📄 উলুমুল হাদীস পড়ার মূল লক্ষ্য
দ্বীন হলো কুরআন, হাদীস এবং ফাহমুস সালাফ তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে' তাবেয়ীনের কুরআন-হাদীসের বুঝের সমষ্টি। কুরআন আমাদের কাছে এত মজবুত সূত্রে পৌঁছেছে যে, এতে কোনো সন্দেহ নেই, এই কুরআন সেই কুরআন যা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু হাদীস ও আসারুস সালাফের যে ভাণ্ডার আমাদের কাছে পৌঁছেছে, তা এতটা মজবুত সূত্রে পৌঁছেনি। ফলে যাচাই করতে হয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনের থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তা আদৌও তাদের থেকে প্রমাণিত কি না? উলূমুল হাদীস শিখতে হয় মূলত এই যাচাই পদ্ধতি শেখার জন্য।
📄 উলুমুল হাদীসে কেন ইখতিসাস করতে হবে
যাচাইয়ের কাজ তো পূর্বের মুহাদ্দিসীনে কেরাম করেই দিয়েছেন। তবে তারা যাচাই করে যা ফলাফল পেশ করেছেন তা জানতেই উলূমুল হাদীস পড়তে হয়। যাচাইয়ের কাজে তারা অনেক পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, যা না বুঝলে আমরা তাদের যাচাইকার্য থেকে যথাযথ উপকৃত হতে পারব না। এই পরিভাষাগুলো জানতে আমাদের উলূমুল হাদীস পড়তে হবে। তাছাড়া যাচাইয়ের কাজে তাদের মাঝে বিভিন্ন সময় মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে কোন মতটা অধিক শক্তিশালী তা বুঝতে তাদের যাচাই-নীতি জানতে হবে। অনেক রেওয়ায়াতের ব্যাপারে প্রমাণিত কি অপ্রমাণিত এই ব্যাপারে তাদের কোনো মন্তব্য নাও পেতে পারি। তখন তাদের যাচাই নীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মোটকথা তাদের যাচাই নীতি জানতে হবে। এই যাচাই নীতি জানার জন্যেও আমাকে উলূমুল হাদীস পড়তে হবে।
📄 উলুমুল হাদীসে ইখতিসাস করার বিশটি ফায়দা
১. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফের কথা বার বার পড়ার কারণে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও মুহাব্বত তৈরি হবে।
২. বেশি বেশি দুরূদ পড়ার সৌভাগ্য হবে।
৩. সুন্নাতের প্রতি মুহাব্বত ও বিদআতরে প্রতি ঘৃণা জন্মাবে।
৪. ব্যক্তি-জীবনে সতর্কতা অর্জন হবে। মানুষ চেনা ও যাচাই করার যোগ্যতা তৈরি হবে।
৫. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সালাফ থেকে প্রমাণিত কুরআনের তাফসীর জানতে পারবে।
৬. ফিকহে ইসলামীর প্রতি আস্থা অর্জন হবে। মুজতাহিদ ইমামগণের মূল্য বুঝে আসবে।
৭. শায ও বিচ্ছিন্ন মতামতের উপর কঠোরতা তৈরি হবে। ইজতেহাদী মাসআলায় ভিন্ন মতাবলম্বীদের ব্যাপারে নমনীয়তা জন্ম নিবে।
৮. সালাফ ও প্রতি যুগের আকাবিরের বিরাট একটা অংশের ইলমী, আমলী ও ফিকরী যিন্দেগীর অবগতি লাভের সুযোগ হবে।
৯. ব্যক্তি ও কর্মের যথাযথ মূল্যায়নের রুচি তৈরি হবে।
১০. সালাফ থেকে প্রমাণিত আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে জানা যাবে।
১১. ইতিহাস যাচাইয়ে অভিজ্ঞ হয়ে উঠব।
১২. ইলমুল ইলাল হলো উলূমুল হাদীসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ইলমের পারর্দশিতা অন্যান্য শাস্ত্রের ভুল ও বিকৃতির প্রবেশের দ্বার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে সহযোগিতা করবে।
১৩. ইলমুল লোগাহ, ইলমুন নাহু ওয়াস সরফ, ও ইলমুল বালাগার মূল ভিত্তি হলো হাদীস এবং বিশুদ্ধ আরবদের গদ্য ও পদ্য। এগুলো যাচাই করতেও উলূমুল হাদীস সহযোগিতা করবে।
১৪. তাহকীকুত তুরাস একটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। পান্ডুলিপির যথার্থতা যাচাই করা হয় ইলমু তাহকীকিত তুরাস ও ইলমু তাহকীকিন নুসূস এর মাধ্যমে। এই শাস্ত্রটির মৌলিক সম্পর্ক উলূমুল হাদীসের সাথে।
১৫. উলূমুল হাদীসের পারদর্শিতা দ্বীনের বিকৃতি সাধনকারীদের খণ্ডন করা ও তাদের বিকৃতি প্রতিহত করার পথ সহজ করে দেয়।
১৬. উলূমুল হাদীসের তালিবে ইলম প্রায় দেখে, কখনো অনেক বড় ব্যক্তিদেরও কোনো মন্তব্য বা কিছু বর্ণনা করতে গিয়ে ভুল হয় যায়। এই বিষয়টা তার মধ্যে সাবধানতা তৈরি করবে।
১৭. অন্য শাস্ত্রের দক্ষ ব্যক্তি হাদীসের সাথে যথাযথ সম্পর্ক না রাখায় যখন হাদীস বিষয়ে কথা বলে তখন তারও মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়। এই শিক্ষা হয়ে যায় যে, যেই শাস্ত্রে পারদর্শিতা নেই, সেই শাস্ত্রে কথা না বলা উচিত।
১৮. ফযলু ইলমিস সালাফ আলা ইলমিল খালাফ তথা উত্তরসূরীদের উপর পূর্বসুরীদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব ও অবদান—এই বিষয়টি অনুধাবন করা তালিবে ইলমের জন্য অনেক জরুরী।
১৯. শায়খ থেকে রেওয়ায়াত করতে গিয়ে যখন দুই ছাত্রের মাঝে ইখতেলাফ হয়, তখন যে ছাত্র উক্ত শায়খের সোহবত তুলনামূলক বেশি লাভ করেছে তার রেওয়ায়াত সাধারণত প্রাধান্য পায়। এই বিষয়টি তালিবে ইলমের কাছে উস্তাদের সান্নিধ্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।
২০. হাদীসের তালিবে ইলম যখন দেখে, উলূমুল হাদীসের বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে তখন তার কাছে সামগ্রিক ইলমের বিস্তৃতিও প্রকাশ পেতে থাকে। তার অর্জিত ইলমের নগণ্যতা ফুটে উঠতে থাকে।
📄 যে পথের শেষ নেই
বর্তমান সময়ের উলূমুল হাদীস বিষয়ের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং শত কিতাবের লেখক শায়খ মুহাম্মদ আব্দুল কাদির বিন আওয়াদার কাছ থেকে নাযেম সাহেব বরাবর একটি চিঠি এসেছে। তাতে লেখা হয়েছে,
"...আপনার বরকতময় বিভিন্ন কর্ম-তৎপরতার সংবাদ আমাকে আনন্দ দেয়। সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছি এটা জেনে যে, আপনি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত সকল রেওয়ায়াতের তাহকীকের কাজ শুরু করেছেন। যেখানে আপনি প্রথমে ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে প্রমাণিত রেওয়ায়াতগুলো চিহ্নিত করবেন। তারপর কোন রেওয়ায়াতগুলোতে ইমাম আবু হানিফা রহ. তাফাররুদ করেছেন, কোনগুলোতে তার মুতাবাআত আছে আর কোনগুলোতে তার মুখালাফাত আছে তা নির্ধারণ করবেন।
তবে আপনার কাছে আমার আবদার থাকবে, আপনি আপনার পিছনের কাজগুলোও সমাপ্ত করবেন। বিশেষ করে 'লিসানুল মিযান'-এর যে তাকমীল, তাযয়ীল ও তাকরীব তৈরি করছিলেন সেটা যদি পূর্ণ হয় তাহলে আহলে ইলমের শোকর ও দোয়ায় আপনি হাবুডুবু খেতে থাকবেন।
এবার এই দুর্বল বান্দার আরজিটা শুনুন! আপনি জানেন, আমি এখন জীবনের শেষ সময়গুলো অতিক্রম করছি। বার্ধক্য আমাকে এতটাই পরাস্ত করেছে যে, প্রায় সবকিছুতে পরনির্ভর হয়ে পড়েছি। তাক থেকে ছোট একটি কিতাব নামাতেও অনেক সময় অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তাই আপনার কাছে যদি কোনো সৎ, সভ্য, মেধাবী, উদ্যমী, চৌকষ ও পরিশ্রমী কোনো তালিবে ইলম থাকে তাহলে মুনাসিব মনে করলে তাকে আমার কাছে পাঠাতে পারেন, যে আমার কাজে সহযোগিতা করবে এবং আমি তার ইলমের পথ নির্দেশনার দায়িত্ব আঞ্জাম দিব...”
নাযেম সাহেব চিঠিটি পড়ে রশীদকে ডাকলেন। এয়ারপোর্টে রশীদকে বিদায় জানাতে এসেছেন রশীদের বাবা, মামা, মোহতামিম সাহেব ও নাযেম সাহেব। রশীদ আজ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। নাযেম সাহেব তার হাতে একটি কাগজ গুঁজে দিয়ে বললেন, বিমানে উঠার পর পড়বে।
বিমান যখন উড়া শুরু করল, তখন রশীদ নাযেম সাহেবের কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরল। তাতে লেখা ছিল:
“জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছ। এই যাত্রার শুরু আছে, শেষ নেই। তুমি যদি দশ মাইল হাঁটার ইচ্ছা করো তাহলে আট মাইল হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আর যদি আট মাইল হাঁটার ইচ্ছে করো তাহলে ছয় মাইল হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তাই ইচ্ছেটা বড় করো। তুমি তোমার মেহনতের সমান বড়। টুকরো টুকরো বর্তমান জোড়া দিয়েই ভবিষ্যৎ নির্মাণ হয়।
কত সৌভাগ্য যে, তুমি শায়খের মত ব্যক্তির সোহবত পেতে যাচ্ছ। সোহবত ছাড়া দুনিয়াবি কোনো বিষয়ে সফল হওয়া গেলেও দ্বীনী কোনো বিষয়ে সোহবত ছাড়া সফল হওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা দ্বীনী সকল বিষয়ের সফলতা গচ্ছিত রেখেছেন সোহবতের কোঁড়ে। সর্বশেষে বলবো, নিজেকে রবের কাছে উজাড় করে দিও। মন খুলে তার কাছে চেয়ে নিও। নিজেকে তার একনিষ্ঠ গোলাম বানাতে চেষ্টা করো। অপরাধ হয়ে গেলে তার কাছে ধরা দিও। ক্ষমা চেয়ে নিও। তিনি বড় দয়ালু। তিনিই একমাত্র আশ্রয়দাতা।”