📘 উলামা তলাবা > 📄 নেয়ামতে ইসলামের মূল্যায়ন ও তার জন্য শোকর আদায়করণ

📄 নেয়ামতে ইসলামের মূল্যায়ন ও তার জন্য শোকর আদায়করণ


[১৯৮৪ ইং সনের ১০ মার্চ বাংলাদেশের বৃহৎ দ্বীনী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় আজিমুশ্বান বার্ষিক মাহফিলে প্রদত্ত ভাষণ। এটি ছিল মাওলানার বাংলাদেশ সফরে প্রথম ভাষণ।]

الْحَمْدُ لِلَّهِ وَحْدَهُ وَالصَّلوةُ وَالسَّلَামُ عَلَى مَنْ لَا نَبِيَّ بَعْدَهُ - أَمَّا بَعْدًا

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَيْنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

আমার প্রিয় বাংলাদেশী ভাই ও বন্ধুগণ!

বাংলাদেশ উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ। এরূপ একটি দেশে আমি এতদিন আসিনি। আপনাদের সাক্ষাতে এখানে আসার এই বিলম্বকে আমি আমার ত্রুটি ও অবহেলা বলে মনে করছি। আমার এই ত্রুটির জন্য আমি আপনাদের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করছি এবং আল্লাহর এই পবিত্র ঘর, জামেয়া ইসলামিয়ার এই বৃহৎ মসজিদে বসে আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার করছি। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মুসলিম দেশে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পৃক্তকারী এত বিশাল সংখ্যক লোক বসবাস করে, এত বিপুল পরিমাণ লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারণ করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করে, আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়, ইসলামের কালিমা উচ্চারণ করে অথচ আমি তাঁদের নিকট এত দেরিতে আসলাম! আল্লাহ তাআলা আমার এই অপরাধ ক্ষমা করে দিন।

সুধী! আমি আপনাদের সামনে একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— “স্মরণ কর, তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, তোমরা যদি শোকর আদায় কর তবে তোমাদেরকে অবশ্যই বৃদ্ধি করে দেব। আর যদি নাশোকরী কর, অকৃতজ্ঞ হও তবে জেনে রাখ, আমার শাস্তি অবশ্যই কঠোর।” (সূরা ইবরাহীম ৭)

মানুষ যখন অন্য কোন জাতির শান-শওকত দেখে, আড়ম্বরপূর্ণ জীবন দেখে, আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী কোন বিষয় দেখে তখন শয়তান আক্রমণের সুযোগ পায়, মুসলমানদের মধ্যে লোভ সৃষ্টি করে দেয় অনুরূপ বিষয়গুলো লাভ করার। পৃথিবীতে বহু জাতি আছে যারা তাওহীদের বিশ্বাস এবং ইসলামের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত। তাদের কেউ বৃক্ষপূজা করে, কেউ মূর্তিপূজা করে। দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে নজর নিয়াজ করে। মেলার আয়োজন করে। সেখানে চিত্তবিনোদনের নানা সামগ্রী ও ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে। কোন কোন সম্প্রদায় এক্ষেত্রে পদস্খলিত হয়েছে এবং শয়তানের আক্রমণের শিকার হয়েছে। তাদের অন্তরে এই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছে যে, আহা! যদি আমরাও এরূপ করতে পারতাম!

দুনিয়ার বহু জাতি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে পূজনীয় দেব-দেবীর মর্যাদা দান করেছে। কেউ আঞ্চলিক বা ভাষাগত জাতীয়তাকে দেবতা বানিয়ে নিয়েছে, কেউ দেশকে, কেউ ভাষাকে দেবতা বানিয়ে নিয়েছে। কেউ পূর্ব পুরুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে দেবতা বানিয়ে বসেছে। কেউ কুলিনতা ও বংশ মর্যাদাকে, কেউ রঙ ও বর্ণকে দেবতা বানিয়ে বসেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এইসব অলীক দেব-দেবী থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা যেন সর্বদা ইসলাম নিয়ে গর্বিত থাকি এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তি জাগ্রত না হয় আমাদেরকে সেই শিক্ষাই দান করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রটি মানুষের পদস্খলনের ক্ষেত্র। কাউকে সুস্বাদু খাবার খেতে দেখলে যেরূপ জিহ্বায় পানি এসে পড়ে তদ্রূপ কোন কোন জাতির ভ্রষ্টতা নির্দেশক জীবনাচার দেখে অনেকে লোভাতুর হয়ে পড়ে, অনুরূপ জীবনাচারকে গ্রহণ করতে চায়।

আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে একজন মহান নবীর সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য দান করেছিলেন। কিন্তু তাদেরও পদস্খলন ঘটেছিল। মূর্তিপূজার দৃশ্য দেখে তারা স্থির থাকতে পারেনি। তারা আকাঙ্ক্ষা করে বসেছিল যে, তাদেরও যদি এইরূপ কোন কিছুর উপাসনা করার ব্যবস্থা থাকত তাহলে ভাল হত। সূরা আরাফে আল্লাহ তাআলা ঘটনাটি এভাবে ব্যক্ত করেছেন— “আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম, অতঃপর তারা প্রতিমা পূজায় রত এক জাতির নিকট উপস্থিত হল। তারা বলল, হে মুসা! তাদের দেবতার ন্যায় আমাদের জন্যও এক দেবতা গড়ে দাও। মুসা বলল, তোমরা তো বড় মূর্খ সম্প্রদায়। এইসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে, তা তো বিধ্বস্ত হয়ে যাবে এবং তারা যা করছে তা অমূলক।” (সূরা আরাফ ১৩৮-১৩৯)

আল্লাহ তাআলা এই বনী ইসরাঈলকেই বলেছেন— “হে ইয়াকুবের সন্তানেরা! তোমরা আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ কর যা দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছিলাম এবং বিশ্বে তোমাদেরকে সবার উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম।” (সূরা বাকারা ৪৭)

তাফসীরবিদগণ বলেন, বিশ্বের সবার উপরে বনী ইসরাঈলের যে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তা ছিল তাওহীদের কারণে। ইসরাঈল বা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সন্তানদের মধ্যে সব সময় তাওহীদের বিশ্বাস বিদ্যমান ছিল। তৎকালীন যুগে বিশ্বের অপরাপর জাতির তুলনায় তারাই ছিল সর্বাধিক তাওহীদে বিশ্বাসী ও আল্লাহ তাআলার ইবাদতকারী। কিন্তু হযরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগে এই জাতি বহু বৎসর যাবৎ মিসরে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সাহচর্য ও শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করেও পদস্খলনের শিকার হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম। তারা এমন এক জাতির নিকট উপস্থিত হল, যারা লিপ্ত ছিল তাদের দেব-দেবীর পূজায়।” সেখানে সম্ভবত দোকানপাট বসেছিল, খাবার-দাবার রান্না হচ্ছিল, গান-বাজনা হচ্ছিল। মেলা ইত্যাদিতে এসব হয়েই থাকে। তো মুসা আলাইহিস সালাম এতদিন যাবৎ বনী ইসরাঈলকে যে পাঠ দান করেছিলেন, যে শিক্ষা-দীক্ষা দান করেছিলেন, তা তারা সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে গেল। তারা বলল— “হে মুসা! আমাদের জন্যও এক দেবতা গড়ে দাও তাদের দেবতাদের ন্যায়।” অর্থাৎ এমন এক উপাস্য আমাদের জন্য নির্ধারিত করে দাও, যাকে আমরা স্পর্শ করতে পারব, সরাসরি চোখে দেখতে পারব এবং তার পা চুম্বন করতে পারব। হযরত মুসা (আ.) তাদের এই কথায় ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি বললেন— “তোমরা তো অবশ্যই মূর্খ সম্প্রদায়! তোমরা চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্বোধ, অকৃতজ্ঞ ও মূর্খ। এতদিন যাবৎ তোমাদেরকে আমি শিক্ষাদান করলাম, এই নিকৃষ্ট জীবনাচার থেকে মুক্ত করলাম, অথচ তোমরা এখন তাদের অনুরূপ মূর্তিপূজায় লিপ্ত হতে চাচ্ছ, মেলা বসাতে বলছ, গান-বাজনার আয়োজন করতে বলছ। এইসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো ধ্বংসশীল এবং তারা যা করছে তা অমূলক।” তাদের দেবতা তাদের কোন উপকারেই আসবে না। এগুলো তো সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

বন্ধুগণ! বনী ইসরাঈলের ওই ঘটনায় আমাদের জন্য রয়েছে একটি দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা, একটি সাবধান বার্তা। আল্লাহর নবী সাইয়্যেদুনা মুসা আলাইহিস সালামের সযত্ন তত্ত্বাবধানে ও নজরদারিতে যে জাতি বহু বৎসর কাটালো তারাও মারাত্মক ভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়ল। দৃশ্যযোগ্য, শরীরবিশিষ্ট ইলাহের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে বসল। এই ঘটনার কাছাকাছি একটি ঘটনা মুসলমানদের মধ্যেও ঘটেছিল। যদিও ঘটনাটি তত বিপজ্জনক ও ভ্রষ্টতামূলক ছিল না। নির্দিষ্ট একটি গাছে কাফেররা তাদের তরবারী ও যুদ্ধাস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। সেখানে তারা পশু যবেহ করত এবং একদিন সেখানে অবস্থান করত। হাদীসের কিতাবে এসেছে যে, হুনায়নের যুদ্ধে গমনকালে নও-মুসলিম কিছু সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমাদের জন্যও তাদের অনুরূপ একটি গাছ নির্দিষ্ট করে দিন, যাতে আমরা সেখানে বসতে পারি, মেলার আয়োজন করতে পারি, বাজার বসাতে পারি, পশু কুরবানী করে খাবার-দাবারের আয়োজন করতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বনী ইসরাঈল হযরত মুসার নিকট যেরূপ আবেদন করেছিল তোমরাও আমার নিকট সেইরূপ আবেদন করলে। তারা বলেছিল— “আমাদের জন্যও তাদের দেবতার ন্যায় এক দেবতা গড়ে দাও।” “হে মুসলমানগণ! তোমরা তাদের কদমে কদমে অনুসরণ করে ছাড়বে।”

একবার কোন এক সফরে জনৈক আনসারী সাহাবীর সঙ্গে জনৈক মুহাজির সাহাবীর কিছুটা বিবাদ হল। আনসারী সাহাবী চিৎকার করে বলল— “আনসারীদের দোহাই।” মুহাজির সাহাবীও চিৎকার করে বলল— “মুহাজিরদের দোহাই।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— “ছাড় এটাকে। কারণ এটা অপবিত্র ও দুর্গন্ধময়।”

ভাই ও বন্ধুগণ! শয়তান আমাদেরকে বিপথে পরিচালিত করতে ওঁৎ পেতে আছে। সে তার নিজ কর্মে কখনও অবহেলা করে না, কখনও উদাসীন থাকে না। সে নতুন নতুন পদ্ধতিতে মানুষকে প্ররোচিত করে। কখনও এই রঙে, কখনও ঐ রঙে। সে জানে, কোন মানুষকে কিভাবে প্রভাবান্বিত করতে হয়, কিভাবে পথচ্যুত করতে হয়, কোন পদ্ধতি মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে অধিক কার্যকর। আলেরমের পরিবারে যেয়ে সে কাউকে চুরি করতে বলবে না। কারণ আলেমের পরিবারের কাউকে দিয়ে চুরির অপরাধ সংঘটিত করানো সহজ নয়। সে তাদেরকে অহংকারের তালীম দেবে। পিতৃপুরুষ নিয়ে গর্ব করতে শিক্ষা দেবে। ব্যবসায়ীর নিকটে যেয়ে সে তাকে মাপে কম দেওয়ার ব্যাপারে প্ররোচিত করবে, অবৈধ পন্থা অবলম্বন করতে প্ররোচিত করবে, অতি মুনাফার ব্যাপারে লোভী করে তুলবে। তদ্রূপ যে সমাজকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের সম্পদ দান করেছেন, ইলম ও মেধা দান করেছেন, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব দান করেছেন শয়তান সেই সমাজকে প্ররোচিত করে এই বলে যে, ইসলামের নেয়ামত তো সবাই লাভ করেছে তোমাদের বৈশিষ্ট্য হল ভাষাগত, জাতিগত। তোমাদের উচিত ভাষাগত ও জাতিগত ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করা। শয়তানের এই মারাত্মক অস্ত্র সে সুযোগ বুঝে ব্যবহার করে থাকে।

আপনারা ইসলামের রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন। আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” শয়তান মানুষের মাঝে বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। কারও সামনে জাতীয়তার অসার মতবাদ দাঁড় করিয়ে দেয়, কারও সামনে সম্পদ, কারও সামনে বস্তুবাদিতা ইত্যাদি নানা বিষয় দাঁড় করিয়ে দেয় এবং তাতে এরূপ আকর্ষণ সৃষ্টি করে যে, অনেক সময় এসবকে কেন্দ্র করে মানুষ হানাহানিতে লিপ্ত হয়, একে অপরকে হত্যা করতে চেষ্টা করে। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিরীহ শিশুরাও রেহাই পায় না। নারীরা হয় নির্যাতিতা, ধর্ষিতা। এইসব শয়তানী চক্রান্ত। আমাদের সকলেরই ইসলাম নিয়ে গর্ব করা উচিত। ইসলামকে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মনে করা উচিত। ইসলামের সব বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা উচিত।

হাদীস শরীফে এসেছে, সমাজে মর্যাদাহীন কুৎসিত চেহারা বিশিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা লাভ করবে। আর তা হবে তাকওয়ার কারণে। “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানের অধিকারী হবে ঐ ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়ার অধিকারী।” আল্লাহ তাআলা তাকওয়াকে বানিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, ইবাদতকে বানিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, ইলমকে বানিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। “কোন অনারবের উপর কোন আরবের এবং কোন আরবের উপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই তাকওয়া ব্যতীত।” কোন সাদার উপর কালোর কিংবা কালোর উপর সাদার অন্য কোন ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়নি। শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হল তাকওয়া। কে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান ও মারেফাত বেশি রাখে, কে দ্বীনের জ্ঞান বেশি রাখে, কে অপেক্ষাকৃত অধিক সুন্দরভাবে নামায আদায় করতে জানে, কে ইসলামের উপর অধিক গর্বিত, কে ইসলামের নেয়ামত পেয়ে অধিক শোকরিয়া আদায় করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রেম ও ভালবাসা কার অধিক—এসব বিষয়ই আল্লাহর নিকট বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু শয়তান আমাদেরকে এসব বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। এইজন্যই বলা হয়েছে— “নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু, অতএব তাকে শত্রুরূপেই বিবেচনা কর।” অন্যত্র বলা হয়েছে— “শয়তান ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা তোমাদেরকে এমন স্থান থেকে দেখে যে, তোমরা তাদের দেখতে পাও না।” শয়তান যেমন জীন বেশে থাকে, তেমনি মানুষের বেশেও আগমন করে। শত্রুবেশেও আসে, বন্ধুবেশেও আসে। শয়তান বহু ভাষায় কথা বলতে পারে। আমাদের চেয়ে উত্তম ভাষায় সে কথা বলতে পারে। চমৎকার ভাষায় সে বোঝাতে পারে। আপনারা এইরূপ সকল শত্রু থেকে সতর্ক থাকবেন। ইসলামের রশি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবেন। ইসলাম নিয়ে গর্বিত থাকবেন। কারণ ইসলাম অপেক্ষা অধিকতর গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। ইসলাম নিয়ে জীবিত থাকুন, ইসলাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করুন। ইসলামের জন্য জীবন দান করুন। ইসলামের জন্য শির দিয়ে দেওয়া বৈধ কিন্তু ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুর জন্য এক বিন্দু রক্ত দেওয়াও অন্যায় ও অবৈধ।

আরব দেশে ১৯৬৫-৬৬ সালে এক ঝড় উঠেছিল। সর্বনাশা তুফান সৃষ্টি হয়েছিল। লাখ লাখ আরবকে এক ব্যক্তি পাগল বানিয়ে দিয়েছিল।¹ কিন্তু তার স্থায়িত্ব ছিল অল্প কিছুদিন। সে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ রয়ে গেছেন। তাঁর রাসূল রয়ে গেছেন। কিবলা এখনও রয়ে গেছে। মসজিদে নববীও এখনও তেমনি আছে। কুরআন শরীফও বহাল আছে। ঐ কুহক দূরীভূত হয়ে গেছে। “নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হবারই। বাতিল কখনও স্থায়িত্ব লাভ করে না।” আপনাদের গর্বের বিষয় একমাত্র ইসলাম। ইসলামের আহ্বান ব্যতীত অন্য কিছু যেন আপনাদেরকে আকৃষ্ট করতে না পারে। ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতি আপনাদের অন্তর যেন ধাবিত না হয়। আর সেটাই হবে ইসলামের কারণে শোকর আদায়, ইসলামের জন্য গর্ব প্রকাশ। আমি দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা আপনাদের ঈমান ও চিন্তা-চেতনাকে হেফাযত করেন। আমাদের ও আমাদের সাথী-সঙ্গীদের ঈমান ও মানসিকতাকে হেফাযত করেন।

ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

টিকাঃ
১. মিসরের জামাল আবদুন নাসেরের কথা বোঝানো হয়েছে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 ভালবাসা ও নিখাদ রূহানিয়াতের বিজয়

📄 ভালবাসা ও নিখাদ রূহানিয়াতের বিজয়


[১৯৮৪ ইং সনের ১৪ মার্চ হোটেল পূর্বাণীতে হযরত মাওলানার সম্মানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত নৈশভোজ উপলক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর মহাপরিচালক জনাব আবুল ফায়েদ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া সাহেবের স্বাগত ভাষণের জবাবে প্রদত্ত ভাষণ।]

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ وَالصَّلوةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِينَ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ ডিন - أَمَّا بَعْدُ

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মহোদয় ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আপনাদের ন্যায় বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণীর সঙ্গে এক জায়গায় একত্রিত হতে পেরে আমি অত্যন্ত মোহিত ও আনন্দিত। আমার উচিত ছিল, আপনাদের প্রত্যেকের বাসা-বাড়িতে যেয়ে যেয়ে আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাত করা। কিন্তু সময়ের স্বল্পতা ও শহরের বিশালতার কারণে এটা আমার পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। মহাপরিচালক আবুল ফায়েদ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া সাহেব আপনাদের সকলের সঙ্গে একই সময়ে, একই স্থানে মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য আমি তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আমি অকৃত্রিম আন্তরিকতার সাথেই বলছি যে, এই মুহূর্তে আমার অত্যন্ত দুঃখ হচ্ছে এই ভেবে যে, আমি বাংলা ভাষা জানি না। পৃথিবীর সকল ভাষাই আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট। আল্লাহ তাআলা ভাষার বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করে আমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ জাহির করেছেন— “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য তাঁর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই এতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন।” (সূরা রূম ২২)

অতএব ভাষার বিভিন্নতা নিন্দনীয় কোন বিষয় নয়। আর বাংলা ভাষা তো মুসলমানদের ভাষা। এই ভাষায় রয়েছে জ্ঞান ও সাহিত্যের ভাণ্ডার। উপমহাদেশের একজন বাসিন্দা হিসাবে আমি যদি বাংলা ভাষা জানতাম তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি আপনাদের সামনে আপনাদের প্রিয় মাতৃভাষায় কথা বলতে পারছি না। এর একমাত্র বিকল্প ছিল আরবী ভাষায় কথা বলা। আমি আরবীতে বলতাম আর আপনারা বুঝে নিতেন। তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। আরবী ভাষাতো ইসলামের সরকারী ভাষা। মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক প্রিয় ও ব্যাপক ভাষা।

সুধী! যখন আমি ঈমানের দেশ, বড় বড় আলেম-উলামার দেশ ও ওলী-আল্লাহর দেশ এই বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছি তখন থেকেই আমার অন্তর আনন্দে আপ্লুত হয়ে আছে। একজন ইতিহাস গবেষক হিসাবে আমি মনে করি, এই ভূখণ্ডে এত বিপুল পরিমাণ মুসলমানের বসতি শুধু ইখলাস ও রূহানিয়াতের ফসল। যদি নিখাদ রূহানিয়াত ও রাজনৈতিক স্বার্থমুক্ত ইখলাস না থাকত, যদি খাঁটি আল্লাহ-প্রেম ও মানবতা-প্রীতি না থাকত (যা আমাদের বুযুর্গানে দ্বীনের মধ্যে ছিল) তবে এই ভূখণ্ড ইসলামের নেয়ামতে এরূপ সমৃদ্ধ ও এরূপ ইসলাম-প্রেমিক হতে পারত না। বর্তমানে একজন মানুষের হৃদয় জয় করাও সুকঠিন বলে মনে হয়। কিন্তু আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ শুধু ইখলাসের বদৌলতে অত্যন্ত সহজভাবে লাখ লাখ মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন, তাদেরকে নিজেদের ভক্ত ও প্রেমিক বানিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশে মুসলমানদের এই সংখ্যাধিক্য কোন মুসলিম সামরিক অভিযানের ফল নয়। আমি অত্যন্ত আস্থা ও দৃঢ়তার সাথে আপনাদের সামনে বলতে চাই যে, যে সকল জায়গায় মুসলিম সেনাবাহিনী যায়নি সেখানেই মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর যেখানে শত শত বৎসর যাবৎ মুসলিম শাসন বহাল ছিল সেখানে দেখা যায় যে, মুসলমানরা সংখ্যালঘু। ইরান থেকে হযরত সাইয়েদ আলী হামদানী এসে গোটা কাশ্মীরকে তার ভালবাসা ও প্রেম দ্বারা শিকার করে ফেললেন। তিনি আসলেন আর সমগ্র কাশ্মীর ইসলামের কালিমা গ্রহণ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল। ইসলামের প্রতি কাশ্মীরবাসীর প্রেম ও ভালবাসা এই পর্যায়ে উপনীত হল যে, বড় বড় ব্রাহ্মণ পরিবারের লোকেরাও ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল। কাশ্মীরেরই এক ব্রাহ্মণ সন্তানকে আমরা দেখতে পাই (আল্লামা ইকবাল) সাইয়েদ বংশীয় একজনকে লক্ষ্য করে আবেগময় ভাষায় কবিতা রচনা করতে— এই রাসূল প্রেম সৃষ্টি হয়েছিল রূহানিয়াতের দ্বারা, ইখলাসের দ্বারা, খাঁটি মানবপ্রেম ও আল্লাহর তাবেদারী দ্বারা। আল্লাহর তাবেদারী এবং মানবপ্রেম এই উভয় গুণের যখন মিলন ঘটে, যখন এই দুই সাগর একই স্থানে এসে মিলেমিশে যায়, অর্থাৎ কেউ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের আল্লাহর তাবেদার হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে যথার্থ মানবপ্রেম তখন তার বিজয় রথকে কেউ রোধ করতে পারে না। অন্ধকারের বুক চিরে তখন পরিস্ফুট হয় আলো। বর্তমান যুগেও দুনিয়ার সকল সঙ্কট ও সকল বিপর্যয়ের একমাত্র চিকিৎসা ইখলাস ও আন্তরিকতা, যথার্থ রূহানিয়াত এবং নিজের সব রকম স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে খেদমতে নিয়োজিত হওয়া।

পূর্ববাংলাতেও দরবেশ এসেছেন, আল্লাহওয়ালা ফকীর এসেছেন। তাঁরা এসেছেন এবং মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। মানুষ আদম সন্তানদেরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। একদল তো তারা, যারা নিজেদেরকে মানুষ মনে করত। আর অপর দল ছিল তারা, যাদেরকে জীব-জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করা হত। মানুষের তৈরি এই কৃত্রিম বিভক্তিকে ঐ সকল দরবেশ ও সুফীগণ মানবপ্রেম দিয়ে উৎখাত করেছিলেন। তাঁরা ইসলামের পয়গাম নিয়ে এসেছেন, তাওহীদের পয়গাম নিয়ে এসেছেন এবং মানবতার ঐক্যের পয়গাম নিয়ে এসেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ আরববাসীকে লক্ষ্য করে বললেন, যারা তৎকালীন যুগে ছিল সর্বাধিক বংশপূজারী, ভাষা পূজারী, এমনকি যারা গোটা পৃথিবীকে নিজেদের তুলনায় বোবা ও ভাষাহীন বলে জ্ঞান করত, আরবী ভাষা ব্যতীত অন্য ভাষাকে ভাষা বলেই মনে করত না— “তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতা একজন। তোমাদের সকলেই আদম থেকে আর আদম মাটি থেকে। কোন অনারবের উপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন আরবের উপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কালোর উপর সাদার, সাদার উপর কালোর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি একমাত্র তাকওয়া।”

“হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী।” (সূরা হুজুরাত ১৩)

মুহাম্মাদ আরবী, হাশেমী, কুরাইশী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে লোক সকল! হে মানুষ! হে আরববাসী! তোমাদের সৃষ্টিকর্তা এক, তোমাদের পিতাও এক। দুই দুইটি দিক থেকে তোমরা একে অপরের ভাই।
এক আল্লাহ তাআলার দিক থেকে, আল্লাহ তাআলার বান্দা হওয়ার দিক থেকে।
দুই তোমাদের আদি পিতা ও উর্ধ্বতন পুরুষের দিক থেকে।
আল্লাহর একত্ব ও মানব বংশের একত্ব দুইটি স্তম্ভ। এই উভয় স্তম্ভের উপর মানবতা প্রতিষ্ঠিত। এই দুই স্তম্ভের যে কোন একটিকে ভূপাতিত করা হলে মানবতা ও মানব সভ্যতার সুউচ্চ প্রাসাদ ভূপাতিত হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে।

ঐ সকল সুফী ও দরবেশের মাধ্যমেই এখানে ইসলাম এসেছে, যাঁরা বুদ্ধি ও মস্তিষ্ক দিয়ে কথা বলার পূর্বে হৃদয় দিয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা মুখের ভাষায় কথা বলেননি, তাঁরা কথা বলেছেন হৃদয়ের ভাষায়। মুখের ভাষা হতে পারে পঞ্চাশটি কিন্তু হৃদয়ের ভাষা হয় একটিই, আত্মার ভাষা একটিই, সত্যতা ও সততার ভাষা একটিই, ভালবাসার ভাষা একটিই। ভালবাসা ও প্রেমের ভাষা সকলেই বোঝে। তার জন্য দোভাষীরও প্রয়োজন হয় না। চোখের প্রেমময় চাহনী, ঠোঁটের মুচকি হাসি, হৃদয় উপচে পড়া ভালবাসার ফোয়ারা শত্রুকেও, জংলী বাঘ ও সিংহকেও বশীভূত করে ফেলতে পারে। নিজের কথা তাদের মুখে উচ্চারণ করিয়ে দিতে পারে।

আমি আপনার (মহাপরিচালক) প্রতি যারপরনাই কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করছি। আপনি শুধু ঢাকার নয় বরং বাংলাদেশের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে এখানে একত্রিত করেছেন। আমার অন্তরে এই কথা উদিত হচ্ছে যে, যে দেশে এত জ্ঞানী-গুণীজণ বিদ্যমান, যে দেশে এত ইসলাম প্রেমিক বিদ্যমান, যাঁরা তাদের এক পরদেশী ভাইয়ের কথা শোনামাত্র সকল জরুরী কাজ ফেলে দিয়ে এখানে ছুটে এসেছেন ইসলামের সাথে সে দেশের সম্পর্ক চিরঅটুট থাকতে বাধ্য, কখনও বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।

গুণগত (Quality) ও পরিমাণগত (Quantity) উভয় দিক দিয়ে এই সমাবেশ অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এই সমাবেশ আমাকে এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী করে তুলছে যে, যেখানে এত বিপুল সংখ্যক মুসলমানের বসবাস, যেখানে এত পণ্ডিত ও জ্ঞানী-গুণী বিদ্যমান, যেখানে এত শিক্ষিত বিদগ্ধজন (SCHOLARS) বিদ্যমান, ইসলামের সাথে সেই দেশের জ্ঞানগত সম্পর্ক, তাহযীবী ও তামাদ্দুনিক সম্পর্ক, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কখনও বিচ্ছিন্ন হবার নয়। আপনি (মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন) এই বিপুল সংখ্যক জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গকে এখানে সমবেত করে তাঁদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে আমাকে বিরাট তোহফা ও উপহার দিয়েছেন।

আমি আমার কথাকে দীর্ঘ করে আপনাদের নৈশভোজ গ্রহণের সময়কে বিলম্বিত করে দিচ্ছি। আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। খাবার তো সব সময়ই পাওয়া যাবে কিন্তু আপনাদেরকে আমি কোথায় পাব?

খোশামোদ ও চাটুকারিতা নয় বরং আমি যথার্থই বলছি, আপনারা সরল ও স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী, ইসলামের প্রতি অন্তরে প্রেম ও আবেগ লালনকারী একটি জাতি পেয়েছেন। অনেক দেশের ভাগ্যেই যা জোটে না। আপনারা এর মূল্যায়ন করবেন। আপনারা বড় বড় Politicians ও রাজনীতিবিদ পাবেন, Diplomates ও কূটনীতিবিদ পাবেন, বড় বড় মেধাবী ও প্রতিভাধর ব্যক্তি পাবেন, কিন্তু সততা ও মমতা সর্বত্র পাবেন না। আপনাদের এই জাতির মধ্যে সততা ও ভালবাসা বিদ্যমান। আপনাদের দায়িত্ব হল এই জাতিকে কাজে লাগানো। আমি টরেন্টো গিয়েছিলাম। সেখানে লোকেরা আমাকে নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখিয়েছে। জলপ্রপাতটি বিশ্বের বিস্ময়কর বস্তুসমূহের একটি। হাজার হাজার ফুট উপর থেকে এর পানি নিচে পতিত হয়। বিভিন্ন দেশের পর্যটকগণ জলপ্রপাতটি দেখতে ভীড় জমায়। আমিও দেখতে গিয়েছিলাম। এই জলপ্রপাতকে কাজে লাগিয়ে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা না হয়, এ থেকে Energy গ্রহণ করা না হয় এবং এর পানি যদি ক্ষেত-খামারে সিঞ্চিত করা না হয় তবে জলপ্রপাতটির কোন মূল্য থাকে না, বেকার বস্তুতে পরিণত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে একটি জলপ্রপাত দান করেছেন। ঈমানের জলপ্রপাত। আর তা হল বাংলাদেশের বিশাল মুমিন জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সততার জলপ্রপাত, ইখলাসের জলপ্রপাত। আপনারা এই জলপ্রপাতকে কাজে লাগান।

এর দ্বারা বিদ্যুৎ ও শক্তি উৎপাদন করুন। যে সকল সমস্যা ও সঙ্কট সম্পর্কে আপনারা মনে করছেন যে, তা দূরীভূত হবার নয়, সমাধানযোগ্য নয় সে সকল সমস্যার সমাধান মুহূর্তেই হয়ে যেতে পারে যদি সততা ও ইখলাস থাকে। আপনাদের এই জাতির মধ্যে এই মহা মূল্যবান সম্পদ বিদ্যমান রয়েছে। অতএব আপনারা এদের দ্বারা যে কাজ নিতে চান নিতে পারবেন।

তবে এটা রাজনীতিকদের কাজ নয়। এটা ঐ সকল ব্যক্তির কাজ যারা স্বচ্ছ ও খাঁটি হৃদয়ের অধিকারী, ইখলাসের অধিকারী। যাদের অন্তরে রয়েছে জাতির প্রতি প্রেম ও ভালবাসা। যারা এই জাতির নিকট থেকে কিছু পেতে চায় না, শুধু দিতে চায়। যারা জাতির সেবা করতে চায় এবং এর বিনিময় চায় শুধুই আল্লাহর নিকট। এই জাতীয় ব্যক্তিগণ এই জাতির মাধ্যমে পরশ পাথর বানাতে পারে, পারে সোনা তৈরি করতে। এই জাতি তো সোনার জাতি। এই জাতি শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং গোটা বিশ্বে এক নতুন শক্তির সঞ্চার করতে পারে। তবে এটা তখনই হবে যখন আমরা নেয়ামত স্বরূপ আল্লাহ তাআলা যে জাতি আমাদেরকে দান করেছেন তার মূল্যায়ন করব। এই জাতি নায়েগ্রা জলপ্রপাত স্বরূপ। আপনারা এর দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করুন। এর পানি অযথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং বহুদিন যাবৎ নষ্ট হচ্ছে। এর দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুৎ সমগ্র উপমহাদেশকে (Sub continent) আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি আরব বিশ্বেও সে আলো পৌঁছে যেতে পারে।

আপনারা আপনাদের এই জাতির মূল্যায়ন করবেন। প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মের মাঝে, উলামা হযরাত ও ভার্সিটি পড়ুয়া গ্রাজুয়েটদের মাঝে দূরত্বের যে সাগর সৃষ্টি হয়েছে এবং দিন দিন গভীর ও বিস্তৃত হচ্ছে সেই সাগরকে ভরাট করবেন, উভয় শ্রেণীর দূরত্বকে দূরীভূত করবেন। উভয় শ্রেণী যেন বন্ধুতে পরিণত হয়। আলেমগণ আধুনিক শিক্ষিতদেরকে দ্বীনী বিষয়ে সহায়তা করবেন, তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দান করবেন, কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করে তুলবেন, আর আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্ম সেগুলোকে বাংলা ভাষায় সমাজে ছড়িয়ে দেবেন। উভয় শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দেশকে শক্তিশালী করে তুলুন, ইসলামের পতাকাবাহী দেশ হিসেবে গড়ে তুলুন। এই দেশ মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। অতএব এই দেশবাসীর উচিত নিজেদের সামর্থ্য ও শক্তি, দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং মূল্য ও মর্যাদা অনুধাবন করা এবং ক্ষুদ্র দেশসমূহের ব্যাপারে বড় ভাই সুলভ সহায়তা প্রদান ও কল্যাণ সাধনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।

আমি পুনরায় আপনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এজন্য যে, আপনি শক্তির এক নতুন দিগন্ত আমার সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন। আপনি আমার মধ্যে এক রাশ আশা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। মুসলিম বিশ্বের ঘটনাবলী দেখে দেখে আমি হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। লেবাননের পরিস্থিতি, ইরাক ইরানের যুদ্ধ এবং আরব বিশ্বের অর্থ-সম্পদের গোলামীর চিত্র দেখে আমার অন্তর যতটা আহত হয়েছিল আপনি তা কিছুটা লাঘব করেছেন। আমি এখানে এসে আশান্বিত হলাম যে, ইসলামের নক্ষত্র এখনও আলোকোজ্জ্বল রয়েছে।

যদি এই দেশ থেকেই ইসলামের পুনর্জাগরণের সূচনা হয় তবে তা বিচিত্র কিছু নয়। একজন ভারতীয় লেখক হিসেবে আমি আপনাদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় বলছি যে, আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে সব রকম যোগ্যতা দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ আপনাদের মধ্যে কোন কিছুর ঘাটতি ও অভাব নেই। শুধু প্রয়োজন, ইসলামের বন্ধনকে দৃঢ় করা, ইসলামের সাথে সম্পৃক্ততাকে সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া। এক্ষেত্রে কোন কিছুই যেন আপনাদের সামনে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়াতে না পারে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টিই জীবনের মূল বিষয়। তাঁর কাছেই আমাদের যেতে হবে। ঈমান, আকীদা ও নেক আমল ব্যতীত কোন কিছুই তাঁর নিকট যেয়ে কাজে আসবে না।

আমরা যেন সকল মানুষকে ভালবাসি। সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। নিজের মাতৃভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে চেষ্টা করি, মাতৃভাষাকে ভালবাসি। তবে অন্য ভাষাকে ঘৃণা করে নয়। আমার তো বলতে ইচ্ছা হয় যে, আপনারা ভারতে এমন কিছু আলেম ও সাহিত্যিক প্রেরণ করুন, যারা বাংলাভাষায় ইসলামের তালীম দিতে পারবে। কোন বিশেষ ভাষা নিয়ে গোঁড়ামী ও অন্ধ ভালবাসার সাথে ইসলামের ইতিহাস পরিচিত নয়। মুসলমানরা সব ভাষাই শিখেছে এবং যেন তেন শিক্ষা নয় বরং পাণ্ডিত্য অর্জন করেছে এবং সেই ভাষায় ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। ফার্সী ভাষা কাদের ভাষা ছিল? অগ্নিপূজকদের ভাষা ছিল। কিন্তু আপনি ফার্সী ভাষার কাব্য ও কবিতার ইতিহাস পাঠ করুন, দেখবেন যে, এই ভাষা শেখ সাদীকে জন্ম দিয়েছে, হাফেজ সিরাজীকে জন্ম দিয়েছে, জালালুদ্দীন রূমীকে জন্ম দিয়েছে, মাওলানা জামী ও কুদসীকে জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশে এসে আমার সর্বাধিক প্রত্যাশা জন্মেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্র করে। এটা এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের বুদ্ধিজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের ভাষায় রচিত ইসলামী গ্রন্থাদি প্রকাশ করে পেশ করতে পারবে। আমার প্রত্যাশা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থাদির ভাষা, স্টাইল সহ সবকিছু মানোত্তীর্ণ হবে। প্রতিষ্ঠানটি আশার আলো। যার দ্বারা এই দেশ আলোকিত হবে। প্রতিষ্ঠানটির সাথে অনেক আশা ও প্রত্যাশা জড়িত।

এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি এবং পুনরায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এই মহা মূল্যবান ও ঐতিহাসিক সুযোগ দানের জন্য।

ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00