📄 হিদায়ার যে হাদীসগুলোকে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে
১. ইবনে হাজার রহ. হেদায়ার অনেক হাদীসের ব্যাপারে বলেছেন, তিনি এর সনদ পাননি। তো এ ব্যাপারে কথা হলো, তার না পাওয়া আর বাস্তবেই না থাকা এক নয়। এমনও তো হতে পারে যে, তিনি পাননি কিন্তু বাস্তবে এর সনদ আছে।
২. আর এমনটা বাস্তবে হয়েছেও। ইবনে হাজার রহ. এর আগে যাইলায়ী রহ.ও নাসবুর রয়াহ কিতাবে হেদায়ার যে হাদীসের সনদ তিনি পাননি তার ব্যাপারে বলেছেন غریب। পরবর্তীতে কাসিম বিন কুতলুবুগা রহ. এসে তাদের উভয়ের না পাওয়া কিছু হাদীসের সনদ খুঁজে পেয়েছেন। তিনি সেগুলো সংকলন করে منية الألمعي فيما فات من تخريج الزيلعي ও العناية في تحقيق الأحاديث الغريبة في الهداية নামে আরেকটি কিতাব লিখেছেন। যাইলায়ী রহ. ও ইবনে হাজার রহ. এর এই হাদীসগুলোর সনদ না পাওয়ার কারণ হলো, তারা মূলত প্রসিদ্ধ কিতাবে হাদীসগুলো অন্বেষণ করেছিলেন। ফিকহে হানাফীর কিছু কিতাব এমন আছে, যেখানে হাদীস সনদসহ বর্ণিত হয়েছে। এই ধরনের কিতাবগুলোতে তারা হাদীসগুলো অন্বেষণ করেননি। অথচ হাদীসগুলো ঐ কিতাবগুলোতে সনদসহ বর্ণিত হয়েছে এবং হেদায়ার লেখক মারগীনানী রহ. ঐ কিতাবগুলো থেকেই সরাসরি অথবা কোনো মধ্যস্থতায় তার কিতাবে হাদীসগুলো উল্লেখ করেছেন। কিছু হাদীস এমনও আছে যা প্রসিদ্ধ কিতাবগুলোতেই সনদসহ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তারা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।
৩. এমন কিছু হাদীসও আছে যার সনদ কাসিম বিন কুতলুবুগা রহ. ও পাননি। কিন্তু তা পরবর্তীতে পাওয়া গেছে।
৪. কিছু হাদীস বাস্তবেই এমন আছে যার সনদ এখনও পাওয়া যায়নি। এই হাদীসগুলোর ব্যাপারে কথা হলো, এমন হাদীস শুধু ফিকহে হানাফীর হেদায়া কিতাবেই আছে বিষয়টি এমন নয়। অন্যান্য মাযহাবের ফিকহী কিতাবেও এমন হাদীস পাওয়া যায়। তবে এর মানে এটা নয় যে, এ ধরনের হাদীস কিতাবের লেখকগণ নিজ থেকে বানিয়ে উল্লেখ করেছেন। মাআযাল্লাহ, যদি তাদের জীবনী পড় তাহলে দেখবে, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু। তাদের পক্ষে হাদীস বানানোর মতো জঘন্য অপরাধ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাহলে কোথা থেকে এই হাদীসগুলো আসলো? এর উত্তর হলো, লেখকগণ সরাসরি বা মধ্যস্থতায় এমন কোনো কিতাব থেকেই নিয়েছেন যেখানে হাদীসগুলো সনদসহ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সে কিতাবগুলো কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে। পরবর্তীদের পর্যন্ত পৌঁছেনি। এক সময়ের প্রসিদ্ধ কত কিতাব হারিয়ে গেছে। উলূম ও ফুনূনের ইতিহাস ও উৎসগ্রন্থের ব্যাপারে যাদের জানাশোনা আছে তাদের কাছে এ কথাটা খুবই স্বাভাবিক লাগবে। তাছাড়া ইবনে হাজার রহ. ফজলুল্লাহ তৃরবিশতী রহ. - সহ একাধিক আলেম বলেছেন, তাতারীদের হামলা, স্পেন পতনসহ বিভিন্ন যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক কিতাব নষ্ট হয়ে গেছে।
📄 হিদায়ার যে হাদীসগুলোকে দুর্বল বলা হয়েছে
ইবনে হাজার রহ. হেদায়ায় উল্লেখিত অনেক হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কথা ঠিক। কিন্তু তুমি যদি তালাশ কর তাহলে দেখবে, ইবনে হাজার রহ. এর দুর্বল বলা অনেক হাদীসকে ইবনে হাজার রহ. এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক ইমাম সহীহ বলে রেখেছেন। মূলত এর কারণ হলো, হাদীস সহীহ হওয়া ও যয়ীফ হওয়ার বিষয়টি ইজতেহাদী। অর্থাৎ যেই শর্ত পাওয়া গেলে একটা হাদীসকে সহীহ বলা হবে সেই শর্তগুলো কোনো হাদীসে পাওয়া গেল কি না তা নিয়ে মুহাদ্দিসীনে কেরামের মাঝে মতভিন্নতা হতে পারে। কারো মনে হবে, এই হাদীসে উক্ত শর্তগুলো পাওয়া গেছে, সুতরাং তা সহীহ। আর কারো মনে হবে, শর্তগুলো পাওয়া যায়নি, সুতরাং তা সহীহ নয়। উদাহরণ স্বরূপ হাদীস সহীহ হওয়ার একটা শর্ত হলো রাবী সত্যবাদী হতে হবে। এখন একজন ব্যক্তি রাবীর ব্যাপারে যা জানে তাতে তার মনে হয়েছে সে সত্যবাদী। তাই সে তার হাদীসকে সহীহ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আরেকজন ঐ রাবীর ব্যাপারে এমন কিছু তথ্য জানে যাতে তার মনে হয়েছে সে মিথ্যাবাদী। তাই সে তার হাদীস সহীহ হিসেবে গ্রহণ করেনি। আমাদের মধ্যেও কিন্তু এমনটা হয়। এক ব্যক্তির ব্যাপারে দুইজনের দুই মত থাকে। একজন বলছে সে সত্যবাদী। আরেকজন বলছে সে মিথ্যাবাদী। এটা তো হলো এক শর্তের ব্যাপারে কথা। বাকি শর্তগুলোর ব্যাপারেও একই কথা। সেগুলোতেও হতে পারে মতভিন্নতা। এই বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করার জন্য উলূমুল হাদীসের অনেক কিতাব পড়তে হবে। রাবী ও হাদীস যাচাইয়ের অনুশীলনমূলক অনেক কাজ করতে হবে।
📄 হিদায়ার হাদীস দুর্বল হলেই কি মাসআলাও দুর্বল হয়ে যাবে
এমন মতভিন্নতা হলে আমাদের করণীয় কী? জানি এই প্রশ্ন তোমাদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর জবাব হলো, আমি যদি মেহনত করে আল্লাহর ফজল ও করমে বাস্তবিকপক্ষেই একজন হাদীস বিশারদ হতে পারি, তাহলে আমি উভয় পক্ষের বক্তব্য দেখব। তাদের দলিল প্রমাণ দেখব। আমি নিজে আরো অনুসন্ধান করব। এরপর আমার কাছে যে মতটি অধিক সঠিক মনে হবে আমি সেটাই গ্রহণ করব। কিন্তু কথা হলো, আমরা কয়জনই বা এমন হতে পারব? এই পর্যায়ের হাদীস বিশারদ হওয়া তো সহজ কথা নয়। এই স্তরের যোগ্যতা অর্জন না করতে পারলে তখন আমরা কী করব? উত্তর সহজ, যোগ্য কারো অনুসরণ করব। যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যেই তো মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। আমি কোন যোগ্য ব্যক্তির অনুসরণ করব? এর উত্তর হলো তুমি আমি ফিকহী যে মাযহাবকে অনুসরণ করি সেই মাযহবের মুহাদ্দিসীনে কেরামের অনুসরণ করব। কারণ এখানে কথা চলছে বিজ্ঞ ও মুত্তাকী মুহাদ্দিসগণের মাঝে মতভিন্নতা নিয়ে। তাই যে কারোরই অনুসরণ করা যায়। কিন্তু তন্মধ্যে যাদের ফিকহী মাযহাব আমাদের ফিকহী মাযহাবের সাথে মিলে যায়, তাদের মতামত অনুসরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিব, যেন বিশৃঙ্খলা ও বৈপরিত্য না দেখা দেয়। বিশৃঙ্খলা ও বৈপরিত্য মানে হলো, এমন মুহাদ্দিসের কথা গ্রহণ করলাম যিনি আমার অনুসরণীয় ফিকহী মাযহাবের বিভিন্ন মাসআলার হাদীসগুলোকে দুর্বল মনে করেন। তখন ফলাফল দাঁড়াবে, আমি এমন কিছু মাসআলা আমল করি যেগুলোর ভিত্তিকে দুর্বল মনে করি।
হ্যাঁ, হেদায়া কিতাবে এমন কিছু হাদীসও আছে যাকে ইবনে হাজার রহ. সহ অন্যরাও দুর্বল বলেছেন এবং আগে পরের কেউ তাকে সহীহ বলেননি। এই হাদীসগুলোর ক্ষেত্রে তুমি প্রশ্ন তুলতে পার, তাহলে হানাফী মাযহাব কি দুর্বল হাদীসের উপর নির্ভরশীল? এর উত্তর হলো, আমরা যদি এই মাসআলাগুলো হানাফী মাযহাবের দলিলভিত্তিক কিতাব থেকে অধ্যয়ন করি তাহলে দেখবে, এসকল মাসআলার পক্ষে হয়ত সুস্পষ্ট অন্য কোনো সহীহ হাদীস আছে। অথবা কোনো ব্যাপক অর্থবহ আয়াত বা সহীহ হাদীস দ্বারা মাসআলাটি প্রমাণিত হচ্ছে এবং সাথে আছে সাহাবা ও তাবেয়ীনের অনুরূপ ফতোয়া। তাই হেদায়ার হাদীসটি দুর্বল হলেই মাসআলা দুর্বল হয়ে যাবে বিষয়টি এত সরল নয়।
📄 ইমাম আবু হানিফা কি দুর্বল হাদীস দিয়ে দলিল দিতেন
না। কারণ ইমাম আবু হানিফা রহ. এর জীবনী নিয়ে লিখিত কিতাব সমূহের মধ্যে একাধিক সূত্রে প্রমাণিত আছে, তিনি সহীহ হাদীস গ্রহণ করতেন এবং তার থেকেই মাসআলা বের করতেন। অন্যরাও তার ব্যাপারে এমনটা বলেছেন। যেমন,
قال علي بن الحسن بن شقيق : سمعت أبا حمزة السكري يقول: سمعت أبا حنيفة يقول : إذا جاء الحديث الصحيح الإسناد عن النبي ﷺ أخذنا به ، وإذا جاء عن أصحابه تخيرنا، ولم نخرج من قولهم، وإذا جاء عن التابعين زاحمناهم. (فضائل أبي حنيفة : ٤٢٦ ، الانتقاء: ص٢٦٦ - ٢٦٧)
وقال أبو حمزة : سمعت أبا حنيفة يقول : ما صح عن النبي ﷺ فليس لأحد فيه قول، وما اتفق عليه أصحاب النبي ﷺ فلا يتعدى إلى غيره، وما اختلفوا فيه يتخير من أقاويلهم. (كشف الآثار الشريفة: ٢٣٩١)
قال عيسى بن يونس قال : سمعت أبي يقول : كان النعمان بن ثابت شديد الاتباع لصحيح حديث رسول الله ﷺ ، فإن عسر عليه ما يستدل به من حديث رسول الله ﷺ أخذ بما صحت الرواية به عن أصحابه من علم أهل الكوفة، فإن خولف في ذلك إلى غير علم أهل بلده، لم يجاوز ما أدرك عليه أهل الكوفة عن أهل الكوفة. (فضائل أبي حنيفة : ٢٦٧)
قال علي بن الحسن بن شقيق قال : سمعت أبي يذكر : عن عبد الله بن المبارك قال: سألت أبا عبد الله سفيান بن سعيد الثوري عن الدعوة للعدو أواجبة هي اليوم ؟ فقال : قد علموا على ما يقاتلون، قال ابن المبارك : فقلت له : إن أبا حنيفة يقول في الدعوة ما قد بلغك، قال فصوب بصره وقال لي: كتبت عنه? قلت : نعم، قال فنكس رأসে ثم التفت يمنيا وشمالا، ثم قال: كان أبو حنيفة شديد الأخذ للعلم، ذابا عن حرام الله عز وجل عن أن يستحل، يأخذ بما صح عنده من الأحاديث التي تحملها الثقات وبالآخر من فعل رسول الله ﷺ ، وما أدرك عليه علماء الكوفة، ثم شنع عليه قوم نستغفر الله، نستغفر الله. (فضائل أبي حنيفة : ١٤٤ ، الانتقاء: ص ٢٦٢)
قال الحسين بن إبراهيم : سمعت محمد بن فضيل يقول : كان أبو حنيفة إذا سئل عن مسألة فيها خبر صحيح اتبعه ، أو ما يستدل على مثله بنحوه قاس عليه، ولقদ سئل يوما عن مسألة فقال : ما أحسن هذا، هذا مما لم أسمع فيه بما يأتي على مثله قياس، فالله أعلم فالله أعلم. (فضائل أبي حنيفة : ۲৮৭)
قال مغيث : أوصانا خارجة عند موته فقال : يا بني ! انظروا في هذا الرأي (رأي أبي حنيفة) واعملوا كي يدلكم على جيد الحديث. (كشف الآثار الشريفة : ٢٢٤٠)
قال سهل : كنت عند النضر بن محمد، فقيل له : إن أبا غسان يقول كذا وكذا ، قال : فغضب وقال : ما أدري ما يقول هولاء الصبيان ! حدثني الفقيه الورع العفيف أبو حنيفة الذي كان يعز عليه أن يتكلم إلا ما يوافق الأثر. (كشف الآثار الشريفة : ٢٣١٠)
قال سهل بن مزاحم كلام أبي حنيفة أخذ بالثقة، وفرار من القبح والنظر في معاملات الناس، وما استقاموا عليه وصلح عليهم أمورهم يمضي الأمور على القيাস، فإذا قبح القياس يمضيه على الاستحسان ما دام يمضي له، فإذا لم يمض له رجع إلى ما يتعامل المسلمون به، وكان يوصل الحديث المعروف الذي أجمع عليه، ثم يقيس عليه ما دام القياس سائغا ، ثم يرجع إلى الاستحسان، أيهما كان أوثق رجع إليه. (كشف الآثار الشريفة : ٢٥٨٨)
হ্যাঁ, এটা হয়েছে যে, তার নিকট যা প্রমাণিত সাব্যস্ত হয়েছে তা অন্যের নিকট অপ্রমাণিত মনে হয়েছে। এমন হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। সকল শাস্ত্রেই শাস্ত্রীয় ব্যক্তিদের মাঝে কমবেশ মতপার্থক্য হয়। তাই এটা বলা যায়, এমন কিছু হাদীস দিয়ে তিনি দলিল দিয়েছেন যা তার নিকট প্রমাণিত হলেও অন্যের নিকট অপ্রমাণিত ছিল। তবে এমনটা শুধু ইমাম আবু হানিফা নয়, সকল মুজতাহিদের ব্যাপারেই বলা যায়। একটু আগে তো বলেই আসলাম, হাদীস প্রমাণিত হওয়া না হওয়া নিয়ে ইখতেলাফ হতে পারে। কিন্তু কখনই এমন হয়নি যে, তাদের কেউ নিজের কাছে অপ্রমাণিত রেওয়ায়াতের উপর কোনো মাসআলার ভিত্তি দাঁড় করিয়েছেন।