📘 উলামা তলাবা > 📄 ধ্বংসের উপকরণ

📄 ধ্বংসের উপকরণ


তোমরা যখন যাকাত আদায় করবে না তখন তোমাদের উপর অনাকাঙ্ক্ষিত ট্যাক্স বসিয়ে দেওয়া হবে। যখন কোন জাতি আল্লাহ তাআলা কর্তৃক যাকাতরূপে নির্ধারিত অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করে আল্লাহ তাআলা তখন তাদের উপর রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ সহ নানা রকম আকারের ট্যাক্স আরোপ করে দেন। উদাহরণ স্বরূপ— ঘরে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ল। ব্যস তার পিছনে অঢেল অর্থ ব্যয় হতে থাকল। কোন কোন লোককে জিজ্ঞাসা করেছি যে, আপনি এত উচ্চ বেতন লাভ করেন সেগুলো কী হয়? উত্তর পাওয়া যায় যে, সাহেব! দশ বৎসর যাবৎ ঘরে একটি রোগ প্রবেশ করেছে, রোগটি আর যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। প্রতিদিন ডাক্তার ডাকতে হয়। বড় বড় ডাক্তারদের বোর্ড বসাতে হয়। স্ক্যানিং করাতে হয়, এক্সরে করাতে হয়। কোন কোন সময় ইউরোপে নিয়ে যেয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। বিলাসী জীবন যাপনকারী ও কৃপণ বিত্তশালীদের ঘরে এই জাতীয় রোগ আল্লাহ তাআলা দিয়ে দিয়েছেন। কারও আবার অহেতুক কোন শখ বা সাধ সৃষ্টি হয়ে গেছে— যাকে বলে Hobby— সেই পথে সে অর্থ ব্যয় করে।

মোটকথা আল্লাহ নির্ধারিত পথে যদি ব্যয় না কর তবে ব্যয় অবশ্যই হয়ে যাবে, তবে অন্য পথে, অন্য খাতে। যে পথে, যে খাতে ব্যয় করার দ্বারা না ইসলামের ফায়দা হবে, না জাতির ফায়দা হবে, না তোমার নিজের ফায়দা হবে। অনর্থক ব্যয় হতে থাকবে। আর তা হবে ধ্বংসের উপকরণ। বলছিলাম যে, মুসলমান পুঁজিপতিদের নিকট তাদের অর্থ-সম্পদই প্রিয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জাতির সমস্যা ও সঙ্কটের দিকে তারা চোখ তুলেও তাকায় না। সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র ছিল ভিন্ন। তাঁরা অর্থ-সম্পদের পরওয়া করতেন না। জাতির কল্যাণ সাধন ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ঘর শূন্য করে তাঁরা অর্থ-কড়ি নিয়ে আসতেন জাতির স্বার্থে ব্যয় করতে। সাহাবায়ে কেরামের জীবনের এই জাতীয় ঘটনার অনেকগুলোই আপনারা জানেন। তবুও একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। ঘটনাটি আপনাদেরও জানা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রাযি.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? তিনি বললেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নাম রেখে এসেছি। এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের হাল ও অবস্থা। কিন্তু আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, এই ত্যাগ ও কুরবানী জীবনের পথ নয়, এটা নিজেকে ধ্বংস করার পথ। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, পয়সা বাঁচানো, অর্থ সঞ্চয় করে রাখা উন্নতির পথ। কিন্তু নবীগণ বলেন, এটা ধ্বংসের পথ। তাঁদের কথাই সত্য বলে প্রমাণিত। আমরা দেখছি, আমরা ক্রমশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমাজে অনেক কারুনের দেখা পাওয়া যায়।

প্রত্যেক গ্রামে কমপক্ষে চার-পাঁচজন বিত্তশালী দেখতে পাবেন, যারা কারুনের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু আমাদের সমাজের অবস্থা কী? আমাদের ধর্মীয় সত্ত্বার কী হাল? আমাদের সম্প্রদায়ের কোন ইজ্জত-সম্মান অবশিষ্ট আছে কি? কানা-কড়ির মূল্যও আজ আমাদের নেই। যেখানে ইচ্ছা সেখানে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের যদি ইজ্জত থাকত, তাদের যদি প্রভাব থাকত, আমাদের যদি চরিত্র ও আদর্শ থাকত, আমরা যদি আদর্শবান হতাম, ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকারকারী হতাম, আমরা যদি জাতি ও দ্বীনের স্বার্থে অর্থ ব্যয়কারী হতাম তাহলে কার সাধ্য ছিল যে, কথায় কথায় আমাদের উপর আক্রমণ চালাবে, কিংবা একটি দিয়াশলাই দিয়ে আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে? কার সাধ্য ছিল যেখানে ইচ্ছা যখন ইচ্ছা হাঙ্গামা বাধানোর?

জাতি তার সম্মান হারিয়ে ফেলেছে, ইজ্জত-আবরু হারিয়ে ফেলেছে। জাতি মর্যাদাহীন হয়ে পড়েছে। জাতির জীবন আর জীবন নেই। জাতির সম্মান আর সম্মান নেই। কাজেই যেখানে চাও বিশৃঙ্খলা ও হাঙ্গামা সৃষ্টি করে দাও, ঠেকায় কে? যদি আপনাদের সম্মান থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি ত্যাগ ও কুরবানীর অভ্যাস থাকত, যদি আপনাদের মধ্যে জাতির স্বার্থে অর্থ ব্যয়ের অভ্যাস থাকত, আপনারা যদি বুক উঁচিয়ে জাতির কল্যাণে দাঁড়িয়ে যেতেন তাহলে কার সাধ্য ছিল আপনাদের বিরুদ্ধে হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? আপনারা যদি প্রমাণ করে দিতে পারতেন যে, আপনারা দৃঢ় সত্ত্বার অধিকারী এক জাতি, আপনাদের মধ্যে যদি অর্থের প্রতি মোহ না থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি কারূনের উপস্থিতি না থাকত, তাহলে কি জাতি আজ এরূপ মর্যাদাহীন হত? কারও কি সাহস হত হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? সংখ্যালঘুতা কোন সমস্যাই নয়। ইজ্জত-সম্মানের অধিকারী, আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী কোন জাতির জন্য সংখ্যালঘুতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। আজ অগ্নি উপাসক জাতির কাউকে আঘাত করে দেখুন, কোন শিখকে আঘাত করে দেখুন তো? এরাও তো সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও শিখরা পাঞ্জাব বানিয়ে নিয়েছে। নিজেদের ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে স্বতন্ত্র প্রদেশ বানিয়ে নিয়েছে। আর আপনারা নিজেদেরকে রক্ষা পর্যন্ত করতে পারছেন না। আপনাদের এই অর্থ-সম্পদ কবে কাজে আসবে? আপনার এত বড় ফার্ম আছে, এত জায়গা-জমি আছে, এতগুলো দোকান আছে— এসব দেখে দেখে আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন। আপনার এসব সম্পদ দ্বারা যদি ইসলামের ফায়দা হত, জাতির ফায়দা হত তাহলে আমাদের অপেক্ষা আর কেউ অধিক আনন্দিত হত না। আপনি বিশাল পুঁজিপতি, আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব কিছুতে আমাদের কিছু যায় আসে না। পুঁজিপতি হয়ে আপনি যদি বোধহীন না হতেন, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন হতেন, ভীরু ও কাপুরুষ না হতেন, হিম্মত ও সাহসের অধিকারী হতেন তাহলে আজ এই জাতি এত লাঞ্ছিত হত না।

📘 উলামা তলাবা > 📄 বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা

📄 বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা


আপনারা আমাদের নিকট বিশৃঙ্খলা দূরীভূত করণের উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে থাকেন। উপায় একটিই। আর তা হল নিজের অর্থকে নিজের অর্থ মনে না করা। গোষ্ঠীগত বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা হল, যে জিহ্বা আপনার বিরুদ্ধে চলছে তা শক্ত করে ধরে ফেলার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। যে হাত আপনার বিরুদ্ধে উঠছে সেই হাতকে ধরে ফেলার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। আপনার বিরুদ্ধে যে হাত অগ্রসর হচ্ছে তাকে রোধ করার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। কারণ এই হাত মুসলমানদের বিরুদ্ধে উঠছে। আপনি যদি তা না করেন তাহলে আপনি বাঁচতে পারবেন না।

এই যুগ স্ব-জাতিকে শক্তিশালী করতে ত্যাগ ও কুরবানীর মাধ্যমে, অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করার যুগ। দুঃখ ও বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই সকল কথা আপনাদেরকে বলতে হচ্ছে। এই সকল কথা আমি কানপুরে বলেছিলাম। রেঙ্গুনেও এ সকল কথা বলেছিলাম। দীর্ঘ এগার বৎসর পূর্বে রেঙ্গুনে আমি কথাগুলো বলেছিলাম। এবার আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে কালিকটে আসার পূর্বে আমি রেঙ্গুন হয়ে এসেছি। আমি কাশফ কিংবা এলহামের অধিকারী কোন ব্যক্তি নই। আমি অত্যন্ত গুনাহগার একজন বান্দা। আমার দ্বারা তিনি সত্য ও বাস্তবসম্মত কথা বলিয়ে নিয়েছেন। রেঙ্গুনের অধিবাসীরা আমাকে খুব মহব্বত করত। তাদের মধ্যে অনেকেই পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদের অধিকারী। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, যদি তোমরা তাবলীগে বের না হও, আল্লাহর রাস্তায় বের না হও, অর্থ-সম্পদে আল্লাহর যে হক তা আদায় না কর, জাতির স্বার্থে, জাতির কল্যাণে যদি অর্থব্যয় না কর তাহলে স্মরণে রেখ, তোমাদের দোকানপাট এক সময় সীলগালা করে দেওয়া হবে, তোমাদের কল-কারখানা বাজেয়াপ্ত করা হবে। তোমরা যদি দ্বীনের চাহিদা ও দাবি পূরণ না কর তবে আল্লাহ তোমাদের উপর আযাব নাযিল করে দেবেন। আপনারা বিশ্বাস করুন, আমি কসম করে বলছি, আমার বলা কথাগুলো আমি ভুলে গিয়েছিলাম। রেঙ্গুনের অধিবাসীরা বারবার পত্রের মাধ্যমে আমাকে জানিয়েছে যে, মাওলানা, আপনি যা বলে গিয়েছিলেন তা শুনে এবং পাঠ করে বার্মার মুসলমানরা এখন শুধুই চোখের পানি ফেলে। কারণ বার্মায় এখন সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতাসীন। সেখানকার মুসলমানদের এখন বড় করুণ দশা।

📘 উলামা তলাবা > 📄 নিজেকে জাতির কল্যাণে বিলীন কর

📄 নিজেকে জাতির কল্যাণে বিলীন কর


আমি স্পষ্ট করে বলছি, ভাটকলের মুসলমানদেরকে আল্লাহ তাআলা অনেক কিছু দিয়েছেন। তাদের উচিত জাতির ব্যাপারে চিন্তা করা, জাতির হেফাযতের ব্যবস্থা গ্রহণ। সবাই মিলে সমগ্র ভারতের মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। মুসলমানদের সমস্যা ও সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। অমুসলিম ভাইদেরকে ইসলামের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে। ইসলামের পয়গাম ও বার্তা তাদের নিকট পৌঁছাতে হবে। তাদেরকে ঘনিষ্ঠ করে তুলতে হবে। নিজের জীবনাচার ও আদর্শ দ্বারা তাদের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করতে হবে। সুন্দর ব্যবহার দ্বারা তাদের মন ও মস্তিষ্ককে প্রভাবান্বিত করতে হবে। তাদের অন্তর থেকে ঘৃণা ও বিদ্বেষকে দূরীভূত করতে হবে। এসব যদি আপনারা করতে পারেন তবেই আপনারা নিরাপদে থাকবেন। নতুনা শুধু ভাটকলের মুসলমান নয়, দাক্ষিণাত্যের মুসলমান নয়, মাইসুরের মুসলমান নয়; সমগ্র ভারতের মুসলমান হুমকির মুখে পড়বে।

এই যে মধ্যপ্রাচ্যে যে প্রচণ্ড আঘাত এসেছে তা কিসের পরিণতি ভেবে দেখেছেন কি? অঢেল সম্পদের অধিকারী বাদশাহ— যাকে আল্লাহ সবকিছু দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন প্রবৃত্তির দাস। ত্যাগ ও কুরবানী কাকে বলে তা তাঁর জানা ছিল না। বিলাসিতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন। সরল জীবন যাপনের কল্পনাও তাঁর অন্তরে কখনও উদিত হয়নি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে সর্বদা টেলিভিশন দেখে দেখে আর ফূর্তি করে কাটানোই ছিল তাঁর জীবন যাপনের পদ্ধতি। ফলে মাত্র পঁচিশ লক্ষ ইয়াহুদী যারা দশ কোটি আরববাসীর তুলনায় মুষ্টিমেয়, সমগ্র আরবকে অপমান ও লাঞ্ছিত করে ছাড়ল। সারা বিশ্বের মুসলমানকে অপদস্থ করে ছাড়ল। এটা ঐ ক্ষমতার মোহ আর বিলাসিতারই কুফল। হাদীস শরীফে এসেছে— এমন এক যামানা আসবে যখন মুসলমানদের উপর 'ওহন' ও দুর্বলতা চাপিয়ে দেওয়া হবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ওহন কাকে বলে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জীবনের প্রতি আসক্তি এবং মৃত্যুভীতি। বন্ধুগণ! এখন তো সেটাই দেখা যাচ্ছে। এটাই বর্তমান মুসলমানদের প্রধান ব্যাধি। মনে রাখবেন, বড় বড় লাখপতি, কোটিপতি ব্যবসায়ী থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং যখন বিপদ ও বিপর্যয় আসবে তখন এই লাখপতি ও কোটিপতিরাই সর্বপ্রথম সেই বিপর্যয়ের শিকার হবে।

আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে রক্ষা করুন। কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষা করুন। খোদা নাখাস্তা যদি কখনও বিপদ ও বিপর্যয় চলে আসে তবে আপনাদের এই ধন-সম্পদ কোন কাজে আসবে না। পাঞ্জাবে কোন কাজে আসেনি। জামশেদপুরে কোন কাজে আসেনি। রুড়কিলার দাঙ্গার বেশ কিছুদিন পর আমি সেখানে গিয়েছিলাম। রুড়কিলায় মুসলমানদের মধ্যে বড় বড় ঠিকাদারী ব্যবসায়ী ছিল। যাদের লাখ লাখ টাকা ঠিকাদারী ব্যবসায় বিনিয়োগ হত। সেখানে যেয়ে দেখলাম এবং জানতে পারলাম যে, দাঙ্গাকারীরা তাদের সমস্ত অর্থ-কড়ি লুটে নিয়েছে। তাদের মোটরগাড়ী পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের পুড়িয়ে দেওয়া ঘরবাড়ী আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি। কুঁড়ে ঘরে যে বেচারা গরীবরা বাস করে তারা তো বেঁচে যান। কারণ তাদেরকে মেরে দাঙ্গাকারীরা কী নেবে। আমি আশঙ্কা করি আপনাদের ব্যাপারে। যদি জাতি শক্তিশালী না হয়, জাতির সমস্যাগুলোর সমাধান যদি না হয়, দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থাভাবে যদি ঠিকমত চালু না থাকে, তবে বিপর্যয় আসবে বৈকি? আপনারা বিত্তশালীরা যদি সাধারণ মুসলমানদেরকে আপন করে না নেন, তাদেরকে যদি আপনাদের প্রতি সহানুভূতিশীলরূপে প্রস্তুত করতে না পারেন তাহলে তারা আপনার সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে কেন? আপনারা যদি তাদের হৃদয় জয় করতে না পারেন তবে তারা আপনাকে ভালবাসবে কেন? দেখুন, পুলিশ, প্রতিরক্ষা বাহিনী, সেনাবাহিনী আপনার রক্ষক নয়। বরং তারা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রাঁচিতে দেখুন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকেরাই সেখানকার মুসলমানদেরকে হত্যা করেছে। তারাই দাঙ্গা লাগিয়েছে এবং নিজেরা দাঙ্গায় অংশগ্রহণ করেছে। আপনাকে রক্ষাকারী আল্লাহ তাআলা। আপনার রক্ষক আপনার আমল ও কৃতকর্ম। আপনার রক্ষক আপনার ত্যাগ ও কুরবানী। আপনার রক্ষক আপনার ঐ হালাল উপায়ে উপার্জিত সম্পদ, যা ব্যয় করে আপনি আপনার জন্য নিবেদিতপ্রাণ কিছু লোক তৈরি করবেন এবং যা ব্যয় করে আপনি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য লাভের অধিকার সৃষ্টি করে নেবেন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ান

📄 দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ান


বন্ধুগণ! আমি আপনাদের মেহমান। এত কড়া বক্তব্য প্রদান আপনাদের সামনে আমার জন্য উচিত নয়। কিন্তু আমি অপারগ। আমি তো আপনাদের ঘনিষ্টজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে কথা বলছি। অন্তরে আপনাদের ভালবাসা আছে বলেই এরূপ কথা বলছি। এই বক্তব্যকে আপনাদের জন্য আমার সহমর্মিতা সুলভ বলে মনে করছি। আপনারা নিজেদেরকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করুন। আপনাদের এই দোকানপাট, কল-কারখানা, ব্যাংক-ব্যালেন্স প্রকৃতপক্ষে দুর্বল জিনিস। এগুলোর মাধ্যমেই দুনিয়ার মোহ প্রবেশ করে থাকে। অতএব সর্বপ্রথম এসব সম্পদের যাকাত আদায় করুন, দান-খয়রাত করুন; তারপর অন্য চিন্তা করুন। মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করুন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে ক্ষত-বিদ্ধস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাদের দারিদ্র ক্ষতে ঔষধের প্রলেপ দিন। তাদের জন্য ব্যয় করুন। এই সকল দরিদ্র ব্যক্তির দুআই আপনার জন্য প্রয়োজনীয়। বাদশাহ নুরুদ্দীন জঙ্গীকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল— আপনি অভাবী ও দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য এত অর্থ ব্যয় করে থাকেন, যুদ্ধকালে এসব ব্যয় কী কাজে আসবে। বাদশাহ বললেন, ভাই! কাজ তো এইসব লোকদের দুআতেই হবে। আমি এদের দুআকেই আশ্রয় মনে করি এবং এদের দুআই কামনা করি। এদের দুআয় শত্রুর কলিজা ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। বাস্তবিক তাই হয়েছিল। এদের দুআয় বাদশাহ নুরুদ্দীন জঙ্গী বিজয় লাভ করেছিলেন। দেখুন, আমি সত্যি বলছি, আল্লাহর ফযলে আমি কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতে আসিনি, ভবিষ্যতেও এজন্য কখনও আসবো না, আমি আপনাদের নিজেদের কল্যাণের জন্য মুসলমানদের জন্য যা প্রয়োজন সেই পরামর্শটুকু দিলাম মাত্র। আল্লাহর ওয়াস্তে অন্তত নিজেকে চিনুন।

নিজেতে লীন হয়ে জীবনের সন্ধান লাভ কর
তুমি যদি আমার না হও না হলে, নিজের তো হও।

নিজেদের সমস্যার সমাধান করুন। দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করুন। নিজের সময়কে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করুন। নিজেকে নিজের জীবনের মালিক মনে করবেন না। আল্লাহকে মালিক মনে করুন। সবকিছুতে আল্লাহর দ্বীনুকে প্রাধান্য দিন। আল্লাহর রাস্তায় বের হউন, তাঁর পথে ব্যয় করুন এবং তাঁর পথে কষ্ট স্বীকার করুন। তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনারা ফুলে ফুলে সুশোভিত হবেন, ফুলে ফলে সমৃদ্ধ হবেন। আপনাদের এলাকা নিরাপদ থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমি জামেয়া ইসলামিয়া থেকে কোন কমিশন লাভ করব বলে এসব বলছি না। কথাগুলো বলছি এজন্য যে, আমি ইতিহাসের ছাত্র। ইতিহাস অধ্যয়ন করেছি। কুরআন শরীফ অধ্যয়ন করেছি। কুরআন শরীফ ও ইতিহাসের আলোকে কথাগুলো বললাম। আসল হেফাযতকারী আল্লাহ তাআলা। কুরআন শরীফ আমাদেরকে জানান দেয় যে, নেক কর্মের দ্বারাও হেফাযতের কাজ হয়। “যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে তিনিও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে অবিচল ও দৃঢ় রাখবেন।”

আল্লাহ তাআলাই সর্বোত্তম ইনস্যুরেন্স। প্রচলিত ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী কতটুকু কী করতে পারে? আপনার কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ-সম্পদ, আপনার জীবন, আপনার সন্তান- সন্ততি এই সবকিছুর বীমা আল্লাহ তাআলার নিকট করিয়ে দিন। আল্লাহ তাআলার নিকট অর্থ-সম্পদের বীমা করার পদ্ধতি হল তাঁর রাস্তায় অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে আপনার যাবতীয় অর্থ-সম্পদকে মূল্যবান বানিয়ে দেওয়া। তাহলে এই সম্পদে আর কেউ হাত মারতে পারবে না। আপনার জীবনকে মূল্যবান বানিয়ে ফেলুন। জীবনের মূল্য সৃষ্টি হয় আল্লাহর দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন। অতঃপর আপনার বিরুদ্ধে যে হাত অগ্রসর হবে তা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আপনি ভেবে দেখুন, পৃথিবীর কোন বাদশাহর কোন জিনিসে কেউ যদি হাত দেয় তাহলে তার পরিণাম কী হয়। এই যে ষাট সত্তর টাকার পুলিশ সেপাই, তার উপর কেউ আক্রমণ করুক তো দেখি। দেশের সরকার আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। অতঃপর তার রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এই যে ডাকপিয়ন, তার বেতনই বা কত? এরূপ দশ বারোজন ডাকপিয়নকে কর্মচারী হিসাবে রাখার সামর্থ আপনাদের আছে। কিন্তু তার গায়ে হাত দিয়ে দেখুন তো? তার ঝুলিটা কেড়ে নিন তো? তারপর দেখুন কী হয়। সে সরকারী দায়িত্বে কর্তব্যরত। আপনিও মহা সরকারের ডিউটিতে নিজেকে নিয়োজিত করুন। আল্লাহ তাআলার আজ্ঞাবহ হয়ে যান। তাঁর খেদমতে আত্মনিয়োগ করুন, তাঁর দ্বীনের খেদমতে আত্মনিয়োগ করুন। এককালে সরকারী চিঠি-পত্রের উপর লেখা থাকত On his Majesty's Service (মহামান্য রাজার কার্যে ব্যবহৃত)। ফলে চিঠির গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেত। আপনার জন্য Majesty বা মহামান্য রাজা কে? আল্লাহ ব্যতীত আর কে এর উপযুক্ত? আপনি সকল বাদশাহর বাদশাহ, রাজাধিরাজ আল্লাহ তাআলার খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করুন। দেখবেন আপনার জান-মাল সব নিরাপদ হয়ে যাবে। মান-মর্যাদা, অর্থ-প্রতিপত্তি অর্জন করতে হলে আল্লাহর দ্বীনের খেদমতে আত্মনিয়োগ ব্যতীত দ্বিতীয় কোন পথ নেই। মুসলমানদেরকে এই পথের সন্ধান দিয়েছেন তিনি, যিনি মুসলমানদেরকে সর্বাধিক মহব্বত করতেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00