভাবে প্রযোজ্য। কোনো সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নয়। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ﴾ [الانبياء: ١٠٧] “আর আমরা তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: ﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ﴾ [سبا: ٢٨] “আর আমরা তো আপনাকে সমগ্র মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীস্বরূপ প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২৮]
টিকাঃ
১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪০৫
📄 দ্বিতীয়ত: নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা
নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ করা তাঁর ওপর ঈমান আনয়নের বাস্তব প্রমাণ। সুতরাং যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও তাঁকে মহব্বত করার (ভালোবাসার) দাবি করল, অতঃপর সে তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করল না এবং নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা থেকে নিষেধ করেছেন এমন হারাম থেকে বিরত থাকল না, আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সুন্নাতের অনুসরণ করল না, সে ব্যক্তি তো তাঁর ঈমান আনয়নের দাবিতে মিথ্যাবাদী। কারণ, ঈমান হলো এমন এক বিষয়, যা অন্তরের মধ্যে স্থিরভাবে অবস্থান করে এবং আমল তাকে সত্য ও বাস্তবে পরিণত করে।
আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণকারী ও অনুগত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ তাঁর (আল্লাহর) রহমত লাভ করতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿ وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖۚ فَسَأَكۡتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلَّذِينَ هُم بِـَٔايَٰتِنَا يُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلۡأُمِّيَّ ﴾ [الاعراف: ١٥٧] “আর আমার দয়া তো প্রত্যেক বস্তুকে ঘিরে রয়েছে। কাজেই আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় ও আমাদের আয়াতসমূহে ঈমান আনে, যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী (নিরক্ষর) নবীর।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬-১৫৭]
আর আল্লাহ তা'আলা ঈমান আনয়ন ও আনুগত্য করা –এ দুটি বিষয়কে একত্রিত করে দিয়েছেন এবং সফলতার অন্যতম উপায় বানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তিনি বলেন: ﴿ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلۡأُمِّيَّ ٱلَّذِي يَجِدُونَهُۥ مَكۡتُوبًا عِندَهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَٱلۡإِنجِيلِ يَأۡمُرُهُم بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَىٰهُمۡ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنۡهُمۡ إِصۡرَهُمۡ وَٱلۡأَغۡلَٰلَ ٱلَّتِي كَانَتۡ عَلَيۡهِمۡۚ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُواْ ٱلنُّورَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ﴾ [الاعراف: ١٥٧] “যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইনজীলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদেরক সকল কাজের আদেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন। আর তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃঙ্খল হতে মুক্ত করেন যা তাদের ওপর ছিল। কাজেই যারা তাঁর ওপর ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে এবং যে নূর তার সাথে নাযিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৭]
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাঁর নির্দেশের বিরোধিতা করে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। সুতরাং তিনি বলেন: ﴿ فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴾ [النور: ٦٣] “কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের ওপর আপতিত হতে হবে অথবা তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬৩]
আর আল্লাহ তা'আলা ঝগড়া-বিবাদ ও মতানৈক্যের সময় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা মূলত আল্লাহরই ফয়সালা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের খেয়াল খুশি মত কোনো কথা বলতেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ ﴾ [النساء: ٥٩] “অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থিাত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান এনে থাক।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৯]
আর তাঁর বিচারের প্রতি মনের ঘৃণা নিয়ে তাঁর নিকট বিচারের আবেদন করলেও যথেষ্ট হবে না; বরং তাঁর বিচারের প্রতি মনের উদারতা প্রদর্শন করতে হবে এবং তাঁর নির্দেশকে এমনভাবে মেনে নেওয়া, যেখানে কোনো প্রকার আপত্তি থাকবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ﴾ [النساء: ٦٥] “কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদের বিচার ভার আপনার ওপর অর্পণ না করে। অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৫]
ইমাম ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন: “আল্লাহ তা'আলা শপথ করার শ্রেষ্ঠ বিষয় দ্বারা এখানে শপথ করেছেন, আর তা হলো তিনি স্বয়ং নিজেই নিজের নামে শপথ করেছেন, আর শপথের প্রাসঙ্গিক বিষয়টি হলো তাদের জন্য ঈমান সাব্যস্ত হবে না এবং তারা ঈমানদার বলেও গণ্য হবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়ে/দ্বীনের সার্বিক বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করবে। শুধু এটাই নয়, (বরং তারা মুমিন হতে পারবে না) যতক্ষণ না এর সাথে সংযুক্ত হবে তাঁর বিচার-মীমাংসার প্রতি তাদের উদর মন-মানসিকতা, যেখানে তারা তাদের মনে তাঁর বিচার-ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের প্রশ্নে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা অনুভব করবে না; বরং তাঁর বিচার-মীমাংসাকে উদার চিত্তে গ্রহণ করে নিবে এবং তাকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে স্বাগত জানাবে।” অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ করার বিষয়টি সাথে অবশ্যই সংযুক্ত থাকতে হবে তাঁর (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের) প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মহব্বত; আর এটা হলো উম্মতের উপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকারসমূহ থেকে তৃতীয় অধিকার।
📄 চতুর্থত: মুস্তফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করা
আর এটা জীবিত ও মৃত অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকারসমূহের মধ্যে একটি অত্যন্ত জোরালো অধিকার; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তাঁর সাহাবীগণ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সর্বোত্তম পন্থায় বাস্তবায়ন করেছেন। এই তো সাহাবী কাতাদা ইবনু নুমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি ধনুর্গ হাদিয়া দেওয়া হলো; ওহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ধনুর্গটি আমার নিকট হস্তান্তর করলেন। তারপর আমি তাঁর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগে তীর নিক্ষেপ করলাম, এমনকি শেষ পর্যন্ত তাঁর দুটি পাশের বাঁকা অংশও গুঁড়া হয়ে গেল, আর আমি সার্বিকভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আমার চেহারার দ্বারা তীর প্রতিহত করতে থাকলাম। যখনই কোনো তীর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারকের দিকে ধেয়ে আসত, তখনই আমি আমার মাথাকে ঝুঁকিয়ে দিতাম, যাতে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারককে রক্ষা করতে পারি!!
আর এ তো সাহাবী ও সবাকবি হাসসান ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর কথা বলছি, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার কাজে ব্যস্ত থাকতেন, এমনকি তিনি এ জন্য নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে সুন্দর সুন্দর প্রশংসা অর্জন করেছেন। কেননা, তিনি বলেন:
أَهْجُهُمْ أَوْ هَاجُوهُمْ وَجِبْرِيلُ مَعَكَ “তুমি তাদের (কাফিরদের) নিন্দা কর, আর জিবরীল আলাইহিস সালাম তোমার সাথে আছেন।”¹
নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে মুশরিকদের বিপক্ষে তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য উৎসাহিত করেছেন, তিনি বলেন:
مَنْ يَرُدُّهُمْ عَنِّي وَلَهُ الْجَنَّةُ أَوْ هُوَ رَفِيقِي فِي الْجَنَّةِ “যে আমাদের থেকে তাদেরকে প্রতিরোধ করবে, তার জন্য জান্নাত রয়েছে, অথবা সে জান্নাতে আমার সাথী হবে।”²
আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর প্রতিরোধ বিষয়টি হবে তাঁর সুন্নাতের ক্ষেত্রে, যখন তা অপবাদ প্রদানকারীদের অপবাদ, জাহিলদের বিকৃতি ও বাতিলদলের জালিয়াতিকার শিকার হয়। অনুরূপভাবে তাঁর মহান ব্যক্তিত্বকে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করা, যখন কেউ তাঁকে মন্দ বলে আক্রমণ করে, অথবা এমন বিশেষণ দ্বারা তাঁকে বিশেষিত করে, যা তাঁর শান ও মর্যাদার সাথে একেবারেই বেমানান। আর এ যুগে দুর্নাম বা কুৎসা রটানোর মত আক্রমণের হার অনেক পরিমাণে বেড়ে গেছে, যার দ্বারা তারা ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অপবাদ আরোপ করে যাচ্ছে; আর এ অবস্থায় গোটা উম্মতের আবশ্যকীয় দায়িত্ব হলো তাদের নবীকে প্রতিরোধের জন্য যথাসম্ভব শক্তি ও বল প্রয়োগের সকল উপায় অবলম্বন করা, যাতে ঐসব দুষ্ট লোকগুলো এ জাতীয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত বর্বর আক্রমণ থেকে বিরত থাকে, যার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো মানুষকে ইসলাম ও মুসলিমগণকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া।
টিকাঃ
১ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৫৪৬, ৩৫৪৭ ও ৩৮০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৮২
২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৮২