📄 শুধু প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপর ভর করে কোন প্রতিষ্ঠান জীবিত থাকতে পারে না
পৃথিবীতে কোন প্রতিষ্ঠানই শুধু এই কারণে অস্তিত্বশীল থাকতে পারে না যে, তা আজ থেকে শত বা দ্বিশত বর্ষ পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আর তা এই এই কল্যাণকর কাজ করেছে। শুধু ইতিহাসের উপর ভর করে, শুধু ইতিহাস চর্বণ করে কোন প্রতিষ্ঠান, কোন দর্শন, কোন মতাদর্শ না টিকে থেকেছে, না টিকে থাকবে। আপনি যদি কোন প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য এবং তার প্রতি মানুষের সুদৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠানটির শুধু অতীত ইতিহাস তুলে ধরেন আর বলেন যে, প্রতিষ্ঠানটি অতীতে এই এই কল্যাণমূলক সেবা প্রদান করেছে, তাহলে মানুষ তাতে আদৌ কর্ণপাত করবে না। আজ যদি কেউ নীরবও থাকে তবে ভবিষ্যতে কোনদিন তার ভিতর থেকে জোরালো ও শক্তিশালী দাবি উত্থাপিত হবে যে, প্রতিষ্ঠানটিকে বিলুপ্ত করে দেওয়া উচিত।
মহাজগতের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আল্লাহ তাআলার যে চিরন্তন রীতি অব্যাহতভাবে কার্যকর রয়েছে তা আমরা কুরআন কারীম ও ইতিহাস অধ্যয়ন করে জানতে পারি। সে রীতি হল— অধিকতর কল্যাণকর বস্তুর বিদ্যমানতা ও অব্যাহত অস্তিত্বের রীতি। অর্থাৎ যা অধিকতর কল্যাণময় তাই অব্যাহতভাবে অস্তিত্বশীল থাকে। অবশ্য বর্তমান পৃথিবী যে নিয়ম ও রীতির কথা বলে তা হল যোগ্যতর বস্তুর অস্তিত্বশীলতার রীতি। অর্থাৎ যে বস্তু অধিকতর যোগ্য তাই অব্যাহতভাবে অস্তিত্বশীল থাকে। এই রীতিকে বলা হয় Survival of the fittest। কিন্তু বস্তুতপক্ষে কুরআন কারীম দ্বারা যা জানা যায় তা হল 'কল্যাণকর বস্তুর অব্যাহত অস্তিত্বশীলতা' রীতি। স্পষ্ট ভাষায় কুরআন কারীমে রীতিটির কথা ব্যক্ত হয়েছে। আপনারা আয়াতটি বহুবার পড়ে থাকবেন এবং তার তাফসীরও দেখে থাকবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ كَذَالِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
'যা ফেনা ও জঞ্জাল তা ভেসে চলে যায়, আর যা মানুষের উপকার করে তা জমিতে থেকে যায়।' (সূরা রাদ ১৭)
যে বস্তুতে কোন কল্যাণ সাধনের যোগ্যতা নেই, যার মধ্যে কোন পয়গাম ও বার্তা নেই, যা কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না, মানুষের অস্তিত্ব, উৎকর্ষ লাভ, মানুষের উন্নতি যার উপর নির্ভরশীল নয় কুরআন মাজীদ তাকে زَبَد (ফেনা ও জঞ্জাল) বলে আখ্যায়িত করেছে। শব্দটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গভীর তাৎপর্যবহ। زَبَد বলা হয় ফেনাকে। অর্থাৎ সাগরের ঐ ফেনা যার মধ্যে অস্তিত্বের কোন উপাদান নাই, স্থিরতা ও দৃঢ়তার কোন যোগ্যতা নাই। তা সাগরের উত্তালতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র, উত্তালতার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ যা সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে স্থায়িত্ব থাকে না। ফুলে ফেঁপে ওঠা এক বস্তু, যার মধ্যে শুধু বাতাস পূর্ণ থাকে অথবা বলা যায়, ফেনা হল নিচের জঞ্জাল ও আবর্জনা যা বৃষ্টির পানির উপর ভেসে ওঠে। অতঃপর ভেসে যায় কিংবা কোন জায়গায় যেয়ে কোন কিছুতে আটকে যায়। তার মধ্যে মানুষের কল্যাণ সাধনের কোন উপাদান বিদ্যমান থাকে না। তার অস্তিত্ব স্থায়ী হয় না। কারণ তার মধ্যে অস্তিত্বের স্থায়িত্বের কোন যোগ্যতা নাই। আল্লাহ তাআলার প্রতিপালন নীতি তার অস্তিত্বের স্থায়িত্বকে অনুমোদন দেয় না। কারণ এই জগতের ঠিক ততটুকু ব্যাপ্তি ও উদারতা নেই যতটুকু থাকলে যাবাদ বা ফেনার অস্তিত্ব বহাল থাকার সুযোগ হতে পারত। যদি সাগরের ফেনা বা পতিত বৃষ্টির সঞ্চিত পানির উপরিভাগের জঞ্জালের অস্তিত্বও বহাল থাকত, তাহলে কল্যাণকর অনেক কিছুর অস্তিত্ব বহাল থাকা মুশকিল হয়ে যেত। কল্যাণকর বস্তুর অস্তিত্ব বহাল থাকার সুযোগ হতো না।
তো আমাদের মাদরাসাগুলো যদি নিজেদের অস্তিত্বকে বহাল রাখতে চায়, জীবন জগতে নিজের জন্য স্থান সৃষ্টি করে নিতে চায়, জীবনের অধিকার প্রমাণ করতে চায় তাহলে তার নিজের মধ্যে মানুষের কল্যাণ সাধনের উপযোগিতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে যে, জীবন জগতের জন্য মাদরাসা নামক প্রতিষ্ঠানও অপরিহার্য, মাদরাসা ব্যতীত মনুষ্য জীবন অকার্যকর, অচল। কারণ যুগ যে ভাষাকে বোঝে এবং প্রত্যেক যুগেই যে ভাষা বুঝে এসেছে সে ভাষার জন্য ভাষ্যকারের দরকার নেই। আপনি যদি আরবীতে বলেন, তাও যুগ বুঝে নেবে, ইংরেজীতে বললেও বুঝে নেবে, নীরব ভাষাতে বললেও বুঝে নেবে। একজন বোবাও যদি তা বলে এবং প্রকাশ করে যুগ তাও বুঝে নেবে। যুগ যে ভাষাকে বোঝে তা হল কল্যাণের ভাষা, উপকারীর উপকারিতার ভাষা, জীবন-অধিকারের ভাষা। ইকবাল যেমনটা বলেছেন, জীবন হল অধিকারের নাম। উপযোগিতার নাম। জীবন কারও অনুকম্পা নয়, জীবন অর্জনের বিষয়। তা অর্জন করে নিতে হয়। আপনি জীবন-অধিকার, জীবন-উপযোগিতা সৃষ্টি করুন। সমগ্র জগত তা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবে। দুই দুইটি বৃহৎ যুদ্ধের পরও জার্মানী তার অস্তিত্ব হারায়নি, কারণ সে তার উপযোগিতার প্রমাণ দিয়েছে। ফলে কেউ তাকে চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেনি। অনেক জাতিই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু অনেক জাতিই বার বার পরাজিত হয়েও টিকে আছে। মুসলমানরা তাতারীদের বর্বর হামলার শিকার হয়েছিল। তাতারীরা মুসলমানদের মধ্যে যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছিল, বোধ করি পৃথিবীর অন্য কোন জাতিই ঐরূপ গণহত্যার শিকার কখনও হয়নি। কিন্তু যেহেতু মুসলিম জাতির মধ্যে যা মানুষের কল্যাণ সাধন করে (مَا يَنْفَعُ النَّاسَ)—এর উপাদান মওজুদ ছিল, তারা একটি আদর্শের ধারক ছিল, তাদের মধ্যে ছিল জীবন জগতের জন্য প্রাণবন্ত পয়গাম ও বার্তা; তাই তারা পুনরায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছিল। তাদের সামনে তাতারীরা অবশেষে অবনত হতে বাধ্য হয়েছিল। প্রথমে মুসলমানরা তাতারীদের তরবারীর নিচে শির দিয়েছে, তাদের কাছে পরাস্ত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমানদের কল্যাণ-সাধন-গুণের সামনে, তাদের আদর্শ ও পয়গামের সামনে তাতারীদের তরবারীকে, তাদের মন-মস্তিষ্ক ও হৃদয়কে অবনত হতে হয়েছে।
📄 হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আলী মুঙ্গেরীর দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! আজ আমাদের দ্বীনী মাদরাসাসমূহের জন্য পথ একটিই। আর তা হল জীবনের অধিকার প্রমাণ করা। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য প্রমাণ করা। এটা প্রমাণ করা যে, মাদরাসাগুলো না থাকলে মানবজীবন অর্থহীন হয়ে পড়বে অথবা জীবন হবে ক্ষয়প্রাপ্ত কিংবা সৃষ্টি হবে বিশাল শূন্যতা, যে শূন্যতা আর কোন কিছু পূরণ করতে পারবে না। অনুকম্পা লাভের আবেদন পৃথিবীতে না কখনও গৃহীত হয়েছে, না তা গৃহীত হওয়ার মত বিষয়। যুগ তো সংখ্যাগরিষ্ঠদের। সংখ্যাগরিষ্ঠতাও এইরূপ যে, তা কমিউনিজমের মত অখাদ্যকে গলাধঃকরণ করেছে। সুতরাং এখন একথা বলার আদৌ কোন অবকাশ নেই যে, ভাই! আমাদেরকে তো অমুক শাসক উচ্ছেদ করেনি। আমাদেরকে রেখে দিয়েছিল, অমুক যুগে আমরা টিকে ছিলাম। অতএব আপনারাও আমাদেরকে রেখে দিন। তদ্রূপ একথা বলারও কোন সুযোগ নেই যে, আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলাম, আমাদেরও টিকে থাকার অধিকার আছে। এই জাতীয় করুণা ভিক্ষাকে দুনিয়া এখন পাত্তা দিতে রাজী নয়।
বরং আপনারা প্রমাণ করুন যে, আপনারা এমন এক ময়দানে ও ক্ষেত্রে অবস্থান করছেন, জীবন জগতের জন্য প্রয়োজনীয় এমন স্থানে আপনাদের অবস্থান যে স্থান আপনারা ত্যাগ করলে তাকে সামাল দেওয়ার মত আর কেউ নেই। আপনারা প্রমাণ করুন যে, চারিত্রিক গুণাবলীর ময়দানে আপনাদের বিচরণ। আপনারা জনসেবার ময়দানে অবস্থান করছেন, আপনারা জ্ঞানের উচ্চমার্গে অবস্থান করছেন, আপনারা জ্ঞান গবেষণার ময়দানে অবস্থান করছেন। প্রমাণ করুন, আপনারা যদি ঐ ক্ষেত্রগুলো থেকে সরে আসেন বা আপনাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে জীবন জগতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে সেই শূন্যতাকে না কোন বিশ্ববিদ্যালয়, না কোন জ্ঞানকেন্দ্র, না কোন একাডেমী পূরণ করতে পারবে, না অন্য কোন প্রচেষ্টা সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে। এটাই আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত সেই চিরন্তন রীতি, যা কুরআন কারীমে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে—
فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْকُثُ فِي الْأَرْضِ كَذَالِكَ يَضْرিবُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
'যা ফেনা ও জঞ্জাল তা ভেসে চলে যায়, আর যা মানুষের কল্যাণ সাধন করে তা থেকে যায়। এইভাবেই আল্লাহ উপমা বর্ণনা করেন।' (সূরা রাদ ১৭)
প্রথম কথা তো এই যে, বর্তমানে আমাদের মাদরাসাগুলো শুধু মুসলমানদের আবেগ, তাদের দ্বীনপ্রিয়তা, ইসলামের প্রতি তাদের ভালবাসা, দ্বীন ও শরীয়তের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ অথবা কিছু আলেমের ত্যাগ ও কুরবানী বা কিছু আলেমের বুযুর্গী ইত্যাদির উপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে না। একথা বলতে আমার অত্যন্ত যাতনা বোধ হচ্ছে, অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি কথাটা বলছি, কিন্তু তবুও কথাটি এই প্রতিষ্ঠানের প্রিয় ছাত্রদের সামনে প্রকাশ হওয়া উচিত বলে মনে করছি। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা যুগের গতিবিধি সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনিই তাঁর যুগে সর্বপ্রথম এই কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন যে, যুগ পরিবর্তিত হয়ে গেছে, যুগের বৈধ পরিবর্তনকে স্বীকার করে নেওয়া উচিত এবং যুগের জন্য নিজেকে কল্যাণকর বলে প্রমাণ করা উচিত।
হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরী (রহ.) কে আপনারা তরীকতের একজন শায়খ বলে জানেন। নিঃসন্দেহে তিনি একজন উঁচুস্তরের একজন শায়েখে তরীকত ছিলেন। ছিলেন বড় মাপের ছাহেবে নিসবত একজন বুযুর্গ। তাঁর সমকালীন বুযুর্গগণও একথার সাক্ষ্য দান করেছেন। তাঁর সম্পর্কে হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব (রহ.) যে মন্তব্য করেছেন তা অত্যন্ত উচ্চমানসম্পন্ন। তিনি বলেছেন, তাঁর উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু তার সঙ্গে আমি আরেকটু যোগ করে বলতে চাই, আল্লাহ তাআলা তাঁকে যে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা দান করেছিলেন, যে বিশুদ্ধ চেতনা ও উপলব্ধি দান করেছিলেন, যে নুর দান করেছিলেন তা লাভ করার সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই হয়। আল্লাহ তাআলা যাঁকে দিয়ে কাজ নিতে চান কেবল তাঁকেই এই জাতীয় গুণাবলী দান করেন। ইকবাল যা বলেছেন আমি তাঁকেই তার মূর্তপ্রতীক বলে মনে করি।
دو صد دانا در ایں محفل سخن گفت
سخن نازک تر از برگ سمن گفت
ولے با من بگو آں دیدہ ور کیست
کہ خارے دید ও احوالِ চমন گفت
এই মাহফিলে (তথা দুনিয়ার এই আসরে) দু'শ জ্ঞানীপণ্ডিত বক্তব্য পেশ করেছেন। তাঁরা চামেলীর পাপড়ির চেয়ে অধিক কোমল বক্তব্য পেশ করেছেন কিন্তু আমাকে বল, সেই চক্ষুষ্মান ব্যক্তি কে, যিনি কাঁটা দেখে বাগানের অবস্থা বলে দিয়েছেন?
📄 নাদওয়াতুল উলামার আন্দোলন চূড়ান্ত দ্বীনি দূরদর্শিতার পরিচায়ক
নাদওয়াতুল উলামার আন্দোলন কোন সাধারণ আন্দোলন নয়। এটা ছিল ঐ যুগে দ্বীনী দূরদর্শিতার নিদর্শন। আমি আপনাদেরকে হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরী (রহ.)-এর ছাত্র গণ্য করে আপনাদের সামনে কথা বলছি। জামেয়া রাহমানিয়া বা নাদওয়াতুল উলামা নয়, আমি হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরী (রহ.)-এর শিক্ষাশালার ছাত্র মনে করে আপনাদের সামনে এবং নাদওয়াতুল উলামার ছাত্রদের সামনে কথা বলি। দুই তিন দিন পূর্বে আমি নাদওয়াতুল উলামার ছাত্রদের সামনে কথা বলেছি আর আজ আপনাদের সামনে বলার সৌভাগ্য লাভ করেছি।
📄 করার মত দুটি কাজ
প্রিয় শিক্ষার্থী ভাইয়েরা! আপনারা দুইভাবে আপন উপযোগিতা প্রমাণ করতে পারেন এবং নিজেদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পারেন, জীবনের অধিকার সৃষ্টি করতে পারেন।
এক. অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রের মাধ্যমে।
দুই. বহির্জগতে কর্মক্ষেত্রের মাধ্যমে।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র হল— আপনারা জ্ঞান-গরিমায় পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা অর্জন করুন। কথাটি আমি একজন এরূপ বিশ্ব পর্যটক হিসাবে বলছি যার বিশ্ব পর্যটন সম্পর্কে মানপত্রেও ইঙ্গিত করা হয়েছে, হযরত আমীরে শরীয়তও বলেছেন। এটা আত্মপ্রশংসা নয়। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় বার বার বহির্দেশে গমনের সুযোগ আমার হয়েছে। শুধু গমন নয় বরং সেসব দেশের ঐসব মজলিসেও অংশগ্রহণ করার সুযোগ আমার হয়েছে শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার জন্য যেসব মজলিস অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বহির্দেশের এই জাতীয় কোন কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আমার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। কথাটি আমি এজন্য বললাম, যাতে আপনারা আমার এই আহ্বান ও অনুরোধকে মূল্যায়ন করেন। এটা কোন পথচারীর কথা নয় বরং এটা এমন এক ব্যক্তির কথা, যে ব্যক্তি ঐ সকল মজলিসে অংশগ্রহণ করেছে এবং পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে ঘুরে প্রভূত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আমি আপনাদেরকে বলছি যে, আপনারা ইলম ও জ্ঞানে পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করুন। যে কোন জ্ঞানই হোক তাতে পূর্ণাঙ্গতা অর্জনই কেবল আপনাদের জন্য কল্যাণকর। আপনারা যদি হতাশার শিকার হন এবং মনে করেন যে, আমরা—যদি আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জন করি, দ্বীনী ইলমে যোগ্যতা অর্জন করি তাতে আমাদের কী লাভ হবে? জঙ্গলে ময়ূরের নাচ কে দেখতে যায়? আমাদের এই দক্ষতার মূল্যায়ন কে করবে? আমি বলব, আপনাদের এই জাতীয় চিন্তা আপনাদের অজ্ঞতার পরিায়ক। আমি আপনাদেরকে বলছি, এখান থেকে নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা পর্যন্ত, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র আপনাদের এই ইলমের কদর ও মর্যাদা আছে। সর্বত্র এর মূল্যায়ন আছে। তবে শর্ত একটাই।
তা হল পূর্ণ দক্ষতা ও যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা কাকে বলে? কয়েকটি শব্দ শিখে নেওয়ার নাম পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা নয়। 'শাদ্দ' আর 'বাদ্দ' এবং 'কানা' আর 'ইয়াকুনু'—এর নাম নয়। আপনি আরবী পড়তে পারেন এবং তা বুঝতে পারেন এতটুকুকে কেউ পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা বলে না। পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা তো বলে তাকে, যা অন্যের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পারে, শত্রুরাও যে যোগ্যতার স্বীকৃতি দান করতে বাধ্য হয়।
আমি আপনাদেরকে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে বলতে পারি, যুগ-পরিবর্তনের ধুয়া সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। যারা বলে, 'যুগ পরিবর্তিত হয়ে গেছে, আর তোমরা সেই পিছনেই পড়ে আছ, তোমরা কোথায় তোমাদের সময়ের অপচয় করছ? আরে ভাই! কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়তে, বিজ্ঞান পড়তে, ইংরেজী পড়তে, অর্থনীতি নিয়ে পড়তে, ফিজিক্স পড়তে, প্রযুক্তি বিজ্ঞানের জ্ঞান লাভ করতে ইত্যাদি ইত্যাদি; তারা প্রকৃতপক্ষে ধোঁকা দিচ্ছে। এসব কথা খাম-খেয়ালিমূলক ও নির্বুদ্ধিতাসুলভ বৈ নয়। আপনি যে কোন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা অর্জন করুন, নিজেকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে গড়ে তুলুন। দেখবেন, অতঃপর আপনার এই অভিযোগ থাকবে না যে, যুগ আমাদেরকে পাত্তা দিচ্ছে না, আমাদের জন্য কোন জায়গা নেই। দ্বীনী শিক্ষার যে অবমূল্যায়ন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন তা অযোগ্যতার কারণেই।