📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 নির্ভরযোগ্য রাবীর মাঝে মাঝে ভুল হওয়া ও তার যাচাই পদ্ধতি

📄 নির্ভরযোগ্য রাবীর মাঝে মাঝে ভুল হওয়া ও তার যাচাই পদ্ধতি


কোনো খবর সত্য হওয়ার অর্থ হলো বাস্তবে যা ঘটেছে খবরটা তার অনুরূপ হওয়া। খবর বাস্তবতা থেকে ভিন্ন হয় খবরদাতার মিথ্যার কারণে বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে। তাই খবর বাস্তবতা অনুযায়ী হওয়ার জন্য খবরদাতা এমন হতে হবে যে, সে মিথ্যা বলবে না, অনিচ্ছাকৃত ভুলও করবে না। সেজন্য মুহাদ্দিসীনে কেরাম হাদীস প্রমাণিত হওয়ার ক্ষেত্রে রাবীর عادل (সত্যবাদী) হওয়া এবং ضابط (ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী) হওয়াকে আবশ্যক করেছে। সাথে রাবী সরাসরি বক্তব্যের শ্রোতা বা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী না হলে যার থেকে খবর বা ঘটনাটা শুনেছে তার নাম উল্লেখ করতে হবে। এভাবে শ্রোতা বা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পর্যন্ত পরম্পরায় পৌঁছতে হবে। একে মুহাদ্দিসীনে কেরাম اتصال السند বলেন। এই اتصال السند কে-ও শর্ত করা হয়েছে হাদীসের প্রত্যেক রাবীর عادل ও ضابط হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

আজকের নতুন আলোচনা হলো, আমরা সচরাচর দেখি, মেধাবী ও ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী ব্যক্তিরাও মাঝে মাঝে কিছু কথা ভুলে যায়। যেভাবে শুনেছে সেভাবে বলতে পারে না। কিছু গড়বড় হয়ে যায়। তাই রাবী ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়ায় শুধু এতটুকু নিশ্চিত হওয়া যায়, সে যেভাবে শুনেছে সেভাবে সাধারণত বর্ণনা করতে পারবে। কিন্তু তার কখনোই ভুল হবে না- এমনটা নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাই কোনো রেওয়ায়াতের সকল বর্ণনাকারী عادل ও ضابط এবং সনদ متصل হলে এতটুকু নিশ্চিত থাকা যায়, এই রেওয়ায়াতটা সাধারণত প্রমাণিত। কারো ভুল হওয়ার কথা না। কিন্তু ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী বা ضابط এর সাধারণত ভুল না হলেও তারও মাঝে মাঝে ভুল হয়। এই রেওয়ায়াতটা সেই মাঝে মাঝে ভুল করা রেওয়ায়াতের অন্তর্ভুক্ত কি না এ ব্যাপারে কীভাবে নিশ্চিত হব?

এই প্রশ্ন মুহাদ্দিসীনে কেরামের মাথায় ছিল। তাই তারা উক্ত তিন শর্তের সাথে আরো দুটি শর্ত যুক্ত করেছেন। ঐ দুই শর্ত পাওয়া গেলে বলা যায়, মাঝে মাঝে যে ভুলটা হয় তা এই রেওয়ায়াতে হয়নি। তখন রেওয়ায়াতটি প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যায়। ঐ দুই শর্ত হলো: انتفاء الشذوذ ও انتفاء العلة।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 তাখরীজুল হাদীস, ই’তিবার, তাফাররুদ, মুতাবাআ, মুখালাফা ও তবাকাতুস সনদ

📄 তাখরীজুল হাদীস, ই’তিবার, তাফাররুদ, মুতাবাআ, মুখালাফা ও তবাকাতুস সনদ


এক্ষেত্রে কয়েকটা কাজ করতে হবে:
১. রেওয়ায়াতের যত সনদ আছে সব একত্র করতে হবে। মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেছেন: إذا لم تجمع للحديث طرقه لم يتبين خطأه অর্থাৎ তুমি যদি হাদীসের সকল সনদ একত্র না কর তাহলে হাদীসের রাবীদের ভুল তোমার কাছে ধরা পড়বে না। হাদীসের সকল সনদ একত্র করা এবং কোন লেখক কোন সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছে তার উল্লেখ করাকে تخريج الحديث বলে।

২. তাখরীজ করার পর খোঁজ করতে হবে, প্রত্যেক রাবী তার শায়খ থেকে একাই রেওয়ায়াত করেছে, না তার সাথে আরো কেউ রেওয়ায়াত করেছে? এই খোঁজ করাকে الاعتبار বলে। যদি একা রেওয়ায়াত করে তাহলে তাকে التفرد বা غريب বলে। আর যদি সাথে অন্য কেউ রেওয়ায়াত করে তাহলে দেখতে হবে, প্রথম জনের মতো রেওয়ায়াত করল, না ভিন্নভাবে রেওয়ায়াত করল। যদি প্রথম জনের মতোই রেওয়ায়াত করে তাহলে তাকে المتابعة বলে। আর ভিন্নভাবে রেওয়ায়াত করলে المخالفة বলে। সনদের প্রত্যেক রাবী যে তার উস্তাদ থেকে রেওয়ায়াত করছে তাকে طبقات السند বলে।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 তাফাররুদের প্রকার ও তার হুকুম

📄 তাফাররুদের প্রকার ও তার হুকুম


৩. যদি কোনো ইমাম কোনো রাবীর تفرد করার কথা বলে, তাহলে দেখতে হবে تفرد কি محتمل (সম্ভব, সহনীয় ও গ্রহণযোগ্য) নাকি غير محتمل (অসম্ভব বা অসহনীয় বা অগ্রহণযোগ্য)? আরেকভাবে বললে, রাবীর জন্য কি সম্ভব, এই শায়খ থেকে এই রেওয়ায়াতটা একমাত্র সে-ই রেওয়ায়াত করবে? নাকি সম্ভব নয়? অনেক সময় মনে হবে, এটা অসম্ভব। কারণ, শায়খ যদি এই রেওয়ায়াতটা বাস্তবেই করতেন তাহলে অন্যান্যরাও তার থেকে এই হাদীসটি বর্ণনা করতেন। কিন্তু এই রাবী ছাড়া শায়খ থেকে এই রেওয়ায়াতটা যেহেতু আর কোনো রাবী বর্ণনা করেনি তাই মনে হচ্ছে, এখানে কোনো সমস্যা আছে। রাবী সত্যবাদী ও ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী হলেও এই জায়গায় তার কোনো ভুল হয়ে গেছে।

কোনটা محتمل আর কোনটা غير محتمل এটা বোঝার জন্য কয়েকটা জিনিসে খেয়াল করতে হবে:
ক. রাবীর স্মৃতিশক্তি ভালো। কিন্তু কেমন ভালো? খুব না অল্প?
খ. রাবী কোন সময়ের? যখন রেওয়ায়াতের প্রচার তেমন হয়নি এবং হাদীস অন্বেষণের মানুষও কম ছিল সে সময়ের, না আরো পরের?
গ. রাবী যে শায়খ থেকে تفرد করছে তার প্রসিদ্ধি কেমন? তার ছাত্র সংখ্যা কি অনেক? তার সাথে রাবীর সম্পর্ক কি অনেক দিনের?
ঘ. রাবী যেই রেওয়ায়াতটা তার শায়খ থেকে تفرد করেছে, সেটার আলোচ্য বিষয়টা কেমন? তা কি এমন যে, খুব চর্চা হওয়ার কথা ছিল?

যদি দেখা যায়, রাবীর স্মৃতিশক্তি অনেক ভালো, রাবী তাবেয়ীনের যুগের, রাবীর শায়খের ছাত্র সংখ্যা তেমন বেশি না এবং تفرد করা রেওয়ায়াতটাও এমন বিষয়ের যা চর্চা কম হয়, তাহলে এই تفرد গ্রহণযোগ্য (محتمل)। এই গুণগুলো যত কমতে থাকবে ততই অগ্রহণযোগ্য (غير محتمل) হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। অগ্রহণযোগ্য تفرد কে منكر، غير محفوظ ইত্যাদি বলে।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 মুতাবাআতের শর্ত ও ফায়দা

📄 মুতাবাআতের শর্ত ও ফায়দা


৪. যদি রাবীর متابعة থাকে তাহলে তো মাসআলা অনেক সহজ। তখন রাবীর শায়খ যে বাস্তবেই রেওয়ায়াতটি করেছেন তা আরো শক্তিশালীভাবে প্রমাণিত হয়। রাবীর ভুল না হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এমনকি متابعة এর সংখ্যা বেশি হলে রাবীর ভুল না হওয়ার ব্যাপারে ইয়াকিন তৈরি হয়ে যায়।

তবে متابعة এর সনদ متابع পর্যন্ত সহীহ হতে হবে, متابعة কোনো রাবীর وهم থেকে সৃষ্ট না হতে হবে এবং متابع নিজে সত্যবাদী হওয়া প্রমাণিত হতে হবে। যদি মুতাবি' সত্যবাদী হয়, কিন্তু দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী হয় তাহলেও কি তা শক্তি যোগাবে? হ্যাঁ। কারণ এখানে যেহেতু একজন ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী তার মতই রেওয়ায়াত করেছে, তাই ধরে নেওয়া হবে সে এই রেওয়ায়াতটা যথাযথ মুখস্থ রাখতে পেরেছে। আর মুতাবি' যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তা অপর রেওয়ায়াতকে শক্তিশালী করবে না। কারণ এখানে সম্ভাবনা আছে মিথ্যাবাদী متابع ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী রাবীকে এই রেওয়ায়াত করতে দেখে নিজেও এই রেওয়ায়াত শোনার মিথ্যা দাবী করে বসেছে, যাকে আমরা سرقة الحديث বলি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px