📄 ইউনানী চিকিৎসা ধারা অবলুপ্তি ঘটেছে যোগ্য চিকিৎসকের অভাবে
অন্য কোন উদাহরণ পেশ করলে বুঝতে হয়তো সমস্যা হত। দেখুন, এক কালে সারা ভারতবর্ষে ইউনানী চিকিৎসা ব্যবস্থার জয়-জয়কার ছিল। জায়গায় জায়গায় হেকিমখানা ছিল। হিন্দু, মুসলমান, মূর্খ, জ্ঞানী নির্বিশেষে সকলেই হেকিম সাহেবদের শরণাপন্ন হত। তাদের হেকিমখানাগুলোতে সব সময় ভিড় লেগে থাকত। আপনারা কি বলবেন, সেই ইউনানী চিকিৎসা ব্যবস্থার পতন ঘটেছে অ্যালোপ্যাথি এসেছে বলে? হোমিওপ্যাথি এসেছে বলে? নতুন নতুন মেডিসিন এসেছে বলে? আমি এটা মানি না। প্রকৃতপক্ষে হেকিমী চিকিৎসা ব্যবস্থার পতন ঘটেছে পূর্বের ন্যায় যোগ্য হেকিম সৃষ্টি হচ্ছে না বলে। বর্তমানে স্বভাবজাত মেধাবী, প্রতিভাবান ও সৃজনশীল মেধার অধিকারী চিকিৎসক সৃষ্টি হচ্ছে না। যদি সেই রকম হেকিম ও চিকিৎসক তৈরি হয়, তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, তাদের নিকট অ্যালোপ্যাথি ডাক্তাররা পর্যন্ত যাবে। এটা অতিশয়োক্তি নয়। আপনাদের শহরের সিভিল সার্জন তার কাছে যাবে। যখন তার নিজের চিকিৎসা ব্যবস্থায় তার রোগমুক্তি ঘটছে না তখন বেচারা কী করবে? আমি জালিনুস ও বাকরাতের ন্যায় ব্যক্তির কথা বলছি না। আমি হেকিম আবদুল আলী, হেকিম আজমল খান সাহেবের নাম উল্লেখ করতে চাই। হেকিম মাহমুদ খানের নাম উল্লেখ করতে চাই। তাদের সমপর্যায়ের না হলেও অন্তত যদি তাদের অর্ধেক যোগ্যতার অধিকারী হেকিম এই যুগে জন্ম নেয় তবে ইউনানী চিকিৎসা ব্যবস্থার অবলুপ্তির কিসসা খতম হয়ে যাবে। এই চিকিৎসা ব্যবস্থা পুনরায় তার জৌলুস ফিরে পাবে। বোঝা যাবে যে, চিকিৎসা ব্যবস্থাটি এখনও জীবিত আছে। আসল ব্যাপার হল আগেকার যুগে দরসে নেজামীতে লেখাপড়া শেষ করে মানুষ হেকিমী চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করতে যেত। যত বড় বড় আলেম ছিলেন তাঁরা প্রায় সকলেই এই চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করেছেন। অবশ্য হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.)-এর কথা আমার জানা নেই। তাঁদের কেউ কেউ এই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা এরূপ মেধাবী ও যোগ্য ছিলেন যে, হাতের নাড়িতে হাত রেখেই রোগীর সকল রোগের সন্ধান পেয়ে যেতেন।
📄 মাদরাসার অবস্থাও তদ্রূপ
আমাদের দ্বীনী ইলমের অবস্থাও তদ্রূপ। আপনি কোন শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করুন, স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতা নিজের মধ্যে সৃষ্টি করুন। পৃথিবী আপনাকে শ্রেষ্ঠ বলে মেনে নেবে। জীবন-জীবিকার সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে। মাদরাসাগুলোর যে সঙ্কট বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে তা দূরীভূত হবে। আমাদের হীনমন্যতা, অলসতা এবং কাজে ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতার ফলেই আজ যোগ্যতা সৃষ্টি হচ্ছে না। এ ব্যাপারে আমাদের মাওলানা মিন্নাতুল্লাহ সাহেবের বিশেষ অভিজ্ঞতা থাকবে নিশ্চয়ই। তিনি নাদওয়াতুল উলামা ও দারুল উলুম দেওবন্দ উভয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ রোকন। তিনি দেখে থাকবেন, কী ধরনের আলেম এই প্রতিষ্ঠানদ্বয় থেকে বের হচ্ছে। দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষার্থী, অথচ ইবারত বিশুদ্ধভাবে পড়তে পারে না।
'ইন্নামাল আমালু বিন নিয়্যাত'—এই প্রথম হাদীসটিই বিশুদ্ধভাবে পাঠ করতে পারে না। তরজমা করে ভুল। এই জাতীয় আলেমই কয়েক বৎসর যাবৎ বের হচ্ছে। আমার ধারণায় গত বিশ বৎসর যাবৎ এই অবক্ষয় স্পষ্টভাবে দৃশ্যগোচর হচ্ছে। অথচ এই জাতীয় আলেমরাই অভিযোগ করে যে, যুগ এখন আমাদের নেই। আমাদের পিতা-মাতা মাদরাসায় পড়িয়ে আমাদের জীবন বরবাদ করে দিয়েছে। আমি বলছি যে, আজও এরূপ ব্যক্তি আছেন যিনি কোন বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন আর যেখানে আছেন সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে আছেন। অতএব যদি কেউ কোন বিষয়ে যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্য অর্জন করে নেয় তবে অর্থনৈতিক সঙ্কট সহ তার সব ধরণের পেরেশানী দূর হয়ে যাবে। যদি কারও ক্ষেত্রে এরপরও অর্থনৈতিক সঙ্কট ও পেরেশানীর বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় তবে বুঝতে হবে তার মধ্যে অন্য কোন পারিপার্শ্বিক দুর্বলতা বিদ্যমান। কিছুক্ষণ পূর্বে মাওলানার মজলিসে আমি বলছিলাম যে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে আমি দারুল উলুম মাজাহিরুল উলুমে বয়ান করেছি। সেখানে আমি বলেছিলাম যে, কোন যোগ্য ও পণ্ডিত ব্যক্তি সম্পর্কে যদি তোমরা শোন অথবা ইতিহাসে পাঠ কর যে, তিনি জীবনে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁর মূল্যায়ন কেউ করেনি, তাহলে নিশ্চিত বিশ্বাস কর যে, তাঁর মধ্যে কোন দুর্বলতা ছিল, তাঁর মধ্যে কোন ধরণের পাগলামী ছিল, তাঁর নাক উঁচু ছিল, তাঁর মধ্যে অহংকার ছিল, গালিগালাজ করত, দুর্ব্যবহার করত ইত্যাদি কোন না কোন মন্দ স্বভাব তাঁর মধ্যে ছিল। ফলে মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হতে পারেনি। নতুবা আমি এটা মানি না যে, কোন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি—যিনি সু-স্বভাবের অধিকারী, সঙ্গতিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের অধিকারী—ধ্বংস ও বরবাদ হয়ে গেছেন, তাঁর কেউ মূল্যায়ন করেনি।
📄 প্রকৃতপক্ষে পরিশ্রমের অভাব
আমি আরও একটা কথা বলতে চাই। কথাটা আমার মত ব্যক্তির মুখ থেকে শুনলে আপনারা অবাক হবেন বৈ কি। আপনারা জানেন, আমাদের নাদওয়াতুল উলামার ভিত্তিই স্থাপিত হয়েছে পাঠ্যসূচি সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে। এর প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেব (রহ.) প্রাচীন পাঠ্যসূচি অনুযায়ী শিক্ষাগ্রহণ করেই বিশাল ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। প্রাচীন পাঠ্যসূচিও যে পণ্ডিত ও যোগ্য আলেম তৈরি করতে পারে তিনি ছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনিই ছিলেন পাঠ্যসূচি সংস্কারের প্রবক্তা ও উদ্যোক্তা। আমরা পাঠ্যসূচি সংস্কারের পক্ষপাতি। মাওলানা মিন্নাতুল্লাহ সাহেবও এর সমর্থক। কিন্তু আমি আপনাদেরকে বলতে চাই—আসল বিষয় পাঠ্যসূচি নয়। বরং আসল বিষয় হচ্ছে মেহনত ও সাধনা এবং শিক্ষকবৃন্দের শিক্ষাদান। প্রাচীন পাঠ্যসূচি অনুযায়ী শিক্ষাগ্রহণ করেও ঐসব ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছেন নতুন পাঠ্যসূচি অনুযায়ী শিক্ষাগ্রহণ করে যাদের ন্যায় ব্যক্তিত্ব এখন তৈরি হচ্ছে না। তাহলে বিষয়টা কী? সমস্যা কোথায়? অথচ এটা যথোচিত সত্য যে, প্রাচীন পাঠ্যসূচির তুলনায় নতুন পাঠ্যসূচি অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠ।
'মাকামাতে হারীরী' ও 'নাফহাতুল ইয়ামান' অপেক্ষা গদ্য সাহিত্যের আর কোন উত্তম কিতাব ছিল না, যার দ্বারা ভাষা ও সাহিত্যের বিশুদ্ধ ও উন্নত রুচি সৃষ্টি হতে পারত, মনের ভাব প্রকাশের যথোপযুক্ত যোগ্যতা সৃষ্টি হতে পারত তখন তো এইরূপ বড় বড় ব্যক্তি তৈরি হয়েছেন যাঁরা অনন্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। আল্লামা যাবিদী সৃষ্টি হয়েছেন, মাওলানা গোলাম আলী বুলগেরামী সৃষ্টি হয়েছেন, শায়খ মুহসিন বিন ইয়াহইয়া সৃষ্টি হয়েছেন, নবাব সিদ্দীক হাসান খান সৃষ্টি হয়েছেন, মাওলানা সদরুদ্দীন আযুরদাহ সৃষ্টি হয়েছেন।
আর আজ গদ্য সাহিত্যের চমৎকার সব কিতাব পড়ানো হচ্ছে কিন্তু সেই রকম ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না। পাঠ্যসূচিই যদি এক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করত তাহলে ঐরূপ ব্যক্তি সৃষ্টি হওয়া অনিবার্য ছিল। আমাদেরকেই দেখুন। মাওলানা মাসউদ আলম নদভী সাহেব আমাদের সঙ্গী ছিলেন, বন্ধু ছিলেন। তিনি আরবী সাহিত্যে অত্যন্ত পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। কিন্তু তিনি পড়েছিলেন কী? এই মাকামাতে হারীরী ইত্যাদি গ্রন্থই পড়েছিলেন। আমিও ছাত্র জীবনে মাকামাতে হারীরী পড়েছি। অন্যান্য কিতাবও পড়েছি। আসলে এক্ষেত্রে শিক্ষকবৃন্দের মেহনতের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। সঙ্গে ছিল ছাত্রদের মেহনত ও অক্লান্ত পরিশ্রম। পাঠ্যগ্রন্থ শুধু সহায়ক ছিল মাত্র। আমি এখনও পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের পক্ষে। তবে শুধু পাঠ্যসূচি পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের পরিশ্রম অত্যাবশ্যক।
📄 আসল কথা
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! আসল ব্যাপার হল আপনারা মেহনত ও পরিশ্রম ত্যাগ করেছেন। আপনাদের মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা নেই, প্রতিযোগিতার স্পৃহা নেই। আপনারা কোন কিছুতে যোগ্যতা অর্জন এবং নিজের মধ্যে শিক্ষকতার শক্তি সৃষ্টি করণকে গর্বের বিষয় বলে মনে করেন না। অথচ আমাদের পূর্বসুরীগণ মুদাররেসী ও শিক্ষকতার মোকাবেলায় বাদশাহী গ্রহণ করতেও প্রস্তুত ছিলেন না। শিক্ষকতাকে তাঁরা এরূপ সম্মানজনক পেশা বলে গণ্য করতেন যে, মন্ত্রীত্বকেও পায়ে ঠেলে দিতে কুণ্ঠিত হতেন না। কেউ কেউ এরূপ ছিলেন যে, তিনি মন্ত্রী অথচ শিক্ষকতাও করছেন। লাক্ষ্ণৌতে মন্ত্রী আসাফদৌল্লার যুগে, সাআদত আলী খানের যুগে দিনে তাঁরা মন্ত্রণালয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, রাতে শিক্ষকতা করতেন। এ রকম বহু দৃষ্টান্ত আপনারা পাবেন। আল্লামা তাফাজ্জল হুসাইন নামে ইলমে রিয়াজীর (গণিতশাস্ত্র) একজন পণ্ডিত আলেম ছিলেন। তিনি মন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন। কিন্তু শিক্ষাদান কার্য এরূপভাবে করতেন, মনে হত তিনি শুধুই শিক্ষক। এ রকম অনেক দৃষ্টান্ত আছে। অথচ আমাদের ও আপনাদের দৃষ্টিতে শিক্ষক হওয়া গর্বের বিষয় থাকেনি। বরং আমরা শিক্ষক হতে লজ্জাবোধ করি। যা হোক প্রথম কথা হল, আপনারা অক্লান্ত পরিশ্রম করুন, যোগ্যতা সৃষ্টি করুন, কোন এক শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করুন।
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ। আজ মাদরাসাসমূহে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা, যাকে ক্রাইসিস বা সঙ্কট বলা চলে তা হল মুদাররিস সমস্যা। আজ মুদাররিস বা শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা এত বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বসে আছি, কয়েকটি বিষয়ের দুই-তিনজন শিক্ষক আমাদের প্রয়োজন, কিন্তু আমরা শিক্ষক পাচ্ছি না। দারুল উলূম দেওবন্দ শায়খুল হাদীস পাচ্ছে না। এটা এখন আর গোপন বিষয় নয় যে, দারুল উলুম দেওবন্দে শায়খুল হাদীস সমস্যার যথোপযুক্ত সমাধান হয়নি। হযরত মাওলানা মিন্নাতুল্লাহ সাহেব দারুল উলূম দেওবন্দের একজন শক্তিশালী রোকন। শায়খুল হাদীস সমস্যার সমাধানকল্পে গঠিত বিশেষ কমিটির তিনি একজন সদস্য। সমস্যাটির যে সমাধান করা হয়েছে তিনি তাতে সন্তুষ্ট নন। আমিও সন্তুষ্ট নই। কেউই সন্তুষ্ট নয়। অর্থাৎ দারুল উলূমের মান অনুযায়ী সমস্যাটির সমাধান হয়নি। কোন শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। এইজন্য আমি বলছি এই কাজটি আপনারা করুন। আপনারা আদৌ এটা ভাববেন না যে, আপনারা অখ্যাত এক কোণে পড়ে আছেন। দেওবন্দে পড়ছেন না বা নাদওয়াতুল উলামায় পড়ছেন না—এই সঙ্কোচবোধ যেন আপনাদের না থাকে। এখানে থেকেই আপনারা যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করুন। দেওবন্দ আপনার মুখাপেক্ষী হবে। নাদওয়াতুল উলামা আপনাকে তালাশ করবে, আপনাকে পেতে চাইবে। আমি আপনাদেরকে লিখে দিতে পারি, আপনারা কোন বিষয়ে যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্য অর্জন করলে দেওবন্দে আপনাদের জন্য স্থান সংরক্ষিত, নাদওয়াতুল উলামায় আপনাদের জন্য জায়গা সংরক্ষিত।