📘 উলামা তলাবা > 📄 দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার নিশ্চয়তা

📄 দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার নিশ্চয়তা


আমার প্রিয় বন্ধুগণ! আমি আপনাদেরকে যে কথা বলতে চাই তা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে পথ দেখিয়েছেন, যে শিক্ষা তিনি আল্লাহর নিকট থেকে নিয়ে এসেছেন, যে কিতাব নিয়ে এসেছেন সেই পথ ও শিক্ষা এবং সেই কিতাব অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে আমরা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গাতেই সফলতা লাভ করতে পারি। এতদ্ব্যতীত আমরা যতই বুদ্ধিমান হই না কেন, যতই দার্শনিক বা অন্য কিছু হই না কেন আমরা না দুনিয়াতে কামিয়াবী ও সফলতা লাভ করতে পারব, না আখেরাতে। তাঁর আনুগত্যেই কামিয়াবী ও সফলতা নিহিত। তাঁর প্রদর্শিত পথেই সৌভাগ্য লাভ হতে পারে। তিনি যে পথ বাতলেছেন তাতেই আমাদের কামিয়াবী ও নাজাত, সফলতা ও মুক্তি।

আমাদের বুদ্ধি আমাদেরকে কী বোঝায়? আমাদের বুদ্ধি আমাদেরকে বোঝায় যে, আধুনিক জীবন ব্যবস্থায়, আধুনিক দর্শন ও শিক্ষায় রয়েছে উন্নতি। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে দর্শন শেখায়, জ্ঞান দান করে যে, ধর্ম, ধর্মের কল্যাণ— এসব আবার কী? পৃথিবীর মুসলমানদের সমস্যা, ভারতীয় মুসলমানদের সমস্যা ও সংকট— এসব আবার কী? খাও-দাও ফুর্তি কর। যত পার অর্থ উপার্জন কর। অর্থ উপার্জন কর, নিজে ভোগ কর, সন্তানদের জন্য রেখে যাও। উন্নতমানের বাড়ি তৈরি কর, বাংলো বানাও, জমি ক্রয় কর। বিদেশে যাও, ভ্রমণ কর, ফুর্তি কর। অযথা কোন্ চিন্তায় সময় নষ্ট করছ? কোথায় আখেরাত, কোথায় হিসাব-নিকাশ? দ্বীনী সমস্যা, মুসলমানদের সমস্যা, এসব নিয়ে কিসের চিন্তা? এইসব ঝঞ্ঝাটে পড়লে কি আর আমরা খেতে পারব? ফুর্তি করতে পারব? এসব নিয়ে অযথা পেরেশান হয়ে কোন লাভ আছে? খামাখা এসব পেরেশানী কেন ক্রয় করতে যাওয়া? খাও-দাও ফুর্তি কর। Eat drink and Be merry। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে এই ইউরোপীয় দর্শনের তালীম দেয়। ব্যক্তি সমস্যাকেই প্রধান সমস্যা, পার্থিব সমস্যাকেই প্রধান সমস্যা বলে আমাদের সামনে তুলে ধরে। প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে যে, জাতীয় সমস্যা, দ্বীনী সমস্যা— এসব আসলে কিছু নয়। বরং পার্থিব ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমস্যাই বড় সমস্যা। এই দর্শনের ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, কী উপার্জন করা হচ্ছে, কিভাবে উপার্জন করা হচ্ছে, কী খাওয়া হচ্ছে, কিভাবে খাওয়া হচ্ছে, কোন বস্ত্র পরিধান করা হচ্ছে, কিভাবে পরিধান করা হচ্ছে, কোন খাতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে —এসবের কোন তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

মানুষের জীবন তো এ রকম হতে পারে না। এটা জীব-জানোয়ারের জীবন। বানরের জীবন। বানরের জীবন, গাধার জীবন, গরু-ছাগলের জীবন কিরূপ হয়? যা পায় তাই খায়। শুধু খাওয়া, পান করা এটাই তাদের জীবনের মূল কর্ম। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে জীব-জানোয়ার অনেক সময় নিজের বাচ্চাদের প্রতিও খেয়াল রাখে না। অনেক সময় দেখা গেছে বাচ্চার মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে তারা নিজেরা সেই খাবার খেয়ে নেয়। বাচ্চাকে খেতে দেয় না। এটাই পশুত্ব দর্শন। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে এই শিক্ষাই দিতে চায়। প্রবৃত্তি ও শয়তান বলে যে, অপরের চিন্তায় নিজেকে বিনাশ করছ কেন? সর্বদা অপরের চিন্তায় কেন নিমগ্ন থাক? আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, আমাদেরকে বোঝায় যে, জীবন-মরণ আবার কী? “আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও জীবিত থাকি। (সবকিছু এই দুনিয়াতেই ঘটে) আমরা কখনও পুনরুত্থিত হব না।” অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনই শেষ কথা। আজ আমরা জীবিত আছি কাল মরে যাব। কোথায় ধর্মের প্রশ্ন, কোথায় জাতীয় প্রশ্ন, ধর্মীয় কল্যাণের প্রশ্নই বা কি, কিসের দ্বীনী তালীম, দ্বীনী তারবিয়্যাত? এই দেশে কী হচ্ছে, পরবর্তী প্রজন্মের অবস্থা কী হবে এসব নিয়ে আমাদের ভাবনা কিসের, দায়িত্ব কিসের? আমাদের দায়িত্ব শুধু খাওয়া-পরা এবং সন্তানদেরকে পার্থিব শিক্ষা-দীক্ষা দান করে পার্থিব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। মরণ পরবর্তী জীবনে কী হবে, এই দেশের ধর্মীয় ভবিষ্যত কী, মুসলমানদের ভবিষ্যত কী —এসব চিন্তায় অযথাই কেন আমরা নিজেদের মেধা ও শক্তি ক্ষয় করব? —এটাই প্রবৃত্তির দর্শন, প্রবৃত্তিপূজার দর্শন। দর্শনটি পশুত্ব দর্শন, আত্মকেন্দ্রিক দর্শন। কোন জাতি যখন এই দর্শন অনুযায়ী জীবন যাপন করে, আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে যায় তখন তার ফল দাঁড়ায় অত্যন্ত ভয়াবহ। এর ফলে সৃষ্টি হয় বিচ্ছিন্নতা। আমরা দেখছি, মামাত ভাই, চাচাত ভাই, ফুফাতো ভাই, তালতো ভাই সহ বিভিন্ন সম্পর্কে সম্পর্কিত আত্মীয়দের নিয়ে যে একাত্মতা গড়ে উঠত তা এখন আর বজায় থাকছে না। মানবতার চেতনা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এইসব আত্মীয়দের আত্মীয়তা সম্পর্কও বিলীন হতে বসেছে। পূর্বে সকলকেই একই গোষ্ঠীভুক্ত বলে মনে করা হত। গ্রামের প্রত্যেকেই অপরকে নিজের ভাই বলে জ্ঞান করত। পার্থিব স্বার্থচিন্তা যখন থেকে জেঁকে বসেছে তখন থেকে চিত্র পাল্টে গেছে। এখন এক পাড়ার একটি ছেলের সঙ্গে অপর পাড়ার কোন ছেলের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে পাড়ায় পাড়ায় মারামারি, হানাহানি শুরু হয়ে যায়। কখনও কখনও তা জার্মান ও ব্রিটেনের পারস্পরিক যুদ্ধের ন্যায় যুদ্ধের আকার ধারণ করে।

এই চিন্তা ও দর্শন যদি চলতে থাকে, তবে এক সময় মামাতো ভাই, খালাতো ভাই, চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে লড়াই হবে। পরে ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই হবে। এমনকি অবশেষে পিতা-পুত্রে লড়াই শুরু হবে। উন্নতির এই দর্শন যদি এইভাবেই চলতে থাকে, আমাদের জীবনযাত্রা যদি এইভাবেই চলতে থাকে তবে আপনারা দেখবেন, সন্তানের জন্য পিতার কোন দরদ থাকবে না। দুর্ভিক্ষের সময় যেমনটা দেখা যায়— সন্তানের হাত থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে খেতে— স্বাভাবিক অবস্থাতেও ঠিক তাই দেখা যাবে। সন্তানের গ্রাস মুখ থেকে কেড়ে নেবে তার পিতা এবং তা হবে জাহেলিয়াতের চরম। এতটুকুতেই ঘটনা থেমে থাকবে না। ঘটনা গড়াবে নিজের পর্যন্ত। আপনারা হয়তো দেখবেন হাতের মালিকের বিরুদ্ধে হাত বিদ্রোহ করবে। সে বলবে, জামেয়া ইসলামিয়ার ছেলেরা গতকাল তামাশা দেখাল। মাটি থেকে মুখ দিয়ে পয়সা উঠিয়ে নিল। তুমিও নিজের খাদ্য আমাকে ব্যবহার না করেই সরাসরি মুখ দিয়ে গ্রহণ কর। কারণ খাবার তো তোমার, আমি কেন তোমাকে সাহায্য করব? পা বলবে, আমি কেন চলব? খাবার তো তোমার। খাবারের স্বাদ তো উপভোগ করবে তুমি। সাপ যেভাবে পা ছাড়াই বুকের উপর চলাচল করে, তুমি সেভাবেই বুকে ভর করে এগিয়ে যাও এবং খাদ্য গ্রহণ কর। আমি তোমার জন্য কষ্ট সইতে যাব কেন? দর্শনের ঐ ধারা অব্যাহত থাকলে দেখুন পৃথিবীর অবস্থা শেষ পর্যন্ত কী হয়। পৃথিবী জাহান্নাম অপেক্ষাও মন্দ আবাসস্থলে পরিণত হবে। কেউ কোন সুস্থ চিন্তা করবে না। গরু, ছাগল, ইঁদুর, বানরের ন্যায় খাবারের গ্রাস গলাধঃকরণ করবে। ইনসাফ ও বে-ইনসাফ এক বরাবর হয়ে যাবে। কোনটাই কোন বিশেষ অর্থ বহন করবে না। কারও অধিকার কেউ স্বীকার করে নেবে না। ত্যাগ ও কুরবানী, নিঃস্বার্থবাদিতা ও পরহিতব্রত প্রাচীন কাহিনীতে পরিণত হবে। প্রাচীন যুগের কল্প-কাহিনীতে পরিণত হবে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 নবীগণের মীরাছ

📄 নবীগণের মীরাছ


নবীগণ যে জীবন যাপন করেছেন সে জীবনের জন্য শরীয়ত এসেছে, কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহর ঐ বান্দাগণের সর্বদা চেষ্টা ছিল, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি, ভালবাসা, ত্যাগ ও কুরবানীর জীবন ব্যাপকতর হোক। মানুষ যেন বানর না হয়, গাধা না হয়ে যায়। মানুষের চিন্তা যেন এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ না থাকে যে, আমার নির্ধারিত খাবার আমি পেয়ে যাই। বরং সে যেন চিন্তা করে, আমার স্ব-জাতি আমারই মত মানুষ। তাদের মধ্যে যারা খাদ্য পাচ্ছে না তাদেরকেও খাদ্য দান করি। অপরকে আহার করানোর মধ্যে সে যেন আনন্দ লাভ করে। অন্যকে ক্ষুধার্ত দেখে নিজে খাদ্য গ্রহণ করতে সে যেন শান্তিবোধ না করে। এটাই নবীগণের মীরাছ ও উত্তরাধিকার। তাঁদের রেখে যাওয়া শিক্ষা। তাঁরা এই আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছেন। মানুষের মধ্যে যেন পরহিতব্রত, পরদুঃখকাতরতার চরিত্র ব্যাপকতর হয় সেজন্য তাঁরা সংগ্রাম করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের ঘটনা আপনারা শুনে থাকবেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে পড়ে থাকা এক সাহাবীর নিকট পানি আনা হলে তিনি বললেন, আমি এইমাত্র আরেকজন আহত ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, আপনি তাকে প্রথমে পানি পান করিয়ে আসুন। দ্বিতীয়জন বলল, আমি অপর একজন আহত ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, তাকে পানি পান করান। তৃতীয়জন বলল, আমি অপর একজন ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, আপনি তার নিকট পানি নিয়ে যান। পানি বাহক চতুর্থজনের নিকট গিয়ে দেখে তিনি ইন্তেকাল করে গেছেন। এরপর একে একে তৃতীয়জন, দ্বিতীয়জন ও প্রথমজনের নিকট এসে দেখে তাঁরা সবাই ইন্তেকাল করে গেছেন। এটাই মানবতা।

মানবতার মর্যাদা এখানেই, তার শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। এর জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই মানবতা প্রতিষ্ঠা করতেই এই উম্মতকে প্রেরণ করা হয়েছে। অতএব এই উম্মতও যদি নিজ নিজ চিন্তায় বিভোর থাকে, নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকার দর্শনে বিশ্বাসী হয়, প্রবৃত্তি যদি শয়তানের অনুগত হয়ে যায়, সত্যকে সত্য বলে জ্ঞান না করে, সত্যকে অস্বীকার করে এবং মনে করে যে, খাওয়া-দাওয়া ও উদরপূর্তি ব্যতীত দ্বিতীয় কোন কর্ম নেই তাহলে বুঝতে হবে যে, এই উম্মত মৃত। বুঝতে হবে যে, এই উম্মতের কোন বৈশিষ্ট্য আর অবশিষ্ট নেই। নবীগণ বলেছেন, নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকা, স্বার্থ-সর্বস্ব হয়ে যাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্তির নামান্তর।

সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে যখন এই চিন্তার উদয় হল যে, আমরা ইসলামের অনেক খেদমত করেছি। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামারকে ত্যাগ করেছি, সবকিছু বিস্মৃত হয়ে আমরা ইসলামের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছি। আমাদের বাড়ি-ঘর উজাড় হয়ে গেছে, ক্ষেত-খামার বরবাদ হয়ে গেছে, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেউলিয়াত্বের শিকার হয়ে গেছে। এখন আমরা কিছু দিনের জন্য ব্যক্তিগত কারবার দেখি। এরপর পুনরায় ইসলামের খেদমতে লেগে যাব। তাঁদের এইরূপ চিন্তা ইসলাম ও মুসলিম জাতির জন্য ছিল শঙ্কাধ্বনি স্বরূপ। তাই সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে হুশিয়ার করে দেওয়া হল। বলা হল, খবরদার। এইরূপ চিন্তাকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনো না। এই চিন্তা করার অর্থ, বিষের পেয়ালা নিজের মুখে তুলে নেওয়া। তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল, তোমরা তোমাদের এই উদ্ভট চিন্তা পরিত্যাগ করে ইসলামের খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ কর, নতুবা তোমাদের পরিণাম হবে অশুভ। বলা হল— “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। এই চিন্তা জীবন বিনাশী বিষ। এই বিষ যদি তোমরা পান করে ফেল, দ্বীনের খেদমতকে পিছনে ঠেলে দিয়ে নিজেদের পার্থিব স্বার্থে জড়িয়ে পড় তবে তোমরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। কারণ কিছু দিনের জন্য যদি তোমরা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য সামলে নেও তাহলে তাতে কী লাভ হবে। জাতি গঠনের কাজ তো হবে না। যদি তোমরা জাতি গঠনের কাজে অবহেলা কর, এই কাজকে উপেক্ষা কর তাহলে দুনিয়াতে মহা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। নবগঠিত মানবতা ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলোর স্তূপে পরিণত হয়ে যাবে। সমগ্র জাতিকে একটি একক মনে কর। গোটা জাতির কল্যাণের লক্ষ্যে ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার কর। ইসলামকে ভিত্তি করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব কায়েম কর।”

সাহাবায়ে কেরামের মস্তিষ্কে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামার ও দোকানপাটের চিন্তা উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে দ্বীনের দাবি সম্পর্কে সচেতন করে দিলেন। বলে দিলেন যে, খবরদার! এটা ধ্বংসাত্মক চিন্তা। জাতীয় স্বার্থ বিস্তৃত হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে চিন্তা করা তোমাদের জন্য প্রাণঘাতী বিষতুল্য। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়, এরপর খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যে ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার করেছেন তার কথা আর কী বলব? সহায়-সম্পদ, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, বাড়ি-ঘর ইত্যাদি কোন কিছুর পরওয়া তাদের ছিল না। সবকিছুই তাঁরা ত্যাগ করেছিলেন। আল্লাহর দ্বীনের রাস্তায় সবকিছু তাঁরা সঁপে দিয়েছিলেন। সন্তান-সন্ততির পরওয়া ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরওয়া ছিল না। সারা জীবনের তিল তিল করে সঞ্চয় করা সম্পদের পরওয়া ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম ইসলামকে যে গতি ও শক্তি দান করে গেছেন সেই গতি ও শক্তিতেই আমাদের শত ত্রুটি ও উদাসীনতা সত্ত্বেও ইসলাম অদ্যাবধি টিকে আছে। কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

📘 উলামা তলাবা > 📄 ধ্বংসের উপকরণ

📄 ধ্বংসের উপকরণ


তোমরা যখন যাকাত আদায় করবে না তখন তোমাদের উপর অনাকাঙ্ক্ষিত ট্যাক্স বসিয়ে দেওয়া হবে। যখন কোন জাতি আল্লাহ তাআলা কর্তৃক যাকাতরূপে নির্ধারিত অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করে আল্লাহ তাআলা তখন তাদের উপর রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ সহ নানা রকম আকারের ট্যাক্স আরোপ করে দেন। উদাহরণ স্বরূপ— ঘরে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ল। ব্যস তার পিছনে অঢেল অর্থ ব্যয় হতে থাকল। কোন কোন লোককে জিজ্ঞাসা করেছি যে, আপনি এত উচ্চ বেতন লাভ করেন সেগুলো কী হয়? উত্তর পাওয়া যায় যে, সাহেব! দশ বৎসর যাবৎ ঘরে একটি রোগ প্রবেশ করেছে, রোগটি আর যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। প্রতিদিন ডাক্তার ডাকতে হয়। বড় বড় ডাক্তারদের বোর্ড বসাতে হয়। স্ক্যানিং করাতে হয়, এক্সরে করাতে হয়। কোন কোন সময় ইউরোপে নিয়ে যেয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। বিলাসী জীবন যাপনকারী ও কৃপণ বিত্তশালীদের ঘরে এই জাতীয় রোগ আল্লাহ তাআলা দিয়ে দিয়েছেন। কারও আবার অহেতুক কোন শখ বা সাধ সৃষ্টি হয়ে গেছে— যাকে বলে Hobby— সেই পথে সে অর্থ ব্যয় করে।

মোটকথা আল্লাহ নির্ধারিত পথে যদি ব্যয় না কর তবে ব্যয় অবশ্যই হয়ে যাবে, তবে অন্য পথে, অন্য খাতে। যে পথে, যে খাতে ব্যয় করার দ্বারা না ইসলামের ফায়দা হবে, না জাতির ফায়দা হবে, না তোমার নিজের ফায়দা হবে। অনর্থক ব্যয় হতে থাকবে। আর তা হবে ধ্বংসের উপকরণ। বলছিলাম যে, মুসলমান পুঁজিপতিদের নিকট তাদের অর্থ-সম্পদই প্রিয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জাতির সমস্যা ও সঙ্কটের দিকে তারা চোখ তুলেও তাকায় না। সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র ছিল ভিন্ন। তাঁরা অর্থ-সম্পদের পরওয়া করতেন না। জাতির কল্যাণ সাধন ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ঘর শূন্য করে তাঁরা অর্থ-কড়ি নিয়ে আসতেন জাতির স্বার্থে ব্যয় করতে। সাহাবায়ে কেরামের জীবনের এই জাতীয় ঘটনার অনেকগুলোই আপনারা জানেন। তবুও একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। ঘটনাটি আপনাদেরও জানা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রাযি.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? তিনি বললেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নাম রেখে এসেছি। এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের হাল ও অবস্থা। কিন্তু আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, এই ত্যাগ ও কুরবানী জীবনের পথ নয়, এটা নিজেকে ধ্বংস করার পথ। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, পয়সা বাঁচানো, অর্থ সঞ্চয় করে রাখা উন্নতির পথ। কিন্তু নবীগণ বলেন, এটা ধ্বংসের পথ। তাঁদের কথাই সত্য বলে প্রমাণিত। আমরা দেখছি, আমরা ক্রমশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমাজে অনেক কারুনের দেখা পাওয়া যায়।

প্রত্যেক গ্রামে কমপক্ষে চার-পাঁচজন বিত্তশালী দেখতে পাবেন, যারা কারুনের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু আমাদের সমাজের অবস্থা কী? আমাদের ধর্মীয় সত্ত্বার কী হাল? আমাদের সম্প্রদায়ের কোন ইজ্জত-সম্মান অবশিষ্ট আছে কি? কানা-কড়ির মূল্যও আজ আমাদের নেই। যেখানে ইচ্ছা সেখানে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের যদি ইজ্জত থাকত, তাদের যদি প্রভাব থাকত, আমাদের যদি চরিত্র ও আদর্শ থাকত, আমরা যদি আদর্শবান হতাম, ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকারকারী হতাম, আমরা যদি জাতি ও দ্বীনের স্বার্থে অর্থ ব্যয়কারী হতাম তাহলে কার সাধ্য ছিল যে, কথায় কথায় আমাদের উপর আক্রমণ চালাবে, কিংবা একটি দিয়াশলাই দিয়ে আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে? কার সাধ্য ছিল যেখানে ইচ্ছা যখন ইচ্ছা হাঙ্গামা বাধানোর?

জাতি তার সম্মান হারিয়ে ফেলেছে, ইজ্জত-আবরু হারিয়ে ফেলেছে। জাতি মর্যাদাহীন হয়ে পড়েছে। জাতির জীবন আর জীবন নেই। জাতির সম্মান আর সম্মান নেই। কাজেই যেখানে চাও বিশৃঙ্খলা ও হাঙ্গামা সৃষ্টি করে দাও, ঠেকায় কে? যদি আপনাদের সম্মান থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি ত্যাগ ও কুরবানীর অভ্যাস থাকত, যদি আপনাদের মধ্যে জাতির স্বার্থে অর্থ ব্যয়ের অভ্যাস থাকত, আপনারা যদি বুক উঁচিয়ে জাতির কল্যাণে দাঁড়িয়ে যেতেন তাহলে কার সাধ্য ছিল আপনাদের বিরুদ্ধে হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? আপনারা যদি প্রমাণ করে দিতে পারতেন যে, আপনারা দৃঢ় সত্ত্বার অধিকারী এক জাতি, আপনাদের মধ্যে যদি অর্থের প্রতি মোহ না থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি কারূনের উপস্থিতি না থাকত, তাহলে কি জাতি আজ এরূপ মর্যাদাহীন হত? কারও কি সাহস হত হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? সংখ্যালঘুতা কোন সমস্যাই নয়। ইজ্জত-সম্মানের অধিকারী, আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী কোন জাতির জন্য সংখ্যালঘুতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। আজ অগ্নি উপাসক জাতির কাউকে আঘাত করে দেখুন, কোন শিখকে আঘাত করে দেখুন তো? এরাও তো সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও শিখরা পাঞ্জাব বানিয়ে নিয়েছে। নিজেদের ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে স্বতন্ত্র প্রদেশ বানিয়ে নিয়েছে। আর আপনারা নিজেদেরকে রক্ষা পর্যন্ত করতে পারছেন না। আপনাদের এই অর্থ-সম্পদ কবে কাজে আসবে? আপনার এত বড় ফার্ম আছে, এত জায়গা-জমি আছে, এতগুলো দোকান আছে— এসব দেখে দেখে আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন। আপনার এসব সম্পদ দ্বারা যদি ইসলামের ফায়দা হত, জাতির ফায়দা হত তাহলে আমাদের অপেক্ষা আর কেউ অধিক আনন্দিত হত না। আপনি বিশাল পুঁজিপতি, আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব কিছুতে আমাদের কিছু যায় আসে না। পুঁজিপতি হয়ে আপনি যদি বোধহীন না হতেন, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন হতেন, ভীরু ও কাপুরুষ না হতেন, হিম্মত ও সাহসের অধিকারী হতেন তাহলে আজ এই জাতি এত লাঞ্ছিত হত না।

📘 উলামা তলাবা > 📄 বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা

📄 বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা


আপনারা আমাদের নিকট বিশৃঙ্খলা দূরীভূত করণের উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে থাকেন। উপায় একটিই। আর তা হল নিজের অর্থকে নিজের অর্থ মনে না করা। গোষ্ঠীগত বিশৃঙ্খলার চিকিৎসা হল, যে জিহ্বা আপনার বিরুদ্ধে চলছে তা শক্ত করে ধরে ফেলার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। যে হাত আপনার বিরুদ্ধে উঠছে সেই হাতকে ধরে ফেলার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। আপনার বিরুদ্ধে যে হাত অগ্রসর হচ্ছে তাকে রোধ করার শক্তি আপনার মধ্যে থাকতে হবে। কারণ এই হাত মুসলমানদের বিরুদ্ধে উঠছে। আপনি যদি তা না করেন তাহলে আপনি বাঁচতে পারবেন না।

এই যুগ স্ব-জাতিকে শক্তিশালী করতে ত্যাগ ও কুরবানীর মাধ্যমে, অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করার যুগ। দুঃখ ও বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই সকল কথা আপনাদেরকে বলতে হচ্ছে। এই সকল কথা আমি কানপুরে বলেছিলাম। রেঙ্গুনেও এ সকল কথা বলেছিলাম। দীর্ঘ এগার বৎসর পূর্বে রেঙ্গুনে আমি কথাগুলো বলেছিলাম। এবার আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে কালিকটে আসার পূর্বে আমি রেঙ্গুন হয়ে এসেছি। আমি কাশফ কিংবা এলহামের অধিকারী কোন ব্যক্তি নই। আমি অত্যন্ত গুনাহগার একজন বান্দা। আমার দ্বারা তিনি সত্য ও বাস্তবসম্মত কথা বলিয়ে নিয়েছেন। রেঙ্গুনের অধিবাসীরা আমাকে খুব মহব্বত করত। তাদের মধ্যে অনেকেই পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদের অধিকারী। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, যদি তোমরা তাবলীগে বের না হও, আল্লাহর রাস্তায় বের না হও, অর্থ-সম্পদে আল্লাহর যে হক তা আদায় না কর, জাতির স্বার্থে, জাতির কল্যাণে যদি অর্থব্যয় না কর তাহলে স্মরণে রেখ, তোমাদের দোকানপাট এক সময় সীলগালা করে দেওয়া হবে, তোমাদের কল-কারখানা বাজেয়াপ্ত করা হবে। তোমরা যদি দ্বীনের চাহিদা ও দাবি পূরণ না কর তবে আল্লাহ তোমাদের উপর আযাব নাযিল করে দেবেন। আপনারা বিশ্বাস করুন, আমি কসম করে বলছি, আমার বলা কথাগুলো আমি ভুলে গিয়েছিলাম। রেঙ্গুনের অধিবাসীরা বারবার পত্রের মাধ্যমে আমাকে জানিয়েছে যে, মাওলানা, আপনি যা বলে গিয়েছিলেন তা শুনে এবং পাঠ করে বার্মার মুসলমানরা এখন শুধুই চোখের পানি ফেলে। কারণ বার্মায় এখন সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতাসীন। সেখানকার মুসলমানদের এখন বড় করুণ দশা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00