📘 উলামা তলাবা > 📄 দুইটি দল

📄 দুইটি দল


আমাদের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক রয়েছে। এক শ্রেণী মাদরাসা ও দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে হতাশ। তারা মাদরাসার কল্যাণকামিতাকে অস্বীকার করে। এই মাদরাসাগুলো কোন উদ্দেশ্যে চলছে এবং এগুলো সমাজের কী খেদমত ও সেবা করবে, এসব মাদরাসার দ্বারা আদৌ কোন লাভ হচ্ছে কিনা, বর্তমান যুগের উদ্দেশ্যে এসব মাদরাসার কোন বার্তা আছে কিনা, সমাজের কল্যাণ সাধনের কোন উপাদান এসব মাদরাসা ধারণ করে কিনা, এসব মাদরাসা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মত যোগ্যতা রাখে কিনা, এ ব্যাপারে তারা সন্দিহান।

অপর শ্রেণী উদাসীনতার নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তারা বাস্তবতা নিয়ে আদৌ ভাবে না। তারা এই যুগকে চারশত এবং ছয়শত বৎসর পূর্বের যুগ বলে মনে করে। মনে করে, এখনও জামেয়া নিযামিয়া বাগদাদের যুগ চলছে। তারা যুগের পরিবর্তন সম্পর্কে কোন ধারণা রাখে না। ধারণা রাখলেও নিজেকে যুগ হতে, যুগের চাহিদা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ব্যাপারটা ঠিক উট পাখীর ন্যায়। উটপাখী বালুর মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। এরপর তার আশেপাশে কী ঘটে যাচ্ছে তা সে দেখে না। যেহেতু সে কিছুই দেখে না তাই মনে করে, কিছুই ঘটছে না। এই উভয় শ্রেণী দুই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে। উভয়েই প্রান্তিকতার শিকার। আমাদের দরসী ভাষায় যাকে বলা যায়—

على طرفي الأخير

এদের কোন শ্রেণীই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সেই অনুযায়ী কাজ করছে না। এদের কারও পথই সরল পথ নয়।

📘 উলামা তলাবা > 📄 যুগ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে

📄 যুগ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে


আপনাদের সামনে কোন রাখ-ঢাকের কথা নয় এবং এর জন্য কোন গবেষণা ও মেধা খরচের প্রয়োজন পড়ে না। কথাটি হল যুগ অত্যন্ত সংবেদনশীল, যুগ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, বরং বলা যায় পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবে যতটুকু পরিবর্তন হয়েছে ততটুকুতে যুগ স্থির নাই বরং অবিরাম পরিবর্তন হয়েই চলেছে। অতএব মাদরাসার ছাত্রদের উল্লেখিত শ্রেণীদ্বয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে, ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত, তাদের করণীয় কী, তাদের ভবিষ্যত কোন পর্যায়ে, তারা কিরূপ খেদমত আঞ্জাম দিতে পারবে?

📘 উলামা তলাবা > 📄 দ্বীন কোন মিউজিয়াম বা যাদুঘর নয়

📄 দ্বীন কোন মিউজিয়াম বা যাদুঘর নয়


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! আপনারা বড় বড় গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করার যোগ্যতা রাখেন। হয়তো সেগুলো অধ্যয়ন করে থাকবেন অথবা ভবিষ্যতে অধ্যয়ন করবেন। এই বিষয়ে বড় বড় উন্নত মানের গ্রন্থাদি রয়েছে, লেখকগণ শাস্ত্র আকারে গবেষণামূলক এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন যে, কোন মতাদর্শ শুধু তার অতীত ইতিহাস, শুধু শক্তি, শুধু জিদ ও অস্বীকৃতি নিয়ে টিকে থাকতে পারে না। যত উপযুক্ত মতাদর্শই হোক, তাকে শুধু ইতিহাসের মর্যাদা দিয়ে, পবিত্র উত্তরাধিকার রূপে কিংবা প্রাচীন নিদর্শনরূপে টিকিয়ে রাখা যায় না। বড় বড় শহরে আপনারা প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণ কেন্দ্র দেখে থাকবেন, জীবজন্তুর যাদুঘর যেমন আছে, তেমনি জড় পদার্থের যাদুঘরও আছে। আপনাদের প্রদেশের রাজধানী পাটনাতেও এরূপ যাদুঘর থেকে থাকবে। এইসব প্রাচীন নিদর্শনগুলোকে শুধু সংরক্ষণই নয়, বরং এগুলোকে হৃদয় দিয়ে আগলে রাখা হয় আর এর জন্য বিশাল ও বিস্তীর্ণ জায়গা-জমি বরাদ্দ করা হয়, সরকারের অর্থ বাজেটের এক বিরাট অংশ এর পিছনে ব্যয় করা হয়। এইসবই যথাস্থানে যথার্থ। কিন্তু এর মূল্য কতটুকু? দর্শনযোগ্য, জীবনসংশ্লিষ্টতাবর্জিত বিনোদনের একটি লাভ-লোকসানহীন মাধ্যম ব্যতীত এগুলো আর কিছু নয়। জীবনের জন্য অপরিহার্য কোন অনুষঙ্গরূপে এগুলোকে সংরক্ষণ করা হয় তা নয়। এসব যাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ কোন সেবা, পরিষেবা আঞ্জাম দিচ্ছে এজন্য এগুলোকে সংরক্ষণ করা হয় তাও নয়। বরং শুধু এজন্য যে, মানুষের ব্যস্ত জীবনে কখনও কখনও বিনোদনের প্রয়োজন পড়ে, আর এগুলো বিনোদনের একটি মাধ্যম। তাছাড়া এসব প্রাচীন নিদর্শনাবলী নিয়ে গর্ব করার সুযোগ পাওয়া যায়। কারণ তা প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক। কোন জাতির, কোন দেশের অতীত সভ্যতার এগুলো একটি বড় নিদর্শন। শুধু এসব কারণেই এগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়। যদি এসব নিদর্শনাবলীর মধ্যে বুদ্ধি ও চেতনা বিদ্যমান থাকত অথবা এসব নিদর্শনাবলী যে সকল অতীত মানুষগুলোর সাথে সম্পৃক্ত তারা যদি জীবিত থাকত তাহলে নিশ্চয়ই তারা এই সংরক্ষণ কর্মকে সাধুবাদ জানাত না।

📘 উলামা তলাবা > 📄 এই পজিশনকে কোন জীবন্ত জাতি, কোন বার্তাবাহক জাতি গ্রহণ করে নিতে পারে না

📄 এই পজিশনকে কোন জীবন্ত জাতি, কোন বার্তাবাহক জাতি গ্রহণ করে নিতে পারে না


কোন জীবন্ত জাতি— যারা কোন মতাদর্শের ধারক, যাদের একটি অবস্থান ও মর্যাদা আছে, যারা কোন সত্যকে দৃঢ়ভাবে লালন করে থাকে এবং কোন অসত্যকে প্রত্যাখ্যান করে থাকে, যাদের একটি সুনির্দিষ্ট পথ আছে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা আলো ও চক্ষু দান করেছেন, যারা কিছু বিষয়কে ভ্রান্ত এবং কিছু বিষয়কে সঠিক বলে মনে করে— এই পজিশনকে গ্রহণ করে নিতে পারে না। তারা তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার সীমাবদ্ধতাকে এবং যেমন করে প্রাচীন ফারাও সম্রাটদের লাশকে মমি করে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তেমনি তাদেরকে ক্ষতিকর নয় মনে করে কোন জায়গায় নিরাপদে থাকতে দেওয়ার সুযোগ দানকে মেনে নিতে পারে না।

ইংরেজ জাতির কাছে মিউজিয়ামের যত অধিক গুরুত্ব রয়েছে তত গুরুত্ব অন্য জাতির কাছে নাই। এই কারণে পৃথিবীর অন্য কোথাও এত সংখ্যক মিউজিয়াম নেই যত সংখ্যক আছে লন্ডন শহরে। তো যারা দ্বীনী মাদরাসাগুলোর পক্ষে এই বলে ওকালতি ও সুপারিশ করে যে, এই মাদরাসাগুলোকে প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন স্বরূপ মিউজিয়ামরূপে টিকিয়ে রাখা দরকার তাদের এই কথাকে অন্ততপক্ষে আমি গ্রহণ করে নিতে প্রস্তুত নই। আমি মনে করি, হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.) এবং হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেব মুঙ্গেরী যে মতাদর্শের ওকালতি করেছিলেন এবং যে জন্য নাদওয়াতুল উলামা এবং দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, যে মতাদর্শের সাথে আমাদের সকলেই সম্পৃক্ত তার ভিত্তি কখনই এর উপর ছিল না। এটা দয়া কিংবা অনুকম্পা ভিক্ষা নয়। কোনরূপ করুণা প্রার্থনা নয়। এরূপ নয় যে, শহরে জনবসতি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হওয়ার কারণে স্থান সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করা সত্ত্বেও, গৃহ নির্মাণের জন্য স্থানাভাব প্রকট হওয়া সত্ত্বেও কিছু স্থান তো কবরস্থানের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। অদ্রূপ মাদরাসার জন্যও কিছু জায়গা না হয় ছেড়ে দেওয়া হল, তাতে আপনাদের ও শহরবাসীদের কিইবা আসে-যায়। মাদরাসা সম্পর্কে এইরূপ ধারণা পোষণ এবং মাদরাসাকে এইরূপ পর্যায়ে অবনমনকে অন্ততপক্ষে আমরা গ্রহণ করে নিতে পারি না।

মোটকথা, একদল তো ধারণা পোষণ করে যে, এই মাদরাসাগুলো তাদের প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলেছে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যোগ্যতা তাদের অবশিষ্ট নেই। এখন শুধু প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক হিসাবে এগুলোকে টিকিয়ে রাখা যায়।

আমি আপনাদেরকে বলছিলাম যে, প্রথমত আমি মাদরাসার এই পজিশনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নই। দ্বিতীয়ত পৃথিবীতে কোন কিছু যদি এই পজিশনে চলে আসে, কোন কিছু যদি নিজের জন্য এই পজিশনকে গ্রহণ করে নেয়, তবে তার অস্তিত্ব রক্ষার সুযোগ বেশি একটা থাকে না। কবরস্থানকে বর্তমানে কিছু লোক যদি টিকিয়ে রাখেও, তবে ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখবে না। আপনারা দেখুন, দিল্লীতে খাজা বাকী বিল্লাহর কবরস্থান কত বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে ছিল। যারা তাঁর কবরস্থান দেখেছেন তাঁদের অনেকেই এখনও জীবিত আছেন। আমি যখন প্রথম দিল্লী যাই তখন তাঁর কবরস্থানটিকে দেখেছিলাম বিস্তীর্ণ এক ময়দানরূপে। হাজার হাজার কবর সেখানে ছিল। কিন্তু এখন সেসব কবরের কোন চিহ্ন নেই। এখন শুধু খাজা বাকী বিল্লাহর মাজার এবং তৎসংলগ্ন সামান্য কিছু জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে। অবশিষ্ট সব জায়গায়ই আবাদ হয়ে গেছে। এর কারণ হল, শহরের প্রয়োজন। শহরের বিভিন্ন প্রয়োজন দিন দিন বৃদ্ধি পায়। শহরের প্রয়োজনকে জীবন জগতের অতি বাস্তবতা বলে মনে করা হয়। আর কবরস্থানজাতীয় বিষয়গুলোকে নিছক বিবেচনাযোগ্য বিষয় বলে মনে করা হয়, যা বাস্তবতার মোকাবেলা করতে পারে না। অতএব প্রথমত মাদরাসাগুলোর বর্ণিত পজিশন যথাযথ নয়। দ্বিতীয়ত ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এইসব বিষয়গুলোকে চলমান ও বাস্তবমুখী জীবন— যে জীবন কোন কিছুকে গ্রহণ করে নিতে এবং নিজের অংশ থেকে তাকে কোন অংশ দিতে প্রস্তুত নয়— খুব বেশি দিন বরদাশত করে না, বেশি দিন টিকে থাকতে দেয় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00