📄 হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলন
হাদীস অস্বীকারকারীরা দাবি করে যে হাদীস নবীজীর মৃত্যুর ২০০ বছর পর লেখা হয়েছে, তাই তা সংরক্ষিত নয়। এটি একটি ভুল ধারণা। নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় ও সাহাবাদের যুগেই অধিকাংশ হাদীস লেখা হয়ে গিয়েছিল। তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীনদের যুগে হাদীস সংকলন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। যেমন:
- নুসখায়ে হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ
- কিতাবুল আসার (আবু হানিফা)
- মুওয়াত্তা (ইমাম মালেক)
- জামে মা'মার বিন রাশেদ
- মুসনাদে ইবনুল মুবারক
বুখারী-মুসলিমের যুগ হলো হাদীস সংকলন শেষ হওয়ার পরের যুগ, তাঁরা মূলত সংক্ষেপিত সংকলনে মনোযোগী হয়েছিলেন। এছাড়া হাদীস কেবল লেখার মাধ্যমে নয়, বরং আমল এবং মুখস্থ রাখার মাধ্যমেও সংরক্ষিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদীস অনুসরণ করাকে আবশ্যক করেছেন। যেমন এক হাদীসে তিনি বলেছেন: "জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু (হাদীস) দেয়া হয়েছে।" অন্য হাদীসে বলা হয়েছে: "যে আমার অনুসরণ করল সে যেন আল্লাহ তাআলারই অনুসরণ করল।" সাহাবীদের প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল: "তোমরা আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নাত অনুসরণ করবে।"
📄 কীভাবে এত হাদীস মুখস্থ রাখলেন
সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফগণ বিপুল পরিমাণ হাদীস কীভাবে মুখস্থ রাখলেন তার কয়েকটি কারণ হলো:
১. তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে কুরআন ও হাদীসই তাদের নাজাতের একমাত্র উপায়। যে বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা মুখস্থ রাখা সহজ হয়।
২. তৎকালীন আরবদের মুখস্থ শক্তি ছিল স্বভাবজাতভাবেই অনেক প্রখর। তারা দীর্ঘ কবিতা একবার শুনেই মুখস্থ করে ফেলতে পারত।
৩. হাদীসের একটি বড় অংশ ছিল নবীজীর কর্ম বা আমল সংক্রান্ত, যা মুখস্থ রাখা বা মনে রাখা সহজ ছিল।
৪. হাদীসের বিশাল ভাণ্ডার কোনো একজনের মুখস্থের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি, বরং তা সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংরক্ষিত হয়েছে। কেউ বেশি, কেউ কম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
📄 অন্যের কথা কখনো নবীজির কথা বলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তা চিহ্নিত হয়েছেই
হাদীস জাল হয়েছে ঠিক, কিন্তু কোনটা প্রমাণিত আর কোনটা জাল তা মুহাদ্দিসগণ নিখুঁতভাবে নির্ণয় করে দিয়েছেন। হাজার হাজার কিতাব কেবল জাল হাদীস চিহ্নিত করার জন্য লেখা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণের নির্ধারিত নীতি অনুসারে কোনো কথাকে নবীজির কথা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া অসম্ভব।
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেছিলেন, প্রত্যেক যুগেই জাল হাদীস চিহ্নিত করার জন্য প্রাজ্ঞ হাদীস বিশারদগণ থাকবেন। [১] হারুনুর রশীদ যখন এক যিন্দিককে জাল হাদীস ছড়ানোর দায়ে পাকড়াও করেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে আবু ইসহাক ফাযারী আর ইবনুল মুবারক তার বানানো প্রতিটি হাদীস চিহ্নিত করে দিবেন। [২]
ইবনে মায়ীন রহ. [৩], ইবনে খুযাইমা রহ. [৪], দারাকুতনী রহ. [৫] এবং খতীবে বাগদাদী রহ. [৬] সম্পর্কে সমকালীনদের সাক্ষ্য ছিল যে, তাঁদের উপস্থিতিতে কেউ নবীজির নামে মিথ্যা বলে পার পাবে না। মুহাদ্দিসগণ সনদ মুত্তাসিল হওয়া, রাবী সত্যবাদী ও দক্ষ হওয়া এবং বর্ণনায় কোনো ভুল না থাকা—এই সূক্ষ্ম মাপকাঠিতে হাদীস যাচাই করেছেন।
টিকাঃ
[১] ইবন আদী, আল কামিল: ১/১০৩।
[২] তারীখে দিমাশক: ৭/১২৭।
[৩] ইবন হিব্বান, সিকাত: ৯/২৬৩
[৪] ইবনুল জাওযী, মাওযুআত: ১/৪৫ – ৪৬
[৫] ইবনুল জাওযী, মাওযুআত: ১/৪৫ – ৪৬
[৬] যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৮/২৮৬
📄 নবীজির হাদীস কি শুধু নবীর যুগের জন্য প্রযোজ্য
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আখেরী নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। তাই তাঁর সকল হাদীস কেয়ামত পর্যন্ত আমাদের জন্য আবশ্যক। হ্যাঁ, কিছু হাদীস আছে যা নবী যুগেই রহিত হয়ে গেছে, কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য বা বিশেষ অবস্থায় প্রযোজ্য ছিল। তবে এই বিভাজন করার অধিকার আমাদের নেই; বরং সাহাবা ও তাবেয়ীনগণ কোনটি চিরস্থায়ী আর কোনটি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য তা নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন।