📄 প্রমাণিত হওয়ার জন্য সনদ থাকার সাথে সাথে সনদটাতে প্রমাণিত হাদীসের পাঁচ শর্ত পেতে হবে
আরেক ছাত্র বলে উঠল, এমনও তো হতে পারে, উপরোক্ত ইমামগণ এই বক্তব্যের সনদ পাননি। কিন্তু অন্যান্য ইমামগণ পেয়েছেন।
হুজুর বললেন, কারা পেয়েছেন? বলতে পারবে না। আমারও জানা নেই।
: এমন হতে পারে না, কোনো ইমাম পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু আমরা তাদের ঐ বক্তব্য পর্যন্ত পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি।
: হতে পারে। কিন্তু এটাও তো হতে পারে, কেউই পাননি। এজন্য পেয়েছেন এমনটা কেউ বলেছেন বলে আমরা জানি না। দেখ, পাওয়া না পাওয়া উভয় সম্ভাবনাই আছে। তবে আমরা না পাওয়ার সম্ভাবনাকেই প্রাধান্য দিব। কারণ, না পাওয়ার ব্যাপারে কয়েকজন ইমামের বক্তব্য পেয়েছি। পক্ষান্তরে পাওয়ার ব্যাপারে কারো বক্তব্য পাইনি।
: উনাদের না পাওয়া কি বাস্তবে না থাকার দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে?
: হ্যাঁ, হাফেজে হাদীসদের না পাওয়াটাই বাস্তবে হাদীসটির অস্তিত্ব না থাকার দলিল হবে। তবে পরবর্তী কেউ যদি পেয়ে যায় তাহলে যিনি পেয়েছেন তার কথাই গ্রহণ করা হবে। আরেকটা কথা শুনে রাখো, শুধু সনদ পেলেই তো যথেষ্ট নয়। তার মধ্যে প্রমাণিত হওয়ার পাঁচ শর্তও বিদ্যমান থাকতে হবে। এই বক্তব্যটির সনদ যদি থেকেও থাকে, সেই সনদ পাঁচ শর্ত বিশিষ্ট কি না তা তো জানা নেই।
তাছাড়া এই বক্তব্যের কোনো সনদ পাওয়া যায় না এমন বক্তব্য আমরা যদি কোনো ইমাম থেকে না পেতাম, সাথে কোনো ইমাম প্রমাণিত বলেছেন এমনটাও না পেতাম তাহলেও আমাদের জন্য এই বক্তব্যকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধ করে বলা জায়েয হতো না। কারণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধ করে তাই বলা যায়, যা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত বলে কোনো ইমাম বলেছেন অথবা এর কোনো সহীহ সনদ বিদ্যমান আছে। তোমরা শুনোনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেন, كفى بالمرء كذبا أن يحدث بكل ما سمع
আরেকটা কথা শোনো। ইমামগণ কোনো একটা হাদীসকে প্রমাণিত বলেছেন এটা যেমনিভাবে তাদের স্পষ্ট বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ঠিক তেমনিভাবে তাদের কর্মপন্থা থেকেও বোঝা যায়। যেমন, কোনো হাদীস দিয়ে এমন কোনো ইমাম দলিল দিয়েছেন যার ব্যাপারে জানা আছে তিনি সহীহ হাদীস ছাড়া দলিল দেন না।
📄 বয়ানে যেসব ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়
হুজুর চোখ খুলে একটু হাসলেন, : আরে ভাই! বক্তারা জাল ভিত্তিহীন রেওয়ায়াত ছাড়াও আরো অনেক কাণ্ড করে।
: যেমন?
: কয়টা বলব!
: কিছু বলেন।
১. আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যা মনমতো করছে। বিশেষ করে যখন আয়াত ও হাদীসকে বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মেলাতে যায়।
২. তাহকীক ছাড়াই মাসআলা বলে দিচ্ছে। এমন ফিকহী মাসআলা যা ব্যক্তি বিশেষের জন্য প্রযোজ্য তা সকলের সামনে বলে দিচ্ছে। যে মাসআলাগুলো অনেক শর্তসাপেক্ষে জায়েয বা নাজায়েয, সেই শর্তগুলো পুরোপুরি না বলে আধাআধি বলছে। মিশকাত দাওরা হাদীসের ছাত্রদের সামনে যেভাবে ইখতেলাফী মাসআলা আলোচনা করা হয় সেভাবে সাধারণ জনগণের সামনে ইখতেলাফী মাসআলা আলোচনা করছে। অথচ এখতেলাফী মাসআলা আওয়ামদের সামনে বলা উচিত নয়। তাদের সামনে যে বক্তব্যের উপর ফতোয়া সেটাই বলা উচিত। অন্যথায় তারা যখন যেটা মনে চাইবে সেটা গ্রহণ করবে। এতে তারা নফসের অনুসরণের পথে হাঁটবে।
৩. প্রমাণিত বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করার সময় নিজের কল্পনা থেকে নতুন অনেক কিছু যুক্ত করে দিচ্ছে। শুনে মনে হয়, ঘটনাটা যেন এ যুগের কোনো ঘটনা বা উপন্যাসের কোনো অংশ।
৪. কোনো আলেম থেকে প্রকাশ পাওয়া কোনো যাল্লাতের কথা উল্লেখ করছে। হয়ত নিন্দার জন্য বা সমর্থনের জন্য। জনসাধারণের সামনে এ আলোচনা উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর। কেউ কেউ এতে ঐ যাল্লাতের অনুসরণ শুরু করে দিবে। আর কেউ কেউ ঐ আলেমের ব্যাপারেই মন্দ ধারণা লালন করতে থাকবে। হ্যাঁ, কারো কোনো যাল্লাতের অনুসরণ যদি অনেক ব্যাপক আকার ধারণ করে তখন সতর্কের জন্য তা আলোচনা করা যেতে পারে।
৫. উপস্থাপনগত ভুল তো অনেক ধরনের। আহলে কুরআন মুনকিরে হাদীসকে রদ করতে গিয়ে এমন কথা বলছে, যা ফিকহে ইসলামীর অবমাননা হয়। ফলে তা আহলে হাদীস গায়রে মুকাল্লিদদের ফায়দা দিচ্ছে। আবার আহলে হাদীস গায়রে মুকাল্লিদদের রদ করতে গিয়ে এমন কথা বলছে, যা হাদীসে রাসূলের উপর থেকে আস্থা উঠিয়ে দেয়। ফলে তা আহলে কুরআন মুনকিরে হাদীসের পক্ষে চলে যাচ্ছে।
৬. একটু আধুনিক সাজতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে। কিন্তু তা হয় ভুল অর্থে বা ভুল উচ্চারণে। উদাহরণ দিতে গিয়ে ডাক্তারি বা বিজ্ঞান বিষয়ের এমন এমন কথা বলছে যা শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞদের জন্য হাসির খোরাক হয়।
৭. তারগীব ও তারহীব বর্ণনায় ভারসাম্য ঠিক রাখছে না। তারগীব ও ফাজায়েল এমনভাবে বলছে, যা শ্রোতাকে নির্ভয় চিন্তাহীন করে তুলছে। আবার তারহীব ও শাস্তির বিষয়গুলো এমনভাবে বলছে, যা অন্তর থেকে আশা ছিনিয়ে নিয়ে একেবারে নিরাশ করে দিচ্ছে।
৮. কোনো আমলকে তাহকীক ছাড়াই শিরক, কুফর ও বিদআত বলে দেওয়া হচ্ছে।
৯. ঘৃণিত ও অশ্লীল বিষয়ের নিন্দা করতে গিয়ে এমন চটকদার বর্ণনা দিচ্ছে, তার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি করার পরিবর্তে আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
১০. বয়ানের নূর ও প্রভাবকে নষ্ট করে দিচ্ছে আত্মপ্রশংসা, অপ্রয়োজনীয় ও আদবহীন সমালোচনা করে।
📄 ত্রুটিগুলো থেকে বাঁচার উপায়
১. জনগণের আগ্রহের জোয়ারে না ভেসে তাদের প্রয়োজন সামনে রেখে কথা বলতে হবে।
২. গলদ কথা প্রচার প্রসার করার ভয়াবহতা নিজের দিলে বসাতে হবে। وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ * إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا (سورة بني إسرائيل: ٣٦)
অর্থ: যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই (তাকে সত্য মনে করে) তার পিছনে পড়ো না। জেনে রেখো, কান, চোখ ও অন্তর এর প্রতিটি সম্পর্কে (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে।
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (سورة النحل: ৪৩)
অর্থ: যদি এ বিষয়ে তোমাদের জানা না থাকে, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করে নাও।
এই দুই আয়াতের উপর আমল করতে হবে। বিশেষ করে لا نثبت إلا بعلم ونتহفظ في النفي 'যথাযথ না জেনে কোন কিছু সাব্যস্ত করব না। কোন বিষয়কে নাকচ করতেও যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করব'- এই মূলনীতির উপর আমল করতে হবে।
৩. বয়ানের আগে বিষয়বস্তু ঠিক করে নিতে হবে। যা যা বলা হবে তা আগেই তাহকীক করে নিতে হবে। আলোচনায় অন্য কিছু চলে আসলেও নিজেকে তা বলা থেকে বিরত রাখতে হবে।
৪. বয়ানের ময়দানে নামার আগে এই কিতাবগুলো অবশ্যই পড়ে নিতে হবে:
কুতুবুল কসাস ওয়াল মুজাক্কিরীন লিবনিল জাওযী (৫৯৭)
আল-বায়িছু আলাল খালাস মিন হাওয়াদিছিল কসাস লিল-ইরাকী (৮০৬)
তাহযীরুল খওয়াস মিন আকাজিবি কসাস লিস-সুয়ূতী (৯১১)
৫. আহলে ইলমের থেকে নিজ বয়ানের পর্যালোচনা গ্রহণ করবে। রেকর্ড থাকলে কোনো ভুল হয়েছে কি না তা জানার জন্য নিজেও মাঝে মাঝে শুনবে।