📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 সংবাদ সত্য হওয়ার জন্য সংবাদ দাতা সত্যবাদী হতে হয়

📄 সংবাদ সত্য হওয়ার জন্য সংবাদ দাতা সত্যবাদী হতে হয়


সংবাদ দাতা ইচ্ছাকৃত বাস্তবতার অনুরূপ সংবাদ দেয়নি এর অর্থ হলো, সে মিথ্যা বলেছে। তাই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধ করে রাবীরা যে কথা বা কাজের সংবাদ দিয়েছে তা সত্য বলে মেনে নেওয়ার জন্য মুহাদ্দিসীনে কেরাম প্রথম শর্ত দিয়েছেন রাবী মিথ্যুক না হতে হবে। রাবী মিথ্যুক না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তারা কয়েকটা বিষয় খেয়াল রেখেছেন:

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 রাবী সত্যবাদী বলে কখন গণ্য হয়

📄 রাবী সত্যবাদী বলে কখন গণ্য হয়


১. রাবী বালেগ হতে হবে। কারণ মিথ্যা থেকে সেই ব্যক্তি বিরত থাকে যে মিথ্যার শাস্তিকে ভয় পায়। নাবালকের যেহেতু গুনাহ লেখা হয় না তাই তার মিথ্যা বলার শাস্তির কোনো ভয় থাকে না এবং এই শাস্তির কোনো উপলব্ধিও থাকে না।

২. আকেল ও জ্ঞানবান হতে হবে। পাগল না হতে হবে। কারণ পাগল সত্য মিথ্যা কিছুই বুঝে না। মিথ্যা বললে কী শাস্তি তা-ও বুঝে না। এজন্য তার উপর মিথ্যার কোনো শাস্তিও হয় না।

৩. মুসলিম হতে হবে। কারণ অনেক কাফের মিথ্যার শাস্তির ভয় পায় না। যারা ভয় পায় তারা আবার ইসলামের ব্যাপারে মিথ্যা বলতে ভয় পায় না। বরং এটাকে তারা নিজ দ্বীনের অংশ মনে করে। তাছাড়া হাদীস হলো দ্বীনে ইসলামের বিশেষ একটি বিষয়। আর কাফের যেহেতু ইসলাম মেনে নেয়নি তাই ইসলামের সাথে সে অবশ্যই বিদ্বেষ রাখে। আর যেহেতু বিদ্বেষ রাখে, তাই ইসলামের ক্ষতির জন্য সে যেকোনো মিথ্যা বলতে পারে। তার থেকে এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। বাস্তবে এমনটাই দেখা যায়। অমুসলিম প্রাচ্যবিদরা ইসলাম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কত যে ছলচাতুরি আর মিথ্যার আশ্রয় নেয় তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

৪. এমন তাকওয়া ও খোদাভীতির অধিকারী হতে হবে, তার সাথে যে ব্যক্তি চলাফেরা করবে সেই বলবে, এই লোক মিথ্যা বলতে পারে না।

৫. মুরুওয়াতের খেলাফ কিছু না করা। অর্থাৎ এমন কোনো কাজে জড়িত হয় না, যা থেকে বোঝা যায় সে নির্লজ্জ। যদিও কাজটা শরীয়তের দিক থেকে মুবাহ হয়। কারণ নির্লজ্জ মানুষ মিথ্যা বলতে ভয় পায় না। মিথ্যা বলার পর ধরা খাওয়ার লজ্জাকে সে গায়ে মাখে না।

৬. সে কখনো মিথ্যা বলেছে এমনটার কোনো প্রমাণ নেই।

এই ছয় গুণ যে রাবীর মধ্যে পাওয়া যায় তাকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম عادل বলে। এই ধরনের কোনো রাবী যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধ করে কোনো কিছু বর্ণনা করে তখন তারা মেনে নেন, এই রাবী মিথ্যা বলেনি। হ্যাঁ, অনিচ্ছাকৃত ভুলে এমন হতে পারে যে, আরেকজনের কথা বা কাজকে নবীজীর দিকে সম্বন্ধ করে দিয়েছে। বা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন একভাবে, আর রাবী বর্ণনা করেছে আরেক ভাবে। আমরা যদি চিন্তা করি তাহলে দেখব, একমাত্র এই ছয় শর্ত কোনো সংবাদ দাতার মধ্যে পাওয়া গেলেই বলা যায়, সে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা সংবাদ দেয়নি। এই ছয় শর্তের কোনো একটাও যদি ছুটে যায় তাহলে তখনই মিথ্যার সম্ভাবনা চলে আসে।

রশীদ কথাগুলো বলে থামল। একটা মাছরাঙা পাখি এসে ছোঁ মেরে পুকুর থেকে মাছ নিয়ে গেল।

একজন বলল, এই ছয় শর্ত পাওয়া গেলেও তো মিথ্যা বলার সম্ভাবনা থেকে যায়। রশীদ বলল, আমরা যে ঘাটলায় বসে আছি তা-ও তো ধসে পড়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তারপরেও আমরা বসে আছি কেন?

: কারণ সম্ভাবনাটি অনেক ক্ষীণ।

: এই ছয় গুণ যার মধ্যে পাওয়া যাবে তার থেকে মিথ্যা বলার সম্ভাবনাটাও এমন ক্ষীণ। এই ছয় গুণ নিয়ে যত ভাববেন ততই বিষয়টি বুঝে আসবে।

: ছয় গুণ যাদের মধ্যে নেই তাদেরও তো সত্য বলার সম্ভাবনা আছে!

: আছে। কিন্তু সম্ভাবনাটা হয়ত একেবারে ক্ষীণ। অথবা বেশি হলেও মিথ্যা বলার সম্ভাবনাটা তুলনামূলক বেশি। অথবা সত্য মিথ্যা বলার উভয় সম্ভাবনা সমান সমান। তাই তার সংবাদ সত্য বলে মেনে নিতে হলে আলাদা কোনো দলিল লাগবে যার কারণে প্রবল ধারণা হবে, সে এই নির্দিষ্ট সংবাদটা সত্যই দিয়েছে। এই প্রবল ধারণাটাই মূল। দুনিয়ার সব কিছু প্রবল ধারণার উপর নির্ভর করেই চলছে। দেখুন, এখন হয়ত পরিপূর্ণ বুঝে আসছে না। সমস্যা নেই। ভাবতে থাকুন। এক সময় এই কথাগুলো খুব বুঝে আসবে ইনশাআল্লাহ।

📘 উলূমুল হাদীস কী,কেন কিভাবে 📄 রাবী সত্যবাদী কি না তা যাচাই করতে মুহাদ্দিসীনে কেরাম কী করতেন

📄 রাবী সত্যবাদী কি না তা যাচাই করতে মুহাদ্দিসীনে কেরাম কী করতেন


তারা রাবীদের সাথে উঠাবসা করতেন। গভীরভাবে তাদের জীবনাচার পর্যবেক্ষণ করতেন। তাদের আড়ালে ঘনিষ্টজনদের কাছে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করতেন।

এক ব্যক্তি উমর রা. এর কাছে এসেছে সাক্ষ্য দিতে। তখন উমর রা. তাকে বলল, আমি তোমাকে চিনি না। এমন কাউকে নিয়ে আসো যে তোমাকে চিনে। তখন এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, আমি তাকে চিনি। উমর রা. বললেন, কেমন চিনো? লোকটি বলল, সৎ ও সত্যবাদী হিসেবেই চিনি। উমর রা. বললেন, কীভাবে বুঝলে সে সৎ ও সত্যবাদী? তুমি কি তার প্রতিবেশী যে, তাকে রাত দিন পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছ? বলল, না। উমর রা. বললেন, তাহলে কি তুমি তার সাথে কখনো ব্যবসা করেছ, যার ফলে তার সততা ও খোদভীরুতা জানতে পেরেছ? বলল, না। উমর রা. বললেন, তাহলে কি তার সাথে সফর করেছ, যার দরুন তার উত্তম আখলাকের পরিচয় পেয়েছ? লোকটি বলল, না। তখন উমর রা. বললেন, তাহলে তুমি তাকে চিনোনি।[১]

ইবরাহীম নাখায়ী রহ. বলেছেন, আমরা যখন কোনো শায়খ থেকে হাদীস গ্রহণের ইচ্ছা করতাম তখন তার খাবার দাবার, চলাফেরা, ইবাদত ইত্যাদি বিষয়ের খোঁজ নিতাম। যদি দেখতাম, তার অবস্থা ভালো তাহলে তার থেকে হাদীস শুনতাম।[২]

যায়েদা বিন কুদামা রহ. বলেছেন, আমি রাবীদের সম্পর্কে এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করি যেমন বিচারকরা সাক্ষীদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে।[৩]

হাসান বিন সালেহ রহ. বলেছেন, আমরা যখন কোনো শায়খ থেকে হাদীস গ্রহণের ইচ্ছা করতাম তখন তার ব্যাপারে এমনভাবে খোঁজখবর নিতাম যে, লোকেরা মনে করত আমরা তার কাছে আমাদের কোনো আত্মীয়কে বিবাহ দিব।[৪]

টিকাঃ
[১] উকাইলী, আযযুআ'ফা: ৫/৯৩, খতীব আল বাগদাদী, কিফায়াহ: ২১৯
[২] ইবনে আদী, আলকামিল: ১/১৫৬, সনামে দারেমী: ৪৩৪, ৪৩৫
[৩] মাসায়িলু আহমাদ বি রেওয়ায়াতি হারব: ৪৮৬
[৪] খতীব আল বাগদাদী, কিফায়াহ: ১/২৪৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px