📄 বলার মত অনেক কথাই আছে
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! এই আলোচনা সভায় আপনাদের উদ্দেশ্যে বলার মত অনেক কথা আছে। আপনারা ও আমরা সকলেই একই নৌকার আরোহী। বরং আমি মনে করি পৃথিবীতে যতগুলো দ্বীনী প্রতিষ্ঠান আছে, তা ভারতে হোক কিংবা মিসর ও সিরিয়ায়, মরক্কোতে হোক কিংবা আল-জাজাইর ও তিউনেশিয়ায় সকল দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীগণ একই নৌকার আরোহী। নৌকাটি বর্তমানে উত্তাল সাগরে পতিত। পানির ভয়াবহ চক্রাবর্তে নিপতিত। সাগরে তুফান উঠেছে। যে সকল বড় বড় জাহাজে জাহাজ রক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থাদি বিদ্যমান এবং যেগুলো সাগরের স্রোতের অনুকূলে চলছে, সেসব জাহাজও বর্তমানে সাগরের উত্তাল তরঙ্গে হাবুডুবু খাচ্ছে, সেগুলোও নিমজ্জনের আশঙ্কায় নিপতিত। সুতরাং আমাদের ও আপনাদের কথা তো বলাই বাহুল্য। কারণ আমরা চলছি বর্তমান স্রোতের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে। আমাদের জাহাজকে আমরা নিয়ে চলেছি স্রোতের উল্টো দিকে। অতএব আমাদের উচিত অত্যন্ত ধীর-স্থিরতার সাথে নিজেদের অবস্থা ও সমস্যা সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা।
📄 দুইটি দল
আমাদের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক রয়েছে। এক শ্রেণী মাদরাসা ও দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে হতাশ। তারা মাদরাসার কল্যাণকামিতাকে অস্বীকার করে। এই মাদরাসাগুলো কোন উদ্দেশ্যে চলছে এবং এগুলো সমাজের কী খেদমত ও সেবা করবে, এসব মাদরাসার দ্বারা আদৌ কোন লাভ হচ্ছে কিনা, বর্তমান যুগের উদ্দেশ্যে এসব মাদরাসার কোন বার্তা আছে কিনা, সমাজের কল্যাণ সাধনের কোন উপাদান এসব মাদরাসা ধারণ করে কিনা, এসব মাদরাসা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মত যোগ্যতা রাখে কিনা, এ ব্যাপারে তারা সন্দিহান।
অপর শ্রেণী উদাসীনতার নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তারা বাস্তবতা নিয়ে আদৌ ভাবে না। তারা এই যুগকে চারশত এবং ছয়শত বৎসর পূর্বের যুগ বলে মনে করে। মনে করে, এখনও জামেয়া নিযামিয়া বাগদাদের যুগ চলছে। তারা যুগের পরিবর্তন সম্পর্কে কোন ধারণা রাখে না। ধারণা রাখলেও নিজেকে যুগ হতে, যুগের চাহিদা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ব্যাপারটা ঠিক উট পাখীর ন্যায়। উটপাখী বালুর মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। এরপর তার আশেপাশে কী ঘটে যাচ্ছে তা সে দেখে না। যেহেতু সে কিছুই দেখে না তাই মনে করে, কিছুই ঘটছে না। এই উভয় শ্রেণী দুই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে। উভয়েই প্রান্তিকতার শিকার। আমাদের দরসী ভাষায় যাকে বলা যায়—
على طرفي الأخير
এদের কোন শ্রেণীই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সেই অনুযায়ী কাজ করছে না। এদের কারও পথই সরল পথ নয়।
📄 যুগ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে
আপনাদের সামনে কোন রাখ-ঢাকের কথা নয় এবং এর জন্য কোন গবেষণা ও মেধা খরচের প্রয়োজন পড়ে না। কথাটি হল যুগ অত্যন্ত সংবেদনশীল, যুগ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, বরং বলা যায় পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবে যতটুকু পরিবর্তন হয়েছে ততটুকুতে যুগ স্থির নাই বরং অবিরাম পরিবর্তন হয়েই চলেছে। অতএব মাদরাসার ছাত্রদের উল্লেখিত শ্রেণীদ্বয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে, ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত, তাদের করণীয় কী, তাদের ভবিষ্যত কোন পর্যায়ে, তারা কিরূপ খেদমত আঞ্জাম দিতে পারবে?
📄 দ্বীন কোন মিউজিয়াম বা যাদুঘর নয়
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! আপনারা বড় বড় গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করার যোগ্যতা রাখেন। হয়তো সেগুলো অধ্যয়ন করে থাকবেন অথবা ভবিষ্যতে অধ্যয়ন করবেন। এই বিষয়ে বড় বড় উন্নত মানের গ্রন্থাদি রয়েছে, লেখকগণ শাস্ত্র আকারে গবেষণামূলক এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন যে, কোন মতাদর্শ শুধু তার অতীত ইতিহাস, শুধু শক্তি, শুধু জিদ ও অস্বীকৃতি নিয়ে টিকে থাকতে পারে না। যত উপযুক্ত মতাদর্শই হোক, তাকে শুধু ইতিহাসের মর্যাদা দিয়ে, পবিত্র উত্তরাধিকার রূপে কিংবা প্রাচীন নিদর্শনরূপে টিকিয়ে রাখা যায় না। বড় বড় শহরে আপনারা প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণ কেন্দ্র দেখে থাকবেন, জীবজন্তুর যাদুঘর যেমন আছে, তেমনি জড় পদার্থের যাদুঘরও আছে। আপনাদের প্রদেশের রাজধানী পাটনাতেও এরূপ যাদুঘর থেকে থাকবে। এইসব প্রাচীন নিদর্শনগুলোকে শুধু সংরক্ষণই নয়, বরং এগুলোকে হৃদয় দিয়ে আগলে রাখা হয় আর এর জন্য বিশাল ও বিস্তীর্ণ জায়গা-জমি বরাদ্দ করা হয়, সরকারের অর্থ বাজেটের এক বিরাট অংশ এর পিছনে ব্যয় করা হয়। এইসবই যথাস্থানে যথার্থ। কিন্তু এর মূল্য কতটুকু? দর্শনযোগ্য, জীবনসংশ্লিষ্টতাবর্জিত বিনোদনের একটি লাভ-লোকসানহীন মাধ্যম ব্যতীত এগুলো আর কিছু নয়। জীবনের জন্য অপরিহার্য কোন অনুষঙ্গরূপে এগুলোকে সংরক্ষণ করা হয় তা নয়। এসব যাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ কোন সেবা, পরিষেবা আঞ্জাম দিচ্ছে এজন্য এগুলোকে সংরক্ষণ করা হয় তাও নয়। বরং শুধু এজন্য যে, মানুষের ব্যস্ত জীবনে কখনও কখনও বিনোদনের প্রয়োজন পড়ে, আর এগুলো বিনোদনের একটি মাধ্যম। তাছাড়া এসব প্রাচীন নিদর্শনাবলী নিয়ে গর্ব করার সুযোগ পাওয়া যায়। কারণ তা প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক। কোন জাতির, কোন দেশের অতীত সভ্যতার এগুলো একটি বড় নিদর্শন। শুধু এসব কারণেই এগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়। যদি এসব নিদর্শনাবলীর মধ্যে বুদ্ধি ও চেতনা বিদ্যমান থাকত অথবা এসব নিদর্শনাবলী যে সকল অতীত মানুষগুলোর সাথে সম্পৃক্ত তারা যদি জীবিত থাকত তাহলে নিশ্চয়ই তারা এই সংরক্ষণ কর্মকে সাধুবাদ জানাত না।