📘 উলামা তলাবা > 📄 হক্কানী উলামায়ে কেরামের কীর্তিগাঁথা

📄 হক্কানী উলামায়ে কেরামের কীর্তিগাঁথা


কিন্তু একথা হয়তো অনেকের মাথায় নেই যে, ভারতের আলেম সমাজ ও মাদরাসায় শিক্ষাপ্রাপ্তগণ তাঁদের ইলম ও জ্ঞান, চিন্তা ও বুদ্ধি, লেখনী ও যুক্তি দ্বারা ভারতে তো বটেই ভারতের বাইরেও খ্রিস্টবাদের প্রচারণামূলক আক্রমণকে রুখে দিয়েছেন। খ্রিস্টানদের রচিত মুসলমানদের অন্তরে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টিকারী লিটারেচারসমূহের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন। তাঁদের এই কর্ম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে এবং ইলম ও দ্বীনের কেন্দ্র দেশগুলো—যেখানে শতাব্দী প্রাচীন ও বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী লেখার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত রয়েছে—তাঁদের এই কর্মতৎপরতার সুফল স্বীকার করে নিয়েছে। আমরা ঐ সকল বিরল ও বিস্ময়কর লেখনীর কথা উল্লেখ করছি না যা ভারতের ইসলামী যুগে লিখিত হয়েছিল এবং আরবের জ্ঞানী-গুণীজন ও শাস্ত্রীয় ইমামগণ পর্যন্ত যেগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও নজরহীনতার স্বীকৃতি দান করেছেন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 মাওলানা রহমাতুল্লাহ কীরানবীর অবদান

📄 মাওলানা রহমাতুল্লাহ কীরানবীর অবদান


তন্মধ্যে হযরত মাওলানা রহমাতুল্লাহ কীরানবী (রহ.) [মৃত্যু ১৮৯১ ঈসায়ী ১৩০৮ হিজরী] এর লিখিত অনবদ্য কিতাব 'ইজহারে হক'-এর নাম উল্লেখযোগ্য। এই কিতাবে তিনি গণিতের ফলাফলের ন্যায় (যেমন দুইয়ে দুইয়ে চার হয়, চারে চারে আটই হয়) অকাট্যভাবে বর্তমান বাইবেলের বর্ণনাদিতে স্ব-বিরোধিতা ও পারস্পরিক সাংঘর্ষিকতা প্রমাণ করেছেন। তাঁর এই কিতাবের জবাব আজ পর্যন্ত খ্রিস্টান জগত ও গীর্জার পাদ্রী পুরোহিতরা দিতে পারেনি। আমি নিজে ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় লেখা দেখেছি যে, যত দিন পর্যন্ত এই কিতাবের প্রকাশনা ও প্রচার কার্য চালু থাকবে, তত দিন খ্রিস্টবাদের প্রচার কার্য সফল হতে পারবে না।

দ্বিতীয় কীর্তি হযরত মাওলানা শিবলী নুমানী (রহ.)-এর। মিসরের প্রসিদ্ধ খ্রিস্টান আলেম, ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক 'তারীখুত তামাদ্দুনিল ইসলামী' নামে একটি কিতাব লিখে প্রকাশ করেছিল। লেখক এই কিতাবে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুনিপুণভাবে তীব্র আক্রমণ করেছিল। কিতাবটি পড়লে ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে পাঠকের মস্তিষ্কে অনিবার্যভাবে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি হত। জীবনের এক উত্তম আদর্শ হওয়ার যোগ্যতা ইসলামের মধ্যে অনুপস্থিত বলে ধারণা হত। মাওলানা শিবলী নুমানী মরহুম এই কিতাবের উপযুক্ত ও দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে যেয়ে লিখলেন— الانتقাদ على التاريخ التمدن الاسلامي

আরবের উলামা সমাজ এমনকি আল্লামা সাইয়েদ রশীদ রেজা মরহুম কিতাবটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এরূপ একটি কিতাব লেখার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন। এইসব প্রতিরোধ ও জবাবমূলক লেখনী প্রচেষ্টা ছাড়াও ভারতের আলেম ও গবেষকগণের আরও কিছু লেখনী ও রচনামূলক কীর্তি রয়েছে, আরও কিছু গবেষণামূলক ও তুলনাধর্মী রচনা রয়েছে। আরব দেশসমূহেও যার দৃষ্টান্ত মেলা কঠিন। এখানে আমরা কয়েকটি লেখনী ও কিতাবের নাম উল্লেখ করছি।

মাওলানা শিবলী প্রণীত (الجزية في الاسلام) (ইসলামে কর ব্যবস্থা), মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর খুতবাতে মাদ্রাজ ও আরদুল কুরআন (ارض القرآن), মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদীর ইংরেজী ও উর্দু অনুবাদ ও তাফসীর। তাফসীরটিতে তিনি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণার আলোকে কুরআনের অসাধারণত্ব এবং অন্যান্য আসমানী গ্রন্থ অপেক্ষা কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর আরও একটি কিতাব আছে 'মুশকিলাতুল কুরআন' (مشكلات القرآن)। মাওলানা আবদুল বারী নদভী প্রণীত 'মাহযাব ও আকীদাত' ইত্যাদি।

আমাদের সামনে এই সত্যটি থাকা উচিত যে, ভারতের আলেম সমাজ কখনও ইসলামী বিশ্বের দেশসমূহের ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে রাখেননি। সেখানে উদ্ভুত ফেতনা, সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টিমূলক কর্মকাণ্ড এবং ধর্মহীনতা, আরব জাতীয়তাবাদের ন্যায় ভয়াবহ পরিণাম সৃষ্টিকারী ইসলামবিরোধী প্রচার-প্রচারণা ও দাওয়াতের ব্যাপারে কখনও উদাসীন থাকেননি। এই পর্যায়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার কৃতী সন্তান ও এখানে শিক্ষাপ্রাপ্ত আলেমগণ ঐ সকল বর্হিদেশীয় ফেতনাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ঐ সকল ফেতনা ছিল ইসলামের কেন্দ্রভূমি আরব বিশ্বে সন্দেহ ও সংশয় ও দোদুল্যমানতা সৃষ্টিকারী, খ্রিস্টবাদ, ইয়াহুদীবাদ ও ধর্মহীনতার পথ উন্মুক্তকারী।

📘 উলামা তলাবা > 📄 ইয়াহুদী পরিকল্পনা

📄 ইয়াহুদী পরিকল্পনা


বহু শত বৎসর যাবৎ ইয়াহুদীদের পরিকল্পনা হল গোটা বিশ্বকে দাবার কোট বানানো। যে দাবার কোটটিও থাকবে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। যে গুটিকে যেখানে চালতে চাইবে সেখানেই চালতে তারা সক্ষম হবে এইরূপ কোট। এই লক্ষ্য অর্জন করতে তারা নির্দয় ও নিষ্ঠুর হতে এবং মানবতাকে পদদলন করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। আর খ্রিস্টান জগত ফিলিস্তিনে ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ইয়াহুদীদের সাথে যৌথভাবে ঐ লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা পালন করছে। এখানে একজন আমেরিকান পণ্ডিত হ্যামুয়েল জ্যুয়েমার এর ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি পেশ করছি। খ্রিস্টবাদ প্রচারকদের একটি সম্মেলনে তিনি এই ভাষণ দিয়েছিলেন।

'প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে আমাদের কর্মতৎপরতার লক্ষ্য হবে মুসলমানদের নতুন প্রজন্ম। যারা মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে সক্ষম হবে। যাতে মুসলমানেরা নিজেদের পরিস্থিতি সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকে, আর আমাদের প্রচেষ্টা তাদেরকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ও টুকরো-টুকরো করে দেয়। ইসলামী দেশসমূহকে আমাদের এই নির্দিষ্ট কর্মতৎপরতাকে অন্যান্য সকল কর্মকাণ্ডের উপর প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ এই নতুন প্রজন্মের অন্তরে যদি ইসলাম-প্রীতি ও ইসলামের প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে ইসলাম পুনরায় তার নতুন যৌবন ফিরে পাবে। অতএব এমতাবস্থায় জরুরী হল মুসলমানদের নতুন প্রজন্মকে তাদের বিশ্বাস ও চেতনা বিন্দু থেকে বিচ্যুত ও সম্পর্কচ্ছিন্ন করে বহু দূরে নিয়ে যাওয়া এবং এটা করতে হবে তাদের চেতনা ও বিশ্বাসগত উৎকর্ষ পূর্ণতায় পৌঁছার পূর্বেই।'

সুধী! ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের যৌথ এই প্রচেষ্টার ফল ইতোমধ্যে উন্নত আরব দেশগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। চাক্ষুষ দৃষ্ট হচ্ছে। তাদের এই প্রচেষ্টার প্রাথমিক ফল এই হয়েছে যে, দ্বীনী মর্যাদাবোধ এবং ইসলামের উপর গর্ববোধ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্মের মাঝে দুর্বল ও বিরল হতে চলেছে এবং ক্ষমতাসীন ও শাসকবর্গের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ধর্মহীনতা, অবিশ্বাস, পাশ্চাত্য সভ্যতা ও পাশ্চাত্য শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের প্রেরণা ও শাহাদত লাভের আকাঙ্ক্ষা তো অনেক দূরের বিষয়, ঐ সকল বিষয়ের প্রতি আরব দেশগুলোতে তো বর্তমানে সামান্য ঘৃণার ও বীতশ্রদ্ধ মনোভাবও আর অবশিষ্ট নেই। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য শক্তির নিগড় হতে মুক্ত হবার কোন চেষ্টা ও প্রচেষ্টাও আর তাদের মধ্যে বিদ্যমান নেই। আরব দেশসমূহের শাসকবর্গ তথাকথিত স্বাধীনতা ও ধর্মহীনতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

অথচ কুরআন মাজীদের কি অসাধারণ দৃষ্টি যে, তার প্রথম সূরাতেই—যে সূরাটি প্রতিটি নামাযে প্রতি রাকাতে পঠিত হয় তথা সূরা ফাতেহায়—ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান জাতির কথা এক সাথে উল্লেখ করে তাদের থেকে আত্মরক্ষার দুআ করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে— صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ তাদের পথ আমাদেরকে প্রদর্শন কর যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ—ওদের পথ নয়, যারা ক্রোধ আপতিত এবং তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি

📄 আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি


লজ্জাকর ও হৃদয়বিদারক এই দূরাবস্থার বর্ণনা এত বিশদভাবে আপনাদের সামনে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছি এই জন্য যে, আপনারা মাদরাসার পরিচালকবৃন্দ ও ব্যবস্থাপকবৃন্দ এখানে উপস্থিত আছেন। আপনাদের এই বিষয়ে ধৈর্য সহকারে চিন্তা-ভাবনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। মাদরাসাসমূহে আরবী ভাষা শিক্ষাদানের মানকে আরও উন্নত করা প্রয়োজন; যাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সমাপন শেষে আরব দেশসমূহে এবং উন্নত মুসলিম দেশসমূহে বয়ান ও লেখনী দ্বারা দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতে যথাযথভাবে সক্ষম হয়। তারা যেন তাদের ভাষা দক্ষতা ও দাওয়াতী দক্ষতা দ্বারা আরবের যুবক শ্রেণীকে, শিক্ষিত ও লেখক ও সাহিত্যিক শ্রেণীকে এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবান্বিত করতে সক্ষম হয়। কারণ অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রিয় এসব ইসলাম বিরোধী কু-প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চল—কুয়েত, বাহরাইন এমনকি সউদী আরবেও অনুপ্রবেশ করেছে।

দ্বিতীয় যে ফেতনার মোকাবেলা করার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত হতে হবে এবং প্রস্তুত থাকতে হবে তাহল হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। স্বল্প ভাষায় বললে, যে আন্দোলনের লক্ষ্য হল এই দেশকে স্পেনে পরিণত করা। যেখানে মুসলমান শুধু বংশগতভাবে মুসলমান হিসেবে পরিচিত থাকবে। কিন্তু তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনযাপন প্রণালীকে, সম্ভব হলে তাদের ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসকে আমূল পরিবর্তিত করে দেওয়া হবে। এমনকি মুসলমানেরা এক পর্যায়ে হিন্দু পুরাণ তত্ত্বকে গ্রহণ করে নেবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে পাঠ্যসূচি, প্রচার মাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ইতোমধ্যে কাজে লাগানো শুরু হয়েছে। এর ফলও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

প্রথমে মুসলিম পার্সোনাল 'ল'তে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হয়েছিল। আদালতে কিছু কিছু ফায়সালা প্রদান করা হয়েছিল এরূপ যা শরীয়তের বিপরীত এবং শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু আমীরে শরীয়ত (বিহার) হযরত মাওলানা সাইয়েদ মিন্নাতুল্লাহ (রহ.) মুসলিম পার্সোনাল 'ল' বোর্ড প্রতিষ্ঠা করে এবং সমগ্র ভারত জুড়ে এর কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়ে ঐ ফেতনার দরজা সাময়িকভাবে হলেও বন্ধ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। কিন্তু সম্প্রতি ইউনিফর্ম সিভিল কোড-এর ধুয়া তোলা হয়েছে। আল্লাহর শুকরিয়া, ভারতের মুসলিম জনগণ সম্মিলিতভাবে এর বিরোধিতা করছে। আশা করি তা কার্যকর হবে না।

এইসব বাস্তবতা, ঘটনাবলী, শঙ্কা ও ফেতনাসমূহকে সামনে রেখে আমি অবশেষে আরজ করছি যে, আমাদের মাদরাসা শিক্ষার্থীদেরকে এই সকল ফেতনা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং এগুলোর মোকাবেলা করার জন্য তাদেরকে জ্ঞানগতভাবে ও মানসিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা খুবই জরুরী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00