📘 উলামা তলাবা > 📄 নিজেকে নিলামের বাজারে উঠাবেন না

📄 নিজেকে নিলামের বাজারে উঠাবেন না


[১৯৮৮ ঈসায়ী সনের ২৪ ফেব্রুয়ারী রোজ বুধবার জামালিয়া হলে অনুষ্ঠিত দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা লাক্ষ্ণৌ-এর শিক্ষা সমাপণকারী ছাত্রদের বিদায় অনুষ্ঠানে মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) চিন্তা জাগানিয়া এই ভাষণ দান করেন। ভাষণটি যে কোন তালিবুল ইলমের জন্য একটি পথ-নির্দেশিকা ।।]

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِيْنَ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِيْنَ وَخَاتَمِ اَلنَّবিِّيْنَ مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ وَدَعَى بِدَعْوَتِهِمْ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ - أَمَّا بَعْدًا

আমার সহকর্মীবৃন্দ, দারুল উলূমের শিক্ষকবৃন্দ ও আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দ!

সর্বপ্রথম আমি আমার প্রতিক্রিয়া জানাতে চাই। শিক্ষা সমাপনকারী ছাত্র ভাইদের উর্দু ও আরবী ভাষায় লিখিত প্রবন্ধাদি শুনে আমি আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করেছি। আমি প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে চাই যে, আলহামদুলিল্লাহ শিক্ষকবৃন্দের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি।

আমি আমার সহকর্মী ভাইদেরকে এবং দারুল উলুমের শিক্ষকবৃন্দকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি। কারণ ছাত্রদের লিখিত প্রবন্ধগুলোতে তাঁদের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার সুস্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। আমি বহু বৎসর যাবৎ এই জাতীয় বিদায়ী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আসছি। আল-ইসলাহের মজলিসগুলোতেও অংশগ্রহণের সুযোগ আমার হয়েছে। চিন্তা ও জ্ঞানগত, প্রকাশ ও বর্ণনাশক্তি, রচনাশৈলী ও লেখনী শক্তি, ভাষা ও সাহিত্যমান ইত্যাদি সব দিকেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত সুখকর বিষয়। প্রিয় ছাত্রবৃন্দকে তাদের উন্নতি ও সাফল্যের জন্য তাদের ইখলাস ও ভালবাসার জন্য আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। দুঃখ প্রকাশ করছি তাদের জন্য, যারা তাদের লেখা পাঠ করে শুনাতে পারেনি। তাদের বিশ্বাস রাখা উচিত যে, তাদের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। কারণ তারা যে পরিশ্রম করেছে, যে সময় ব্যয় করেছে তা তাদের জন্য সর্বাবস্থায় কল্যাণকর। সুতরাং মন খারাপ করার কোন কারণ নেই। এই সকল প্রবন্ধগুলি ছাপার অক্ষরে আসলে ভাল। এগুলো তাদের জন্য স্মারক হয়ে থাকবে।

এখন আমি স্বল্প সময়ে কিছু জরুরী ও বিদায়ী কথা বলব। আপনাদের ভালবাসা ও আমার প্রতি আপনাদের দাবি আছে এই প্রেক্ষিতে আমার বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আপনাদের জন্য যা কল্যাণকর বলে মনে করছি আপনাদের সামনে তা তুলে ধরছি।

আপনাদের উদ্দেশ্যে চারটি কথা বলব এরূপ যা বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সংশ্লিষ্ট, আর চারটি কথা বলব আপনাদের নিজেদের সাথে সংশ্লিষ্ট।

বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সংশ্লিষ্ট চার কথার প্রথম কথাটি অত্যন্ত বড় কথা, উচ্চস্তরের কথা। আমার মত নগণ্য ব্যক্তির মুখে ঐরূপ কথা সাজে না। কিন্তু কথাটি বলার মধ্যে এক প্রকার বরকতও আছে, স্বাদও রয়েছে। একবার হযরত উমর ফারুক (রাযি.) বড় ও বিশিষ্ট কিছু সাহাবীর মজলিসে উপস্থিত হলেন। হযরত উমর (রাযি.) অনুভব করলেন যে, সময়টি দুআ করার সময়। আরেফগণের মাঝে যেরূপ বিশেষ সময়ে বিশেষ আমলের চাহিদা সৃষ্টি হয় তদ্রূপ তাঁর অন্তরেও দুআর আমলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। তিনি উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, আপনারা স্বাধীনভাবে প্রত্যেকেই নিজের জন্য দুআ করুন। তো কেউ বললেন, আয় আল্লাহ! আপনার রাস্তায় আমাকে বের হওয়ার তাওফীক দান করুন, যাতে আমার সম্পদ আপনার রাস্তায় বিলিয়ে দিতে পারি এবং আপনার বান্দাদের খেদমত করতে পারি। কেউ বললেন, হে আল্লাহ! আপনার রাস্তায় আমাকে বের হওয়ার তাওফীক দান করুন, যাতে আপনার রাস্তায় আমি নিজের রক্ত প্রবাহিত করতে পারি এবং শহীদ হয়ে যেতে পারি। এইরূপে একেকজন সাহাবী দুআ করতে থাকলেন। অবশেষে হযরত উমর ফারুক (রাযি.)-এর পালা আসল। তিনি হযরত আবু উবাইদা, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, তালহা, খালেদ (রাযি.) সহ বেশ কিছু সাহাবীর নাম উল্লেখ করে বললেন, আমার প্রার্থনা হল এই সকল সাহাবী আমার সঙ্গে থাকুক। যাতে তাঁদের একেকজনকে আমি একেক দিকে প্রেরণ করতে পারি, আর সারা বিশ্বে তাঁদের মাধ্যমে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করতে পারি। বাস্তবেই ঐ সকল সাহাবী বড় বড় বিজয় লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।

বর্তমান কালের পূর্বে ইসলামের ভবিষ্যত নির্ধারণকারী কর্ম এত নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট ছিল না। তখন পরিস্থিতি ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন ও অন্ধকার। ফলে নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ছিল যে, এই চারটি কর্ম রয়েছে যা দ্বারা ইসলাম ও ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যত ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে এবং ইসলাম তার পয়গাম ও যথারূপ নিয়ে বহাল থাকবে। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আজ থেকে কয়েক বৎসর পূর্বে বিশেষত ১৯৪৭ ইং সালের পূর্বে এই কর্ম এত নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু ১৯৪৭ ইং সনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বর্তমান কালের প্রোপাগাণ্ডা এবং আমাদের অভিজ্ঞতা ঐ দায়িত্ব ও কর্মগুলোকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ঐ জাতীয় চারটি দায়িত্ব ও সংগ্রামের কথাই আপনাদেরকে আমি বলব। আর এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ়চেতা কিছু সৈনিকের, যাঁরা দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেছে এবং যাঁরা ইখলাস ও আন্তরিকতার অধিকারী।

চারটি দায়িত্বের মধ্য থেকে সর্বপ্রধান দায়িত্ব হল, মুসলমানদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে মুসলমানরূপে বহাল রাখার প্রচেষ্টা গ্রহণ। তারা যেন মুসলমান পরিচয়ে টিকে থাকে। শুধু সভ্যতা-সংস্কৃতি ও চিন্তাগত নয় বরং বিশ্বাসগত ইরতিদাদ ও ধর্মহীনতা থেকেও তারা যেন রক্ষা পায়। এখন সবচেয়ে বড় ফরয হল, আমাদের মাদরাসায় শিক্ষা সমাপনকারীরা যেন এই দিকটাকে সামাল দেয়, এই দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয় এবং এই কাজের জন্য নিজেদেরকে ওয়াকফ করে দিয়ে সর্বাত্মক মেহনত চালায়। তাদের চেষ্টা থাকবে মুসলমানদের পরবর্তী প্রজন্মকে- যারা বর্তমানে আট-দশ বছর বয়সের অথবা পনেরো ষোল বৎসরের যুবক তারা যেন মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। আর এর জন্য প্রয়োজন শহরে-শহরে, গ্রামে-গ্রামে মাদরাসা, মক্তব ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে সম্ভব সেখানে প্রভাতী ও বৈকালিক উভয় শাখা খোলা প্রয়োজন। যে সকল আধুনিক শিক্ষিত লোক তাদের সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠাতে বাধ্য হয় তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এদেরকে রক্ষা করার জন্য এখনই যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে ভবিষ্যত-আশঙ্কা সৃষ্টি হবে যে, নতুন প্রজন্মকে কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমান বলা যাবে কিনা। তারা তাওহীদ ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে কিনা, রিসালাত এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেষ নবী হিসেবে স্বীকার করবে কিনা, তাঁকে শাফায়াতকারীরূপে বিশ্বাস করবে কি না-

إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ নিঃসন্দেহে ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন। (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৯)

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يَقْبَلَ مِنْهُ কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা গ্রহণ করা হবে না। (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ৮৫)

এই আয়াত দুটিতে তাদের বিশ্বাস থাকবে কি না।

প্রিয় ছাত্রবৃন্দ।

আপনাদের মানসিক দৃঢ়তা, আপনাদের উন্নত চিন্তা-চেতনা, আপনাদের ইলমী যোগ্যতার জন্য আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এবং আপনাদেরকেও মোবারকবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু বর্তমান জিজ্ঞাসা হল, কে কোন্ দিক সামাল দেবে। আপনারা এখনই সংকল্পবদ্ধ হোন যে, আপনারা এই ভয়াবহ ও নাজুক পরিস্থিতির মোকাবেলায় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন। আপনারা সংকল্পদ্ধ হলে আল্লাহ তাআলা আপনাদের মদদ করবেন। তিনিই যাবতীয় উপকরণাদির ব্যবস্থা করে দেবেন। পরবর্তী প্রজন্মকে, আমাদের, আপনাদের সন্তানদেরকে মুসলমানরূপে পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখার জন্য যে প্রচেষ্টা গ্রহণের প্রয়োজন তা গ্রহণ করুন, যতটুকু হাত-পা ছোঁড়া যায় ছুঁড়ুন, হৃদয়ের যতটুকু রক্ত ঢেলে দেওয়া যায় ঢেলে দিন।

দ্বিতীয় দায়িত্ব হল- দ্বীন ইসলাম যেন তার স্ব-রূপে বহাল থাকে। অর্থাৎ দেশের জনগণ যেন ইসলামের পারিবারিক আইন-কানুন, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার সহ কুরআনের অকাট্য বিধি-বিধান মোতাবেক জীবন যাপন করতে পারে। অন্যথায় এ দেশে তাদের বসবাস নাজায়েজ ও হারাম হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا অَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَبِكَ مَأْوَهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

'যারা নিজেদের উপর জুলুম করে (কাফেরদের দেশে বসবাস করত) তাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতাগণ বলে, 'তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?' তারা বলে, 'দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম;' তারা বলে, আল্লাহর যমীন কি এমন প্রশস্ত ছিল না যেথায় তোমরা হিজরত করতে পারতে? এদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কত মন্দ আবাস।' (সূরা নিসা, আয়াত ৯৭)

অত্যন্ত কঠিন হুশিয়ারী। খোদা নাখাস্তা যদি এরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, মুসলমান নামায তো পড়তে পারে, কালিমা উচ্চারণ করতে পারে, কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতে পারে, কিন্তু কুরআন মাজীদে বর্ণিত পারিবারিক আইন-কানুন মেনে চলতে পারে না তখন উলামায়ে কেরামকে হিজরতের ফতওয়া দানের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। প্রার্থনা করি- এরূপ পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়। এই দেশে বসবাসকে আমরা আমাদের অধিকার বলে মনে করি। দূর দৃষ্টিসম্পন্ন আরেফগণ, আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম প্রাপ্ত, স্ব-যুগের সর্বাধিক ইখলাসের অধিকারী ব্যক্তিগণ অবশ্য বলেছেন যে, এই দেশ থেকে ইসলাম কখনও নিশ্চিহ্ন হবার নয়। এই দেশের ভাগ্যে ইসলাম লিপিবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইসলাম এদেশের জন্য বরাদ্দ হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলার ফায়সালা, এই দেশে ইসলাম থাকবে। ইসলাম এই দেশকে পরিচালনা করতে পারে। ইসলাম এই দেশের জন্য রক্ষাকবচ। অসম্ভব নয়, এই দেশের শাসনক্ষমতা পুনরায় মুসলমানদের হাতে চলে আসতে পারে। অতএব আল্লাহ তাআলার রহমতের ব্যাপারে আমরা নিরাশ নই। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও বাস্তবতার নিরিখে আমাদের মেহনত ও প্রচেষ্টার গতিধারা কিরূপ হওয়া উচিত তা নির্ণয় করতে হবে। কারণ মুসলমানদের ধর্মীয় স্বকীয়তা ক্রমশ হুমকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা শাহবানুর মামলার মাধ্যমে এক গায়েবী সাহায্য করেছেন। মামলাটি মুসলমানদের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্বসঙ্কটের অনুভূতি জাগ্রত করে দিয়েছিল। ফলে এ নিয়ে আন্দোলন হয়েছে এবং এক পর্যায়ে আন্দোলন সফলতাও লাভ করেছে। এতদ্বারা বোঝা গেছে যে, ইখলাসের সাথে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে যে আন্দোলন পরিচালিত হয় তা অবশ্যই সফল হয়।

তৃতীয় বিষয়- মানবতার পরগাম। এই দেশে নিজেদের দ্বীনকে টিকিয়ে রাখতে, দ্বীনের উপর আমল করতে, দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রগুলোকে সংরক্ষিত রাখতে, শিক্ষাদান ও রচনা সংকলনের কাজ করতে আমাদের ইজ্জত-সম্মান নিয়ে, নিজেদের আকীদা-বিশ্বাসকে অটুট রেখে জীবন যাপন করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন পরিবেশ শান্ত থাকা। পরিবেশ যদি উত্তপ্ত হয়, অমুসলিমদের সাথে যদি আমাদের দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে থাকে তাহলে আমাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। অতএব সকলের মধ্যে মানবতার পয়গাম ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা সকলেই মানুষ। আমাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য মানবতা। এই উপলব্ধি সকলের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। এই বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব খুব কম মানুষই অনুভব করে। তারা মনে করে, এটা কিছু মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত উদ্ভট কথা, তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা।

আপনারা বিশ্বাস করুন, পরিস্থিতির বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং স্বরূপ সন্ধানী দৃষ্টি আমাকে এই পথনির্দেশ করেছে। এই অভিজ্ঞতাই আমার মত আরও কিছু ব্যক্তিকে ঐ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। যদিও আমাদের প্রচেষ্টা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। যদিও এই সমাবেশ এরূপ নয় যেখানে বললে বিষয়টি এক আন্দোলনে রূপ নেবে, কিন্তু বিচিত্র নয় যে, আল্লাহ তাআলা আপনাদের দ্বারা ঐ কাজ করিয়ে নেবেন। অতএব আপনারা কথাটি মনে রাখবেন। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানবোধ সৃষ্টি হওয়া জরুরী।

স্পেনে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হওয়ার যে দুর্ভাগ্যজনক ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তার কারণ নির্ণয়ে বহু গ্রন্থ লিখিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। স্পেনে দ্বীনের পর্যাপ্ত খেদমত হয়েছে। বড় বড় লেখক ও বুযুর্গ সৃষ্টি হয়েছে। শায়খ আকবর মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবীর ন্যায় মাশায়েখ জন্ম লাভ করেছে। আল্লামা শাতেবী ও ইবনে আবদুল বার-এর ন্যায় লেখক জন্মলাভ করেছে। কিন্তু একটি বিষয় সেখানে উপেক্ষিত ছিল। তাহল সেখানকার আদিবাসীদেরকে- যাদের সংখ্যাগত পরিমাণ ছিল আটার মধ্যে লবণের পরিমাণের ন্যায়- ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে, তাদেরকে ইসলামের আওতাভুক্ত করতে চেষ্টা করা হয়নি। অথচ সেখানকার শাসনক্ষমতা ছিল মুসলমানদের হাতে। কিন্তু ক্ষমতায় আসীনরা মনে করে যে, এই দেশ তাদের নামে চির বন্দোবস্ত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মোঘল শাসকদের ফরমানগুলোতে 'চিরস্থায়ী সাম্রাজ্য' কথাটির সন্ধান মেলে। অর্থাৎ তারা যেন মনে করত যে, তারা সরাসরি ইসরাফীলের হাতে দায়িত্বভার অর্পণ করবে। এর পূর্বে তাদের সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। এটা ছিল তাদের ভ্রান্ত ধারণা। যা হোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আদিবাসীদেরকে তাদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া, তাদের মেধা ও অনুভূতিগুলোকে ভ্রান্ত শিক্ষা দ্বারা, ভ্রান্ত ইতিহাস দ্বারা এবং নিজেদের চারিত্রিক দুর্বলতা দ্বারা বিকাশপ্রাপ্ত হওয়ার, তাদের চিন্তা-চেতনাকে উস্কে দেওয়ার সুযোগ দান করাটাই হয়েছে সমস্ত বিপর্যয়ের কারণ।

মুসলমানরা এই দেশ শাসন করেছে আটশত বৎসর। নানা কারণে অমুসলিমদের অন্তরে যে ক্ষোভ ও ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা প্রশমনের একমাত্র উপায় মানবতার পয়গাম।

চতুর্থ বিষয়- দ্বীনী ইলমের চর্চা অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা এবং যুগের সঙ্গে দ্বীনী ইলমের সমন্বয় সাধন। সমন্বয় সাধনের অর্থ এই নয় যে, দ্বীনী ইলম যুগের অনুগামী হয়ে যাবে। বরং যুগের জায়েজ ও আবশ্যকীয় দাবি পূরণ করত যুগের ভাষা ও সাহিত্য বিবেচনায় নিয়ে দ্বীনী ইলমকে এরূপ উপযোগী করে তুলতে হবে, যাতে দ্বীনী ইলম তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, যুগকে সাথে নিয়ে চলতে পারে এবং যুগের নেতৃত্ব দান করতে পারে। আর এর জন্য মাদরাসাগুলো মেরুদণ্ড স্বরূপ। অতএব মাদরাসাগুলোকে উন্নত করতে হবে। মাদরাসার জন্য উপযুক্ত শিক্ষক গড়ে তুলতে হবে। নাদওয়াতুল উলামার সাথে সংযুক্ত মাদরাসাগুলোর সংখ্যা ষাটের অধিক। কিন্তু যোগ্য শিক্ষক মিলছে না। আপনারা নিজেদেরকে যোগ্য শিক্ষকরূপে গড়ে তুলুন। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করুন। দ্বীনী ইলমে নতুন করে সজীবতা সৃষ্টি করুন, নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটান। প্রাচীন বিষয়াদিকে প্রাচীন বিষয় মনে করে পড়াবেন না। বরং তাতে নতুন প্রাণ ও নতুন শক্তি সৃষ্টি করুন। লেখায় সৃষ্টি হোক নতুন আঙ্গিক। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে নতুনত্ব সৃষ্টি হোক, শিক্ষাদানে জন্মলাভ করুক নতুন শক্তি। জ্ঞানচর্চায় সৃজনশীল রুচির জন্ম হোক, সৃজনশীল মানসিক যোগ্যতা সৃষ্টি হোক। সঙ্গে থাকুক মেধা, প্রতিভা এবং অধ্যয়নের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা।

এই ছিল চারটি বিষয়, যা আমি সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করলাম। বিষয়গুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

এখন আমি আপনাদের নিজেদের সাথে সম্পর্কিত চারটি বিষয়ের উল্লেখ করব। বিষয়গুলোকে সাধারণ মনে করবেন না। যা বলব তা হাজার হাজার পৃষ্ঠা অধ্যয়নের নির্যাস। যদিও এটা আত্মপ্রসংসা, তারপরও বলছি কথায় গুরুত্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। পূর্ববর্তী যুগের, সমকালীন যুগের এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী যুগের উলামা সুলাহাগণের জীবন চরিত বিশেষত ভারতীয় আলেমগণের জীবন চরিত অধ্যয়নের যতটা সুযোগ ও সৌভাগ্য আমি লাভ করেছে ততটা সুযোগ ও সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়েছে। এর কিছু যথার্থ কারণও রয়েছে। আমি জন্মলাভ করেছি ইতিহাস চর্চার পরিবেশে, ইতিহাস চর্চার ঘরানায়। আমাদের বাড়িতে ইতিহাসের বিশাল ভাণ্ডার মওজুদ ছিল। نزهة الخواطر গ্রন্থখানিতে সাড়ে চার সহস্রের অধিক ভারতীয় আলেমের জীবন চরিত বিবৃত হয়েছে। গ্রন্থখানি আমি কয়েকবার পাঠ করেছি। পাণ্ডুলিপি থেকে শুরু করে ছাপার অক্ষরে আসা পর্যন্ত প্রত্যেকটি স্তরে গ্রন্থখানিকে আমি কয়েকবার করে পাঠ করেছি। তদ্রূপ وفيات طبقات ملك الاعيان এর গ্রন্থসমূহ পাঠ করেছি। এছাড়া আল্লাহ আমাকে বুযুর্গদের খেদমতে থাকারও সুযোগ দান করেছেন।

প্রথম বিষয়- আল্লাহর সাথে মুআমালা দুরস্ত হয়ে যাওয়া। উল্লেখযোগ্য কিছু পরিমাণ তাকওয়া, দিয়ানতদারী এবং আল্লাহর সঙ্গে তাআল্লুক ও সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া। এটাই মৌলিক বিষয়। এটা ব্যতীত কোন কাজে না বরকত হবে, না গতি ও হরকত সৃষ্টি হবে। প্রকৃত কল্যাণ তখনই লাভ হবে যখন আল্লাহ ও রাসূলের সঙ্গে মুআমালা দুরস্ত হয়ে যাবে।

আমি বলছি না যে, আপনারা সকলেই নির্ঘুম রাত যাপনকারী হয়ে যান। সকলেই সুফী ও আরেফ বিল্লাহ হয়ে যান। কারণ এটা সকলের জন্য জরুরী নয়। কিন্তু যেটি জরুরী সেটি হল মোটামুটি পর্যায়ের তাকওয়া অর্জন, আল্লাহর সঙ্গে মুআমালা ও সম্পর্ক দুরস্ত হওয়া। নামাযের ফিকির থাকতে হবে, দুআর প্রতি স্বভাবজাত আগ্রহ সৃষ্টি হতে হবে, সর্ব কাজে ইনাবাত ইলাল্লাহ ও আল্লাহমুখিতা ও আল্লাহ-নির্ভরতা সৃষ্টি হতে হবে। এ বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়। এটা অর্জনের অনেক পন্থা রয়েছে। তন্মধ্যে একটি তো এই যে, কুরআন কারীম ও হাদীস পাঠ করবেন, ফিকহের চর্চা করবেন এবং সেই অনুযায়ী নিজের নামাযকে উন্নত পর্যায়ের নামাযে পরিণত করার চেষ্টা করবেন। এছাড়া সর্বাধিক কার্যকর হল বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন চরিত পাঠ। নসীব হলে কোন বুযুর্গের সোহবত ও সংসর্গ অবলম্বন। আমি কোন প্রকার কৃত্রিমতার আশ্রয় না নিয়ে সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সাথেই বলছি যে, এক্ষেত্রে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর কিতাবাদি, বিশেষত তাঁর মালফুযাত ও মাওয়ায়েজ খুবই ফলপ্রসূ। আমি আলহামদুলিল্লাহ তাঁর মালফুযাত ও মাওয়ায়েজ দ্বারা যারপরনাই উপকৃত হয়েছি। তাঁর কিতাবাদি, মালফুযাত ও মাওয়ায়েজ পাঠ করলে আপনার মধ্যকার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো আপনার নিকট ধরা পড়বে। নিজের অর্থলিপ্সা, মর্যাদালিন্সা ও জীবন যাপনের অন্যান্য ত্রুটিগুলো সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন। বিশেষত সম্মিলিত কাজ-কর্মে চারিত্রিক ও আচরণগত ত্রুটি সংশোধনের ব্যাপারেও তার মজলিসে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হত। আল্লাহ তাঁর দ্বারা আখলাকের ইসলাহের এই বিশেষ কাজ করিয়ে নিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিষয়- যুহদ ও ঈসার তথা দুনিয়াবিমুখতা ও ত্যাগ ও কুরবানী। ইসলামের ইতিহাস, বিশেষত ইসলামী দাওয়াত ও আযীমতের ইতিহাস এবং ইসলামের সংস্কার আন্দোলনসমূহের ইতিহাস আমাদেরকে জানান দেয় যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত ইলম ও মানব-কল্যাণ সাধনের সঙ্গে, সংস্কার ও বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ও আন্দোলনের সঙ্গে যুহদ ও ঈসারের মানিকজোড় সম্পর্ক রয়েছে। যুহদ ও ঈসার এসব কর্মকাণ্ডের সহযাত্রী ছিল সব সময়। আপনি যদি ইসলামের সমগ্র ইতিহাসের খোঁজ-খবর নেন, তাহলে দেখবেন- এতদুভয়ের সম্পর্কে কখনও ভাটা পড়েনি। আল্লাহ, তাআলা যাঁদের মাধ্যমে উম্মতের কল্যাণ বিহিত করেছেন এবং উম্মতকে কোন বড় ফেতনা থেকে রক্ষা করেছেন তাঁদের সকলের মধ্যেই এই গুণ ছিল অভাবিত পর্যায়ে। তাঁরা ছিলেন অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি নিরাসক্ত ও পরহিতব্রতী। নিঃস্বার্থবাদিতা, ত্যাগ ও কুরবানী ছিল তাঁদের ভূষণ।

ফেতনাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফেতনা ছিল ইরতিদাদ তথা দ্বীন ত্যাগের ফেতনা। এই ফেতনার মোকাবেলা করেছিলেন হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.)। দ্বিতীয় বড় ফেতনা ইসলামের ইতিহাসে খালকে কুরআন তথা কুরআনের সৃষ্টত্ব মতবাদের ফেতনা। এই ফেতনার মোকাবেলা করেছিলেন হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)। এরপর এসেছে দর্শনের আক্রমণ। এর মোকাবেলায় যারা এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে ইমাম গাযযালী ও আবুল হাসান আশআরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে যে ফেতনাসমূহ সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোর মোকাবেলায় এসেছেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া সহ বেশ কিছু উলামায়ে কেরাম। ভারতে যখন পার্থিব স্বার্থচিন্তা ও উদাসীনতার কুফল স্বরূপ এবং শাসকবর্গের কুপ্রভাবে মর্যাদা ও ক্ষমতালিপ্সা, অর্থলোলুপতা ও প্রবৃত্তি পূজার ন্যায় নিন্দনীয় সব চরিত্রের প্রকাশ ঘটতে থাকল তখন সুফিয়ায়ে কেরাম এগুলোর প্রতিরোধে এগিয়ে এলেন। অতঃপর অমুসলিমদের প্রভাবে মুসলিম সমাজে যে বিদআত ও শিরকী আকীদা-বিশ্বাসের অনুপ্রবেশ ঘটল এবং وحدة الوجود তথা অস্তিত্বের একত্ব বা অন্য কথায় 'সবই তিনি' -এই দর্শনের যে প্রভাব দার্শনিক ও সুফী থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিকদের মস্তিষ্ক পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে ফেলল তার মোকাবেলা করতে এগিয়ে এলেন হযরত মুজাদ্দেদে আলফেসানী (রহ.)। অতঃপর ভারতে সৃষ্টি হয়েছিল এক ধরনের ভারতীয় জাহেলিয়াত। এর কারণ ছিল সুযোগ্য উস্তাদের তত্ত্বাবধান ব্যতীত কুরআন ও হাদীস চর্চার প্রবণতা। সঙ্গে ছিল আঞ্চলিক একটা প্রভাব। সেই সময়ে ইত্তিবায়ে সুন্নাতের প্রতি সমাজে সৃষ্টি হয়েছিল অনাগ্রহ, আকীদা-বিশ্বাসে ধরেছিল ঘুণ। এসবের মোকাবেলায় এগিয়ে এলেন হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) ও তাঁর খলীফাবৃন্দ। যুগ সংস্কারক ও উম্মতের কল্যাণ সাধক এই সকল ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকেই যুহদ ও ঈসারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন।

মোটকথা ইসলামের গোটা ইতিহাস আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, সংস্কার ও উম্মতের কল্যাণ সাধন কর্মের সঙ্গে যুহদ ও ঈসারের একটি সৃষ্টিগত ও স্বাভাবিক বন্ধন আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ইসলামের ইতিহাসে সে বন্ধন কখনও ছিন্ন হয়নি। এই কারণেই আমি আপনাদেরকে স্পষ্ট করে বলছি যে, ত্যাগ ও কুরবানীর জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করুন, অর্থ ও দুনিয়ার মোহ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। অন্যান্য জাতির মধ্যেও কোন বৃহৎ কর্ম ত্যাগ ও কুরবানী ব্যতীত সাধিত হয়নি। অতএব নিজেকে সস্তা মূল্যে বিক্রয় করা থেকে বেঁচে থাকুন। দুনিয়ার সম্পদ ও পদ-পদবীকে জীবনের লক্ষ্য বানাবেন না। কোন জায়গা থেকে লোভনীয় প্রস্তাব আসল আর চোখ বন্ধ করে সেখানে চলে গেলেন তা যেন না হয়।

ইতিহাস আমাদেরকে আরও জানান দেয় যে, ত্যাগ ও কুরবানী ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহতায় যে প্রকৃত শান্তি ও পরিতৃপ্তি লাভ হয়, যে যথার্থ সম্মান ও মর্যাদা লাভ হয় তা অন্য কিছুতেই হয় না। কোটি-কোটি টাকার মালিক হয়েও অনেকে ঐ শান্তি ও পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারে না। অনেক সময় আহারের একটি মাত্র গ্রাসকেও গলাধঃকরণ করতে তারা ভয় পায়। কোন এক বিত্তশালীকে বলতে শোনা গেছে যে, তোমরা আমার সমস্ত ধন-সম্পদ নিয়ে নাও। বিনিময়ে আমার পরিপাক যন্ত্রকে সুস্থ করে দাও, আমি যেন কিছু পানাহার করতে পারি। ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর মত অর্থের যোগান দান আল্লাহ তাআলা যিম্মায়। তা সহজভাবে ও সম্মানের সাথে লাভ হয়ে থাকে।

বলা উচিত না হলেও বলছি যে, আমি এবং আমার কিছু বন্ধুবর্গ আজ যে স্তরে উন্নীত হয়েছি তা শুধু বুযুর্গ ও মুরব্বীদের ফয়েয ও বরকতে এবং কিতাবে পঠিত বিষয়ের প্রভাবে আল্লাহ তাআলা রক্ষা করেছেন বলেই। তা না হলে আল্লাহ জানেন, হয়তো বা কোন কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে থেকে অবসর গ্রহণ করতাম, আর যা কিছু পেনশন পেতাম তাই নিয়ে কোন পাড়াগাঁয়ে জীবন অতিবাহিত করতাম। এই সকল ক্ষেত্রে প্রায়ই বুযুর্গদের ঘটনাবলী স্মরণ হয়। তন্মধ্য থেকে মাওলানা আবদুর রহীম সাহেবের একটি ঘটনা বর্ণনা করছি। ঘটনাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও দৃষ্টান্তমূলক।

نزهة الخواطر গ্রন্থর শেষ খণ্ডে গ্রন্থটির লেখক আমার মরহুম পিতা মাওলানা নাজমুল গণী রামপুরী সাহেবের বরাতে লিখেছেন যে, মাওলানা আবদুর রহীম সাহেব ছিলেন দর্শন ও গণিত শাস্ত্রের একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। রামপুর রাজ্যের পক্ষ থেকে তিনি শিক্ষকতা বাবদ পনেরো কি বিশ টাকা মাসিক বেতন পেতেন। তাঁর শাস্ত্রীয় যোগ্যতার খ্যাতি দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বেরেলীতে যখন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এর প্রিন্সিপ্যাল মিষ্টার হকিন্স তাঁকে দুইশত টাকা বেতনে বেরেলী কলেজে শিক্ষকতা করতে প্রস্তাব পেশ করেন। মাওলানার জবাব ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি জবাবে বললেন, বেরেলী কলেজে যোগদান করলে আমার এই পনেরো টাকা বন্ধ হয়ে যাবে। মিষ্টার হকিন্স বললেন, আপনি গণিত শাস্ত্রের এত বড় পণ্ডিত অথচ দুইশত টাকা আর পনেরো টাকার পার্থক্য বোঝেন না? তিনি পুনরায় অজুহাত দেখিয়ে বললেন, এখানকার ছাত্রদের পড়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

মিষ্টার হকিন্স বললেন, এখানকার ছাত্ররা সকলেই আমার কলেজে চলে যাবে। আমি তাদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করব। মাওলানা জবাবে বললেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, আমার ঘরের পাশে একটি বরই গাছ আছে। এই গাছের টাটকা বরই দিয়ে প্রত্যহ সকালে আমি নাস্তা করে থাকি, বেরেলী কলেজে গেলে তো এই বরই পাব না। ফলে আমার স্বাস্থ্যহানী ঘটবে।

ইংরেজ প্রিন্সিপ্যাল বলল, ডাক বিভাগের গাড়ির মাধ্যমে এই বরই প্রত্যেক দিন সকালে আপনার সামনে উপস্থিত করা হবে। মাওলানা জবাবে বললেন, এ সবই যথার্থ। কিন্তু কাল কিয়ামতে আল্লাহ যখন বলবেন, তুমি রামপুর ছেড়ে বেরেলী কলেজে গিয়েছিলে রামপুরে তুমি পনেরো টাকা পাও, বেরেলী কলেজে গেলে দুইশত টাকা পাবে শুধু এই জন্যে? তখন আমি কী জবাব দেব? ইংরেজ তো ইংরেজই ছিল। সে বলল, না, এর কোন জবাব আমার কাছে নেই।

আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দ!

পুনরায় এরূপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হওয়া উচিত। সকল আসমানী গ্রন্থ ও আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের জীবন চরিত এবং যুগ-সংস্কারকদের ইতিহাস বলে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ইজ্জত ও সম্মান লাভ, আন্তরিক প্রশান্তি ও আত্মিক আনন্দ লাভ ও সেই সঙ্গে রহমত ও বরকত লাভ যুহদ ও ঈসার- ত্যাগ ও কুরবানীর উপর, দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি ও নিঃস্বার্থবাদিতার উপর নির্ভরশীল। এটাই আল্লাহ তাআলার চিরন্তন রীতি, তাঁর ফায়সালা। বর্তমানে নিকৃষ্ট এক মানসিকতার জন্ম নিয়েছে যে, যেখানে টাকা-কড়ি বেশি পাওয়া যায়, যেখানে অপেক্ষাকৃত অধিক আরাম-আয়েশ লাভ হয়, যেখানে বিনা ক্লেশে পরিবারের ভরণ-পোষণ ও প্রতিপালনের ব্যবস্থা হয় সেখানে চলে যাও। এটা একটা ফেতনা। এ থেকে আত্মরক্ষা করা উচিত।

তৃতীয় কথা- কথাটি বহু অভিজ্ঞতা প্রসূত। দেখুন, আমি অনেক কিতাব অধ্যয়ন করেছি। মাযহাব চতুষ্টয়ের কিতাবাদি ছাড়াও তুলনামূলক অধ্যয়ন করেছি। খুব কম লোকেরই এরূপ অধ্যয়ন করার সুযোগ হয়। সব অধ্যয়নের নির্যাসরূপ একটি মৌলিক কথা বলছি যে, আহলে সুন্নাতের মত ও পথ থেকে কখনও বিচ্যুত হবেন না। আপনার চিন্তা-চেতনায় যা-ই উদিত হোক, আপনার মেধা ও মস্তিষ্ক যা-ই বলুক, আপনার ভাণ্ডারে যত শক্তিশালী প্রমাণাদিই থাকুক জমহুর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফ ও খালাফের মত ও পথ কখনও পরিহার করবেন না। জমহুর সালাফ ও খালাফের সঙ্গে সর্বকালেই আল্লাহ তাআলার মদদ ও সাহায্য ছিল এবং আছে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় আমরা তার দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। এই দ্বীনকে কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখাই আল্লাহর অভিপ্রায়। টিকে থাকার অর্থ দ্বীনের প্রকৃত রূপ বহাল থাকা। বিকৃতি হতে সুরক্ষিত থাকা। নতুবা বৌদ্ধ ধর্মও টিকে আছে কিন্তু বিকৃত রূপে। ঈসায়ী ধর্মও টিকে আছে কিন্তু বিকৃত রূপে। একে টিকে থাকা বলে না। আর এ কারণেই কুরআন মাজীদে ঈসায়ী বা খ্রিস্টানদেরকে (ضالين) (পথভ্রষ্ট) রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বলা হয়েছে-

غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় যেহেতু এই দ্বীনকে অবিকৃতরূপে টিকিয়ে রাখা- যেমনটা তিনি বলেছেন-

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ 'আমিই যিকির অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।'

সেহেতু তিনি প্রত্যেক যুগেই স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী, স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁদেরকে তিনি দান করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমের যোগ্যতা ও চূড়ান্ত ইখলাস। সেই সঙ্গে তাঁদের প্রতি তাঁর মদদ ও সাহায্য তো আছেই। আমাদের, আপনাদের সকলের উস্তাদ হযরত মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.) তাঁর কিছু শাগরেদকে বলেছিলেন এবং কথাটি তাঁকে বলেছিলেন তাঁর উস্তাদ মাওলানা শিবলী (রহ.) যে, কিছু লোক আকর্ষণীয় কিছু লেখা পাঠ করে ধোঁকা খেয়ে যায় এবং সালাফে সালেহীন উলামায়ে কেরামকে নিয়ে উপহাস করে। বিখ্যাত সব তাফসীরবিদ তাদের সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত হয়। অতএব জমহুরের মত ও পথের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে রাখুন। এতেই কল্যাণ নিহিত। এতেই আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত ও তাঁর নুসরত ও বরকত নিহিত।

এই কয়েকটি কথা ছিল বলার। হয়তো আমি যথাযথ পদ্ধতিতে কথাগুলো উপস্থাপন করতে পারিনি। কিন্তু আপনারা কথাগুলোকে শত ভাগ সত্য বলে জ্ঞান করবেন। ব্যাপক অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতায় আল্লাহ তাআলার ফযল ও করমে আমি কথাগুলো পর্যন্ত উপনীত হয়েছি। আমানত ও অসিয়ত স্বরূপ আপনাদের নিকট কথাগুলো ব্যক্ত করলাম।

চতুর্থ কথা- ইলম চর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। নিজেকে কখনও ফারেগুত তাহসীল বা ইলম অন্বেষণ সমাপণকারী ভাববেন না। যেখানেই থাকুন সব সময় নতুন ও পুরাতন কিতাবাদি অধ্যয়ন করুন। কুরআনের তাফসীর, হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং ইতিহাস গ্রন্থের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখুন। যে সকল কিতাব ইলমুল কালাম বা ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে লিখিত, যে সকল কিতাবে বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস বিশুদ্ধ রীতিতে লিখিত হয়েছে সে সকল কিতাব সব সময় অধ্যয়ন করুন এবং নিজের কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলুন।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 নেয়ামতে ইসলামের মূল্যায়ন ও তার জন্য শোকর আদায়করণ

📄 নেয়ামতে ইসলামের মূল্যায়ন ও তার জন্য শোকর আদায়করণ


[১৯৮৪ ইং সনের ১০ মার্চ বাংলাদেশের বৃহৎ দ্বীনী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় আজিমুশ্বান বার্ষিক মাহফিলে প্রদত্ত ভাষণ। এটি ছিল মাওলানার বাংলাদেশ সফরে প্রথম ভাষণ।]

الْحَمْدُ لِلَّهِ وَحْدَهُ وَالصَّلوةُ وَالسَّلَামُ عَلَى مَنْ لَا نَبِيَّ بَعْدَهُ - أَمَّا بَعْدًا

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَيْنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

আমার প্রিয় বাংলাদেশী ভাই ও বন্ধুগণ!

বাংলাদেশ উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ। এরূপ একটি দেশে আমি এতদিন আসিনি। আপনাদের সাক্ষাতে এখানে আসার এই বিলম্বকে আমি আমার ত্রুটি ও অবহেলা বলে মনে করছি। আমার এই ত্রুটির জন্য আমি আপনাদের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করছি এবং আল্লাহর এই পবিত্র ঘর, জামেয়া ইসলামিয়ার এই বৃহৎ মসজিদে বসে আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার করছি। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মুসলিম দেশে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পৃক্তকারী এত বিশাল সংখ্যক লোক বসবাস করে, এত বিপুল পরিমাণ লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারণ করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করে, আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়, ইসলামের কালিমা উচ্চারণ করে অথচ আমি তাঁদের নিকট এত দেরিতে আসলাম! আল্লাহ তাআলা আমার এই অপরাধ ক্ষমা করে দিন।

সুধী! আমি আপনাদের সামনে একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— “স্মরণ কর, তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, তোমরা যদি শোকর আদায় কর তবে তোমাদেরকে অবশ্যই বৃদ্ধি করে দেব। আর যদি নাশোকরী কর, অকৃতজ্ঞ হও তবে জেনে রাখ, আমার শাস্তি অবশ্যই কঠোর।” (সূরা ইবরাহীম ৭)

মানুষ যখন অন্য কোন জাতির শান-শওকত দেখে, আড়ম্বরপূর্ণ জীবন দেখে, আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী কোন বিষয় দেখে তখন শয়তান আক্রমণের সুযোগ পায়, মুসলমানদের মধ্যে লোভ সৃষ্টি করে দেয় অনুরূপ বিষয়গুলো লাভ করার। পৃথিবীতে বহু জাতি আছে যারা তাওহীদের বিশ্বাস এবং ইসলামের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত। তাদের কেউ বৃক্ষপূজা করে, কেউ মূর্তিপূজা করে। দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে নজর নিয়াজ করে। মেলার আয়োজন করে। সেখানে চিত্তবিনোদনের নানা সামগ্রী ও ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে। কোন কোন সম্প্রদায় এক্ষেত্রে পদস্খলিত হয়েছে এবং শয়তানের আক্রমণের শিকার হয়েছে। তাদের অন্তরে এই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছে যে, আহা! যদি আমরাও এরূপ করতে পারতাম!

দুনিয়ার বহু জাতি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে পূজনীয় দেব-দেবীর মর্যাদা দান করেছে। কেউ আঞ্চলিক বা ভাষাগত জাতীয়তাকে দেবতা বানিয়ে নিয়েছে, কেউ দেশকে, কেউ ভাষাকে দেবতা বানিয়ে নিয়েছে। কেউ পূর্ব পুরুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে দেবতা বানিয়ে বসেছে। কেউ কুলিনতা ও বংশ মর্যাদাকে, কেউ রঙ ও বর্ণকে দেবতা বানিয়ে বসেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এইসব অলীক দেব-দেবী থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা যেন সর্বদা ইসলাম নিয়ে গর্বিত থাকি এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তি জাগ্রত না হয় আমাদেরকে সেই শিক্ষাই দান করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রটি মানুষের পদস্খলনের ক্ষেত্র। কাউকে সুস্বাদু খাবার খেতে দেখলে যেরূপ জিহ্বায় পানি এসে পড়ে তদ্রূপ কোন কোন জাতির ভ্রষ্টতা নির্দেশক জীবনাচার দেখে অনেকে লোভাতুর হয়ে পড়ে, অনুরূপ জীবনাচারকে গ্রহণ করতে চায়।

আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে একজন মহান নবীর সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য দান করেছিলেন। কিন্তু তাদেরও পদস্খলন ঘটেছিল। মূর্তিপূজার দৃশ্য দেখে তারা স্থির থাকতে পারেনি। তারা আকাঙ্ক্ষা করে বসেছিল যে, তাদেরও যদি এইরূপ কোন কিছুর উপাসনা করার ব্যবস্থা থাকত তাহলে ভাল হত। সূরা আরাফে আল্লাহ তাআলা ঘটনাটি এভাবে ব্যক্ত করেছেন— “আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম, অতঃপর তারা প্রতিমা পূজায় রত এক জাতির নিকট উপস্থিত হল। তারা বলল, হে মুসা! তাদের দেবতার ন্যায় আমাদের জন্যও এক দেবতা গড়ে দাও। মুসা বলল, তোমরা তো বড় মূর্খ সম্প্রদায়। এইসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে, তা তো বিধ্বস্ত হয়ে যাবে এবং তারা যা করছে তা অমূলক।” (সূরা আরাফ ১৩৮-১৩৯)

আল্লাহ তাআলা এই বনী ইসরাঈলকেই বলেছেন— “হে ইয়াকুবের সন্তানেরা! তোমরা আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ কর যা দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছিলাম এবং বিশ্বে তোমাদেরকে সবার উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম।” (সূরা বাকারা ৪৭)

তাফসীরবিদগণ বলেন, বিশ্বের সবার উপরে বনী ইসরাঈলের যে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তা ছিল তাওহীদের কারণে। ইসরাঈল বা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সন্তানদের মধ্যে সব সময় তাওহীদের বিশ্বাস বিদ্যমান ছিল। তৎকালীন যুগে বিশ্বের অপরাপর জাতির তুলনায় তারাই ছিল সর্বাধিক তাওহীদে বিশ্বাসী ও আল্লাহ তাআলার ইবাদতকারী। কিন্তু হযরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগে এই জাতি বহু বৎসর যাবৎ মিসরে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সাহচর্য ও শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করেও পদস্খলনের শিকার হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম। তারা এমন এক জাতির নিকট উপস্থিত হল, যারা লিপ্ত ছিল তাদের দেব-দেবীর পূজায়।” সেখানে সম্ভবত দোকানপাট বসেছিল, খাবার-দাবার রান্না হচ্ছিল, গান-বাজনা হচ্ছিল। মেলা ইত্যাদিতে এসব হয়েই থাকে। তো মুসা আলাইহিস সালাম এতদিন যাবৎ বনী ইসরাঈলকে যে পাঠ দান করেছিলেন, যে শিক্ষা-দীক্ষা দান করেছিলেন, তা তারা সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে গেল। তারা বলল— “হে মুসা! আমাদের জন্যও এক দেবতা গড়ে দাও তাদের দেবতাদের ন্যায়।” অর্থাৎ এমন এক উপাস্য আমাদের জন্য নির্ধারিত করে দাও, যাকে আমরা স্পর্শ করতে পারব, সরাসরি চোখে দেখতে পারব এবং তার পা চুম্বন করতে পারব। হযরত মুসা (আ.) তাদের এই কথায় ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি বললেন— “তোমরা তো অবশ্যই মূর্খ সম্প্রদায়! তোমরা চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্বোধ, অকৃতজ্ঞ ও মূর্খ। এতদিন যাবৎ তোমাদেরকে আমি শিক্ষাদান করলাম, এই নিকৃষ্ট জীবনাচার থেকে মুক্ত করলাম, অথচ তোমরা এখন তাদের অনুরূপ মূর্তিপূজায় লিপ্ত হতে চাচ্ছ, মেলা বসাতে বলছ, গান-বাজনার আয়োজন করতে বলছ। এইসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো ধ্বংসশীল এবং তারা যা করছে তা অমূলক।” তাদের দেবতা তাদের কোন উপকারেই আসবে না। এগুলো তো সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

বন্ধুগণ! বনী ইসরাঈলের ওই ঘটনায় আমাদের জন্য রয়েছে একটি দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা, একটি সাবধান বার্তা। আল্লাহর নবী সাইয়্যেদুনা মুসা আলাইহিস সালামের সযত্ন তত্ত্বাবধানে ও নজরদারিতে যে জাতি বহু বৎসর কাটালো তারাও মারাত্মক ভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়ল। দৃশ্যযোগ্য, শরীরবিশিষ্ট ইলাহের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে বসল। এই ঘটনার কাছাকাছি একটি ঘটনা মুসলমানদের মধ্যেও ঘটেছিল। যদিও ঘটনাটি তত বিপজ্জনক ও ভ্রষ্টতামূলক ছিল না। নির্দিষ্ট একটি গাছে কাফেররা তাদের তরবারী ও যুদ্ধাস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। সেখানে তারা পশু যবেহ করত এবং একদিন সেখানে অবস্থান করত। হাদীসের কিতাবে এসেছে যে, হুনায়নের যুদ্ধে গমনকালে নও-মুসলিম কিছু সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমাদের জন্যও তাদের অনুরূপ একটি গাছ নির্দিষ্ট করে দিন, যাতে আমরা সেখানে বসতে পারি, মেলার আয়োজন করতে পারি, বাজার বসাতে পারি, পশু কুরবানী করে খাবার-দাবারের আয়োজন করতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বনী ইসরাঈল হযরত মুসার নিকট যেরূপ আবেদন করেছিল তোমরাও আমার নিকট সেইরূপ আবেদন করলে। তারা বলেছিল— “আমাদের জন্যও তাদের দেবতার ন্যায় এক দেবতা গড়ে দাও।” “হে মুসলমানগণ! তোমরা তাদের কদমে কদমে অনুসরণ করে ছাড়বে।”

একবার কোন এক সফরে জনৈক আনসারী সাহাবীর সঙ্গে জনৈক মুহাজির সাহাবীর কিছুটা বিবাদ হল। আনসারী সাহাবী চিৎকার করে বলল— “আনসারীদের দোহাই।” মুহাজির সাহাবীও চিৎকার করে বলল— “মুহাজিরদের দোহাই।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— “ছাড় এটাকে। কারণ এটা অপবিত্র ও দুর্গন্ধময়।”

ভাই ও বন্ধুগণ! শয়তান আমাদেরকে বিপথে পরিচালিত করতে ওঁৎ পেতে আছে। সে তার নিজ কর্মে কখনও অবহেলা করে না, কখনও উদাসীন থাকে না। সে নতুন নতুন পদ্ধতিতে মানুষকে প্ররোচিত করে। কখনও এই রঙে, কখনও ঐ রঙে। সে জানে, কোন মানুষকে কিভাবে প্রভাবান্বিত করতে হয়, কিভাবে পথচ্যুত করতে হয়, কোন পদ্ধতি মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে অধিক কার্যকর। আলেরমের পরিবারে যেয়ে সে কাউকে চুরি করতে বলবে না। কারণ আলেমের পরিবারের কাউকে দিয়ে চুরির অপরাধ সংঘটিত করানো সহজ নয়। সে তাদেরকে অহংকারের তালীম দেবে। পিতৃপুরুষ নিয়ে গর্ব করতে শিক্ষা দেবে। ব্যবসায়ীর নিকটে যেয়ে সে তাকে মাপে কম দেওয়ার ব্যাপারে প্ররোচিত করবে, অবৈধ পন্থা অবলম্বন করতে প্ররোচিত করবে, অতি মুনাফার ব্যাপারে লোভী করে তুলবে। তদ্রূপ যে সমাজকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের সম্পদ দান করেছেন, ইলম ও মেধা দান করেছেন, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব দান করেছেন শয়তান সেই সমাজকে প্ররোচিত করে এই বলে যে, ইসলামের নেয়ামত তো সবাই লাভ করেছে তোমাদের বৈশিষ্ট্য হল ভাষাগত, জাতিগত। তোমাদের উচিত ভাষাগত ও জাতিগত ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করা। শয়তানের এই মারাত্মক অস্ত্র সে সুযোগ বুঝে ব্যবহার করে থাকে।

আপনারা ইসলামের রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন। আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” শয়তান মানুষের মাঝে বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। কারও সামনে জাতীয়তার অসার মতবাদ দাঁড় করিয়ে দেয়, কারও সামনে সম্পদ, কারও সামনে বস্তুবাদিতা ইত্যাদি নানা বিষয় দাঁড় করিয়ে দেয় এবং তাতে এরূপ আকর্ষণ সৃষ্টি করে যে, অনেক সময় এসবকে কেন্দ্র করে মানুষ হানাহানিতে লিপ্ত হয়, একে অপরকে হত্যা করতে চেষ্টা করে। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিরীহ শিশুরাও রেহাই পায় না। নারীরা হয় নির্যাতিতা, ধর্ষিতা। এইসব শয়তানী চক্রান্ত। আমাদের সকলেরই ইসলাম নিয়ে গর্ব করা উচিত। ইসলামকে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মনে করা উচিত। ইসলামের সব বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা উচিত।

হাদীস শরীফে এসেছে, সমাজে মর্যাদাহীন কুৎসিত চেহারা বিশিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা লাভ করবে। আর তা হবে তাকওয়ার কারণে। “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানের অধিকারী হবে ঐ ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়ার অধিকারী।” আল্লাহ তাআলা তাকওয়াকে বানিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, ইবাদতকে বানিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, ইলমকে বানিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। “কোন অনারবের উপর কোন আরবের এবং কোন আরবের উপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই তাকওয়া ব্যতীত।” কোন সাদার উপর কালোর কিংবা কালোর উপর সাদার অন্য কোন ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়নি। শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হল তাকওয়া। কে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান ও মারেফাত বেশি রাখে, কে দ্বীনের জ্ঞান বেশি রাখে, কে অপেক্ষাকৃত অধিক সুন্দরভাবে নামায আদায় করতে জানে, কে ইসলামের উপর অধিক গর্বিত, কে ইসলামের নেয়ামত পেয়ে অধিক শোকরিয়া আদায় করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রেম ও ভালবাসা কার অধিক—এসব বিষয়ই আল্লাহর নিকট বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু শয়তান আমাদেরকে এসব বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। এইজন্যই বলা হয়েছে— “নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু, অতএব তাকে শত্রুরূপেই বিবেচনা কর।” অন্যত্র বলা হয়েছে— “শয়তান ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা তোমাদেরকে এমন স্থান থেকে দেখে যে, তোমরা তাদের দেখতে পাও না।” শয়তান যেমন জীন বেশে থাকে, তেমনি মানুষের বেশেও আগমন করে। শত্রুবেশেও আসে, বন্ধুবেশেও আসে। শয়তান বহু ভাষায় কথা বলতে পারে। আমাদের চেয়ে উত্তম ভাষায় সে কথা বলতে পারে। চমৎকার ভাষায় সে বোঝাতে পারে। আপনারা এইরূপ সকল শত্রু থেকে সতর্ক থাকবেন। ইসলামের রশি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবেন। ইসলাম নিয়ে গর্বিত থাকবেন। কারণ ইসলাম অপেক্ষা অধিকতর গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। ইসলাম নিয়ে জীবিত থাকুন, ইসলাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করুন। ইসলামের জন্য জীবন দান করুন। ইসলামের জন্য শির দিয়ে দেওয়া বৈধ কিন্তু ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুর জন্য এক বিন্দু রক্ত দেওয়াও অন্যায় ও অবৈধ।

আরব দেশে ১৯৬৫-৬৬ সালে এক ঝড় উঠেছিল। সর্বনাশা তুফান সৃষ্টি হয়েছিল। লাখ লাখ আরবকে এক ব্যক্তি পাগল বানিয়ে দিয়েছিল।¹ কিন্তু তার স্থায়িত্ব ছিল অল্প কিছুদিন। সে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ রয়ে গেছেন। তাঁর রাসূল রয়ে গেছেন। কিবলা এখনও রয়ে গেছে। মসজিদে নববীও এখনও তেমনি আছে। কুরআন শরীফও বহাল আছে। ঐ কুহক দূরীভূত হয়ে গেছে। “নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হবারই। বাতিল কখনও স্থায়িত্ব লাভ করে না।” আপনাদের গর্বের বিষয় একমাত্র ইসলাম। ইসলামের আহ্বান ব্যতীত অন্য কিছু যেন আপনাদেরকে আকৃষ্ট করতে না পারে। ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতি আপনাদের অন্তর যেন ধাবিত না হয়। আর সেটাই হবে ইসলামের কারণে শোকর আদায়, ইসলামের জন্য গর্ব প্রকাশ। আমি দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা আপনাদের ঈমান ও চিন্তা-চেতনাকে হেফাযত করেন। আমাদের ও আমাদের সাথী-সঙ্গীদের ঈমান ও মানসিকতাকে হেফাযত করেন।

ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

টিকাঃ
১. মিসরের জামাল আবদুন নাসেরের কথা বোঝানো হয়েছে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 ভালবাসা ও নিখাদ রূহানিয়াতের বিজয়

📄 ভালবাসা ও নিখাদ রূহানিয়াতের বিজয়


[১৯৮৪ ইং সনের ১৪ মার্চ হোটেল পূর্বাণীতে হযরত মাওলানার সম্মানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত নৈশভোজ উপলক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর মহাপরিচালক জনাব আবুল ফায়েদ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া সাহেবের স্বাগত ভাষণের জবাবে প্রদত্ত ভাষণ।]

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ وَالصَّلوةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِينَ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ ডিন - أَمَّا بَعْدُ

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মহোদয় ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আপনাদের ন্যায় বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণীর সঙ্গে এক জায়গায় একত্রিত হতে পেরে আমি অত্যন্ত মোহিত ও আনন্দিত। আমার উচিত ছিল, আপনাদের প্রত্যেকের বাসা-বাড়িতে যেয়ে যেয়ে আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাত করা। কিন্তু সময়ের স্বল্পতা ও শহরের বিশালতার কারণে এটা আমার পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। মহাপরিচালক আবুল ফায়েদ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া সাহেব আপনাদের সকলের সঙ্গে একই সময়ে, একই স্থানে মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য আমি তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আমি অকৃত্রিম আন্তরিকতার সাথেই বলছি যে, এই মুহূর্তে আমার অত্যন্ত দুঃখ হচ্ছে এই ভেবে যে, আমি বাংলা ভাষা জানি না। পৃথিবীর সকল ভাষাই আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট। আল্লাহ তাআলা ভাষার বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করে আমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ জাহির করেছেন— “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য তাঁর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই এতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন।” (সূরা রূম ২২)

অতএব ভাষার বিভিন্নতা নিন্দনীয় কোন বিষয় নয়। আর বাংলা ভাষা তো মুসলমানদের ভাষা। এই ভাষায় রয়েছে জ্ঞান ও সাহিত্যের ভাণ্ডার। উপমহাদেশের একজন বাসিন্দা হিসাবে আমি যদি বাংলা ভাষা জানতাম তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি আপনাদের সামনে আপনাদের প্রিয় মাতৃভাষায় কথা বলতে পারছি না। এর একমাত্র বিকল্প ছিল আরবী ভাষায় কথা বলা। আমি আরবীতে বলতাম আর আপনারা বুঝে নিতেন। তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। আরবী ভাষাতো ইসলামের সরকারী ভাষা। মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক প্রিয় ও ব্যাপক ভাষা।

সুধী! যখন আমি ঈমানের দেশ, বড় বড় আলেম-উলামার দেশ ও ওলী-আল্লাহর দেশ এই বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছি তখন থেকেই আমার অন্তর আনন্দে আপ্লুত হয়ে আছে। একজন ইতিহাস গবেষক হিসাবে আমি মনে করি, এই ভূখণ্ডে এত বিপুল পরিমাণ মুসলমানের বসতি শুধু ইখলাস ও রূহানিয়াতের ফসল। যদি নিখাদ রূহানিয়াত ও রাজনৈতিক স্বার্থমুক্ত ইখলাস না থাকত, যদি খাঁটি আল্লাহ-প্রেম ও মানবতা-প্রীতি না থাকত (যা আমাদের বুযুর্গানে দ্বীনের মধ্যে ছিল) তবে এই ভূখণ্ড ইসলামের নেয়ামতে এরূপ সমৃদ্ধ ও এরূপ ইসলাম-প্রেমিক হতে পারত না। বর্তমানে একজন মানুষের হৃদয় জয় করাও সুকঠিন বলে মনে হয়। কিন্তু আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ শুধু ইখলাসের বদৌলতে অত্যন্ত সহজভাবে লাখ লাখ মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন, তাদেরকে নিজেদের ভক্ত ও প্রেমিক বানিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশে মুসলমানদের এই সংখ্যাধিক্য কোন মুসলিম সামরিক অভিযানের ফল নয়। আমি অত্যন্ত আস্থা ও দৃঢ়তার সাথে আপনাদের সামনে বলতে চাই যে, যে সকল জায়গায় মুসলিম সেনাবাহিনী যায়নি সেখানেই মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর যেখানে শত শত বৎসর যাবৎ মুসলিম শাসন বহাল ছিল সেখানে দেখা যায় যে, মুসলমানরা সংখ্যালঘু। ইরান থেকে হযরত সাইয়েদ আলী হামদানী এসে গোটা কাশ্মীরকে তার ভালবাসা ও প্রেম দ্বারা শিকার করে ফেললেন। তিনি আসলেন আর সমগ্র কাশ্মীর ইসলামের কালিমা গ্রহণ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল। ইসলামের প্রতি কাশ্মীরবাসীর প্রেম ও ভালবাসা এই পর্যায়ে উপনীত হল যে, বড় বড় ব্রাহ্মণ পরিবারের লোকেরাও ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল। কাশ্মীরেরই এক ব্রাহ্মণ সন্তানকে আমরা দেখতে পাই (আল্লামা ইকবাল) সাইয়েদ বংশীয় একজনকে লক্ষ্য করে আবেগময় ভাষায় কবিতা রচনা করতে— এই রাসূল প্রেম সৃষ্টি হয়েছিল রূহানিয়াতের দ্বারা, ইখলাসের দ্বারা, খাঁটি মানবপ্রেম ও আল্লাহর তাবেদারী দ্বারা। আল্লাহর তাবেদারী এবং মানবপ্রেম এই উভয় গুণের যখন মিলন ঘটে, যখন এই দুই সাগর একই স্থানে এসে মিলেমিশে যায়, অর্থাৎ কেউ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের আল্লাহর তাবেদার হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে যথার্থ মানবপ্রেম তখন তার বিজয় রথকে কেউ রোধ করতে পারে না। অন্ধকারের বুক চিরে তখন পরিস্ফুট হয় আলো। বর্তমান যুগেও দুনিয়ার সকল সঙ্কট ও সকল বিপর্যয়ের একমাত্র চিকিৎসা ইখলাস ও আন্তরিকতা, যথার্থ রূহানিয়াত এবং নিজের সব রকম স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে খেদমতে নিয়োজিত হওয়া।

পূর্ববাংলাতেও দরবেশ এসেছেন, আল্লাহওয়ালা ফকীর এসেছেন। তাঁরা এসেছেন এবং মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। মানুষ আদম সন্তানদেরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। একদল তো তারা, যারা নিজেদেরকে মানুষ মনে করত। আর অপর দল ছিল তারা, যাদেরকে জীব-জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করা হত। মানুষের তৈরি এই কৃত্রিম বিভক্তিকে ঐ সকল দরবেশ ও সুফীগণ মানবপ্রেম দিয়ে উৎখাত করেছিলেন। তাঁরা ইসলামের পয়গাম নিয়ে এসেছেন, তাওহীদের পয়গাম নিয়ে এসেছেন এবং মানবতার ঐক্যের পয়গাম নিয়ে এসেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ আরববাসীকে লক্ষ্য করে বললেন, যারা তৎকালীন যুগে ছিল সর্বাধিক বংশপূজারী, ভাষা পূজারী, এমনকি যারা গোটা পৃথিবীকে নিজেদের তুলনায় বোবা ও ভাষাহীন বলে জ্ঞান করত, আরবী ভাষা ব্যতীত অন্য ভাষাকে ভাষা বলেই মনে করত না— “তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতা একজন। তোমাদের সকলেই আদম থেকে আর আদম মাটি থেকে। কোন অনারবের উপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন আরবের উপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কালোর উপর সাদার, সাদার উপর কালোর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি একমাত্র তাকওয়া।”

“হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী।” (সূরা হুজুরাত ১৩)

মুহাম্মাদ আরবী, হাশেমী, কুরাইশী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে লোক সকল! হে মানুষ! হে আরববাসী! তোমাদের সৃষ্টিকর্তা এক, তোমাদের পিতাও এক। দুই দুইটি দিক থেকে তোমরা একে অপরের ভাই।
এক আল্লাহ তাআলার দিক থেকে, আল্লাহ তাআলার বান্দা হওয়ার দিক থেকে।
দুই তোমাদের আদি পিতা ও উর্ধ্বতন পুরুষের দিক থেকে।
আল্লাহর একত্ব ও মানব বংশের একত্ব দুইটি স্তম্ভ। এই উভয় স্তম্ভের উপর মানবতা প্রতিষ্ঠিত। এই দুই স্তম্ভের যে কোন একটিকে ভূপাতিত করা হলে মানবতা ও মানব সভ্যতার সুউচ্চ প্রাসাদ ভূপাতিত হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে।

ঐ সকল সুফী ও দরবেশের মাধ্যমেই এখানে ইসলাম এসেছে, যাঁরা বুদ্ধি ও মস্তিষ্ক দিয়ে কথা বলার পূর্বে হৃদয় দিয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা মুখের ভাষায় কথা বলেননি, তাঁরা কথা বলেছেন হৃদয়ের ভাষায়। মুখের ভাষা হতে পারে পঞ্চাশটি কিন্তু হৃদয়ের ভাষা হয় একটিই, আত্মার ভাষা একটিই, সত্যতা ও সততার ভাষা একটিই, ভালবাসার ভাষা একটিই। ভালবাসা ও প্রেমের ভাষা সকলেই বোঝে। তার জন্য দোভাষীরও প্রয়োজন হয় না। চোখের প্রেমময় চাহনী, ঠোঁটের মুচকি হাসি, হৃদয় উপচে পড়া ভালবাসার ফোয়ারা শত্রুকেও, জংলী বাঘ ও সিংহকেও বশীভূত করে ফেলতে পারে। নিজের কথা তাদের মুখে উচ্চারণ করিয়ে দিতে পারে।

আমি আপনার (মহাপরিচালক) প্রতি যারপরনাই কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করছি। আপনি শুধু ঢাকার নয় বরং বাংলাদেশের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে এখানে একত্রিত করেছেন। আমার অন্তরে এই কথা উদিত হচ্ছে যে, যে দেশে এত জ্ঞানী-গুণীজণ বিদ্যমান, যে দেশে এত ইসলাম প্রেমিক বিদ্যমান, যাঁরা তাদের এক পরদেশী ভাইয়ের কথা শোনামাত্র সকল জরুরী কাজ ফেলে দিয়ে এখানে ছুটে এসেছেন ইসলামের সাথে সে দেশের সম্পর্ক চিরঅটুট থাকতে বাধ্য, কখনও বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।

গুণগত (Quality) ও পরিমাণগত (Quantity) উভয় দিক দিয়ে এই সমাবেশ অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এই সমাবেশ আমাকে এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী করে তুলছে যে, যেখানে এত বিপুল সংখ্যক মুসলমানের বসবাস, যেখানে এত পণ্ডিত ও জ্ঞানী-গুণী বিদ্যমান, যেখানে এত শিক্ষিত বিদগ্ধজন (SCHOLARS) বিদ্যমান, ইসলামের সাথে সেই দেশের জ্ঞানগত সম্পর্ক, তাহযীবী ও তামাদ্দুনিক সম্পর্ক, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কখনও বিচ্ছিন্ন হবার নয়। আপনি (মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন) এই বিপুল সংখ্যক জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গকে এখানে সমবেত করে তাঁদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে আমাকে বিরাট তোহফা ও উপহার দিয়েছেন।

আমি আমার কথাকে দীর্ঘ করে আপনাদের নৈশভোজ গ্রহণের সময়কে বিলম্বিত করে দিচ্ছি। আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। খাবার তো সব সময়ই পাওয়া যাবে কিন্তু আপনাদেরকে আমি কোথায় পাব?

খোশামোদ ও চাটুকারিতা নয় বরং আমি যথার্থই বলছি, আপনারা সরল ও স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী, ইসলামের প্রতি অন্তরে প্রেম ও আবেগ লালনকারী একটি জাতি পেয়েছেন। অনেক দেশের ভাগ্যেই যা জোটে না। আপনারা এর মূল্যায়ন করবেন। আপনারা বড় বড় Politicians ও রাজনীতিবিদ পাবেন, Diplomates ও কূটনীতিবিদ পাবেন, বড় বড় মেধাবী ও প্রতিভাধর ব্যক্তি পাবেন, কিন্তু সততা ও মমতা সর্বত্র পাবেন না। আপনাদের এই জাতির মধ্যে সততা ও ভালবাসা বিদ্যমান। আপনাদের দায়িত্ব হল এই জাতিকে কাজে লাগানো। আমি টরেন্টো গিয়েছিলাম। সেখানে লোকেরা আমাকে নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখিয়েছে। জলপ্রপাতটি বিশ্বের বিস্ময়কর বস্তুসমূহের একটি। হাজার হাজার ফুট উপর থেকে এর পানি নিচে পতিত হয়। বিভিন্ন দেশের পর্যটকগণ জলপ্রপাতটি দেখতে ভীড় জমায়। আমিও দেখতে গিয়েছিলাম। এই জলপ্রপাতকে কাজে লাগিয়ে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা না হয়, এ থেকে Energy গ্রহণ করা না হয় এবং এর পানি যদি ক্ষেত-খামারে সিঞ্চিত করা না হয় তবে জলপ্রপাতটির কোন মূল্য থাকে না, বেকার বস্তুতে পরিণত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে একটি জলপ্রপাত দান করেছেন। ঈমানের জলপ্রপাত। আর তা হল বাংলাদেশের বিশাল মুমিন জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সততার জলপ্রপাত, ইখলাসের জলপ্রপাত। আপনারা এই জলপ্রপাতকে কাজে লাগান।

এর দ্বারা বিদ্যুৎ ও শক্তি উৎপাদন করুন। যে সকল সমস্যা ও সঙ্কট সম্পর্কে আপনারা মনে করছেন যে, তা দূরীভূত হবার নয়, সমাধানযোগ্য নয় সে সকল সমস্যার সমাধান মুহূর্তেই হয়ে যেতে পারে যদি সততা ও ইখলাস থাকে। আপনাদের এই জাতির মধ্যে এই মহা মূল্যবান সম্পদ বিদ্যমান রয়েছে। অতএব আপনারা এদের দ্বারা যে কাজ নিতে চান নিতে পারবেন।

তবে এটা রাজনীতিকদের কাজ নয়। এটা ঐ সকল ব্যক্তির কাজ যারা স্বচ্ছ ও খাঁটি হৃদয়ের অধিকারী, ইখলাসের অধিকারী। যাদের অন্তরে রয়েছে জাতির প্রতি প্রেম ও ভালবাসা। যারা এই জাতির নিকট থেকে কিছু পেতে চায় না, শুধু দিতে চায়। যারা জাতির সেবা করতে চায় এবং এর বিনিময় চায় শুধুই আল্লাহর নিকট। এই জাতীয় ব্যক্তিগণ এই জাতির মাধ্যমে পরশ পাথর বানাতে পারে, পারে সোনা তৈরি করতে। এই জাতি তো সোনার জাতি। এই জাতি শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং গোটা বিশ্বে এক নতুন শক্তির সঞ্চার করতে পারে। তবে এটা তখনই হবে যখন আমরা নেয়ামত স্বরূপ আল্লাহ তাআলা যে জাতি আমাদেরকে দান করেছেন তার মূল্যায়ন করব। এই জাতি নায়েগ্রা জলপ্রপাত স্বরূপ। আপনারা এর দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করুন। এর পানি অযথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং বহুদিন যাবৎ নষ্ট হচ্ছে। এর দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুৎ সমগ্র উপমহাদেশকে (Sub continent) আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি আরব বিশ্বেও সে আলো পৌঁছে যেতে পারে।

আপনারা আপনাদের এই জাতির মূল্যায়ন করবেন। প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মের মাঝে, উলামা হযরাত ও ভার্সিটি পড়ুয়া গ্রাজুয়েটদের মাঝে দূরত্বের যে সাগর সৃষ্টি হয়েছে এবং দিন দিন গভীর ও বিস্তৃত হচ্ছে সেই সাগরকে ভরাট করবেন, উভয় শ্রেণীর দূরত্বকে দূরীভূত করবেন। উভয় শ্রেণী যেন বন্ধুতে পরিণত হয়। আলেমগণ আধুনিক শিক্ষিতদেরকে দ্বীনী বিষয়ে সহায়তা করবেন, তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দান করবেন, কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করে তুলবেন, আর আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্ম সেগুলোকে বাংলা ভাষায় সমাজে ছড়িয়ে দেবেন। উভয় শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দেশকে শক্তিশালী করে তুলুন, ইসলামের পতাকাবাহী দেশ হিসেবে গড়ে তুলুন। এই দেশ মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। অতএব এই দেশবাসীর উচিত নিজেদের সামর্থ্য ও শক্তি, দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং মূল্য ও মর্যাদা অনুধাবন করা এবং ক্ষুদ্র দেশসমূহের ব্যাপারে বড় ভাই সুলভ সহায়তা প্রদান ও কল্যাণ সাধনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।

আমি পুনরায় আপনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এজন্য যে, আপনি শক্তির এক নতুন দিগন্ত আমার সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন। আপনি আমার মধ্যে এক রাশ আশা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। মুসলিম বিশ্বের ঘটনাবলী দেখে দেখে আমি হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। লেবাননের পরিস্থিতি, ইরাক ইরানের যুদ্ধ এবং আরব বিশ্বের অর্থ-সম্পদের গোলামীর চিত্র দেখে আমার অন্তর যতটা আহত হয়েছিল আপনি তা কিছুটা লাঘব করেছেন। আমি এখানে এসে আশান্বিত হলাম যে, ইসলামের নক্ষত্র এখনও আলোকোজ্জ্বল রয়েছে।

যদি এই দেশ থেকেই ইসলামের পুনর্জাগরণের সূচনা হয় তবে তা বিচিত্র কিছু নয়। একজন ভারতীয় লেখক হিসেবে আমি আপনাদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় বলছি যে, আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে সব রকম যোগ্যতা দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ আপনাদের মধ্যে কোন কিছুর ঘাটতি ও অভাব নেই। শুধু প্রয়োজন, ইসলামের বন্ধনকে দৃঢ় করা, ইসলামের সাথে সম্পৃক্ততাকে সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া। এক্ষেত্রে কোন কিছুই যেন আপনাদের সামনে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়াতে না পারে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টিই জীবনের মূল বিষয়। তাঁর কাছেই আমাদের যেতে হবে। ঈমান, আকীদা ও নেক আমল ব্যতীত কোন কিছুই তাঁর নিকট যেয়ে কাজে আসবে না।

আমরা যেন সকল মানুষকে ভালবাসি। সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। নিজের মাতৃভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে চেষ্টা করি, মাতৃভাষাকে ভালবাসি। তবে অন্য ভাষাকে ঘৃণা করে নয়। আমার তো বলতে ইচ্ছা হয় যে, আপনারা ভারতে এমন কিছু আলেম ও সাহিত্যিক প্রেরণ করুন, যারা বাংলাভাষায় ইসলামের তালীম দিতে পারবে। কোন বিশেষ ভাষা নিয়ে গোঁড়ামী ও অন্ধ ভালবাসার সাথে ইসলামের ইতিহাস পরিচিত নয়। মুসলমানরা সব ভাষাই শিখেছে এবং যেন তেন শিক্ষা নয় বরং পাণ্ডিত্য অর্জন করেছে এবং সেই ভাষায় ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। ফার্সী ভাষা কাদের ভাষা ছিল? অগ্নিপূজকদের ভাষা ছিল। কিন্তু আপনি ফার্সী ভাষার কাব্য ও কবিতার ইতিহাস পাঠ করুন, দেখবেন যে, এই ভাষা শেখ সাদীকে জন্ম দিয়েছে, হাফেজ সিরাজীকে জন্ম দিয়েছে, জালালুদ্দীন রূমীকে জন্ম দিয়েছে, মাওলানা জামী ও কুদসীকে জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশে এসে আমার সর্বাধিক প্রত্যাশা জন্মেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্র করে। এটা এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের বুদ্ধিজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের ভাষায় রচিত ইসলামী গ্রন্থাদি প্রকাশ করে পেশ করতে পারবে। আমার প্রত্যাশা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থাদির ভাষা, স্টাইল সহ সবকিছু মানোত্তীর্ণ হবে। প্রতিষ্ঠানটি আশার আলো। যার দ্বারা এই দেশ আলোকিত হবে। প্রতিষ্ঠানটির সাথে অনেক আশা ও প্রত্যাশা জড়িত।

এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি এবং পুনরায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এই মহা মূল্যবান ও ঐতিহাসিক সুযোগ দানের জন্য।

ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00