📄 কুরআনই হাদীস অনুসরণ করতে বলেছে
স্বয়ং কুরআনই বলেছে হাদীস মানতে। তাই হাদীস মানব। কুরআনে অনেক জায়গায় এ কথা বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটা আয়াত:
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ (সورة آل عمران: ٣٢)
অর্থ: আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। তারপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আল্লাহ কাফিরদেরকে পছন্দ করেন না।
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّসُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (سورة آل عمران: ١٣٢)
অর্থ: তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের প্রতি রহমতের আচরণ করা হয়।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا (সورة النساء: ٥٩)
অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, তাঁর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখতিয়ারধারী তাদেরও। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কোনও বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তবে তোমরা আল্লাহ ও পরকালে সত্যিকারের বিশ্বাসী হয়ে থাকলে সে বিষয়কে আল্লাহ ও রাসূলের উপর ন্যস্ত কর। এটাই উৎকৃষ্টতর এবং এর পরিণামও সর্বাপেক্ষা শুভ।
এছাড়াও কুরআনের আরও বহু আয়াতে (যেমন: সূরা মায়েদা: ৯২; সূরা আনফাল: ১, ২০, ৪৬; সূরা নূর: ৫৪; সূরা মুহাম্মদ: ৩৩; সূরা মুজাদালা: ১৩; সূরা তাগাবুন: ১৮) আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিছু আয়াতে আল্লাহ এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যারা অনুসরণ করে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন পুরস্কারের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে। যেমন:
- সূরা নিসা: ১৩, ৬৯
- সূরা তাওবা: ৭১
- সূরা নূর: ৫২, ৬১
- সূরা আহযাব: ৭১
- সূরা হুজুরাত: ১৪
- সূরা তাওবা: ১১৭
আবার কিছু আয়াতে আল্লাহ ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যারা অবাধ্য হয়, তাদের নিন্দা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন শাস্তির ধমকি দেওয়া হয়েছে। যেমন:
- সূরা নিসা: ১৪
- সূরা আনফাল: ১৩
- সূরা তাওবা: ৬৩
- সূরা আহযাব: ৩৬
- সূরা জিন: ২৩
📄 কুরআন ও হাদীস উভয়টা অনুসরণের মাধ্যমেই নবীজির অনুসরণ হবে
হাদীস হলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজ। ব্যক্তি অনুসরণের অর্থই হলো ব্যক্তির কথা ও কাজের অনুসরণ করা। সুতরাং হাদীস অনুসরণের অর্থ হলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করা। কুরআনে বলা হয়েছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করার দ্বারাই আল্লাহ তাআলার অনুসরণ হবে।
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (সورة آل عمران: ۳১)
অর্থ: (হে নবী! মানুষকে) বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন।
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْসَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا (সورة النساء : ٨٠)
অর্থ: যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।
কুরআনে যেখানেই আল্লাহকে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে সেখানেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। আবার কিছু আয়াত এমন আছে যেখানে শুধু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে (যেমন: সূরা আরাফ: ১৫৮; সূরা হাশর: ৭; সূরা নিসা: ১১৫; সূরা নূর: ৬৩)। যারা আল্লাহর অনুসরণ আর নবী রাসূলদের অনুসরণে পার্থক্য করে, তাদের শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে (সূরা নিসা: ১৫০)। সুতরাং কুরআনের অনুসরণের পাশাপাশি হাদীসের অনুসরণের মাধ্যমেই প্রকৃতপক্ষে নবীজির অনুসরণ সম্পন্ন হবে।
📄 মুনকিরীনে হাদীসের কিছু সংশয় ও জবাব
মুনকিরীনে হাদীস বা হাদীস অস্বীকারকারীরা সাধারণত কুরআনের কিছু আয়াতের অপব্যাখ্যা করে দাবি করে যে হাদীসের প্রয়োজন নেই। তারা সূরা আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াত (ম্যা ফাররতনা ফিল কিতাবি মিন শাই) বা সূরা নাহলের ৮৯ নম্বর আয়াত পেশ করে বলে কুরআন পূর্ণাঙ্গ, তাই হাদীসের দরকার নেই।
প্রকৃতপক্ষে, কুরআনে সব কিছু বলে দেওয়ার অর্থ হলো দ্বীনের সব বিষয় বলে দেওয়া হয়েছে। কিছু বিষয় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আর কিছু বিষয় হাদীস, ইজমা ও কিয়াস অনুসরণ করার নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে বলা হয়েছে। কুরআন নিজেই হাদীস অনুসরণের কথা সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে।
কুরআনে 'হিকমত' শব্দের ব্যবহার থেকেও হাদীসের গুরুত্ব বোঝা যায়। যেমন সূরা বাকারা: ২৩০; সূরা আল ইমরান: ১৬৪; সূরা নিসা: ১০৫; সূরা আহযাব: ৩৪ আয়াতে কিতাব বা কুরআনের পাশাপাশি 'হিকমত' নাযিলের কথা বলা হয়েছে। এখানে হিকমত দ্বারা কুরআন বহির্ভূত নবীজির সুন্নাহ বা হাদীসকেই বোঝানো হয়েছে।
এছাড়া আল্লাহ তাআলা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআনের ব্যাখ্যা বা বয়ানের দায়িত্ব দিয়েছেন (সূরা নাহল: ৪৪, ৬৪)। নবীজীকে কোনো জিনিস হালাল বা হারাম করার অধিকার দেওয়া হয়েছে (সূরা আরাফ: ১৫৬-১৫৭)। নবীজীর জীবনকে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ বা 'উসওয়াতুন হাসানা' হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে (সূরা আহযাব: ২১)। কুরআন ও হাদীস উভয়টা মিলেই আমাদের জন্য দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়েছে।
📄 হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলন
হাদীস অস্বীকারকারীরা দাবি করে যে হাদীস নবীজীর মৃত্যুর ২০০ বছর পর লেখা হয়েছে, তাই তা সংরক্ষিত নয়। এটি একটি ভুল ধারণা। নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় ও সাহাবাদের যুগেই অধিকাংশ হাদীস লেখা হয়ে গিয়েছিল। তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীনদের যুগে হাদীস সংকলন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। যেমন:
- নুসখায়ে হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ
- কিতাবুল আসার (আবু হানিফা)
- মুওয়াত্তা (ইমাম মালেক)
- জামে মা'মার বিন রাশেদ
- মুসনাদে ইবনুল মুবারক
বুখারী-মুসলিমের যুগ হলো হাদীস সংকলন শেষ হওয়ার পরের যুগ, তাঁরা মূলত সংক্ষেপিত সংকলনে মনোযোগী হয়েছিলেন। এছাড়া হাদীস কেবল লেখার মাধ্যমে নয়, বরং আমল এবং মুখস্থ রাখার মাধ্যমেও সংরক্ষিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদীস অনুসরণ করাকে আবশ্যক করেছেন। যেমন এক হাদীসে তিনি বলেছেন: "জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু (হাদীস) দেয়া হয়েছে।" অন্য হাদীসে বলা হয়েছে: "যে আমার অনুসরণ করল সে যেন আল্লাহ তাআলারই অনুসরণ করল।" সাহাবীদের প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল: "তোমরা আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নাত অনুসরণ করবে।"