📄 অল্পে তুষ্টি এক মহাসম্পদ
সুধী! প্রকৃতপক্ষে বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতার মোকাবেলা ঐ সকল আলেমই করতে পারেন, যাঁদের মধ্যে অল্পে তুষ্টির মহা সম্পদ বিদ্যমান, যে সম্পদের কোন মূল্য হয় না। যাঁরা বলতে পারেন- যাও, অন্য কাউকে চেষ্টা করো, আমাদেরকে খরিদ করতে চেষ্টা করো না। আমরা অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে অথবা তোমাদের পদ ও পদবীর বিনিময়ে, সিংহাসনের বিনিময়ে অথবা সম্মানের বিনিময়ে নিজেদেরকে বিক্রি করে দেব, নিজেদের হৃদয়ের প্রশান্তিকে বিক্রি করে দেব তা হবে না। এর আশাটিও করো না।
হযরত মির্জা মাজহার জানে জাঁনা-র নিকট দিল্লীর বাদশাহ অনুরোধ জানিয়ে পাঠাল যে, হযরত! আপনি আমাকে কখনও আপনার খেদমতের সুযোগ দেন না। একটিবার অন্তত আপনার খেদমতের সুযোগ দিন। অন্তত একটিবার আমাকে আপনার জন্য কিছু করতে নির্দেশ দিন। এরপর দিল্লীর বাদশাহ তাঁর জন্য এক হাজার টাকা পাঠাতে চাইলেন। তিনি বলে পাঠালেন, দেখুন আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
বল, দুনিয়ার সামগ্রী অতি স্বল্প ও তুচ্ছ।
এই বিশাল পৃথিবীর মধ্যে এশিয়া মহাদেশ একটি অংশ মাত্র। এশিয়া মহাদেশের একটি ক্ষুদ্র দেশ হিন্দুস্তান। তারও একটি অংশবিশেষ আপনার শাসনাধীন। সেখান থেকেও আমি কিছু অংশ নিয়ে আপনার রাজত্ব ছোট করে দেব- তা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি কথাটি বলেছিলেন, অকৃত্রিমভাবেই, সম্পূর্ণ মন থেকে। এরূপ ঘটনা তো বহু আছে।
বুরহানপুরে এক বুযুর্গ ছিলেন। বাদশাহ আলমগীর তাঁর নিকট আসা-যাওয়া শুরু করলে তিনি বললেন, আমি আমার একটি স্থান নির্বাচিত করে নিয়েছি, এটাও যদি বাদশাহর পছন্দ হয়ে যায় তাহলে আমি অন্য কোথাও চলে যাব। দুঃখের বিষয়, বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন চরিত, তাঁদের ইতিহাস এমনভাবে লিখিত হয়েছে যে, তাতে তাঁদের শরীয়ত অনুসরণের আবেগ ও প্রেরণা, ইত্তিবায়ে সুন্নাতের জযবা ও আবেগ তাঁদের রাত্রি জাগরণ, কুরআন তেলাওয়াত, কুরআন ও হাদীসের সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় অনালোচিত থেকে গেছে। ‘তারীখে গুজরাট’-এর প্রণেতা মাওলানা হাকীম সাইয়েদ আবদুল হাই মরহুমের ভাষায়- যে বুযুর্গেরই জীবন চরিত পাঠ করবে তাতে মনে হবে যে, অলৌকিক ঘটনাবলী সংঘটিত করণ ও কারামত প্রদর্শন ব্যতীত যেন ঐ সকল বুযুর্গের আর কোন কাজ ছিল না। মৌল উপাদান-চতুষ্টয় (মাটি ও বাতাস, আগুন ও পানি) এবং সৃষ্টিত্রয় (উদ্ভিদ, জড়বস্তু ও প্রাণীকুল) এর উপর নিজেদের কর্তৃত্ব ও শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই যেন তারা সদা সচেষ্ট থাকতেন। অমুককে মেরে ফেলল, তমুককে যিন্দা করল, নৌকা ডুবে গেল তো আঙ্গুলের ইশারায় তাকে আবার পানির উপরে উঠিয়ে আনল ইত্যাদি। ঐ সকল বুযুর্গের জীবন ইতিহাস ভ্রান্ত ধারায় লিখিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ছিলেন অনেক বড় জ্ঞানী, পর্যাপ্ত জ্ঞানের অধিকারী। হাঁ কখনও কখনও কোন কোন বুযুর্গ কর্তৃক বিশুদ্ধ হাদীস জানা না থাকার কারণে অথবা হাদীস শাস্ত্রীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ দখল না থাকার কারণে এরূপ কাজ সংঘটিত হয়ে গেছে, যা হাদীস দ্বারা সমর্থিত হয় না। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা জ্ঞান ও ইলমের অধিকারী ছিলেন। ইলম ব্যতীত মুরশিদের পদে কেউ অধিষ্ঠিত হতে পারে না।
📄 হিকমাহ বলে আখলাক বোঝানো হয়েছে
হিকমাহ্ বলে আখলাকে ফাযেলা ও উন্নত চরিত্র বোঝানো হয়েছে। আমাদের উস্তাদ স্ব-যুগের বিশিষ্ট গবেষক মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর গবেষণা ও তাহকীক তেমনটাই বলে। তিনি বলেন যে, হিকমাহ শব্দটি কুরআন কারীমের যত জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে, সর্বত্র তা দ্বারা চরিত্র বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
'আমি লুকমানকে হেকমত দান করেছি।'
এরপর যেসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে সবই চরিত্র আর চরিত্র। প্রথমে হিকমাহ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর হিকমাহর যে শাখা-প্রশাখা আলোচিত হয়েছে তার সবই আখলাক ও চরিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। সূরা বনী ইসরাঈলে আখলাক সংক্রান্ত বিষয়াবলী বর্ণনার পর আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
'তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা যে হিকমাহ দান করেছেন এইগুলি তার অন্তর্ভুক্ত।' (সূরা বনী ইসরাঈল ৩৯)
এখানে উন্নত চরিত্রসমূহ বর্ণনার পর সেইগুলোকে হিকমাহ'র অন্তর্ভুক্ত বলে বলা হয়েছে। অতএব বোঝা গেল যে, হিকমাহ হল চরিত্র, উন্নত চরিত্র।
📄 তাযকিয়াহ ব্যতীত কিতাব ও হিকমাহ’র শিক্ষা অসম্পূর্ণ
এরপর আসে নফসের পবিত্রতা অর্জনের বিষয়। মন্দ চরিত্রকে অন্তর থেকে বের করে দেওয়া, হিংসা-বিদ্বেষকে দূরীভূত করা। পার্থিব লালসা, অর্থ ও ক্ষমতা লিপ্সাকে দূরীভূত করা। এর পরিবর্তে অন্তরে আল্লাহর প্রেম, আখেরাতের আকাঙ্ক্ষা, জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা অন্তরে সৃষ্টি করা। যে কোন জামেয়া ও দারুল উলুমের লক্ষ্য হওয়া উচিত এরূপ ব্যক্তিত্ব তৈরি করা, যারা তেলাওয়াত, তালীমে কিতাব, তালীমে হিকমাহ এবং তাযকিয়ায়ে নফস- এই চার বিভাগেই আম্বিয়ায়ে কেরামের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তেলাওয়াত ও তালীমে কিতাব ও তালীমে হিকমাহ অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত থেকে যাবে যদি এগুলোর সঙ্গে তাযকিয়ায়ে নফস না থাকে। অর্থাৎ আমাদের উলামায়ে কেরামকে নফস ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যেতে হবে। সম্পদ ও সম্মানের কোন বিশাল পরিমাণও তাদেরকে নিজস্ব নীতি হতে, দাওয়াতী কার্যক্রম হতে, তাদের স্বকীয়তা হতে, শিক্ষা হতে এবং জীবন পদ্ধতি হতে তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারবে না- তাদেরকে এরূপ হতে হবে।
আজ আরব ও আযম কোন জায়গাতেই কোন কিছুর অভাব নেই, অভাব শুধু একটি জিনিসের। আর তা হল সাদাসিধা ও দুনিয়াবিমুখ জীবন যাপন এবং অল্পে তুষ্টি গুণ। মানুষ সেখানেই যায় যেখানে তার প্রয়োজনীয় ও অভাবের বস্তুর সন্ধান পায়। এটাই রীতি। আমার যদি কোন জিনিসের অভাব থাকে তাহলে আমি ভীত ও হীনবল থাকব। হাঁ তা যদি আমার নিকট বিশের জায়গায় ঊনিশ পরিমাণও থাকে তাহলে আমি মার খাব না অন্যের নিকট মাথা নত করব না। তো যারা এখন ভোগবাদিতা ও বস্তুবাদিতার আঘাতে জর্জরিত এরা যখন নিজেদের ক্ষত প্রশমনের জন্য উলামায়ে কেরামের নিকট যায় এবং দেখে যে, উলামায়ে কেরামও আমাদের চেয়ে ভোগবাদিতা ও বিলাসিতায় কোন অংশে কম নয়, তখন তারা উলামায়ে কেরাম কর্তৃক প্রভাবিত হওয়ার পরিবর্তে তাদের প্রতি অনাস্থাশীল হয়ে ওঠে, তাদের অন্তরের কুধারণা আরও বৃদ্ধি পায়। অতএব এই দেশে ঐ জাতীয় আলেম গড়ে উঠুক, যাঁরা হবেন-
এর উপর আমলকারী। হবেন নববী উত্তরাধিকারের বাহক-
'নবীগণ দীনার ও দিরহাম (তথা টাকা-পয়সার) উত্তরাধিকার রেখে যান না বরং তারা রেখে যান ইলমের উত্তরাধিকার।'
বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জ হল বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতা। এই চ্যালেঞ্জের জবাব হল ভোগবাদিতা ও বস্তুবাদিতার ঊর্ধ্বে অবস্থান। ভোগবাদিতার ভূমি থেকে উচ্চে বিচরণ এবং এটা প্রমাণ করণ যে, অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আমাদেরকে কিছুমাত্র বিচলিত করে না। এগুলো আমাদেরকে প্রভাবান্বিত করতে পারে না। আমরা অর্থ-সম্পদের গোলাম নই। আমি একথা বলছি না যে, আমরা হালাল বস্তুকেও নিজেদের জন্য হারাম ও অবৈধ জ্ঞান করব। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
'বল, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের জন্য যে শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে?' (সূরা আরাফ ৩২) এবং বলেছেন-
'হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যা বৈধ করেছেন তা তোমার জন্য নিষিদ্ধ করছ কেন?' (সূরা তাহরীম ১)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন আল্লাহ তাআলা এরূপ বলেছেন, তখন আমরা তো কোন ছার? আমরা হালাল বস্তুকে পূর্ণরূপে কাজে লাগাব। আল্লাহর নেয়ামত রাজি কে সোৎসাহে কাজে লাগাব। আমরা যদি উন্নত ও উপাদেয় খাদ্য খেতে সক্ষম হই তবে অযথাই তাকে বিস্বাদ বানিয়ে নেব না। যেমন অনেক অতি সুফীদের কথা শোনা যায় যে, তরকারীতে অতিরিক্ত পানি দিয়ে দিয়েছে, যাতে তা বিস্বাদে পরিণত হয়। প্রতিবেশীদেরকে দেওয়ার জন্য নয় বরং তরকারীকে বিস্বাদযুক্ত বানানোর জন্য অতিরিক্ত পানি ঢেলে দিয়েছে অথবা বেশি করে লবণ দিয়ে দিয়েছে, যাতে তরকারী বিস্বাদযুক্ত হয়। এটা ইসলামের তাযকিয়া নয়। শরীয়ত এরূপ করতে উৎসাহিত করে না। আপনার যদি সুস্বাদু খাবার খাওয়ার সামর্থ থাকে, তবে অবশ্যই তা খাবেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন, প্রত্যেক লুকমায়, প্রত্যেক গ্রাসে শুকরিয়া আদায় করবেন। কিন্তু 'আরো চাই'-এর লালসা- যা আজ সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, অর্থ-সম্পদের কোন পরিমাণই, ক্ষমতার কোন স্তরই তাদেরকে তৃপ্ত করতে পারছে না, সর্বদা 'আরও চাই' -ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে; তা থেকে উলামায়ে কেরামকে মুক্ত থাকতে হবে। ঐরূপ মানসিকতা থেকে মুক্ত থেকে তাদেরকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে হবে।
📄 চাটাইতে উপবেশনকারী কিছু নির্মোহ ব্যক্তির প্রয়োজন
করাচী থেকে ইসলামাবাদ, ইসলামাবাদ থেকে এই ফয়সালাবাদ পর্যন্ত যে কথাটি আমি বলে আসছি তা হল, আজ পাকিস্তানকে রক্ষা করতে অন্য অনেক কিছুর মধ্যে সর্বাধিক প্রয়োজন যে উপকরণ ও উপাদানের, প্রয়োজন যে শক্তির তা হল উলামায়ে কেরামের দুনিয়াবিমুখ জীবন, অল্পে তুষ্ট জীবন, স্বকীয়তা ধারণকারী জীবন যাপন। উলামায়ে কেরামকে এরূপ জীবনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে হবে যাতে অনুমিত হয় যে, এঁরা বিশেষ কোন স্তরের লোক। এঁরা আম্বিয়া কেরামের রেখে যাওয়া সম্পদের যথার্থ উত্তরাধিকারী। এঁরা তাঁদের উপযুক্ত প্রতিনিধি। এঁরা অর্থ-সম্পদ ও ভোগবাদিতায় নিবিষ্ট নয়, ভোগবাদিতার তরবারী এদেরকে হত্যা করতে পারেনি, টিকিটিও স্পর্শ করতে পারেনি। যাঁদের কাছে গেলে দুনিয়ার অসারতা স্পষ্ট হয়, কমপক্ষে এতটুকু উপলব্ধি হয় যে, অর্থ-সম্পদই জীবনের সবকিছু নয়। যার প্রয়োজন সে আমাদের নিকট আসুক, আমরা কারও দরজায় ধর্না দিতে রাজি নই। যদি কারও দরজায় যাই তবে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যাব। 'আমর বিল মারূফ নাহী আনিল মুনকার' এর উদ্দেশ্যে যাব। কোন ফরয কিংবা কোন সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত করতে যাব। নিজের স্বার্থসিদ্ধি কিংবা কারও পক্ষে সুপারিশ ও তদবিরের জন্য যাব না।