📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 মুনকিরীনে হাদীসের কিছু সংশয় ও জবাব

📄 মুনকিরীনে হাদীসের কিছু সংশয় ও জবাব


মুনকিরীনে হাদীস বা হাদীস অস্বীকারকারীরা সাধারণত কুরআনের কিছু আয়াতের অপব্যাখ্যা করে দাবি করে যে হাদীসের প্রয়োজন নেই। তারা সূরা আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াত (ম্যা ফাররতনা ফিল কিতাবি মিন শাই) বা সূরা নাহলের ৮৯ নম্বর আয়াত পেশ করে বলে কুরআন পূর্ণাঙ্গ, তাই হাদীসের দরকার নেই।

প্রকৃতপক্ষে, কুরআনে সব কিছু বলে দেওয়ার অর্থ হলো দ্বীনের সব বিষয় বলে দেওয়া হয়েছে। কিছু বিষয় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আর কিছু বিষয় হাদীস, ইজমা ও কিয়াস অনুসরণ করার নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে বলা হয়েছে। কুরআন নিজেই হাদীস অনুসরণের কথা সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে।

কুরআনে 'হিকমত' শব্দের ব্যবহার থেকেও হাদীসের গুরুত্ব বোঝা যায়। যেমন সূরা বাকারা: ২৩০; সূরা আল ইমরান: ১৬৪; সূরা নিসা: ১০৫; সূরা আহযাব: ৩৪ আয়াতে কিতাব বা কুরআনের পাশাপাশি 'হিকমত' নাযিলের কথা বলা হয়েছে। এখানে হিকমত দ্বারা কুরআন বহির্ভূত নবীজির সুন্নাহ বা হাদীসকেই বোঝানো হয়েছে।

এছাড়া আল্লাহ তাআলা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআনের ব্যাখ্যা বা বয়ানের দায়িত্ব দিয়েছেন (সূরা নাহল: ৪৪, ৬৪)। নবীজীকে কোনো জিনিস হালাল বা হারাম করার অধিকার দেওয়া হয়েছে (সূরা আরাফ: ১৫৬-১৫৭)। নবীজীর জীবনকে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ বা 'উসওয়াতুন হাসানা' হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে (সূরা আহযাব: ২১)। কুরআন ও হাদীস উভয়টা মিলেই আমাদের জন্য দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়েছে।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলন

📄 হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলন


হাদীস অস্বীকারকারীরা দাবি করে যে হাদীস নবীজীর মৃত্যুর ২০০ বছর পর লেখা হয়েছে, তাই তা সংরক্ষিত নয়। এটি একটি ভুল ধারণা। নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় ও সাহাবাদের যুগেই অধিকাংশ হাদীস লেখা হয়ে গিয়েছিল। তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীনদের যুগে হাদীস সংকলন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। যেমন:
- নুসখায়ে হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ
- কিতাবুল আসার (আবু হানিফা)
- মুওয়াত্তা (ইমাম মালেক)
- জামে মা'মার বিন রাশেদ
- মুসনাদে ইবনুল মুবারক

বুখারী-মুসলিমের যুগ হলো হাদীস সংকলন শেষ হওয়ার পরের যুগ, তাঁরা মূলত সংক্ষেপিত সংকলনে মনোযোগী হয়েছিলেন। এছাড়া হাদীস কেবল লেখার মাধ্যমে নয়, বরং আমল এবং মুখস্থ রাখার মাধ্যমেও সংরক্ষিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদীস অনুসরণ করাকে আবশ্যক করেছেন। যেমন এক হাদীসে তিনি বলেছেন: "জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু (হাদীস) দেয়া হয়েছে।" অন্য হাদীসে বলা হয়েছে: "যে আমার অনুসরণ করল সে যেন আল্লাহ তাআলারই অনুসরণ করল।" সাহাবীদের প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল: "তোমরা আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নাত অনুসরণ করবে।"

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 কীভাবে এত হাদীস মুখস্থ রাখলেন

📄 কীভাবে এত হাদীস মুখস্থ রাখলেন


সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফগণ বিপুল পরিমাণ হাদীস কীভাবে মুখস্থ রাখলেন তার কয়েকটি কারণ হলো:

১. তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে কুরআন ও হাদীসই তাদের নাজাতের একমাত্র উপায়। যে বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা মুখস্থ রাখা সহজ হয়।
২. তৎকালীন আরবদের মুখস্থ শক্তি ছিল স্বভাবজাতভাবেই অনেক প্রখর। তারা দীর্ঘ কবিতা একবার শুনেই মুখস্থ করে ফেলতে পারত।
৩. হাদীসের একটি বড় অংশ ছিল নবীজীর কর্ম বা আমল সংক্রান্ত, যা মুখস্থ রাখা বা মনে রাখা সহজ ছিল।
৪. হাদীসের বিশাল ভাণ্ডার কোনো একজনের মুখস্থের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি, বরং তা সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংরক্ষিত হয়েছে। কেউ বেশি, কেউ কম হাদীস বর্ণনা করেছেন।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 অন্যের কথা কখনো নবীজির কথা বলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তা চিহ্নিত হয়েছেই

📄 অন্যের কথা কখনো নবীজির কথা বলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তা চিহ্নিত হয়েছেই


হাদীস জাল হয়েছে ঠিক, কিন্তু কোনটা প্রমাণিত আর কোনটা জাল তা মুহাদ্দিসগণ নিখুঁতভাবে নির্ণয় করে দিয়েছেন। হাজার হাজার কিতাব কেবল জাল হাদীস চিহ্নিত করার জন্য লেখা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণের নির্ধারিত নীতি অনুসারে কোনো কথাকে নবীজির কথা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া অসম্ভব।

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেছিলেন, প্রত্যেক যুগেই জাল হাদীস চিহ্নিত করার জন্য প্রাজ্ঞ হাদীস বিশারদগণ থাকবেন। [১] হারুনুর রশীদ যখন এক যিন্দিককে জাল হাদীস ছড়ানোর দায়ে পাকড়াও করেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে আবু ইসহাক ফাযারী আর ইবনুল মুবারক তার বানানো প্রতিটি হাদীস চিহ্নিত করে দিবেন। [২]

ইবনে মায়ীন রহ. [৩], ইবনে খুযাইমা রহ. [৪], দারাকুতনী রহ. [৫] এবং খতীবে বাগদাদী রহ. [৬] সম্পর্কে সমকালীনদের সাক্ষ্য ছিল যে, তাঁদের উপস্থিতিতে কেউ নবীজির নামে মিথ্যা বলে পার পাবে না। মুহাদ্দিসগণ সনদ মুত্তাসিল হওয়া, রাবী সত্যবাদী ও দক্ষ হওয়া এবং বর্ণনায় কোনো ভুল না থাকা—এই সূক্ষ্ম মাপকাঠিতে হাদীস যাচাই করেছেন।

টিকাঃ
[১] ইবন আদী, আল কামিল: ১/১০৩।
[২] তারীখে দিমাশক: ৭/১২৭।
[৩] ইবন হিব্বান, সিকাত: ৯/২৬৩
[৪] ইবনুল জাওযী, মাওযুআত: ১/৪৫ – ৪৬
[৫] ইবনুল জাওযী, মাওযুআত: ১/৪৫ – ৪৬
[৬] যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৮/২৮৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px