📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 ফিতান ও মালাহিম বিষয়ক রেওয়ায়াতের ক্ষেত্রে করণীয়

📄 ফিতান ও মালাহিম বিষয়ক রেওয়ায়াতের ক্ষেত্রে করণীয়


সংক্ষেপ কথা হলো, ভবিষ্যতে কী কী হবে এটা একমাত্র বলার অধিকার আল্লাহ তাআলার। আমরা বর্তমানের কিছু হালত ও অবস্থা দেখে শুধু অনুমান করতে পারি ভবিষ্যতে কী হতে পারে। কিন্তু সুনিশ্চিত করে ভবিষ্যৎ বিষয়ে আমরা কিছুই বলতে পারি না। গায়েবের ইলম একমাত্র আল্লাহ তাআলারই আছে। তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ওহী প্রেরণ – যা তিনি কথা ও কাজের দ্বারা প্রকাশ করেছেন- এর মাধ্যমে বান্দাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন। এগুলো নিশ্চিত ঘটবে এ বিষয়ে আমাদের ঈমান রাখতে হবে। এটা হলো প্রথম কথা।

দ্বিতীয় কথা হলো, কেয়ামতের আগে কী কী ঘটবে এটা আমাদের জানার একমাত্র মাধ্যম হলো কুরআন ও হাদীস। কারণ, ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। আর আল্লাহ যা জানানোর তা কেবল কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমেই জানিয়েছেন।

তৃতীয় কথা হলো, কিয়ামতের আগে ঘটবে এমন অনেক ঘটনা বিভিন্ন রেওয়ায়াতে পাওয়া যায়। এগুলো গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। কারণ এই রেওয়ায়াতগুলোর সবই প্রমাণিত না। যেগুলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত কেবল তাই গ্রহণ করা যাবে।

চতুর্থ কথা হলো, যেই রেওয়ায়াতগুলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত তা জানার পর তা যথাযথ বোঝাও অনেক জরুরী। বিশেষ করে হাদীসে কোন ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে তা নির্ধারণ করার ব্যাপারে অনেক সতর্ক হতে হবে। যদি কোনো ঘটনার পরিপূর্ণ অবস্থা হাদীসে বর্ণিত অবস্থার সাথে মিলে যায় তাহলে এতটুকু বলতে পারব, হয়ত এই হাদীসে এই ঘটনার কথা বলা হয়েছে। নিশ্চিত করে বলা উচিত নয়।

উদাহরণস্বরূপ হুজুর গযওয়াতুল হিন্দের কথা বলেছেন। এই উম্মাতের একটা দল হিন্দ বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করবে এবং এ দলকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন এমন হাদীস নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে। এখন কথা হলো, ইতিহাসে অনেকবার হিন্দ বিজয়ের জন্য যুদ্ধ হয়েছে এবং মুসলিমদের হাতে হিন্দ বিজয়ও হয়েছে। এই হাদীসে যেই দলের কথা বলা হয়েছে সেই দলটি কি পূর্বের মুজাহিদদের কোনো দল? নাকি এই দল ভবিষ্যতে হিন্দুস্থান আক্রমনকারী মুজাহিদদের কোনো দল?

এই বিষয়ে হাদীসে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তাই আমরাও চুপ থাকব। অনেকে বলেছেন, এই দল পূর্বের কোনো দল। তাহলে ভবিষ্যতেও কোনো যুদ্ধ হবে কি না, সে যুদ্ধকে এই হাদীসের ফজিলত শামিল করবে কি না তার কিছুই সুস্পষ্ট ভাবে জানা যায় না। তাই আমরাও কিছু বলব না।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 রাবী শুধু সত্যবাদী বুযুর্গ হলেই যথেষ্ট নয়

📄 রাবী শুধু সত্যবাদী বুযুর্গ হলেই যথেষ্ট নয়


ভাই শুধু বুযুর্গ হলেই হয় না। কারো সংবাদের উপর আস্থা রাখার জন্য তাকে মেধাবীও হতে হয়, যা শুনেছে বা দেখেছে তা যেন হুবহু তুলে ধরতে পারে। নাসী ভাই তার নামের মতই সব ভুলে যায়। যা শুনবে তার কম হলেও পঞ্চাশ পার্সেন্ট ভুলে যাবে। যতটুকু বলতে পারবে তার অনেক কিছুই হুবহু বর্ণনা করতে পারবে না।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 রাবী ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী কি না তা মুহাদ্দিসীনে কেরাম কীভাবে যাচাই করতেন

📄 রাবী ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী কি না তা মুহাদ্দিসীনে কেরাম কীভাবে যাচাই করতেন


তারা রাবীদের বর্ণনাগুলো দেখেছেন। যারা তার উস্তাদ থেকে যেভাবে শুনেছে সেভাবেই রেওয়ায়াত করতে পেরেছেন তারা তাদেরকে ضابط বা ভালো মুখস্থশক্তির অধিকারী হিসেবে গণ্য করেছেন। আর যার যেভাবে শুনেছেন সেভাবে বর্ণনা করতে পারেনি তাদেরকে তারা দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী বলে গণ্য করেছেন।

রাবী তার উস্তাদ থেকে যেভাবে শুনেছে সেভাবেই রেওয়ায়াত করেছে এটা তারা কীভাবে বুঝতেন? কয়েকভাবে বুঝতেন, এক. উস্তাদ নিজেই সাক্ষ্য দিয়েছেন, সে আমার থেকে যেভাবে শুনেছে সেভাবেই রেওয়ায়াত করে অথবা তার মেধার প্রশংসা করেছেন।

দুই. উস্তাদ তার রেওয়ায়াতগুলো লিখিত আকারে লিপবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। ঐ লিখিত কিতাবের সাথে উস্তাদ থেকে তার বর্ণনাগুলো মিলে গেছে।

তিন. উস্তাদের স্বীকৃত ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছাত্ররা উস্তাদ থেকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন তার বর্ণনাও ঠিক ঐ রকম হয়েছে।

এভাবেই মুহাদ্দিসীনে কেরাম কোন বর্ণনাকারী ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী, আর কোন বর্ণনাকারী দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী তা নির্ধারণ করেছেন।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 ضابط এর বিভিন্ন ধরণ

📄 ضابط এর বিভিন্ন ধরণ


ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী বলে গণ্য হতে হলে উস্তাদ যেভাবে রেওয়ায়াত করেছেন, ছাত্রকে ঐভাবেই রেওয়ায়াত করতে হতো। কিন্তু ছাত্র যদি এমন হতো, উস্তাদের কথা মুখস্থ রাখতে পারত না, কিন্তু হুবহু লিখে রাখতে পারত, তাহলে মুহাদ্দিসীনে কেরাম কী করতেন? এই ক্ষেত্রে তারা লক্ষ্য করতেন, উস্তাদ থেকে লিখিত খাতাটিকে ছাত্র যথাযথ হেফাযত করছে কি না? তার খাতায় অন্য কোনো ব্যক্তি ভিন্ন কিছু ঢুকিয়ে দিয়েছে কি না? যদি যাচাই-বাছাইয়ের পর মনে হতো, সে তার খাতাটিকে যথাযথ হেফাজত করেছে, উস্তাদ থেকে যেভাবে লিখেছিল খাতাটি সেভাবেই বহাল আছে, তখন তার লেখা থেকে সে যা রেওয়ায়াত করত তা মুহাদ্দিসীনে কেরাম গ্রহণ করতেন। কিন্তু সে মুখস্থ যা রেওয়ায়াত করত, তা মুহাদ্দিসীনে কেরাম গ্রহণ করতেন না। এই দিকে তাকিয়ে মুহাদ্দিসীনে কেরাম ضابط কে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এক. ضابط كتاب দুই. ضابط صدر وحفظ

আমরাও কিন্তু এমনটা করি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যার মুখস্থ শক্তি ভালো নয়, কিন্তু হুজুররা দরসে যা বলেন তা ভালো নোট করতে পারে। সে হুজুরদের কথা মুখস্থ বললে আমরা গ্রহণ করি না। বিপরীতে পরীক্ষার আগে তার নোট খাতাই হয় আমাদের সম্বল। তার খাতা নিয়ে একটা হুড়াহুড়ি পড়ে যায়।

আরেকটা বিষয়, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে, মুখতাসারুল মাআনী বা শরহে তাহযীব কিতাবে আগ্রহ না থাকায় দরস মনোযোগ দিয়ে শুনে না, ফলে এই কিতাবের উস্তাদের তাকরীর সে মুখস্থ করে না, কিন্তু শরহে বেকায়া কিতাব খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে, উস্তাদ যা বলেন তা মুখস্থ করেন। এই ক্ষেত্রে আমরা শরহে বেকায়ার উস্তাদের তাকরীর তার থেকে শুনলেও মুখতাসারুল মাআনীর উস্তাদের তাকরীর তার থেকে নেই না। কিছু ছাত্র আছে যে একজন নির্দিষ্ট উস্তাদের দরসের কথা অন্য দরসের তুলনায় খুব মনে রাখতে পারে। কারণ, ঐ উস্তাদের সাথে তার ভক্তি শ্রদ্ধা ও মুহাব্বত বেশি। ফলে ঐ উস্তাদ কী বলেছেন তা আমরা এই ছাত্র থেকেই বেশি শুনি। কিছু তালিবে ইলম এমন আছে, যারা আগের মাদরাসায় মনোযোগ দিয়ে পড়া লেখা করেছে, কিন্তু এই মাদরাসায় এসে সঙ্গ দোষের কারণে পড়া লেখা ছেড়ে দিয়েছে। এদের থেকে আগের মাদরাসার উস্তাদগণ দরসে কী বলেছেন তা গ্রহণ করলেও এই মাদরাসার উস্তাদগণ দরসে কী বলেন তা গ্রহণ করি না। কখনো এমন হয়, মাদরাসায় বড় কোনো আলেম মেহমান হলেন এবং ফজরের পর মসজিদে সকল ছাত্রের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে মাদরাসার সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটি ঐ রাতে অত্যাধিক পড়াশোনার কারণে ঘুমাতে না পারায় এই বয়ানে ঝিমিয়েছে। ফলে অন্যান্য সময় তার বর্ণনাকে গুরুত্ব দিলেও এই বয়ানের ব্যাপারে সে যা বর্ণনা করবে তাকে আমরা গুরুত্ব দেই না।

আমরা এমনটা করি, কারণ এমনটা করাই স্বাভাবিক নিয়ম ও বিবেকের দাবি। হাদীসের রাবীদের মধ্যেও এমন ছিল। মুহাদ্দিসীনে কেরাম তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কেউ ছিল, আহকাম সংক্রান্ত হাদীস ভালো মনে রাখতে পারত কিন্তু তাফসীর সংক্রান্ত হাদীস ভালো মনে রাখতে পারত না। কারো সনদ ভালো মনে থাকত কিন্তু মতন তুলনামূলক কম মনে থাকত। কেউ ছিল এর বিপরীত। আবার অনেকে এক অঞ্চলের শায়খদের হাদীস ভালো মনে রাখতে পারত কিন্তু আরেক অঞ্চলের শায়খদের হাদীস মনে রাখতে পারত না। কারো এক উস্তাদের হাদীস তো খুব মুখস্থ থাকত কিন্তু আরেক উস্তাদের হাদীস ভুলে যেত। শরহে ইলালুত তিরমিযীর মধ্যে ইবনে রজব হাম্বলী রহ. এমন রাবীদের নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px