📄 নবীগণের মীরাছ
নবীগণ যে জীবন যাপন করেছেন সে জীবনের জন্য শরীয়ত এসেছে, কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহর ঐ বান্দাগণের সর্বদা চেষ্টা ছিল, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি, ভালবাসা, ত্যাগ ও কুরবানীর জীবন ব্যাপকতর হোক। মানুষ যেন বানর না হয়, গাধা না হয়ে যায়। মানুষের চিন্তা যেন এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ না থাকে যে, আমার নির্ধারিত খাবার আমি পেয়ে যাই। বরং সে যেন চিন্তা করে, আমার স্ব-জাতি আমারই মত মানুষ। তাদের মধ্যে যারা খাদ্য পাচ্ছে না তাদেরকেও খাদ্য দান করি। অপরকে আহার করানোর মধ্যে সে যেন আনন্দ লাভ করে। অন্যকে ক্ষুধার্ত দেখে নিজে খাদ্য গ্রহণ করতে সে যেন শান্তিবোধ না করে। এটাই নবীগণের মীরাছ ও উত্তরাধিকার। তাঁদের রেখে যাওয়া শিক্ষা। তাঁরা এই আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছেন। মানুষের মধ্যে যেন পরহিতব্রত, পরদুঃখকাতরতার চরিত্র ব্যাপকতর হয় সেজন্য তাঁরা সংগ্রাম করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের ঘটনা আপনারা শুনে থাকবেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে পড়ে থাকা এক সাহাবীর নিকট পানি আনা হলে তিনি বললেন, আমি এইমাত্র আরেকজন আহত ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, আপনি তাকে প্রথমে পানি পান করিয়ে আসুন। দ্বিতীয়জন বলল, আমি অপর একজন আহত ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, তাকে পানি পান করান। তৃতীয়জন বলল, আমি অপর একজন ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, আপনি তার নিকট পানি নিয়ে যান। পানি বাহক চতুর্থজনের নিকট গিয়ে দেখে তিনি ইন্তেকাল করে গেছেন। এরপর একে একে তৃতীয়জন, দ্বিতীয়জন ও প্রথমজনের নিকট এসে দেখে তাঁরা সবাই ইন্তেকাল করে গেছেন। এটাই মানবতা।
মানবতার মর্যাদা এখানেই, তার শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। এর জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই মানবতা প্রতিষ্ঠা করতেই এই উম্মতকে প্রেরণ করা হয়েছে। অতএব এই উম্মতও যদি নিজ নিজ চিন্তায় বিভোর থাকে, নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকার দর্শনে বিশ্বাসী হয়, প্রবৃত্তি যদি শয়তানের অনুগত হয়ে যায়, সত্যকে সত্য বলে জ্ঞান না করে, সত্যকে অস্বীকার করে এবং মনে করে যে, খাওয়া-দাওয়া ও উদরপূর্তি ব্যতীত দ্বিতীয় কোন কর্ম নেই তাহলে বুঝতে হবে যে, এই উম্মত মৃত। বুঝতে হবে যে, এই উম্মতের কোন বৈশিষ্ট্য আর অবশিষ্ট নেই। নবীগণ বলেছেন, নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকা, স্বার্থ-সর্বস্ব হয়ে যাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্তির নামান্তর।
সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে যখন এই চিন্তার উদয় হল যে, আমরা ইসলামের অনেক খেদমত করেছি। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামারকে ত্যাগ করেছি, সবকিছু বিস্মৃত হয়ে আমরা ইসলামের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছি। আমাদের বাড়ি-ঘর উজাড় হয়ে গেছে, ক্ষেত-খামার বরবাদ হয়ে গেছে, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেউলিয়াত্বের শিকার হয়ে গেছে। এখন আমরা কিছু দিনের জন্য ব্যক্তিগত কারবার দেখি। এরপর পুনরায় ইসলামের খেদমতে লেগে যাব। তাঁদের এইরূপ চিন্তা ইসলাম ও মুসলিম জাতির জন্য ছিল শঙ্কাধ্বনি স্বরূপ। তাই সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে হুশিয়ার করে দেওয়া হল। বলা হল, খবরদার। এইরূপ চিন্তাকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনো না। এই চিন্তা করার অর্থ, বিষের পেয়ালা নিজের মুখে তুলে নেওয়া। তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল, তোমরা তোমাদের এই উদ্ভট চিন্তা পরিত্যাগ করে ইসলামের খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ কর, নতুবা তোমাদের পরিণাম হবে অশুভ। বলা হল— “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। এই চিন্তা জীবন বিনাশী বিষ। এই বিষ যদি তোমরা পান করে ফেল, দ্বীনের খেদমতকে পিছনে ঠেলে দিয়ে নিজেদের পার্থিব স্বার্থে জড়িয়ে পড় তবে তোমরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। কারণ কিছু দিনের জন্য যদি তোমরা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য সামলে নেও তাহলে তাতে কী লাভ হবে। জাতি গঠনের কাজ তো হবে না। যদি তোমরা জাতি গঠনের কাজে অবহেলা কর, এই কাজকে উপেক্ষা কর তাহলে দুনিয়াতে মহা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। নবগঠিত মানবতা ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলোর স্তূপে পরিণত হয়ে যাবে। সমগ্র জাতিকে একটি একক মনে কর। গোটা জাতির কল্যাণের লক্ষ্যে ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার কর। ইসলামকে ভিত্তি করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব কায়েম কর।”
সাহাবায়ে কেরামের মস্তিষ্কে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামার ও দোকানপাটের চিন্তা উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে দ্বীনের দাবি সম্পর্কে সচেতন করে দিলেন। বলে দিলেন যে, খবরদার! এটা ধ্বংসাত্মক চিন্তা। জাতীয় স্বার্থ বিস্তৃত হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে চিন্তা করা তোমাদের জন্য প্রাণঘাতী বিষতুল্য। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়, এরপর খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যে ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার করেছেন তার কথা আর কী বলব? সহায়-সম্পদ, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, বাড়ি-ঘর ইত্যাদি কোন কিছুর পরওয়া তাদের ছিল না। সবকিছুই তাঁরা ত্যাগ করেছিলেন। আল্লাহর দ্বীনের রাস্তায় সবকিছু তাঁরা সঁপে দিয়েছিলেন। সন্তান-সন্ততির পরওয়া ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরওয়া ছিল না। সারা জীবনের তিল তিল করে সঞ্চয় করা সম্পদের পরওয়া ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম ইসলামকে যে গতি ও শক্তি দান করে গেছেন সেই গতি ও শক্তিতেই আমাদের শত ত্রুটি ও উদাসীনতা সত্ত্বেও ইসলাম অদ্যাবধি টিকে আছে। কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
📄 ধ্বংসের উপকরণ
তোমরা যখন যাকাত আদায় করবে না তখন তোমাদের উপর অনাকাঙ্ক্ষিত ট্যাক্স বসিয়ে দেওয়া হবে। যখন কোন জাতি আল্লাহ তাআলা কর্তৃক যাকাতরূপে নির্ধারিত অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করে আল্লাহ তাআলা তখন তাদের উপর রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ সহ নানা রকম আকারের ট্যাক্স আরোপ করে দেন। উদাহরণ স্বরূপ— ঘরে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ল। ব্যস তার পিছনে অঢেল অর্থ ব্যয় হতে থাকল। কোন কোন লোককে জিজ্ঞাসা করেছি যে, আপনি এত উচ্চ বেতন লাভ করেন সেগুলো কী হয়? উত্তর পাওয়া যায় যে, সাহেব! দশ বৎসর যাবৎ ঘরে একটি রোগ প্রবেশ করেছে, রোগটি আর যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। প্রতিদিন ডাক্তার ডাকতে হয়। বড় বড় ডাক্তারদের বোর্ড বসাতে হয়। স্ক্যানিং করাতে হয়, এক্সরে করাতে হয়। কোন কোন সময় ইউরোপে নিয়ে যেয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। বিলাসী জীবন যাপনকারী ও কৃপণ বিত্তশালীদের ঘরে এই জাতীয় রোগ আল্লাহ তাআলা দিয়ে দিয়েছেন। কারও আবার অহেতুক কোন শখ বা সাধ সৃষ্টি হয়ে গেছে— যাকে বলে Hobby— সেই পথে সে অর্থ ব্যয় করে।
মোটকথা আল্লাহ নির্ধারিত পথে যদি ব্যয় না কর তবে ব্যয় অবশ্যই হয়ে যাবে, তবে অন্য পথে, অন্য খাতে। যে পথে, যে খাতে ব্যয় করার দ্বারা না ইসলামের ফায়দা হবে, না জাতির ফায়দা হবে, না তোমার নিজের ফায়দা হবে। অনর্থক ব্যয় হতে থাকবে। আর তা হবে ধ্বংসের উপকরণ। বলছিলাম যে, মুসলমান পুঁজিপতিদের নিকট তাদের অর্থ-সম্পদই প্রিয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জাতির সমস্যা ও সঙ্কটের দিকে তারা চোখ তুলেও তাকায় না। সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র ছিল ভিন্ন। তাঁরা অর্থ-সম্পদের পরওয়া করতেন না। জাতির কল্যাণ সাধন ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ঘর শূন্য করে তাঁরা অর্থ-কড়ি নিয়ে আসতেন জাতির স্বার্থে ব্যয় করতে। সাহাবায়ে কেরামের জীবনের এই জাতীয় ঘটনার অনেকগুলোই আপনারা জানেন। তবুও একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। ঘটনাটি আপনাদেরও জানা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রাযি.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? তিনি বললেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নাম রেখে এসেছি। এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের হাল ও অবস্থা। কিন্তু আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, এই ত্যাগ ও কুরবানী জীবনের পথ নয়, এটা নিজেকে ধ্বংস করার পথ। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, পয়সা বাঁচানো, অর্থ সঞ্চয় করে রাখা উন্নতির পথ। কিন্তু নবীগণ বলেন, এটা ধ্বংসের পথ। তাঁদের কথাই সত্য বলে প্রমাণিত। আমরা দেখছি, আমরা ক্রমশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমাজে অনেক কারুনের দেখা পাওয়া যায়।
প্রত্যেক গ্রামে কমপক্ষে চার-পাঁচজন বিত্তশালী দেখতে পাবেন, যারা কারুনের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু আমাদের সমাজের অবস্থা কী? আমাদের ধর্মীয় সত্ত্বার কী হাল? আমাদের সম্প্রদায়ের কোন ইজ্জত-সম্মান অবশিষ্ট আছে কি? কানা-কড়ির মূল্যও আজ আমাদের নেই। যেখানে ইচ্ছা সেখানে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের যদি ইজ্জত থাকত, তাদের যদি প্রভাব থাকত, আমাদের যদি চরিত্র ও আদর্শ থাকত, আমরা যদি আদর্শবান হতাম, ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকারকারী হতাম, আমরা যদি জাতি ও দ্বীনের স্বার্থে অর্থ ব্যয়কারী হতাম তাহলে কার সাধ্য ছিল যে, কথায় কথায় আমাদের উপর আক্রমণ চালাবে, কিংবা একটি দিয়াশলাই দিয়ে আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে? কার সাধ্য ছিল যেখানে ইচ্ছা যখন ইচ্ছা হাঙ্গামা বাধানোর?
জাতি তার সম্মান হারিয়ে ফেলেছে, ইজ্জত-আবরু হারিয়ে ফেলেছে। জাতি মর্যাদাহীন হয়ে পড়েছে। জাতির জীবন আর জীবন নেই। জাতির সম্মান আর সম্মান নেই। কাজেই যেখানে চাও বিশৃঙ্খলা ও হাঙ্গামা সৃষ্টি করে দাও, ঠেকায় কে? যদি আপনাদের সম্মান থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি ত্যাগ ও কুরবানীর অভ্যাস থাকত, যদি আপনাদের মধ্যে জাতির স্বার্থে অর্থ ব্যয়ের অভ্যাস থাকত, আপনারা যদি বুক উঁচিয়ে জাতির কল্যাণে দাঁড়িয়ে যেতেন তাহলে কার সাধ্য ছিল আপনাদের বিরুদ্ধে হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? আপনারা যদি প্রমাণ করে দিতে পারতেন যে, আপনারা দৃঢ় সত্ত্বার অধিকারী এক জাতি, আপনাদের মধ্যে যদি অর্থের প্রতি মোহ না থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি কারূনের উপস্থিতি না থাকত, তাহলে কি জাতি আজ এরূপ মর্যাদাহীন হত? কারও কি সাহস হত হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? সংখ্যালঘুতা কোন সমস্যাই নয়। ইজ্জত-সম্মানের অধিকারী, আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী কোন জাতির জন্য সংখ্যালঘুতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। আজ অগ্নি উপাসক জাতির কাউকে আঘাত করে দেখুন, কোন শিখকে আঘাত করে দেখুন তো? এরাও তো সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও শিখরা পাঞ্জাব বানিয়ে নিয়েছে। নিজেদের ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে স্বতন্ত্র প্রদেশ বানিয়ে নিয়েছে। আর আপনারা নিজেদেরকে রক্ষা পর্যন্ত করতে পারছেন না। আপনাদের এই অর্থ-সম্পদ কবে কাজে আসবে? আপনার এত বড় ফার্ম আছে, এত জায়গা-জমি আছে, এতগুলো দোকান আছে— এসব দেখে দেখে আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন। আপনার এসব সম্পদ দ্বারা যদি ইসলামের ফায়দা হত, জাতির ফায়দা হত তাহলে আমাদের অপেক্ষা আর কেউ অধিক আনন্দিত হত না। আপনি বিশাল পুঁজিপতি, আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব কিছুতে আমাদের কিছু যায় আসে না। পুঁজিপতি হয়ে আপনি যদি বোধহীন না হতেন, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন হতেন, ভীরু ও কাপুরুষ না হতেন, হিম্মত ও সাহসের অধিকারী হতেন তাহলে আজ এই জাতি এত লাঞ্ছিত হত না।
📄 বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা
আপনারা আমাদের নিকট বিশৃঙ্খলা দূরীভূত করণের উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে থাকেন। উপায় একটিই। আর তা হল নিজের অর্থকে নিজের অর্থ মনে না করা। গোষ্ঠীগত বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা হল, যে জিহ্বা আপনার বিরুদ্ধে চলছে তা শক্ত করে ধরে ফেলার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। যে হাত আপনার বিরুদ্ধে উঠছে সেই হাতকে ধরে ফেলার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। আপনার বিরুদ্ধে যে হাত অগ্রসর হচ্ছে তাকে রোধ করার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। কারণ এই হাত মুসলমানদের বিরুদ্ধে উঠছে। আপনি যদি তা না করেন তাহলে আপনি বাঁচতে পারবেন না।
এই যুগ স্ব-জাতিকে শক্তিশালী করতে ত্যাগ ও কুরবানীর মাধ্যমে, অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করার যুগ। দুঃখ ও বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই সকল কথা আপনাদেরকে বলতে হচ্ছে। এই সকল কথা আমি কানপুরে বলেছিলাম। রেঙ্গুনেও এ সকল কথা বলেছিলাম। দীর্ঘ এগার বৎসর পূর্বে রেঙ্গুনে আমি কথাগুলো বলেছিলাম। এবার আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে কালিকটে আসার পূর্বে আমি রেঙ্গুন হয়ে এসেছি। আমি কাশফ কিংবা এলহামের অধিকারী কোন ব্যক্তি নই। আমি অত্যন্ত গুনাহগার একজন বান্দা। আমার দ্বারা তিনি সত্য ও বাস্তবসম্মত কথা বলিয়ে নিয়েছেন। রেঙ্গুনের অধিবাসীরা আমাকে খুব মহব্বত করত। তাদের মধ্যে অনেকেই পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদের অধিকারী। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, যদি তোমরা তাবলীগে বের না হও, আল্লাহর রাস্তায় বের না হও, অর্থ-সম্পদে আল্লাহর যে হক তা আদায় না কর, জাতির স্বার্থে, জাতির কল্যাণে যদি অর্থব্যয় না কর তাহলে স্মরণে রেখ, তোমাদের দোকানপাট এক সময় সীলগালা করে দেওয়া হবে, তোমাদের কল-কারখানা বাজেয়াপ্ত করা হবে। তোমরা যদি দ্বীনের চাহিদা ও দাবি পূরণ না কর তবে আল্লাহ তোমাদের উপর আযাব নাযিল করে দেবেন। আপনারা বিশ্বাস করুন, আমি কসম করে বলছি, আমার বলা কথাগুলো আমি ভুলে গিয়েছিলাম। রেঙ্গুনের অধিবাসীরা বারবার পত্রের মাধ্যমে আমাকে জানিয়েছে যে, মাওলানা, আপনি যা বলে গিয়েছিলেন তা শুনে এবং পাঠ করে বার্মার মুসলমানরা এখন শুধুই চোখের পানি ফেলে। কারণ বার্মায় এখন সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতাসীন। সেখানকার মুসলমানদের এখন বড় করুণ দশা।
📄 নিজেকে জাতির কল্যাণে বিলীন কর
আমি স্পষ্ট করে বলছি, ভাটকলের মুসলমানদেরকে আল্লাহ তাআলা অনেক কিছু দিয়েছেন। তাদের উচিত জাতির ব্যাপারে চিন্তা করা, জাতির হেফাযতের ব্যবস্থা গ্রহণ। সবাই মিলে সমগ্র ভারতের মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। মুসলমানদের সমস্যা ও সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। অমুসলিম ভাইদেরকে ইসলামের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে। ইসলামের পয়গাম ও বার্তা তাদের নিকট পৌঁছাতে হবে। তাদেরকে ঘনিষ্ঠ করে তুলতে হবে। নিজের জীবনাচার ও আদর্শ দ্বারা তাদের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করতে হবে। সুন্দর ব্যবহার দ্বারা তাদের মন ও মস্তিষ্ককে প্রভাবান্বিত করতে হবে। তাদের অন্তর থেকে ঘৃণা ও বিদ্বেষকে দূরীভূত করতে হবে। এসব যদি আপনারা করতে পারেন তবেই আপনারা নিরাপদে থাকবেন। নতুনা শুধু ভাটকলের মুসলমান নয়, দাক্ষিণাত্যের মুসলমান নয়, মাইসুরের মুসলমান নয়; সমগ্র ভারতের মুসলমান হুমকির মুখে পড়বে।
এই যে মধ্যপ্রাচ্যে যে প্রচণ্ড আঘাত এসেছে তা কিসের পরিণতি ভেবে দেখেছেন কি? অঢেল সম্পদের অধিকারী বাদশাহ— যাকে আল্লাহ সবকিছু দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন প্রবৃত্তির দাস। ত্যাগ ও কুরবানী কাকে বলে তা তাঁর জানা ছিল না। বিলাসিতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন। সরল জীবন যাপনের কল্পনাও তাঁর অন্তরে কখনও উদিত হয়নি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে সর্বদা টেলিভিশন দেখে দেখে আর ফূর্তি করে কাটানোই ছিল তাঁর জীবন যাপনের পদ্ধতি। ফলে মাত্র পঁচিশ লক্ষ ইয়াহুদী যারা দশ কোটি আরববাসীর তুলনায় মুষ্টিমেয়, সমগ্র আরবকে অপমান ও লাঞ্ছিত করে ছাড়ল। সারা বিশ্বের মুসলমানকে অপদস্থ করে ছাড়ল। এটা ঐ ক্ষমতার মোহ আর বিলাসিতারই কুফল। হাদীস শরীফে এসেছে— এমন এক যামানা আসবে যখন মুসলমানদের উপর 'ওহন' ও দুর্বলতা চাপিয়ে দেওয়া হবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ওহন কাকে বলে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জীবনের প্রতি আসক্তি এবং মৃত্যুভীতি। বন্ধুগণ! এখন তো সেটাই দেখা যাচ্ছে। এটাই বর্তমান মুসলমানদের প্রধান ব্যাধি। মনে রাখবেন, বড় বড় লাখপতি, কোটিপতি ব্যবসায়ী থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং যখন বিপদ ও বিপর্যয় আসবে তখন এই লাখপতি ও কোটিপতিরাই সর্বপ্রথম সেই বিপর্যয়ের শিকার হবে।
আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে রক্ষা করুন। কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষা করুন। খোদা নাখাস্তা যদি কখনও বিপদ ও বিপর্যয় চলে আসে তবে আপনাদের এই ধন-সম্পদ কোন কাজে আসবে না। পাঞ্জাবে কোন কাজে আসেনি। জামশেদপুরে কোন কাজে আসেনি। রুড়কিলার দাঙ্গার বেশ কিছুদিন পর আমি সেখানে গিয়েছিলাম। রুড়কিলায় মুসলমানদের মধ্যে বড় বড় ঠিকাদারী ব্যবসায়ী ছিল। যাদের লাখ লাখ টাকা ঠিকাদারী ব্যবসায় বিনিয়োগ হত। সেখানে যেয়ে দেখলাম এবং জানতে পারলাম যে, দাঙ্গাকারীরা তাদের সমস্ত অর্থ-কড়ি লুটে নিয়েছে। তাদের মোটরগাড়ী পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের পুড়িয়ে দেওয়া ঘরবাড়ী আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি। কুঁড়ে ঘরে যে বেচারা গরীবরা বাস করে তারা তো বেঁচে যান। কারণ তাদেরকে মেরে দাঙ্গাকারীরা কী নেবে। আমি আশঙ্কা করি আপনাদের ব্যাপারে। যদি জাতি শক্তিশালী না হয়, জাতির সমস্যাগুলোর সমাধান যদি না হয়, দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থাভাবে যদি ঠিকমত চালু না থাকে, তবে বিপর্যয় আসবে বৈকি? আপনারা বিত্তশালীরা যদি সাধারণ মুসলমানদেরকে আপন করে না নেন, তাদেরকে যদি আপনাদের প্রতি সহানুভূতিশীলরূপে প্রস্তুত করতে না পারেন তাহলে তারা আপনার সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে কেন? আপনারা যদি তাদের হৃদয় জয় করতে না পারেন তবে তারা আপনাকে ভালবাসবে কেন? দেখুন, পুলিশ, প্রতিরক্ষা বাহিনী, সেনাবাহিনী আপনার রক্ষক নয়। বরং তারা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রাঁচিতে দেখুন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকেরাই সেখানকার মুসলমানদেরকে হত্যা করেছে। তারাই দাঙ্গা লাগিয়েছে এবং নিজেরা দাঙ্গায় অংশগ্রহণ করেছে। আপনাকে রক্ষাকারী আল্লাহ তাআলা। আপনার রক্ষক আপনার আমল ও কৃতকর্ম। আপনার রক্ষক আপনার ত্যাগ ও কুরবানী। আপনার রক্ষক আপনার ঐ হালাল উপায়ে উপার্জিত সম্পদ, যা ব্যয় করে আপনি আপনার জন্য নিবেদিতপ্রাণ কিছু লোক তৈরি করবেন এবং যা ব্যয় করে আপনি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য লাভের অধিকার সৃষ্টি করে নেবেন।