📄 মুহাদ্দিসীনে কেরামের যাচাই পদ্ধতি
কথাটা শুনে রশীদ অবাক হলো এবং অনেক ভালো লাগল। সে মুহাদ্দিস উলামায়ে কেরামের মত যাচাই করতে পেরেছে। ভালো লাগারই তো কথা। নিজের একটা কাজ নিজের অজান্তেই অকল্পনীয়ভাবে মুহাদ্দিসীনে কেরামের সাথে মিলে গেছে। আমাদের সকল চেষ্টা প্রচেষ্টা তো এই জন্যই যে, আমাদের কাজ-কর্ম ও কথা- বার্তা সবকিছু যেন সালাফে সলেহীনের ধ্যান-ধারণার মতো হয়ে যায়।
: আমার তো মুহাদ্দিসীনে কেরামের যাচাইপদ্ধতি জানা নেই। এত কাকতলীয়ভাবে তাদের যাচাই পদ্ধতির সাথে আমার যাচাই পদ্ধতি কীভাবে মিলে গেল?
: হ্যাঁ, তোমার জানা নেই। কিন্তু তুমি অনুসরণ করেছ তোমার ফিতরত ও আকলে সালীম তথা সৃষ্টিগত যোগ্যতা, স্বভাবজাত রুচি ও সাধারণ বিবেকের। আর মুহাদ্দিসীনে কেরাম হাদীস প্রমাণিত না কি অপ্রমাণিত তা যাচাই করার ক্ষেত্রে এই ফিতরত ও আকলে সালীমেরই অনুসরণ করেছেন।
: হুজুর যদি বিষয়টা একটু খুলে বলতেন? রশীদের খুবই কৌতূহল হলো।
হুজুর একটু মুচকি হেসে বললেন, : শুনবে? আচ্ছা তবে শোনো। তোমার ঘটনার সার কথা হলো, তুমি অসুস্থতার কারণে আফফান সাহেবের বয়ানে উপস্থিত হতে পারোনি। পরে বয়ানের কথাগুলো জানতে চেয়েছো। কীভাবে জানবে? সোজা উত্তর, যারা সরাসরি আফফান সাহেবের বয়ান শুনেছে, তাদের থেকেই জানবে। তো এই যে তুমি আফফান সাহেবের বয়ানটা জানার জন্য তাদের খোঁজ করেছো যারা আফফান সাহেব থেকে সরাসরি বয়ানটা শুনেছে অর্থাৎ একটা সূত্র খোঁজ করেছ। ঠিক মুহাদ্দিসীনে কেরামও নবীজীর কথা ও কর্ম জানার জন্য সূত্র তালাশ করে। এই সূত্রকে পরিভাষায় তারা السند বলে। এরপর খেয়াল কর, আফফান সাহেবের বয়ানের কথা তোমাকে পাঁচজন জানিয়েছে। অর্থাৎ তোমার কাছে পাঁচটি সূত্র আছে।
এক. ফাহিম। সে তোমাকে আফফান সাহেবের বয়ানের কিছু কথা জানিয়েছে। কিন্তু সে নিজে উপস্থিত হয়ে বয়ান শুনেনি। তাই তুমি জানতে চেয়েছ, সে কার থেকে আফফান সাহেবের বয়ান শুনেছে। তখন ফাহিম বজলুর নাম বলেছিল, যে সরাসরি আফফান সাহেবের বয়ান শুনেছে। এই যে ফাহিম সরাসরি না শোনার কারণে তুমি যাচাই করলে সে কার কাছ থেকে শুনেছে, তারপর সে বজলুর নাম বলল, যে সরাসরি আফফান সাহেব থেকে শুনেছে, এই অনুসন্ধানকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম اتصال السند বলে।
তারপর তুমি ফাহিমকে বিশ্বাস করলেও বজলুকে বিশ্বাস করোনি। কারণ সে মিথ্যা বলে। তুমি তো তার খবরই গ্রহণ করবে যে সদা সত্য বলে। বর্ণনাকারী সত্যবাদী হওয়াকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম عدالة الراوي বলে।
তোমার দ্বিতীয় সূত্র আবীর। সে নিজে সরাসরি আফফান সাহেবের বয়ান শুনেছে। তুমি এটাও জানো, সে কখনও মিথ্যা বলে না। তারপরও তার বর্ণনার উপর তোমার আস্থা হয়নি। কারণ, তার মেধার উপর তোমার আস্থা নেই। তুমি তার বর্ণনাই গ্রহণ করবে যে ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী, যাতে সে যা শুনেছে তা মনে রেখে তোমাকে জানাতে পারে। বর্ণনাকারীর ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়াকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম ضبط الراوي বলে।
বাকি তিন, চার ও পাঁচ নাম্বার সূত্র হলো নাইম, হুসাইন ও মাহমুদ। তারা তিনজন সরাসরি আফফান সাহেব থেকে বয়ান শুনেছে। তিন জনই সত্যবাদী ও মেধাবী। তাদের মধ্যে নাইম আফফান সাহেব বয়ানে একটা কথা বলেছেন (নামায বেহেস্তের চাবি) বলে সংবাদ দিয়েছে যা বাকি দুইজন দেয়নি। এমনিভাবে হুসাইনও অন্য একটা সংবাদ দিয়েছে (যার অন্তর মাদরাসার সাথে ঝুলন্ত থাকবে তাকে আরশের নিচে ছায়া দিবে) যা বাকি দুইজন দেয়নি। নাইমের মেধা খুব ভালো, এজন্য তার একার সংবাদ তুমি গ্রহণ করেছ। কিন্তু হুসাইনের মেধা নাইম ও মাহমুদ থেকে কিছুটা কম, এজন্য তার একার সংবাদ তুমি গ্রহণ করোনি। এই যে একজনের স্মৃতিশক্তি কিছুটা দুর্বল হওয়ায় তার একার সংবাদ গ্রহণ করলে না একে মুহাদ্দিসীনে কেরাম انتفاء الشذوذ বলেন।
আরেকটা ক্ষেত্রে নাইম বর্ণনা করেছে যে, আফফান সাহেব কথাটা এভাবে বলেছেন (ডান হাত জানতে পারে না বাম হাত কী দান করে)। ঐ কথাটার ব্যাপারেই বাকি দুইজন হুসাইন ও মাহমুদ বলেছে, আফফান সাহেব কথাটি অন্যভাবে বলেছেন (বাম হাত জানতে পারে না ডান হাত কী দান করে)। এখানে তুমি দুইজনের কথা মেনে নিয়েছ। আর নাইমের সংবাদটিকে ভুল হিসেবে ধরে নিয়েছ। এই যে মতভিন্নতার সময় একজনের কথাকে প্রধান্য দেওয়া আর অন্যেরটা গ্রহণ না করা একে মুহাদ্দিসীনে কেরাম انتفاء العلة বলেন।
এখান থেকে বুঝতে পারলাম, কারো ব্যাপারে যখন কোনো সংবাদ আসে, সে এই কথা বলেছে বা এই কাজ করেছে তখন সেই সংবাদ সত্য বলে বিশ্বাস করতে হলে কয়েকটা বিষয় যাচাই করতে হয়:
১. সংবাদ দাতা নিজে ঐ ব্যক্তি থেকে সরাসরি কথাটি শুনেছে না কি তাদের মাঝে আরো কেউ আছে। কেউ থেকে থাকলে সে কে? এভাবে সংবাদ দাতাদের পরম্পরা সামনে আনা।
২. আমার থেকে নিয়ে ঐ ব্যক্তি পর্যন্ত যে কয়জন সংবাদ দাতা আছে তারা সকলে সত্যবাদী কি না তা যাচাই করা।
৩. তারা সকলে মেধাবী ও ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী কি না তা যাচাই করা।
৪. ৫. মেধাবীদেরও তো কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়। এখানে সংবাদ দিতে গিয়ে কোনো ভুল হলো কি না তা যাচাই করা।
সংবাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে মেধাবীদের ভুলটা দুইভাবে ধরা পড়ে:
এক. সে একাকী এমন একটা সংবাদ দিলো যা তার মতো ব্যক্তির একা সংবাদ দেওয়ার কথা ছিল না। ঘটনাটি বাস্তবেই ঘটে থাকলে তার সংবাদ দাতা একাধিক থাকার কথা ছিল।
দুই. সংবাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদ দাতাদের মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিলে যার মেধা শক্তি বেশি ভালো, বা যে পক্ষে সংবাদ দাতার সংখ্যা বেশি তাদেরটা ঠিক ধরে অপর পক্ষের সংবাদকে ভুল হিসেবে বিবেচনা করা।
তুমি যদিও মাহফিলে উপস্থিত ছিলে না। কিন্তু মাহফিল যে হয়েছে তাতে তোমার কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এটা অনেক মানুষ স্বচক্ষে দেখে তোমাকে জানিয়েছে। এখানে সংবাদ দাতারা সত্যবাদী কি না, মেধা শক্তির অধিকারী কি না তা যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করোনি। কারণ এত মানুষ একসাথে মিথ্যা বলবে এটাও সম্ভব না, ভুলে বলবে এটাও সম্ভব না। এমন খবরকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম متواتر বলেন।
নাযেম সাহেব রশীদের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন, সে কথাগুলো বুঝতে পেরেছে কি না। রশীদের চেহারা দেখে মনে হলো, কিছু বুঝেছে আর কিছু বুঝেনি। তাই নাযেম সাহেব বললেন, আচ্ছা তোমাকে আরেকটু সহজে বুঝানোর চেষ্টা করি।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার তেষট্টি বছরের জীবনে যত কথা বলেছেন, যত কিছু করেছেন। তার সাথে যা কিছু হয়েছে সেগুলোকে পরিভাষায় হাদীস বলে। এগুলোর একটিও কিন্তু আমরা স্বচক্ষে দেখিনি। সরাসরি নিজ কানে শুনিনি। সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি দেখেছেন ও শুনেছেন। তারপর তাবেয়ীদেরকে তার সংবাদ দিয়েছেন। তারা তাদের ছাত্রদের সেই সংবাদ দিয়েছেন। তারা সংবাদ দিয়েছেন তাদের ছাত্রদের। এভাবে হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ রহ., মুজাহিদ রহ., মুসা বিন উকবা রহ., আবু হানিফা রহ., ইবনে ইসহাক রহ., ইবনে জুরাইজ রহ., সুফিয়ান সাওরী রহ., মালেক রহ., মা'মার বিন রাশেদ রহ., আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ., ওয়াকি' ইবনুল জাররাহ রহ., আব্দুর রাযযাক রহ., আহমদ বিন হাম্বল রহ., ইবনে আবী শাইবা, বুখারী, মুসলিম রহ. সহ হাদীসের অন্যান্য সংকলকগণের কাছে পর্যায়ক্রমে এসেছে। তারা সেই হাদীসগুলোকে তাদের পর্যন্ত পৌঁছার সূত্র অর্থাৎ সংবাদ দাতাদের নামসহ লিপিবদ্ধ করে কিতাব লিখে গিয়েছেন।
📄 علم الرجال، علم آداب التحمل والأداء، علم العلل
সংবাদ দাতাদেরকে পরিভাষায় রাবী আর তাদের পরম্পরাকে সনদ বা ইসনাদ বলে। সনদে বর্ণিত হাদীসের ভাষ্যকে মতন বলে।
তুমি যেমনিভাবে সংবাদ দাতাদের যাচাই করেছ, হাদীসের ইমামগণও ঠিক এভাবে রাবীদের যাচাই করেছেন। রাবী সত্যবাদী না কি মিথ্যাবাদী, ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী না কি তার মেধাশক্তি দুর্বল তা নির্ণয় করেছেন। সনদের কোন রাবী তার উপরেরজন থেকে শুনেছে আর কোন রাবী শোনেনি তা নির্ধারণ করেছেন। তাদের এই মেহনতের ফলে علم الرجال، علم آداب التحمل والأداء، علم العلل সামনে এসেছে। এই বিষয়ে রচিত হয়েছে শত শত কিতাব।
পূর্ববর্তী রাবী যথাযথভাবে তার পরবর্তী রাবীর কাছে রেওয়ায়াত করেছে কিনা, পরবর্তী রাবী তার পূর্ববর্তী রাবী থেকে রেওয়ায়াতটা যথাযথভাবে গ্রহণ করেছে কিনা, গ্রহণ করার পর থেকে নিয়ে তার পরবর্তী রাবীর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যথাযথভাবে নিজের স্মৃতি বা লেখায় সংরক্ষণ করেছে কিনা- হাদীসের ইমামগণ এ বিষয়গুলোও যাচাই করেছেন। এ নিয়ে তারা একাধিক কিতাবও লিখেছেন। তাদের এই প্রচেষ্টায় সামনে এসেছে علم آداب التحمل ও الأداء
এমনকি শক্তিশালী মেধার অধিকারী হয়েও যাদের কিছু কিছু রেওয়ায়াতে ভুল হয়ে গেছে সেই ভুলগুলোও চিহ্নিত করেছেন। এই অংশে তাদের মেহনতের ফসল হলো علم العلل। এ বিষয়েও রচিত হয়েছে অনেক কিতাব।
📄 مرفوع، موقوف، مقطوع
এভাবেই তারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবেই কোন কথাটি বলেছেন, কোন কাজটি করেছেন তা চিহ্নিত করেছেন। যেটা তিনি বলেননি, তিনি করেননি, কিন্তু কোনো মিথ্যুক রাবী তার নামে চালিয়ে দিয়েছে বা কোনো সত্যবাদী কিন্তু দুর্বল মেধার রাবী তার দিকে ভুলবশত সম্বন্ধ করে ফেলেছে তা-ও আলাদা করে দিয়েছেন। এই কাজটি করতে গিয়ে তারা রচনা করেছেন সিহাহের কিতাব, যেখানে শুধু তার থেকে প্রমাণিত হাদীসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। সংকলন করেছেন মাওযুআত ও মানাকিরের কিতাব, যেখানে তার থেকে অপ্রমাণিত হাদীসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও লিখেছেন তাখরীজের কিতাব, যেখানে তার থেকে অনেক প্রমাণিত ও অপ্রমাণিত হাদীসগুলো নির্ণয় করা হয়েছে।
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন ও পূর্ববর্তী সালাফ থেকে অনেক কথা ও কর্ম বর্ণিত হয়েছে। তাদের থেকে বর্ণিত কথা ও কর্মকেও হাদীসের ইমামগণ এভাবেই যাচাই বাছাই করেছেন।
পরিভাষায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধকৃত কথা ও কর্মকে مرفوع বলে। আর সাহাবায়ে কেরামের দিকে সম্বন্ধকৃত কথা ও কর্মকে موقوف বলে। আর তাদের পরবর্তীদের থেকে বর্ণিত কথা ও কর্মকে مقطوع বলে।
📄 উসূলুল হাদীস, মুসতালাহুল হাদীস ও উলুমুল হাদীস
এই যাচাই-বাছাইয়ের কাজগুলো করতে গিয়ে তারা কিছু যৌক্তিক ও স্বভাবজাত নিয়মনীতির অনুসরণ করেছেন। ঐ নীতিগুলোকে বলা হয় أصول الحديث الأصول التي يميز بها الحديث الثابت عن النبي صلى الله عليه وسلم عما لم يثبت।
সহজতার জন্য দীর্ঘ কথাকে সংক্ষেপে বুঝাতে তারা কিছু পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। ঐ পরিভাষাগুলোকে বলা হয় مصطلح الحديث উসূলুল হাদীস, الكلمات والتعابير التي اصطلحوا عليها لإفهام أمور وقضايا اختصারা। এই উসুল ও মুস্তালাহগুলো একত্রে লিপিবদ্ধ করেও তারা অনেক কিতাব লিখেছেন।
তুমি তো উলূমুল হাদীসের নাম অনেক শুনে থাক। কিন্তু জানো উলূমুল হাদীস কী?
: জ্বী না।
হাদীসের কিতাব সমূহে বর্ণিত বিভিন্ন রেওয়ায়াতের ভাণ্ডার তথা مرویات حديثية, ইলমুর রিজাল, ইলমু আদাবিত তাহাম্মুলি ওয়াল আদা, ইলমুল ইলাল, উসূলুল হাদীস ও মুস্তালাহুল হাদীস- তোমাকে এতক্ষণ যেগুলোর কথা বললাম এগুলোর সমষ্টিকেই উলূমুল হাদীস বলে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীন থেকে যা বর্ণিত তা প্রমাণিত কি না এই বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য মুহাদ্দিসীনে কেরাম যা যা করেছেন তার সমষ্টিকেই উলূমুল হাদীস বলে।