📘 উলামা তলাবা > 📄 উম্মতের প্রতি নবীগণের অসাধারণ মমতা ও ভালবাসা

📄 উম্মতের প্রতি নবীগণের অসাধারণ মমতা ও ভালবাসা


তবে পিতা-মাতার ভালবাসা অন্ধ হয়। এমনিতেই ভালবাসা অন্ধ হয়। মায়ের ভালবাসা অপেক্ষাকৃত বেশি অন্ধ হয়। ফলে মা শিশুর সকল আবদার, সকল অনুরোধ রক্ষা করতে চেষ্টা করে। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তা কল্যাণকর কি অকল্যাণকর মা অনেক সময় তা বিবেচনায় আনে না। ভালবাসাপ্রসূত আবেগ তাকে অন্ধ করে ফেলে। অনেক সময় সন্তানের জন্য যা ক্ষতিকর সেরূপ আবদারও পূরণ করে থাকে। আজ মক্তবে যেতে চাইল না, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন অজুহাত দেখাল তো মা তাতে সায় দিয়ে তাকে আর মক্তবে পাঠালেন না। সন্তান শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকল। এরূপ হাজারো দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যেতে পারে। যা হোক, মানুষের দৈহিক প্রতিপালন ও পার্থিব উন্নতির ব্যবস্থাপনা যেরূপ পিতা-মাতার মায়া-মমতা ও ভালবাসার উপর ভর করে চলছে, অদ্রূপ মানুষের আত্মিক ও চারিত্রিক প্রতিপালন ব্যবস্থা, সত্য বলতে— এই জগতের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আম্বিয়ায়ে কেরামের মায়া-মমতা ও ভালবাসার ভিত্তিতে চলছে। যে সকল পিতা-মাতা কিছুটা বুদ্ধি রাখে, কিছুটা দূরদর্শী হয়, সন্তানের ভবিষ্যতের প্রতি যাদের কিছুটা দৃষ্টি থাকে তারা সন্তানের সকল অনুরোধ, সকল জিদ পূরণ করে না। তাদের অন্যায় আবদার তাঁরা কখনই রক্ষা করে না। অনেক সময় তাঁরা সন্তানকে কাঁদান, তাদেরকে শাস্তিও দিয়ে থাকেন। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য যা কল্যাণকর তাই তাঁরা করে থাকেন। সন্তান মাদরাসায় যেতে চায় না তাঁরা জোরপূর্বক তাকে মাদরাসায় প্রেরণ করেন। সন্তান ঔষধ খেতে চায় না, জোরপূর্বক ঔষধ খাওয়ান। সন্তান অপারেশন করাতে চায় না তাঁরা অপারেশন করান। পিতা-মাতা অপেক্ষা সন্তানের প্রতি অধিক ভালবাসা আর কার হতে পারে? কিন্তু তারা এই সবকিছু করেন সন্তানের কল্যাণের জন্যই। এটাই প্রকৃত ভালবাসা। এই ভালবাসা না থাকলে মানবজাতি শিক্ষা, দীক্ষা, আদর্শ, সর্বোপরি মানবতা থেকে বঞ্চিত থাকত। তো যেরূপ এই পার্থিব প্রতিপালন ব্যবস্থা চলছে পিতা-মাতার মাধ্যমে, অদ্রূপ মানুষের আত্মিক ও চারিত্রিক প্রতিপালনের ব্যবস্থা নবীগণের সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহ তাআলা উম্মতের প্রতি তাঁদেরকে এত মমতা ও ভালবাসা দান করেছেন, যার সামনে পিতা-মাতার মমতা ও ভালবাসা নিতান্ত নগণ্য ও তুচ্ছ। আমাদের পক্ষে অনুমান করাও অসম্ভব যে, উম্মতের প্রতি নবীগণের অন্তরে কী পরিমাণ ভালবাসা থাকতে পারে। নিজের উম্মতের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা পরিমাপ করা আমাদের পক্ষে কঠিন। কুরআন মাজীদের যে আয়াতখানি আমি আপনাদের সামনে তেলাওয়াত করেছি, আমাদের কিছুটা জ্ঞান যদি থেকে থাকে, নবীর জীবন চরিত ও তাঁর জীবনের ঘটনাবলী সম্পর্কে আমরা যদি ওয়াকিফহাল থেকে থাকি তাহলে একজন মুসলমান হিসেবে আয়াতখানির প্রতিটি শব্দ নয়, বর্ণ নয় বরং প্রতিটি নুক্তায় আমাদের বিশ্বাস থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

“অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলো, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি।”

আয়াতে বলা হয়েছে, এ রকম একজন নবী এসেছেন যিনি তোমাদেরই একজন। তিনি যদি আমাদের মধ্য থেকে না হতেন তাহলে আমাদের দুঃখ-বেদনার অনুভূতি তাঁর হত না। আমাদের সঙ্কটকে তিনি অনুধাবন করতে পারতেন না। অনুধাবন করলেও ঐ সঙ্কটের অংশীদার হতেন না। একমাত্র মানুষই পারে মানুষের দুঃখ-বেদনা উপলব্ধি করতে। ভাইয়ের কষ্ট ভাই অনুভব করতে পারে। একই গ্রামের অধিবাসীরা একে অপরের দুঃখ-বেদনা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারে। অবশ্য একই গ্রামের অধিবাসীরা অনেক সময় একে অপরের সঙ্কট উপলব্ধি করতে পারে না। প্রদেশ ও দেশ আরও বড়। আর গোটা বিশ্ব তো অনেক পরের ব্যাপার। একটি ছোট্ট গ্রামের অধিবাসীরাও অনেক সময় একে অপরের সঙ্কটকে উপলব্ধি করতে পারে না।

যা হোক, আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমাদের নিকট একজন নবী এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই।” অর্থাৎ যিনি তোমাদের মানব জাতিরই একজন। তোমাদের কষ্টে তিনিও কষ্ট অনুভব করেন। তোমাদের কষ্ট ও যন্ত্রণা তিনি বরদাশত করতে পারেন না। তোমাদের যন্ত্রণায় তাঁর জীবন বের হওয়ার উপক্রম হয়। তোমাদের কষ্টে, তোমাদের দুঃখ-বেদনা দেখে তোমাদের প্রতি ভালবাসার কারণে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি তোমাদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। তিনি তোমাদের চিন্তায় বিভোর থাকেন। তাঁর ধ্যান ও খেয়াল তোমাদেরকে নিয়েই। তোমরা আল্লাহর মকবুল বান্দা হয়ে যাবে, তোমাদের প্রতি সর্বদা আল্লাহর রহমত থাকবে, তাঁর ক্ষমা থাকবে তোমাদের জন্য, আল্লাহর ব্যাপারে সামান্যতম উদাসীনতায় তাঁর রহমত থেকে তোমরা যেন বঞ্চিত না হয়ে যাও, কুফরী কোন কথা তোমাদের হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়া তো দূরের কথা মুখেও যেন উচ্চারিত না হয়, মানুষ যেন জাহান্নামীদের দলের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যায়, শয়তানের দলভূক্ত যেন হতে না পারে। সকল মানুষ যেন আল্লাহ তাআলার রহমতের আওতায় চলে আসে। মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।

উম্মতের প্রতি রাসূলের মায়া-মমতা কী পর্যায়ের ছিল, উম্মতকে নিয়ে তাঁর চিন্তা-ফিকির কী পরিমাণ ছিল তা আপনারা অনুমান করতে পারবেন না। ব্যস, এতটুকু বুঝুন যে, এক মায়ের একজনই মাত্র সন্তান আছে। ঐ একজন সন্তানই তার জীবন-আশ্রয়, তার ঘরের প্রদীপ। ঐ সন্তানের প্রতি তার মায়ের যতটুকু চিন্তা-ফিকির হতে পারে, যতটুকু মায়া-মমতা থাকতে পারে, তার উন্নতিতে তার মায়ের যে পরিমাণ আনন্দ অনুভূত হতে পারে তার কষ্টে তার মায়ের যতটুকু কষ্ট হতে পারে, উম্মতের প্রতি একজন নবী ও রাসূলের ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্ক তদপেক্ষা অনেক বেশি। সাহাবায়ে কেরামের সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা তো বলাই বাহুল্য। এমনকি যারা মক্কার অধিবাসী ছিল, তখনও মুসলমান হয়নি তারা যখন বদরের যুদ্ধে বন্দী হয়ে আসল তখন নামাযের মধ্যেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তি পাচ্ছিলেন না, অস্থির ও পেরেশান হয়ে পড়ছিলেন। অথচ নামায ছিল তাঁর চোখের শীতলতা। নামাযে যে শান্তি তিনি পেতেন তা কোথাও তিনি পেতেন না। নামাযের প্রতি তাঁর যে আসক্তি ছিল, নামাযে তাঁর যে নিমগ্নতা থাকত তা অনুমান করাও আমাদের জন্য দুঃসাধ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে বসা থাকতেন। মজলিসে আলোচনা চলত। দ্বীন সংক্রান্ত আলোচনাই হত বৈ কি। ইসলামের প্রচার-প্রসার ও তাবলীগ সম্পর্কে আলোচনা চলত। কুরআন ও হাদীসের আলোচনা চলত। কিন্তু নামাযে উপস্থিতি তাঁর নিকট এত প্রিয় ছিল, নামাযের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এত বেশি ছিল যে, তিনি নামাযের জন্য ব্যাকুল হয়ে হযরত বেলাল (রাযি.) কে বলতেন, হে বেলাল! আযান দিয়ে আমাকে শান্তি দাও। অনেক অপেক্ষা করেছি, আর অপেক্ষা সইছে না। আল্লাহর ওয়াস্তে আযান দাও, যাতে প্রশান্তি লাভ করতে পারি, আরাম পেতে পারি। নামাযের প্রতি তাঁর আকর্ষণ, নামাযের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এইরূপই ছিল। এতদসত্ত্বেও নামাযরত অবস্থাতেও তিনি উম্মতের চিন্তা করতেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কখনও কখনও আমি নামাযে থাকি আর পিছনে শিশুর কান্নার আওয়াজ পাই, ফলে আমি নামায সংক্ষিপ্ত করি। অর্থাৎ অন্তর তো চায় নামায দীর্ঘ করতে, হৃদয় উজাড় করে নামাযে কুরআন তেলাওয়াত করতে, একাগ্রতা ও আকুতি সহকারে লম্বা লম্বা সিজদা করতে, আল্লাহর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ একান্ত আলাপচারিতায় লিপ্ত থাকতে, তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে, তাঁকে রাজী-খুশি করতে কিন্তু শিশুর কান্নার শব্দ পাই আর চিন্তা হয় যে, শিশুর মা হয়তো পেরেশান হবে, নামাযে তার মন বসবে না, শিশুকে কোলে তুলে নিতে তার হৃদয় ছটফট করবে তাই নামায সংক্ষিপ্ত করে দেই। উম্মতের প্রতি এতদপেক্ষা মায়া-মমতা আর কী হতে পারে? নামাযের সাথে আমাদের সেই পরিমাণ হৃদয়ের সম্পর্ক নেই। নামাযের সাথে যাদের হৃদয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে তারা অনুধাবন করতে পারে যে, নামায সংক্ষিপ্ত করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য কত বড় ত্যাগ ও কুরবানী ছিল।

উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মমতা ও ভালবাসা কী পরিমাণ ছিল তা তাঁর একটি বক্তব্য দ্বারাও আমরা কিছুটা অনুমান করতে পারি। তিনি বলেন, “আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে ব্যক্তি আগুন জ্বালল, আর পতঙ্গপাল উড়ে এসে সেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকল।” বর্ষার মৌসুমে আপনারা দেখে থাকবেন যে, কীট-পতঙ্গ উড়ে এসে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ধ্বংস হয়ে যায়। একটি প্রদীপ জ্বাললেই হল। ব্যস হাজার হাজার কীট-পতঙ্গ তাতে উড়ে এসে পড়ে। আলো জ্বালতেই আল্লাহ জানেন, তাদেরকে কে সংবাদ দেয়— দলে দলে এসে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। তো রাসূল বলেন, তোমাদের দৃষ্টান্ত এ রকমই যে রকম কেউ আগুন জ্বালে আর পতঙ্গপাল ছুটে এসে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর নিজের সর্বনাশ করে। তদ্রূপ তোমরাও জাহান্নামের আগুনে নিপতিত হতে চাও, দোযখে প্রবেশ করে নিজের সর্বনাশ করতে চাও, আর আমি তোমাদের কোমর ধরে ধরে টেনে এনে আগুন থেকে রক্ষা করতে চাই। উম্মতের সাথে রাসূলের সম্পর্ক এ রকমই। উম্মতের প্রতি তাঁর ব্যাকুল ভালবাসা। এত ব্যাকুলতা যে, আল্লাহ তাআলাকে বলতে হয়— “তারা এই বাণীতে বিশ্বাস করল না বলে তুমি কি তাদের পিছনে ঘুরে দুঃখে আত্মবিনাশ করে ফেলবে?” উম্মতের কেউ যেন জাহান্নামে না যায়, সকলেই যেন জান্নাতে যেতে পারে এই চিন্তায় সর্বদা তিনি ব্যাকুল থাকতেন। এ ব্যাপারে তিনি তো তিনি, তাঁর অনুগত বান্দারা পর্যন্ত ব্যাকুল থাকতেন। আপনারা সাহাবায়ে কেরাম ও সুফী মাশায়েখ ও বড় বড় উলামায়ে কেরামের জীবনী পাঠ করলে জানতে পারবেন যে, তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উত্তরাধিকার যথাযথভাবে বহন করেছেন। তাঁরা তাঁদের ভক্ত-অনুরক্তদের প্রতি যে ভালবাসা পোষণ করতেন, তাদেরকে যেরূপ মায়া-মমতা করতেন, তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের এই দিকটা পরিস্ফুট হয়ে উঠত। এতদসম্পর্কে হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার ঘটনা বর্ণিত আছে। তিনি একবার এক মজলিসে দ্বীন সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। দলে দলে লোক এসে সমবেত হতে থাকল। এক সময় ছায়াবিশিষ্ট জায়গা ভর্তি হয়ে গেল। পরবর্তীতে যারা আসল তারা রোদে দাঁড়িয়েই তাঁর কথা শুনতে থাকল। তিনি হঠাৎ ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা ছায়ায় চলে আস। তোমরা রোদে দাঁড়িয়ে আছ আর আমার দেহ পুড়ে যাচ্ছে, জ্বলে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারীদের অবস্থা এইরূপই ছিল। অপরের কষ্ট তারা এত তীব্রভাবে উপলব্ধি করতেন যে, রোদে দাঁড়িয়ে থাকত অন্য কেউ, আর তাঁরা নিজের দেহে জ্বালা অনুভব করতেন।

হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার অপর একটি ঘটনা বর্ণিত আছে যে, তিনি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনগুলো ব্যতীত সারা বছরই রোযা রেখে কাটাতেন। ইফতারের সময় দস্তরখান বিছানো থাকত। লোকেরা হালুয়া ইত্যাদি খাবার নিয়ে আসত। তিনি তাঁর পছন্দ মোতাবেক খাবার গ্রহণ করতেন। অনেক সময় দেখা যেত দস্তরখানের দিকে শুধু হাত বাড়িয়ে রেখেছেন, ব্যস। নামে মাত্র দুই-এক লোকমা আহার করেছেন আর দস্তরখান উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এইরূপ দেখে একবার একজন জিজ্ঞেস করল, আপনি খাবার খান না কেন? আমরা আপনাকে দেখলাম, মাত্র দুই-এক লোকমা খেতে? কারণ কী? তিনি বললেন, তোমরা যা কিছু আহার কর তা আমার পেটেই যায়। আমার অনুভব হয়, তোমাদের আহারকৃত খাদ্যগুলো আমার পেটে প্রবেশ করছে। সুবহানাল্লাহ! নিজামুদ্দীন আউলিয়ার একজন খাদেমের বর্ণনা— আমি সাহরীর খাবার নিয়ে আসতাম। তিনি কখনও পেট ভরে খেতেন না। দুই-এক লোকমা খেয়েই উঠে যেতেন। আমি একদিন তাঁকে বললাম, হযরত! ভালমত কিছু আহার করুন না! বয়স তো আশির উপরে। এই বয়সে ঠিকমত খাবার না খেলে চলবেন কী করে? তিনি বললেন, মিয়াঁ ইকবাল! তুমি কি জান না, আল্লাহর অনেক বান্দা ক্ষুধার্ত অবস্থায় মসজিদের আঙ্গিনায় রাত যাপন করছে? তুমি কি জান, দিল্লীর মুসাফির খানায় কত মুসাফির যবের এক টুকরো রুটির অপেক্ষায় প্রহর গুণছে? তারা আহার পায় না, আমি কি করে উদরপূর্তি করে আহার করতে পারি? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারীদের, তাঁর যথার্থ উত্তরাধিকারীদের জীবনের এরূপ অসংখ্য ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়।

📘 উলামা তলাবা > 📄 দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার নিশ্চয়তা

📄 দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার নিশ্চয়তা


আমার প্রিয় বন্ধুগণ! আমি আপনাদেরকে যে কথা বলতে চাই তা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে পথ দেখিয়েছেন, যে শিক্ষা তিনি আল্লাহর নিকট থেকে নিয়ে এসেছেন, যে কিতাব নিয়ে এসেছেন সেই পথ ও শিক্ষা এবং সেই কিতাব অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে আমরা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গাতেই সফলতা লাভ করতে পারি। এতদ্ব্যতীত আমরা যতই বুদ্ধিমান হই না কেন, যতই দার্শনিক বা অন্য কিছু হই না কেন আমরা না দুনিয়াতে কামিয়াবী ও সফলতা লাভ করতে পারব, না আখেরাতে। তাঁর আনুগত্যেই কামিয়াবী ও সফলতা নিহিত। তাঁর প্রদর্শিত পথেই সৌভাগ্য লাভ হতে পারে। তিনি যে পথ বাতলেছেন তাতেই আমাদের কামিয়াবী ও নাজাত, সফলতা ও মুক্তি।

আমাদের বুদ্ধি আমাদেরকে কী বোঝায়? আমাদের বুদ্ধি আমাদেরকে বোঝায় যে, আধুনিক জীবন ব্যবস্থায়, আধুনিক দর্শন ও শিক্ষায় রয়েছে উন্নতি। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে দর্শন শেখায়, জ্ঞান দান করে যে, ধর্ম, ধর্মের কল্যাণ— এসব আবার কী? পৃথিবীর মুসলমানদের সমস্যা, ভারতীয় মুসলমানদের সমস্যা ও সংকট— এসব আবার কী? খাও-দাও ফুর্তি কর। যত পার অর্থ উপার্জন কর। অর্থ উপার্জন কর, নিজে ভোগ কর, সন্তানদের জন্য রেখে যাও। উন্নতমানের বাড়ি তৈরি কর, বাংলো বানাও, জমি ক্রয় কর। বিদেশে যাও, ভ্রমণ কর, ফুর্তি কর। অযথা কোন্ চিন্তায় সময় নষ্ট করছ? কোথায় আখেরাত, কোথায় হিসাব-নিকাশ? দ্বীনী সমস্যা, মুসলমানদের সমস্যা, এসব নিয়ে কিসের চিন্তা? এইসব ঝঞ্ঝাটে পড়লে কি আর আমরা খেতে পারব? ফুর্তি করতে পারব? এসব নিয়ে অযথা পেরেশান হয়ে কোন লাভ আছে? খামাখা এসব পেরেশানী কেন ক্রয় করতে যাওয়া? খাও-দাও ফুর্তি কর। Eat drink and Be merry। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে এই ইউরোপীয় দর্শনের তালীম দেয়। ব্যক্তি সমস্যাকেই প্রধান সমস্যা, পার্থিব সমস্যাকেই প্রধান সমস্যা বলে আমাদের সামনে তুলে ধরে। প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে যে, জাতীয় সমস্যা, দ্বীনী সমস্যা— এসব আসলে কিছু নয়। বরং পার্থিব ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমস্যাই বড় সমস্যা। এই দর্শনের ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, কী উপার্জন করা হচ্ছে, কিভাবে উপার্জন করা হচ্ছে, কী খাওয়া হচ্ছে, কিভাবে খাওয়া হচ্ছে, কোন বস্ত্র পরিধান করা হচ্ছে, কিভাবে পরিধান করা হচ্ছে, কোন খাতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে —এসবের কোন তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

মানুষের জীবন তো এ রকম হতে পারে না। এটা জীব-জানোয়ারের জীবন। বানরের জীবন। বানরের জীবন, গাধার জীবন, গরু-ছাগলের জীবন কিরূপ হয়? যা পায় তাই খায়। শুধু খাওয়া, পান করা এটাই তাদের জীবনের মূল কর্ম। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে জীব-জানোয়ার অনেক সময় নিজের বাচ্চাদের প্রতিও খেয়াল রাখে না। অনেক সময় দেখা গেছে বাচ্চার মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে তারা নিজেরা সেই খাবার খেয়ে নেয়। বাচ্চাকে খেতে দেয় না। এটাই পশুত্ব দর্শন। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে এই শিক্ষাই দিতে চায়। প্রবৃত্তি ও শয়তান বলে যে, অপরের চিন্তায় নিজেকে বিনাশ করছ কেন? সর্বদা অপরের চিন্তায় কেন নিমগ্ন থাক? আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, আমাদেরকে বোঝায় যে, জীবন-মরণ আবার কী? “আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও জীবিত থাকি। (সবকিছু এই দুনিয়াতেই ঘটে) আমরা কখনও পুনরুত্থিত হব না।” অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনই শেষ কথা। আজ আমরা জীবিত আছি কাল মরে যাব। কোথায় ধর্মের প্রশ্ন, কোথায় জাতীয় প্রশ্ন, ধর্মীয় কল্যাণের প্রশ্নই বা কি, কিসের দ্বীনী তালীম, দ্বীনী তারবিয়্যাত? এই দেশে কী হচ্ছে, পরবর্তী প্রজন্মের অবস্থা কী হবে এসব নিয়ে আমাদের ভাবনা কিসের, দায়িত্ব কিসের? আমাদের দায়িত্ব শুধু খাওয়া-পরা এবং সন্তানদেরকে পার্থিব শিক্ষা-দীক্ষা দান করে পার্থিব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। মরণ পরবর্তী জীবনে কী হবে, এই দেশের ধর্মীয় ভবিষ্যত কী, মুসলমানদের ভবিষ্যত কী —এসব চিন্তায় অযথাই কেন আমরা নিজেদের মেধা ও শক্তি ক্ষয় করব? —এটাই প্রবৃত্তির দর্শন, প্রবৃত্তিপূজার দর্শন। দর্শনটি পশুত্ব দর্শন, আত্মকেন্দ্রিক দর্শন। কোন জাতি যখন এই দর্শন অনুযায়ী জীবন যাপন করে, আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে যায় তখন তার ফল দাঁড়ায় অত্যন্ত ভয়াবহ। এর ফলে সৃষ্টি হয় বিচ্ছিন্নতা। আমরা দেখছি, মামাত ভাই, চাচাত ভাই, ফুফাতো ভাই, তালতো ভাই সহ বিভিন্ন সম্পর্কে সম্পর্কিত আত্মীয়দের নিয়ে যে একাত্মতা গড়ে উঠত তা এখন আর বজায় থাকছে না। মানবতার চেতনা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এইসব আত্মীয়দের আত্মীয়তা সম্পর্কও বিলীন হতে বসেছে। পূর্বে সকলকেই একই গোষ্ঠীভুক্ত বলে মনে করা হত। গ্রামের প্রত্যেকেই অপরকে নিজের ভাই বলে জ্ঞান করত। পার্থিব স্বার্থচিন্তা যখন থেকে জেঁকে বসেছে তখন থেকে চিত্র পাল্টে গেছে। এখন এক পাড়ার একটি ছেলের সঙ্গে অপর পাড়ার কোন ছেলের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে পাড়ায় পাড়ায় মারামারি, হানাহানি শুরু হয়ে যায়। কখনও কখনও তা জার্মান ও ব্রিটেনের পারস্পরিক যুদ্ধের ন্যায় যুদ্ধের আকার ধারণ করে।

এই চিন্তা ও দর্শন যদি চলতে থাকে, তবে এক সময় মামাতো ভাই, খালাতো ভাই, চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে লড়াই হবে। পরে ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই হবে। এমনকি অবশেষে পিতা-পুত্রে লড়াই শুরু হবে। উন্নতির এই দর্শন যদি এইভাবেই চলতে থাকে, আমাদের জীবনযাত্রা যদি এইভাবেই চলতে থাকে তবে আপনারা দেখবেন, সন্তানের জন্য পিতার কোন দরদ থাকবে না। দুর্ভিক্ষের সময় যেমনটা দেখা যায়— সন্তানের হাত থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে খেতে— স্বাভাবিক অবস্থাতেও ঠিক তাই দেখা যাবে। সন্তানের গ্রাস মুখ থেকে কেড়ে নেবে তার পিতা এবং তা হবে জাহেলিয়াতের চরম। এতটুকুতেই ঘটনা থেমে থাকবে না। ঘটনা গড়াবে নিজের পর্যন্ত। আপনারা হয়তো দেখবেন হাতের মালিকের বিরুদ্ধে হাত বিদ্রোহ করবে। সে বলবে, জামেয়া ইসলামিয়ার ছেলেরা গতকাল তামাশা দেখাল। মাটি থেকে মুখ দিয়ে পয়সা উঠিয়ে নিল। তুমিও নিজের খাদ্য আমাকে ব্যবহার না করেই সরাসরি মুখ দিয়ে গ্রহণ কর। কারণ খাবার তো তোমার, আমি কেন তোমাকে সাহায্য করব? পা বলবে, আমি কেন চলব? খাবার তো তোমার। খাবারের স্বাদ তো উপভোগ করবে তুমি। সাপ যেভাবে পা ছাড়াই বুকের উপর চলাচল করে, তুমি সেভাবেই বুকে ভর করে এগিয়ে যাও এবং খাদ্য গ্রহণ কর। আমি তোমার জন্য কষ্ট সইতে যাব কেন? দর্শনের ঐ ধারা অব্যাহত থাকলে দেখুন পৃথিবীর অবস্থা শেষ পর্যন্ত কী হয়। পৃথিবী জাহান্নাম অপেক্ষাও মন্দ আবাসস্থলে পরিণত হবে। কেউ কোন সুস্থ চিন্তা করবে না। গরু, ছাগল, ইঁদুর, বানরের ন্যায় খাবারের গ্রাস গলাধঃকরণ করবে। ইনসাফ ও বে-ইনসাফ এক বরাবর হয়ে যাবে। কোনটাই কোন বিশেষ অর্থ বহন করবে না। কারও অধিকার কেউ স্বীকার করে নেবে না। ত্যাগ ও কুরবানী, নিঃস্বার্থবাদিতা ও পরহিতব্রত প্রাচীন কাহিনীতে পরিণত হবে। প্রাচীন যুগের কল্প-কাহিনীতে পরিণত হবে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 নবীগণের মীরাছ

📄 নবীগণের মীরাছ


নবীগণ যে জীবন যাপন করেছেন সে জীবনের জন্য শরীয়ত এসেছে, কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহর ঐ বান্দাগণের সর্বদা চেষ্টা ছিল, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি, ভালবাসা, ত্যাগ ও কুরবানীর জীবন ব্যাপকতর হোক। মানুষ যেন বানর না হয়, গাধা না হয়ে যায়। মানুষের চিন্তা যেন এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ না থাকে যে, আমার নির্ধারিত খাবার আমি পেয়ে যাই। বরং সে যেন চিন্তা করে, আমার স্ব-জাতি আমারই মত মানুষ। তাদের মধ্যে যারা খাদ্য পাচ্ছে না তাদেরকেও খাদ্য দান করি। অপরকে আহার করানোর মধ্যে সে যেন আনন্দ লাভ করে। অন্যকে ক্ষুধার্ত দেখে নিজে খাদ্য গ্রহণ করতে সে যেন শান্তিবোধ না করে। এটাই নবীগণের মীরাছ ও উত্তরাধিকার। তাঁদের রেখে যাওয়া শিক্ষা। তাঁরা এই আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছেন। মানুষের মধ্যে যেন পরহিতব্রত, পরদুঃখকাতরতার চরিত্র ব্যাপকতর হয় সেজন্য তাঁরা সংগ্রাম করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের ঘটনা আপনারা শুনে থাকবেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে পড়ে থাকা এক সাহাবীর নিকট পানি আনা হলে তিনি বললেন, আমি এইমাত্র আরেকজন আহত ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, আপনি তাকে প্রথমে পানি পান করিয়ে আসুন। দ্বিতীয়জন বলল, আমি অপর একজন আহত ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, তাকে পানি পান করান। তৃতীয়জন বলল, আমি অপর একজন ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনেছি, আপনি তার নিকট পানি নিয়ে যান। পানি বাহক চতুর্থজনের নিকট গিয়ে দেখে তিনি ইন্তেকাল করে গেছেন। এরপর একে একে তৃতীয়জন, দ্বিতীয়জন ও প্রথমজনের নিকট এসে দেখে তাঁরা সবাই ইন্তেকাল করে গেছেন। এটাই মানবতা।

মানবতার মর্যাদা এখানেই, তার শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। এর জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই মানবতা প্রতিষ্ঠা করতেই এই উম্মতকে প্রেরণ করা হয়েছে। অতএব এই উম্মতও যদি নিজ নিজ চিন্তায় বিভোর থাকে, নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকার দর্শনে বিশ্বাসী হয়, প্রবৃত্তি যদি শয়তানের অনুগত হয়ে যায়, সত্যকে সত্য বলে জ্ঞান না করে, সত্যকে অস্বীকার করে এবং মনে করে যে, খাওয়া-দাওয়া ও উদরপূর্তি ব্যতীত দ্বিতীয় কোন কর্ম নেই তাহলে বুঝতে হবে যে, এই উম্মত মৃত। বুঝতে হবে যে, এই উম্মতের কোন বৈশিষ্ট্য আর অবশিষ্ট নেই। নবীগণ বলেছেন, নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকা, স্বার্থ-সর্বস্ব হয়ে যাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্তির নামান্তর।

সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে যখন এই চিন্তার উদয় হল যে, আমরা ইসলামের অনেক খেদমত করেছি। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামারকে ত্যাগ করেছি, সবকিছু বিস্মৃত হয়ে আমরা ইসলামের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছি। আমাদের বাড়ি-ঘর উজাড় হয়ে গেছে, ক্ষেত-খামার বরবাদ হয়ে গেছে, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেউলিয়াত্বের শিকার হয়ে গেছে। এখন আমরা কিছু দিনের জন্য ব্যক্তিগত কারবার দেখি। এরপর পুনরায় ইসলামের খেদমতে লেগে যাব। তাঁদের এইরূপ চিন্তা ইসলাম ও মুসলিম জাতির জন্য ছিল শঙ্কাধ্বনি স্বরূপ। তাই সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে হুশিয়ার করে দেওয়া হল। বলা হল, খবরদার। এইরূপ চিন্তাকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনো না। এই চিন্তা করার অর্থ, বিষের পেয়ালা নিজের মুখে তুলে নেওয়া। তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল, তোমরা তোমাদের এই উদ্ভট চিন্তা পরিত্যাগ করে ইসলামের খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ কর, নতুবা তোমাদের পরিণাম হবে অশুভ। বলা হল— “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। এই চিন্তা জীবন বিনাশী বিষ। এই বিষ যদি তোমরা পান করে ফেল, দ্বীনের খেদমতকে পিছনে ঠেলে দিয়ে নিজেদের পার্থিব স্বার্থে জড়িয়ে পড় তবে তোমরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। কারণ কিছু দিনের জন্য যদি তোমরা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য সামলে নেও তাহলে তাতে কী লাভ হবে। জাতি গঠনের কাজ তো হবে না। যদি তোমরা জাতি গঠনের কাজে অবহেলা কর, এই কাজকে উপেক্ষা কর তাহলে দুনিয়াতে মহা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। নবগঠিত মানবতা ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলোর স্তূপে পরিণত হয়ে যাবে। সমগ্র জাতিকে একটি একক মনে কর। গোটা জাতির কল্যাণের লক্ষ্যে ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার কর। ইসলামকে ভিত্তি করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব কায়েম কর।”

সাহাবায়ে কেরামের মস্তিষ্কে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামার ও দোকানপাটের চিন্তা উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে দ্বীনের দাবি সম্পর্কে সচেতন করে দিলেন। বলে দিলেন যে, খবরদার! এটা ধ্বংসাত্মক চিন্তা। জাতীয় স্বার্থ বিস্তৃত হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে চিন্তা করা তোমাদের জন্য প্রাণঘাতী বিষতুল্য। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়, এরপর খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যে ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকার করেছেন তার কথা আর কী বলব? সহায়-সম্পদ, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, বাড়ি-ঘর ইত্যাদি কোন কিছুর পরওয়া তাদের ছিল না। সবকিছুই তাঁরা ত্যাগ করেছিলেন। আল্লাহর দ্বীনের রাস্তায় সবকিছু তাঁরা সঁপে দিয়েছিলেন। সন্তান-সন্ততির পরওয়া ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরওয়া ছিল না। সারা জীবনের তিল তিল করে সঞ্চয় করা সম্পদের পরওয়া ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম ইসলামকে যে গতি ও শক্তি দান করে গেছেন সেই গতি ও শক্তিতেই আমাদের শত ত্রুটি ও উদাসীনতা সত্ত্বেও ইসলাম অদ্যাবধি টিকে আছে। কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

📘 উলামা তলাবা > 📄 ধ্বংসের উপকরণ

📄 ধ্বংসের উপকরণ


তোমরা যখন যাকাত আদায় করবে না তখন তোমাদের উপর অনাকাঙ্ক্ষিত ট্যাক্স বসিয়ে দেওয়া হবে। যখন কোন জাতি আল্লাহ তাআলা কর্তৃক যাকাতরূপে নির্ধারিত অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করে আল্লাহ তাআলা তখন তাদের উপর রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ সহ নানা রকম আকারের ট্যাক্স আরোপ করে দেন। উদাহরণ স্বরূপ— ঘরে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ল। ব্যস তার পিছনে অঢেল অর্থ ব্যয় হতে থাকল। কোন কোন লোককে জিজ্ঞাসা করেছি যে, আপনি এত উচ্চ বেতন লাভ করেন সেগুলো কী হয়? উত্তর পাওয়া যায় যে, সাহেব! দশ বৎসর যাবৎ ঘরে একটি রোগ প্রবেশ করেছে, রোগটি আর যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। প্রতিদিন ডাক্তার ডাকতে হয়। বড় বড় ডাক্তারদের বোর্ড বসাতে হয়। স্ক্যানিং করাতে হয়, এক্সরে করাতে হয়। কোন কোন সময় ইউরোপে নিয়ে যেয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। বিলাসী জীবন যাপনকারী ও কৃপণ বিত্তশালীদের ঘরে এই জাতীয় রোগ আল্লাহ তাআলা দিয়ে দিয়েছেন। কারও আবার অহেতুক কোন শখ বা সাধ সৃষ্টি হয়ে গেছে— যাকে বলে Hobby— সেই পথে সে অর্থ ব্যয় করে।

মোটকথা আল্লাহ নির্ধারিত পথে যদি ব্যয় না কর তবে ব্যয় অবশ্যই হয়ে যাবে, তবে অন্য পথে, অন্য খাতে। যে পথে, যে খাতে ব্যয় করার দ্বারা না ইসলামের ফায়দা হবে, না জাতির ফায়দা হবে, না তোমার নিজের ফায়দা হবে। অনর্থক ব্যয় হতে থাকবে। আর তা হবে ধ্বংসের উপকরণ। বলছিলাম যে, মুসলমান পুঁজিপতিদের নিকট তাদের অর্থ-সম্পদই প্রিয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জাতির সমস্যা ও সঙ্কটের দিকে তারা চোখ তুলেও তাকায় না। সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র ছিল ভিন্ন। তাঁরা অর্থ-সম্পদের পরওয়া করতেন না। জাতির কল্যাণ সাধন ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ঘর শূন্য করে তাঁরা অর্থ-কড়ি নিয়ে আসতেন জাতির স্বার্থে ব্যয় করতে। সাহাবায়ে কেরামের জীবনের এই জাতীয় ঘটনার অনেকগুলোই আপনারা জানেন। তবুও একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। ঘটনাটি আপনাদেরও জানা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রাযি.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? তিনি বললেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নাম রেখে এসেছি। এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের হাল ও অবস্থা। কিন্তু আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, এই ত্যাগ ও কুরবানী জীবনের পথ নয়, এটা নিজেকে ধ্বংস করার পথ। আমাদের প্রবৃত্তি আমাদেরকে বলে, পয়সা বাঁচানো, অর্থ সঞ্চয় করে রাখা উন্নতির পথ। কিন্তু নবীগণ বলেন, এটা ধ্বংসের পথ। তাঁদের কথাই সত্য বলে প্রমাণিত। আমরা দেখছি, আমরা ক্রমশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমাজে অনেক কারুনের দেখা পাওয়া যায়।

প্রত্যেক গ্রামে কমপক্ষে চার-পাঁচজন বিত্তশালী দেখতে পাবেন, যারা কারুনের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু আমাদের সমাজের অবস্থা কী? আমাদের ধর্মীয় সত্ত্বার কী হাল? আমাদের সম্প্রদায়ের কোন ইজ্জত-সম্মান অবশিষ্ট আছে কি? কানা-কড়ির মূল্যও আজ আমাদের নেই। যেখানে ইচ্ছা সেখানে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের যদি ইজ্জত থাকত, তাদের যদি প্রভাব থাকত, আমাদের যদি চরিত্র ও আদর্শ থাকত, আমরা যদি আদর্শবান হতাম, ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকারকারী হতাম, আমরা যদি জাতি ও দ্বীনের স্বার্থে অর্থ ব্যয়কারী হতাম তাহলে কার সাধ্য ছিল যে, কথায় কথায় আমাদের উপর আক্রমণ চালাবে, কিংবা একটি দিয়াশলাই দিয়ে আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে? কার সাধ্য ছিল যেখানে ইচ্ছা যখন ইচ্ছা হাঙ্গামা বাধানোর?

জাতি তার সম্মান হারিয়ে ফেলেছে, ইজ্জত-আবরু হারিয়ে ফেলেছে। জাতি মর্যাদাহীন হয়ে পড়েছে। জাতির জীবন আর জীবন নেই। জাতির সম্মান আর সম্মান নেই। কাজেই যেখানে চাও বিশৃঙ্খলা ও হাঙ্গামা সৃষ্টি করে দাও, ঠেকায় কে? যদি আপনাদের সম্মান থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি ত্যাগ ও কুরবানীর অভ্যাস থাকত, যদি আপনাদের মধ্যে জাতির স্বার্থে অর্থ ব্যয়ের অভ্যাস থাকত, আপনারা যদি বুক উঁচিয়ে জাতির কল্যাণে দাঁড়িয়ে যেতেন তাহলে কার সাধ্য ছিল আপনাদের বিরুদ্ধে হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? আপনারা যদি প্রমাণ করে দিতে পারতেন যে, আপনারা দৃঢ় সত্ত্বার অধিকারী এক জাতি, আপনাদের মধ্যে যদি অর্থের প্রতি মোহ না থাকত, আপনাদের মধ্যে যদি কারূনের উপস্থিতি না থাকত, তাহলে কি জাতি আজ এরূপ মর্যাদাহীন হত? কারও কি সাহস হত হাঙ্গামা সৃষ্টি করার? সংখ্যালঘুতা কোন সমস্যাই নয়। ইজ্জত-সম্মানের অধিকারী, আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী কোন জাতির জন্য সংখ্যালঘুতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। আজ অগ্নি উপাসক জাতির কাউকে আঘাত করে দেখুন, কোন শিখকে আঘাত করে দেখুন তো? এরাও তো সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও শিখরা পাঞ্জাব বানিয়ে নিয়েছে। নিজেদের ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে স্বতন্ত্র প্রদেশ বানিয়ে নিয়েছে। আর আপনারা নিজেদেরকে রক্ষা পর্যন্ত করতে পারছেন না। আপনাদের এই অর্থ-সম্পদ কবে কাজে আসবে? আপনার এত বড় ফার্ম আছে, এত জায়গা-জমি আছে, এতগুলো দোকান আছে— এসব দেখে দেখে আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন। আপনার এসব সম্পদ দ্বারা যদি ইসলামের ফায়দা হত, জাতির ফায়দা হত তাহলে আমাদের অপেক্ষা আর কেউ অধিক আনন্দিত হত না। আপনি বিশাল পুঁজিপতি, আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব কিছুতে আমাদের কিছু যায় আসে না। পুঁজিপতি হয়ে আপনি যদি বোধহীন না হতেন, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন হতেন, ভীরু ও কাপুরুষ না হতেন, হিম্মত ও সাহসের অধিকারী হতেন তাহলে আজ এই জাতি এত লাঞ্ছিত হত না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00