📄 প্রমাণিত হাদীসের শর্ত সমূহ ও তার বিভিন্ন নাম
রশীদ অনেক দিন থেকেই উলূমুল হাদীস কথাটা শুনে আসছে। আজ অনেকটাই বুঝতে পারল উলূমুল হাদীস আসলে কী? তার মুখাবয়বে এই বুঝতে পারার আনন্দের ছটা ফুটে উঠল। নাযেম সাহেবেরও ভালো লাগল। ছেলেটা বেশ মেধাবী ও বুদ্ধিমান। মেহনত করলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।
এরপর হুজুর বললেন, বোঝা গেল উলূমুল হাদীসের মূল মাকসাদ হলো, কোন কথা বা কাজটা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত আর কোনটা অপ্রমাণিত তা নির্ধারণ করা। তুমি যেমন কোন কথাটা আফফান সাহেব থেকে প্রমাণিত তা যাচাইয়ের জন্য পাঁচটি বিষয় খেয়াল রেখেছ হাদীসের ইমামগণও রেওয়ায়াত যাচাইয়ের জন্য পাঁচটি শর্ত দিয়েছেন। বলতে পারবে কী কী?
রশীদ বলে উঠল: প্রথম, রাবীদের সত্যবাদী হওয়া। যাকে পরিভাষায় العدالة বলে। দ্বিতীয়, রাবীদের শক্তিশালী মেধার অধিকারি হওয়া। যাকে পরিভাষায় الضبط বলে। তৃতীয়, নিচের সংবাদ দাতা তার উপরের সংবাদ দাতা থেকে সরাসরি শোনা। যাকে পরিভাষায় اتصال السন্দ বলে। চতুর্থ, কোনো সংবাদ দাতা বা রাবী একাকী এমন রেওয়ায়াত না করা যা একাধিক রাবীর রেওয়ায়াত করার কথা ছিল। পরিভাষায় একে انتفاء الشذوذ বলে। সর্বশেষ হলো, রাবীদের রেওয়ায়াতের মাঝে পরস্পরে ভিন্নতা দেখা দিলে ভুলটাকে নির্ধারণ করে তা প্রত্যাখ্যান করা, যাকে পরিভাষা انتفاء العلة বলে।
নাযেম সাহেব অভিভূত হলেন। খুশি হয়ে বললেন, এইতো তুমি বুঝতে পেরেছ। মাশাআল্লাহ। এবার তোমাকে মুহাদ্দিসীনে কেরামের কিছু পরিভাষা শুনাই। কারণ পরিভাষা না জানলে তুমি তাদের ভাষা বুঝবে না। তাদের উলূম থেকে সঠিকভাবে উপকৃত হতে পারবে না। অনেক জায়গায় ভুল বুঝেরও শিকার হতে পার।
কিছু রেওয়ায়াত এমন আছে যার রাবী অসংখ্য। তাই রাবীদের যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে না। পরিভাষায় তাকে متواتر বলে। আর যে রেওয়ায়াতের রাবীর সংখ্যা কম হওয়ায় তার রাবীদের যাচাই করতে হয় সেই রেওয়ায়াতকে পরিভাষায় خبر الواحد বলে। কোনো খবরে ওয়াহিদের ক্ষেত্রে উপরোক্ত পাঁচ শর্ত পাওয়া গেলে তাকে প্রমাণিত ধরে নেওয়া হয়। পরিভাষায় এমন রেওয়ায়াতকে صحيح، حسن ،جيد، ثابت، قوي ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। আর যেই রেওয়াতে উক্ত পাঁচ শর্তের কোনো একটা শত অনুপস্থিত তাকে অপ্রমাণিত ধরে নেওয়া হয়। মুহাদ্দিসীনে কেরাম ছুটে যাওয়া শত অনুযায়ী অপ্রমাণিত হাদীসের ভিন্ন ভিন্ন পারিভাষিক নাম দিয়েছেন, যা পড়াশোনা করতে থাকলে সামনে জানতে পারবে।
রশীদ বলল, আমার মনে কয়েকটা প্রশ্ন জেগেছে।
: বল, কী প্রশ্ন।
: সেই কিতাবগুলোর নাম কী যেখানে হাদীস বর্ণিত হয়েছে? কোন রাবী সত্যবাদী ও মেধাবী, আর কোন রাবী মিথ্যাবাদী বা দুর্বল স্মৃতিশক্তি বিশিষ্ট তা কীভাবে জানব? কোন রাবী তার উপরের রাবী থেকে শুনেছে আর কোন রাবী তার উপরের রাবী থেকে শুনেনি তা জানার উপায় কী? মেধাবী ও ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী রাবীর ভুল কীভাবে চিহ্নিত করব?
: মাশাআল্লাহ, যথার্থ প্রশ্নই মনে এসেছে। কিন্তু এগুলোর জবাব আমি আজকে দিব না। অল্প সময়ে দেওযা সম্ভবও নয়। সুযোগ করে সামনের দিনগুলোতে ধীরে ধীরে বলব। আরেকটা কথা, শুধু শুনলেই হবে না। অনেক পড়তেও হবে। আবার শুধু পড়লেও হবে না। অনেক ভাবতে হবে এবং যথাযথ বুঝতে হবে।
রশীদ সালাম দিয়ে উঠে গেল। উলূমুল হাদীস বিষয়টা তার জন্য একেবারে নতুন। আজকে যা শুনেছে তার সবই তার অজানা ছিল। সবকিছু পরিপূর্ণ না বুঝলেও উলূমুল হাদীসের মূল চিন্তাটা বুঝতে পেরেছে। অন্তরের ভিতরে উলূমুল হাদীস শেখার অদম্য আগ্রহ জেগে উঠেছে। আফফান সাহেব আদৌ বয়ানে এই এই কথা বলেছেন কি না তা যাচাইয়ের জন্য সে ঐ পন্থাই অবলম্বন করেছিল যা তার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। আজ জানতে পারল, মুহাদ্দিসীনে কেরাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীন থেকে বর্ণিত কথা ও কর্মগুলো তাদের থেকে প্রমাণিত কি না তা যাচাইয়ের জন্যও এই একই পন্থা অবলম্বন করেছেন। বলতেই হয়, মুহাদ্দিসীনে কেরামের যাচাইয়ের নীতি অনেক সুন্দর ও যৌক্তিক। নাযেম সাহেব ঠিকই বলেছেন, উলূমুল হাদীস বা মুহাদ্দিসীনে কেরামের যাচাই নীতি হলো ফিতরী তথা স্বভাবজাত।