📘 উলামা তলাবা > 📄 দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা অপরিহার্য

📄 দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা অপরিহার্য


সুধী! আমি আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يا أيها الذين امنوا قوا أنفسكم وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلئِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

হে ঐ সকল ব্যক্তিগণ, যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর ঐ আগুন থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন এবং তারা তা-ই করে যা তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়। (সূরা তাহরীম ৬)

সুধী! আমি আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আয়াতটি আপনাদের সামনে এর পূর্বেও অনেকে তেলাওয়াত করে থাকবেন। আপনাদের নিজেদের তেলাওয়াতের সময়ও আয়াতটি আপনাদের দৃষ্টিতে পড়ে থাকবে। অবশ্য কোন বিষয় বার বার সামনে আসা সত্ত্বেও অনেক সময় তা গভীর দৃষ্টিতে ও মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখা হয় না। আপনি একই রাস্তায় বার বার আসা-যাওয়া করে থাকেন, রাস্তাটির উভয় পার্শ্বে অনেক সাইনবোর্ড টানানো থাকে আপনি সেগুলোকে বার বার দেখেও থাকেন। কিন্তু আপনি নিজেই চিন্তা করুন এ সকল সাইনবোর্ডের কতটিকে আপনি মনোযোগ সহকারে দেখেছেন এবং তাতে কী লেখা আছে তা মনে রেখেছেন? আপনাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, বলুন তো এসব সাইনবোর্ডের মধ্যে কয়টি সাইনবোর্ড গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংক্রান্ত? আপনাদের মধ্যে কম লোকই তা বলতে পারবে।

আয়াতটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং চমকে দেওয়ার মত। কোন জিনিস বার বার সামনে আসলে অনেক সময় তা সাধারণ ও মামুলী বিষয় বলে গণ্য হতে থাকে- তা না হলে আয়াতটি এতই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী যে, আমি অনুরোধ করতাম এবং জোর দিয়ে বলতাম যে, আয়াতটি দেয়ালে দেয়ালে স্পষ্ট অক্ষরে লিখে রাখা হোক। সাইনবোর্ড আকারে লিখে মসজিদে মসজিদে টানিয়ে দেওয়া হোক।

আল্লাহ তাআলা বলছেন, হে ঐ সকল লোক, যারা নিজেরা ঈমান এনেছ- يا أيها الذين امنوا -এর মধ্যকার امنوا শব্দটি অতীতকাল বাচক ক্রিয়াপদ। প্রতিটি শব্দ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। কুরআন মাজীদের কোন শব্দের ব্যবহারই যথেচ্ছাচার-নির্ভর নয়, অপরিকল্পিত নয়। এটা কবিতা কিংবা কাব্যগ্রন্থ নয়। এর প্রতিটি শব্দই তাৎপর্যপূর্ণ। أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ হে মুমিনগণ! বা أَيُّهَا الْمُسْلِمُونَ হে মুসলমানগণ বলা যেত, কিন্তু তা বলা হয়নি। বলা হয়েছে يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا হে ঐ সকল লোক, যারা ঈমান এনেছ قُوا أَنْفُসَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّাসُ وَالْحِجَارَةُ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর ঐ আগুন থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। আয়াতটিতে প্রথম সম্বোধন যাদেরকে করা হয়েছে তাঁরা ছিলেন মুসলমান, তাঁরা ছিলেন সাহাবী। কুরআন অবতরণের সময় কালে যাঁরা ছিলেন বর্তমান। তাঁরাই ছিলেন আয়াতের সম্বোধনের প্রধান লক্ষ্য। এমনিতে তো কিয়ামত পর্যন্ত যে সকল মানুষ জন্ম নেবে তাদের সকলেই এই আয়াতের সম্বোধনের লক্ষ্য। কিন্তু প্রথম লক্ষ্য তাঁরাই যাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে ঈমান এনেছেন। যাঁরা সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিশ্চয়ই ঐ সকল সাহাবীও ছিলেন, যাঁরা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যাঁরা হুদায়বিয়াতে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রাসুলের হাতে হাত রেখে ইসলামের জন্য জীবন দানের শপথ করেছিলেন। যাঁদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُবָايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا

'আল্লাহ তো মুমিনগণের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়আত গ্রহণ করল এবং তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি অবগত হলেন; ফলে তাদের উপর তিনি নাযিল করলেন প্রশান্তি এবং তাদেরকে পুরস্কার দান করলেন আসন্ন বিজয়।' (সূরা ফাতহ ১৮)

যাদেরকে স্থায়ী সনদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এইরূপ সনদপ্রাপ্ত উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীগণও ছিলেন আলোচ্য আয়াতের সম্বোধনের লক্ষ্য। নিশ্চয়ই আশারায়ে মুবাশশারা বিল জান্নাহ সাহাবীগণও এই সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বড় বড় সাহাবীগণ।

এখন আমি আপনাদের নিকট প্রশ্ন করি, কোন ব্যক্তি কি জেনে-শুনে তার সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে আগুনে নিক্ষেপ করে কিংবা আগুনে ঝাঁপ দিতে দেয়? তাহলে এই আয়াতে যে বলা হল, হে ঐ সকল লোক, যারা নিজেরা ঈমান এনেছ তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর- এর অর্থ ও তাৎপর্য কী?

আপনারা কি ইতিহাসে এরূপ কোন ঘটনার কথা পাঠ করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে আগুনে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেছিল কিংবা তাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজন আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছিল, আর তারা নিশ্চুপ বসে বসে তামাশা দেখছিলেন? তাহলে কেন তাদের উদ্দেশ্যে এই কথা বলা হল যে, হে ঐ সকল লোক, যারা ঈমান এনেছ তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর? এটা কি বিনা প্রয়োজনে বলা হয়েছে? এটা কোন আগুন ছিল? কবে এই ঘটনা ঘটেছিল যে, মুসলমানদের সন্তান ও পরিবার-পরিজন আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছিল আর মুসলমানরা আরামের ঘুম ঘুমাচ্ছিল, তাদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল না, ফলে আল্লাহ তাদেরকে সচেতন করতে ওহী নাযিল করলেন, আর তাতে সকলে চমকে গেল, সচেতন হল এবং নিজেদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে চেষ্টা করল? বলাবাহুল্য, এইরূপ ঘটনা কখনও ঘটেনি। তাহলে এই আয়াতের মর্ম ও তাৎপর্য কী?

আয়াতটির মর্ম এছাড়া আর কিছুই নয় যে, তোমরা তোমাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে এরূপ বিষয় থেকে এরূপ কাজ-কর্ম থেকে রক্ষা কর, যার পরিণতি হবে তাদের জাহান্নামে প্রবেশ। কোন মানুষ নিজ সন্তান বা পরিবার-পরিজনকে আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হতে দেখলে তাকে রক্ষার চেষ্টা না করে পারে না। কিন্তু শঙ্কার বিষয় শুধু একটাই যে, মানুষ জানে না কোন্ কর্মে, কোন্ কারণে আগুনে জ্বলতে হয়। সুতরাং আয়াতের মর্ম দাঁড়াল এই যে, ঐসব আমল থেকে তাদেরকে রক্ষা কর, যা আগুনে প্রবেশের কারণ হয়। ফিকহের পরিভাষায় ঐসব আমলকে বলা হয়, আসবাবে মুআদ্দিয়াহ (কোন কিছুতে উপনীতকারী কারণ)। অর্থাৎ ঐ সকল কারণ যা কোন পরিণামের দিকে ধাবিত করে। ফিকাহ বিদগণের মতে ঐসব কারণ ও পরিণাম প্রকারান্তরে একই বিষয়। উদাহরণ স্বরূপ কেউ যদি এমন ঔষধ কাউকে পান করায়, যা মৃত্যু ডেকে আনে তাহলে এই ঔষধ প্রদান হত্যার সমার্থক হবে। কেননা সে এরূপ কারণ অবলম্বন করেছে, যার ফলে মৃত্যু অনিবার্য। আইনও তাকে হত্যাকারী বলেই সাব্যস্ত করবে এবং চিকিৎসকরাও তাকে হত্যাকারী বলে সাব্যস্ত করবে।

এখন আমি আপনাদের নিকট আরজ করছি যে, বর্তমান পরিস্থিতি এইরূপই। সন্তানদেরকে দ্বীনী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাদেরকে ন্যস্ত করা হচ্ছে ধর্মহীন শিক্ষার পরিবেশে। ঐ সকল লোকের ইচ্ছা ও মর্জির উপর তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যে শিক্ষার উপর পরকালীন মুক্তি নির্ভরশীল, পয়গম্বরগণের আনীত যে শিক্ষা না থাকার পরিণতি হল ঈমানহারা হওয়া শিশুদেরকে সেই শিক্ষাদানের ব্যাপারে যাদের ন্যূনতম দায়িত্ববোধ নেই এবং যারা ঐ শিক্ষাদানের উপযুক্তও নয়। দেখার বিষয় হল তাহলে এই বিষয়টা সন্তানদের জন্য কিভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে? বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শুধু ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা নয়; বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা দ্বীন ও তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শগত শিক্ষাব্যবস্থা। বৃটিশ শাসনামলের শিক্ষাব্যবস্থাও ছিল ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা। তৎকালীন পাঠ্য পুস্তকে কুকুর-বিড়ালের কাহিনী থাকত। আমাদের অনেকেই তৎকালীন যুগে ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তৎকালীন যুগের ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ্য পুস্তক ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসে কোন বিরূপ প্রভাব বিস্তার করত না, ঐসব পাঠ্যপুস্তক দ্বারা সৃষ্ট কোন বস্তুর প্রতি দাসত্ব মনোভাব সৃষ্টি হত না এবং এই জগতে কোন মাখলুকের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার ধারণাও সৃষ্টি হত না। সেই সময়কার পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষার্থীরা বাঘ, ভালুক, শিয়াল, নেকড়ে আর বিড়াল-কুকুরের কাহিনী ও গল্প পাঠ করত। বাড়ী থেকে যেরূপ মানসিকতা নিয়ে পাঠশালায় যেত সেই মানসিকতা নিয়েই ঘরে ফিরে আসত। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারী সিলেবাসভুক্ত পাঠ্যপুস্তকে আকীদা-বিশ্বাসের উপর প্রভাব বিস্তারকারী সমূহ উপাদান, গল্প ও আলোচ্য বিষয়াদি বিদ্যমান থাকে। আকীদা-বিশ্বাস বিনষ্টকারী উপাদানে যতটুকু ঘাটতি থাকে শিক্ষকগণ তা পূর্ণ করে দেন। শিক্ষার্থীদেরকে সম্মিলিতভাবে কিছু কাজ এইরূপ করতে হয়, যা তাওহীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দেখুন, রাস্তা এরূপ ঢালু যেখানে ঠিকমত পা জমে না। এরূপ ঢালু রাস্তায় কোন বালক সাইকেল চালাচ্ছে। সামনে গভীর বড় গর্ত রয়েছে। সাইকেলের ব্রেকও ঠিকমত কাজ করছে না। পিতা বসে বসে দেখছেন কিন্তু তাকে বাধা দিচ্ছেন না। অথচ তিনি জানেন যে, তার ছেলের সাইকেলটির ব্রেক ঠিকমত কাজ করে না, তিনি এটাও জানেন যে, সাইকেল চালিয়ে ঐ রাস্তায় গেলে তার ছেলের জীবন রক্ষা পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। এমতাবস্থায় আপনারা কি বলবেন না যে, পিতাই ছেলেটিকে ঐ গর্তে নিপতিত করে তার জীবন ধ্বংস করেছে?

তাহলে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা ঈমান কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে যদি সন্তানের জন্য দ্বীনী শিক্ষার ভিন্ন কোন ব্যবস্থা না করা হয় (যাকে আমরা সাইকেলের ব্রেকের সঙ্গে তুলনা করতে পারি)? স্কুলে বাচ্চারা যা পাঠ করে এবং যা শিক্ষা লাভ করে তার সংশোধনের ব্যবস্থা না করা হয়? যদি বাচ্চাকে ঈমানী ও তাওহীদী ব্যবস্থা দেওয়া হয়, প্রভাতকালীন অথবা সান্ধ্যকালীন মক্তবে প্রেরণ করা হয়, দ্বীনী আলোচনা সভায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, পিতা-মাতা নিজেরাও তাদেরকে দ্বীনের উপদেশ দান করে, উৎসাহব্যঞ্জক ও দ্বীনী অনুপ্রেরণা মূলক ভাল ভাল কিসসা-কাহিনী তাদেরকে শোনানো হয়, ঘরের পরিবেশও দ্বীনের অনুকূল হয়, তবে তো এসব এক প্রকার ব্রেকের কাজ করবে। পক্ষান্তরে এসব যদি না হয় তাহলে আপনি যেন আপনার সন্তানদেরকে কানে কানে বলে দিলেন যে, স্কুলে শিক্ষা লাভ করা সব বিষয়ই মেনে নেবে। হাঁ আপনি আপনার সন্তানদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন আর তার জন্য দ্বীনী শিক্ষার ভিন্ন কোন ব্যবস্থা করলেন না, তবে তার কানে যেন এই কথাই বলে দেওয়া হল যে, স্কুলের সব বিষয়ই মেনে নেবে। আপনি যেন আপনার সন্তানদেরকে একপ্রকার উৎসাহ দান করলেন ইসলাম বিরোধী সব কথা মেনে নিতে। তার দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন না, মহল্লায় কোন মক্তবও চালু নেই, দ্বীনী পুস্তকাদিও সে পাঠ করে না তাহলে আপনি বলুন আপনার উদ্দেশ্যে কি বলা হয়নি قوا انفسكم واهليكم نارا তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর?

লাক্ষ্ণৌতে মহিলাদের একটি মাহফিলে আমি একজন মমতাময়ী মায়ের গল্প বলেছিলাম। সুশিক্ষিতা ঐ মা একবার একটি আপ্যায়ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। অন্য মহিলারা মহিলাটিকে বেশ অস্থির, বিষণ্ণ ও চিন্তিত দেখতে পেল। তারা দেখল যে, কোন কথায় মহিলাটির মন বসছে না। অনেক দিন পর সকলেই একত্রিত হয়ে আনন্দ-ফুর্তির কথাবার্তা বলছে কিন্তু ঐ মহিলা কোন কিছুতেই আনন্দ পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে- যেন তার মন-মস্তিস্ক অন্য কোথাও পড়ে আছে। অন্যরা তাকে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার বোন! শরীর খারাপ? মনে কোন বেদনা আছে কি? অনেক জিজ্ঞাসার পর মহিলাটি বলল, না এসব কিছুই নয়। আসলে আমি ঘরে আমার শিশুটিকে রেখে এসেছি। এদিকে রান্নাঘরের দিয়াশলাইয়ের কৌটাটা সামলে রেখে আসিনি। ফলে আমার খুব আশঙ্কা হচ্ছে আমার বাচ্চা না পাছে দিয়াশলাই থেকে কাঠি বের করে আগুন জ্বালিয়ে নেয়। সঙ্গিনী মহিলারা বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন! আপনার বাচ্চার বয়স কত? মহিলাটি জবাব দিল- এই বছর দুয়েক হবে। দেখুন, বাচ্চা দিয়াশলাইয়ের বাক্স খুলতে জানে কি জানে না, যদি জানে তবে দিয়াশলাইয়ের কাঠির বারুদ যুক্ত দিক দিয়ে ঘষা দেবে কি উল্টো দিক দিয়ে ঘষা দেবে এই উভয় রকম সম্ভাবনাই বিদ্যমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও মা বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তার কল্পনায় ভেসে উঠছে তার বাচ্চা খেলতে খেলতে সেখানে গেল। দিয়াশলাইয়ের কৌটা খুলল। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বের করে দিয়াশলাইয়ের বারুদযুক্ত পাশে কাঠির বারুদযুক্ত দিক দিয়ে ঘষা দিল। ফলে আগুন জ্বলল আর তার বাচ্চার কাপড়ে আগুন লেগে গেল। এইসব কিছু দূর সম্ভাবনার বিষয় হলেও মমতাময়ী মা এই সম্ভাবনাযুক্ত শঙ্কাকেই নিশ্চিত মনে করে বিচলিত হয়ে পড়ছে।

দ্বীন পরিপন্থী পরিবেশে দ্বীন ও ঈমান বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কি জীবন নাশের সম্ভাবনা অপেক্ষা গুরুতর নয়? আপনাদের যে বাচ্চারা স্কুলে লেখাপড়া করছে আপনি কি তাদেরকে কোন দিন শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছেন যে, তাওহীদ কী? নিজেদের শহর ও মহল্লায় দ্বীনী মক্তব প্রতিষ্ঠার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। না ঘরে দ্বীনী পরিবেশ আছে, না মহল্লায়। এই অবস্থায় তাদের দ্বীন ও ঈমান কিভাবে সংরক্ষিত হবে? স্কুলের ব্যাপারে কী বলব, আরবী মাদরাসাগুলোর অবস্থাও এই দাঁড়িয়েছে যে, যে সকল শিশুরা এখানে আসছে তারাও ঐসব মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ, আমাদের শৈশবে যেসব বিষয়ে কোন মুসলমান শিশুর অজ্ঞ থাকার কল্পনাও আমরা করতে পারতাম না।

এই অবস্থার পরিণতি কী হবে? পরিণতি হবে এই যে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম দ্বীন সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ থেকে যাবে। উর্দু পড়তে পারবে না। বর্তমানে অবস্থা এই যে, ঐহিত্যের অধিকারী একটি বড় মাপের তিব্বীয়া কলেজের এক ছাত্রকে বলা হল একটি প্রবন্ধ লিখতে। ধারণা করা হল যে, যেহেতু তিব্বিয়া কলেজের পাঠ্যপুস্তক সব আরবী, ফার্সী ও উর্দু ভাষায় রচিত সেহেতু সে প্রবন্ধটি কমপক্ষে উর্দুতে লিখবে। কিন্তু দেখা গেল যে, সে হিন্দীতে তা লিখে এনেছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ছেন অথচ উর্দু লিখতে জানেন না? উত্তরে সে বলল, আমাদেরকে হিন্দীই পড়ানো হয়েছে। তো বলছিলাম যে, নতুন প্রজন্মের ব্যাপারে আমাদের আশঙ্কা অমূলক নয়, বাস্তবও বটে। দ্বীনের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ, মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে অজ্ঞ, আমাদের অন্তরে আল্লাহ ও রাসূল সম্পর্কে যে বিশ্বাস বিদ্যমান সে সম্পর্কে অজ্ঞ প্রজন্ম যথারীতি সৃষ্টি হয়ে গেছে। একজন মুসলিম ছাত্রকে সীরাত সম্পর্কে একটি রচনা লিখতে বলা হলে, সে তা হিন্দিতে লিখল এবং পাঠ করল উর্দু উচ্চারণে। শব্দ তো উর্দু কিন্তু Script ও বর্ণমালা হিন্দির।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক আর্নল্ড টয়েনবি লিখেছেন, এখন কোন জাতিকে ধ্বংস করতে তাদের গ্রন্থাগারে আগুন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু Script তথা তাদের ভাষার হস্তলিপি ও বর্ণমালা পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট। এর দ্বারা ঐ জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে তাদের সম্পর্ক বিনষ্ট হয়ে যাবে, তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। এরপর তাদেরকে যে দিকে ইচ্ছা সেদিকে পরিচালিত কর। যে জিনিস জাতিকে তার অতীত ও ঐতিহ্যের সাথে, তার মতাদর্শ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ সৃষ্টি করে তা হল ঐ জাতির Script তথা হস্তলিপি ও বর্ণমালা। হস্তলিপির পরিবর্তন হল তো জাতিরও পরিবর্তন হল। ভারতে তাই হচ্ছে। দলগত বিভেদে লাভ কিছুই হয় না, দেশের বদনাম হয়। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন যদি হয়ে যায়, তাহলেই আমাদের সর্বনাশের জন্য যথেষ্ট। আজ থেকে ষাট বৎসর পূর্বে মরহুম আকবর এলাহাবাদী বলেছেন-

শায়খ মরহুমের কথাটি আজ আমার খুব মনে পড়ে হৃদয় বদলে যাবে শিক্ষা বদলে গেলে।

আমাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিছু সময় লাগবে। ত্রিশ-চল্লিশ বৎসরের মধ্যে এরূপ এক প্রজন্মের সৃষ্টি হবে যাদের নিকট কুফর ও ঈমানের পার্থক্য, তাওহীদ ও শিরকের পার্থক্য, আকীদা-বিশ্বাসের পার্থক্য এসব কিছুই নিরর্থক বলে মনে হবে।

মুসলমান পিতা-মাতা তাদের সন্তানের ক্যারিয়ার ক্ষতি হবে আশঙ্কায় সন্তানদেরকে মাতৃভাষা উর্দু লেখায় না, পড়ায় না। তাদের দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। তাদের ক্যারিয়ারের সাথে এগুলো কি সাংঘর্ষিক? একজন মুসলমানের চেতনা তো এরূপ দৃঢ় হওয়া উচিত যে, যদি সে কোনভাবে বুঝতে পারে, তার সন্তানের ভাগ্যে ইসলাম নেই কিংবা খোদা না করুন সে মুসলমান থাকবে না তবে সে দুআ করবে, হে আল্লাহ! আমার এই সন্তানকে ভালোয় ভালোয় উঠিয়ে নাও। মুসলমানের শান এটাই।

একজন মহিলা সাহাবীয়া ছিলেন। নাম ছিল খানসা (রাযি.)। কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর হৃদয় ছিল কোমল। তিনি তাঁর মৃত দুই ভাইয়ের শোকগাথা রচনা করে সব সময় বেদনার্ত হৃদয়ে তা আবৃত্তি করতেন। বলা যায় যে, কোন ভাষায় নারী কর্তৃক রচিত শোকগাথার এত বড় ভাণ্ডার আর নেই। এই কোমল হৃদয়ের অধিকারিণী নারী একটি জিহাদ উপলক্ষ্যে তাঁর এক সন্তানকে ডাকলেন এবং বললেন, বৎস! তোমাকে আমি এই দ্বীনের জন্যই লালন-পালন করে বড় করেছি। যাও, আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়ে দাও। অতঃপর দ্বিতীয়জন, তৎপরে তৃতীয়জনকে ডেকেও অনুরূপ কথা বললেন। যখন তাদের সকলের শহীদ হওয়ার সংবাদ তাঁর নিকট আসল তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন,

'ঐ আল্লাহর শোকর, যিনি আমাকে সম্মানিত করেছেন তাদের শাহাদাতের মাধ্যমে।'

ঈমানের শান এটাই। ইসলামের জন্য সবকিছুই কুরবান করতে প্রস্তুত হওয়া। জিজ্ঞাসা একটাই। তা হল এই প্রজন্মকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে। কিভাবে মুসলমানরূপে তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা যাবে। সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সাধনের প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনী শিক্ষারও সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আজ এই পর্যন্তই। আল্লাহ আমাদেরকে কাজ করার তাওফীক দিন। আমীন!

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার গুরুত্ব ও উপকারিতা: কুরআন ও ইসলামী শিক্ষার আলোকে

📄 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার গুরুত্ব ও উপকারিতা: কুরআন ও ইসলামী শিক্ষার আলোকে


اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ وَالصَّلٰوةُ وَالسَّلَامُ عَلٰی سَيِّدِ الْاَنْبِيَآءِ وَالْمُرْسَلِيْنَ وَعَلٰى اٰلِهٖ وَاَصْحٰبِهٖ اَجْمَعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِاِحْسَانٍ وَدَعٰی بِدَعْوَতِهِمْ اِلٰی يَوْমِ الدِّيْنِ- اَمَّا بَعْدُ

فَاعُوْذُ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ بِসْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَاَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ فِيْهِ بَاْسٌ شَدِيْدٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللّٰهُ مَنْ يَّنْصُرُهٗ وَرُسُلَهٗ بِالْغَيْبِ- اِنَّ اللّٰهَ قَوِیٌّ عَزِيْزٌ

উপস্থিত সুধীবৃন্দ! এই মজলিসে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিগণ যেমন আছেন তেমনি দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত সম্মানিত উলামায়ে কেরামও আছেন। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আমার অন্তরে এই ধারণা রয়েছে যে, আমাদের সম্মানিত শ্রোতাবৃন্দের বিশেষত উলামায়ে কেরামের মস্তিষ্ক কখনও এই দিকে হয়তো ধাবিত হয়নি যে, কুরআন মাজীদেও শিল্প ও কারিগরি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে এবং ঐ সকল দক্ষ ব্যক্তিদের সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে, যাঁরা সমকালীন যুগে কারিগরি বিদ্যা দ্বারা নির্মাণমূলক কাজ করেছেন এবং জনগণের সেবা করেছেন এবং মানবতাকে ও নিজের সম-বিশ্বাসী লোকদেরকে রক্ষা করেছেন। বিষয়টি খুব স্বল্প সংখ্যক লোকের মস্তিষ্কেই জাগ্রত হয়েছে। আমি এইমাত্র আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেছি-

وَاَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ فِيْهِ بَاْسٌ شَدِيْدٌ وَّমَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللّٰهُ مَنْ يَّنْصُرُهٗ وَرُسُلَهٗ بِالْغَيْبِ- اِنَّ اللّٰهَ قَوِیٌّ عَزِيْزٌ

'আমি অবতীর্ণ করেছি লোহা, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। এটা এজন্য যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দেন কে প্রত্যক্ষ না করেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।' (সূরা হাদীদ ২৫)

আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ প্রকাশ করে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, আমি নাযিল করেছি লোহা। প্রথমে লক্ষ্য করুন, কথাটি ব্যক্ত করতে অন্য কোন শব্দও ব্যবহার করা যেত। উদাহরণ স্বরূপ خلقنا 'আমি সৃষ্টি করেছি' শব্দটি ব্যবহার করা যেত। কিন্তু নাযিল করেছি শব্দটি দ্বারা বিশেষত্ব ও গুরুত্ব প্রকাশ পায়। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কুদরত ও অনুগ্রহের উপাদানও বস্তুটির সাথে যে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত তা প্রকাশ পায়। আপনারা জানেন, শুধু প্রযুক্তি নয় বরং স্থাপত্য, শিল্প ও কারিগরি, যুদ্ধ ইত্যাদি প্রায় সকল ক্ষেত্রে লোহা এক কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কোন শিল্প ও কারিগরি জগত লোহা ব্যতীত চলতে পারে না।

বিংশোর্ধ খনিজ ধাতব পদার্থের মধ্য থেকে সবকিছুকে বাদ দিয়ে কুরআন একমাত্র লোহার উল্লেখ করেছে। বলেছে- انزلنا الحديد এবং আমি নাযিল করেছি লোহা, তাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি। লোহা আল্লাহ তাআলার রবুবিয়াত গুণের প্রকাশস্থল। লোহা শুধু তরবারি তৈরির জন্য নয়, নয় শুধু বন্দুক ও তার গুলি তৈরির জন্য; বরং فيه باس شديد ومনাفع للناس তাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহুবিধ উপকারিতা ও কল্যাণ। যাঁরা আরবী সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তাঁরা জানেন- অনির্দিষ্ট বাচক শব্দ ব্যাপকতার অর্থ প্রদান করে। বলা হয়েছে, منافع للناس তাতে রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। অনির্দিষ্ট বাচক শব্দ ব্যবহার করে কল্যাণের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির ইঙ্গিত করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা তাঁর এক নবী হযরত দাউদ (আ.) প্রসঙ্গে বলেছেন- وعلمنه صنعة لبوس لكم لتحصنكم من بأسكم 'আর আমি তাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ করতে, যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে।' (সূরা আম্বিয়া ৮০)

আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আ.)-এর জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলেন। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে- وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ أَنِ اعْمَلْ سَبِغَاتٍ وَقَدْرٍ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

'আমি তার জন্য লোহাকে করে দিয়েছিলাম নরম। (এবং বলেছিলাম) তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈয়ার কর এবং বুননে পরিমাপ রক্ষা কর।' (সূরা সাবা ১০-১১)

অর্থাৎ লোহাকে তাঁর জন্য এরূপ করে দিয়েছিলাম, যাতে তিনি তা দ্বারা ইচ্ছা মাফিক সহজেই বর্ম ইত্যাদি তৈরি করতে পারেন। ধ্বংসাত্মক কাজে নয় বরং নির্মাণ ও গড়ার কাজে যেন লোহাকে তিনি ব্যবহার করতে পারেন।

হযরত দাউদ (আ.) নয় বরং কুরআনুল কারীম হযরত সুলাইমান ইবনে দাউদ (আ.)-এর প্রসঙ্গেও আলোচনা করেছে। জীন জাতিকে তাঁর সেবকরূপে নিয়োজিত করার কথা বিবৃত করেছে। বলেছে- وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانِ كَالْجَوابِ وَقُدُورٍ رَاسِيَاتٍ

'তাঁর প্রতিপালকের আদেশক্রমে জীনদের কতক তাঁর সম্মুখে কাজ করত। তাদের মধ্যে যে আমার আদেশ অমান্য করে তাকে আমি জ্বলন্ত অগ্নি-শাস্তি আস্বাদন করাব। তারা নির্মাণ করত সুলাইমানের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রাসাদ, ভাস্কর্য, হাউজ সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেগ।' (সূরা সাবা ১২-১৩)

এ থেকে বোঝা যায়, জীনরা শিল্প ও কারিগরী কার্যাবলী সম্পাদন করত। হযরত সুলাইমান (আ.) যা চাইতেন সেই অনুযায়ী তারা কাজ করত। নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী তারা কিছু করত না। সুতরাং স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, তারা ধ্বংসাত্মক কোন কাজ করত না। কারণ নবীর নির্দেশনা অনুযায়ী যেহেতু কাজ হত নিশ্চয়ই তা মানুষের কল্যাণের জন্যই হত। এ থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ প্রদত্ত পদার্থ ও শক্তিকে তাঁর মর্জি মাফিক এবং নবী কর্তৃক আনীত পয়গামের দাবি অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। সমগ্র জগতের জন্য মহাবিপদ হল এই সকল বস্তু ও শক্তিকে ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক (DESTRUCTIVE & PASSIVE) লক্ষ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বলেছেন- يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ

তারা তার জন্য তাই করত যা সে (সুলাইমান আ.) চাইত। তারা স্বাধীন ছিল না। যা তারা চাইত তাই করতে পারত না। মানুষের উপর আক্রমণ করা, ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হওয়া, দেশকে পয়মাল করে দেওয়া -এ সবের কিছুই তারা করতে পারত না।

আমার শুধু ধারণা নয় বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা হল এই যে, মুসলমানরা অতীতে কারিগরি ও শিল্প ক্ষেত্রে কী পরিমাণ উন্নতি লাভ করেছিল আর আধুনিক যে জগতকে উন্নত জগত বলা হয়, বিজ্ঞান-সমৃদ্ধ জগত বলা হয়, তাতে মুসলমানদের অংশীদারিত্ব (Contribution) কতটুকু- এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের ইতিহাসকে খুব কমই অধ্যয়ন করা হয়েছে।

উদাহরণ স্বরূপ একটি কথা বলি। দর্শনে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। একটি কিয়াস বা অনুমাননির্ভর যুক্তি। যাকে বলা হয় অবরোহ বা deductive logic। দ্বিতীয়টি হল ইস্তিকরা (استقراء) যাকে বলা হয় inductive Logic বা যুক্তির আরোহ পদ্ধতি। এটা এক ঐতিহাসিক সত্য এবং স্বীকৃত বাস্তবতা যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও স্থাপত্য কলার সূচনা ও উন্নতি যুক্তিশাস্ত্রের এই আরোহ পদ্ধতিরই অবদান। ইউরোপে সায়েন্স ও বিজ্ঞান এবং তার সমূহ শাখা-প্রশার বিকাশ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ ও আবিষ্কারের যুগ তখন থেকেই শুরু হয়েছে যখন তারা কিয়াস তথা deductive logic এর পরিবর্তে ইস্তিকরা তথা inductive logic কাজে লাগাতে শুরু করেছে। আর যুক্তির এই পদ্ধতি ও এর মূলনীতিসমূহ আরবদের দান। আরব হতে স্পেনের পথ বেয়ে তা ইউরোপে এসেছিল।

প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও লেখক Gustave Lebon লিখেছেন, 'মানুষ নিরীক্ষণ পর্যবেক্ষণ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি আরোহ যুক্তি (Inductive logic) সম্পর্কে বলে থাকে যে, তা ফ্রান্সিস বেকনের উদ্ভাবন। কিন্তু আজ এটা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, এই পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে আরবদের সৃষ্টি।'

কিয়াস বা অবরোহ হল আপনি একটি বিষয়কে সত্য বলে ধরে নিলেন এবং বললেন, অমুক বস্তুতে এই গুণ রয়েছে। এরপর সমজাতীয় সব বস্তু সম্পর্কে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, এই সকল বস্তুতেও ঐ গুণ রয়েছে। যুক্তিবিদ্যার এই পদ্ধতিটি দুনিয়ার সব দর্শন এমনকি ইউনানী দর্শনের উপরও জেঁকে বসেছিল। ইউনানী দর্শনের আলোচনা উঠলেই যুক্তিবিদ্যার এই পদ্ধতির দিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাস্তিষ্ক ধাবিত হয় যে, তারা এই ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল। আমাদের এখানেও যে মানতেক (যুক্তিবিদ্যা) ও দর্শন পড়ানো হয়, তা ইউনানী দর্শনকেন্দ্রিক।

ইসতিকরা বা আরোহ অনুমান হল কার্য থেকে কারণ অনুমান। একাধিক বস্তুকে নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করে সবগুলোর মধ্যে যে সাধারণ গুণ (Common Factors) পরিলক্ষিত হয় তাকে মূল ধরে অন্য বস্তুতেও সেই গুণের উপস্থিতি অনুমান করা।

ইউরোপের যে সকল ঐতিহাসিক বিজ্ঞান ও ইউরোপের উন্নতি সম্পর্কে ইতিহাস লিখেছেন তাদের সকলেই একমত যে, ইউরোপের উন্নতি এবং তার বিশ্ব-বিস্তারী প্রযুক্তিগত বিজয়, আবিষ্কার ও উন্নতির মূল ভিত্তি হল ইসতিকরা বা আরোহ অনুমান। আর এটা সবাই জানে যে, এই বিদ্যার মূলনীতিসমূহ স্পেন থেকে আমদানীকৃত। স্পেন থেকে যদি তা ইউরোপে আমদানী না হত তাহলে ইউরোপ উন্নতি করতে পারত না।

আপনি দেখলেন যে, পানির মধ্যে এই গুণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আপনি অতি তড়িঘড়ি একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন এবং অপর বস্তুর ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করলেন। এটাই কিয়াস বা অবরোহ অনুমান। অনেক সময় এতটুকুও দেখা হয় না বরং নিজের ধারণা থেকে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এরপর সব বস্তুকে ঐ সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত করা হয় এবং ঐ সব বস্তুতে ঐ সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করা হয়, এটাকেই বলে কিয়াস। কিন্তু এটা যথার্থ নয়। আসল বিষয় ইসতিকরা বা অনুসন্ধান, নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে তড়িঘড়ি না করা। বরং বস্তুসমূহকে দেখা, নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা, তার বৈশিষ্ট্যকে দেখা, তার আচরণকে দেখা ও পর্যবেক্ষণ করা। গাছকেও দেখবেন, পাতাকেও দেখবেন, ভূমি দেখবেন অন্যান্য বস্তুসমূহকেও দেখবেন, পর্যবেক্ষণ করবেন, পরীক্ষা করবেন। অতঃপর দেখবেন এইসব বস্তুর মধ্যে Common Factors বা সাধারণ গুণ কী? এরপর মূলনীতি প্রস্তুত করবেন ও সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। যুক্তি বিজ্ঞানের এই পদ্ধতিই ইউরোপকে নতুন আলোর, নতুন পথের সন্ধান দান করেছে এবং নতুন এক ক্ষেত্র দান করেছে এবং বিজ্ঞানের উন্নতি সেই দিন থেকেই শুরু হয়েছে। যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন, মানুষের যেমন জন্মদিন থাকে তদ্রূপ বিজ্ঞানের জন্মদিন কোনটি? তবে আমি বলব, যে দিন ইসতিকরা বা যুক্তিবিজ্ঞানের আরোহ অনুমান পদ্ধতিকে ইউরোপ গ্রহণ করে নিয়েছে এবং স্পেন থেকে তা অর্জন করেছে সেই দিন।

তদ্রূপ যে এলাকাকে মা-ওরাউন্নাহর বলা হয়, বোখারা-সমরকন্দ ইত্যাদি শহর যে এলাকায় অবস্থিত সেখানে বড় বড় জ্ঞানী-গুণী, দার্শনিক, গবেষক ও আবিষ্কারক সৃষ্টি হয়েছেন। শায়খ ইবনে সীনা প্রণীত 'আল-কানুন' দেখুন। আজও তা সমভাবে সমাদৃত। আজও তা থেকে জ্ঞান আহরণ করা হচ্ছে। তাঁর বিস্তৃত নিরীক্ষণ ও গভীর পর্যবেক্ষণ, তাঁর প্রজ্ঞা ও মেধা দেখে বিস্মিত হতে হয় যে, কিভাবে তিনি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের কার্যাবলী ও বৈশিষ্ট্যাবলী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী বিভিন্ন রোগ চিহ্নিত করেছিলেন এবং তার চিকিৎসা সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন! ঠিক একইভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইসলামী বিশ্বের উন্নতি এরূপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, ইউরোপের জন্য যা ভিত্তি রচনা করে দিয়েছিল। এই কথাটি একটি বড় ভ্রান্তি ও অজ্ঞতাপ্রসূত যে, মানবজাতির উন্নতি, বিজ্ঞানের উন্নতি এবং বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট শাস্ত্র ও বিদ্যার উন্নতির সূচনা হয়েছে ইউরোপে এবং ইউরোপ ছিল এসবের প্রথম শিক্ষক। এটা বক্রদৃষ্টি ও গোঁড়ামী প্রসূত তথ্য। আল্লাহ আমাকে স্পেন ভ্রমণের সুযোগ দান করেছেন। স্পেনের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত, টলেটোলা থেকে গ্রানাডা পর্যন্ত সফর করেছি। আমি আলহামরা প্রাসাদ দেখেছি, কর্ডোভার মসজিদ দেখেছি, সেখানকার অন্যান্য স্থাপনা এবং পুরাতত্ত্বের নিদর্শনসমূহ দেখেছি। আপনি দেখলে বিস্মিত হবেন যে, সেই যুগে স্থাপত্য কলায় এত উচ্চ স্তরে মানুষ কিভাবে পৌঁছে গিয়েছিল? বিশ্বাস করতে কঠিন হয় যে, এসব স্থাপনা এভাবেও নির্মাণ করা যায়! এখানে আল বেরুনীর ন্যায় ব্যক্তি জন্মলাভ করেছেন। তিনি ভারতে এসেছিলেন। তাঁর লিখিত ইতিহাসে স্বীকার করা হয়েছে যে, অনেক সূত্র ও দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভাবক তাঁরাই।

এটা মনে করা উচিত নয় যে, এক বিদআতের প্রচলন দান করা হচ্ছে। হয়তো অনেককে এ থেকে বিরত রাখা হবে। এজন্য আমি দ্বীনী পরিভাষাতেই বলছি যে, এটা বিদআত নয় বরং আমি মনে করি যে, এটা মুসলমানদের এক প্রাচীন রীতির প্রচলন দান এবং মৃত রীতিকে পুনরায় জীবন দান। মুসলমানদের জন্য বর্তমানে এটা অপরিহার্য। এইসব ক্ষেত্রেও মুসলমানরা এক সময় অগ্রসর ছিল। আমি যেহেতু অনবরত সফর করতে থাকি এবং বিভিন্ন শিক্ষিত মহল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেয়ে থাকি এবং হিন্দুস্তানেই শুধু নয়; হিন্দুস্তানের সংলগ্ন দেশগুলোতেও আমার সফর হয়েছে একাধিকবার। সেহেতু এসব সফরের কারণে আমার অভিজ্ঞতা এই যে, মুসলমানদের মস্তিষ্ক সাহিত্য ও কাব্য-কবিতায় ব্যস্ত থাকে বেশি। তাদের মস্তিষ্ক এই জাতীয় বিষয় চর্চার দিকে অধিক ধাবিত হয়। এইজন্য কেউ কেউ এ রকমও বলে যে, মুসলমান তো ব্যস ঐ সকল বিষয় চর্চা করতে ভালবাসে যেসব বিষয় অপেক্ষাকৃত লঘু, যাতে আনন্দ উপভোগ করা যায়, স্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু যেসব বিষয় কিছুটা কঠিন, কষ্টকর এবং ধৈর্য ও স্থৈর্যের দাবি করে অথবা যেসব বিষয় অর্জন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পড়ে, যা অপেক্ষাকৃত নিরানন্দের ও শুষ্ক বিষয় সেসব বিষয়ে তাদের মস্তিষ্ক খুব কমই চলে। অথচ কথাটা সত্য নয়। মুসলমানদের সম্পর্কে এরূপ ধারণা অন্যায় ধারণা বৈ নয়।

আমি খুব আনন্দবোধ করছি এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি যে, আমাদের শহরে এরূপ একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি শহরেই এইরূপ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা উচিত। কেননা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির, শিল্প ও কারিগরির এবং গবেষণা কর্মের বিভিন্ন শাখার গুরুত্ব এখনও অপরিসীম। অনুমান করা যায় যে, এই গুরুত্ব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাবে। আমরা ভারতে নিজেদের যোগ্যতাবলে ও স্বনির্ভররূপে মর্যাদাকর জীবন যাপন করতে সক্ষম হবো না, যতক্ষণ না আমরা এই সকল ক্ষেত্রে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারব। কমপক্ষে এই সকল বিষয়কে আমরা যতক্ষণ না কাজে লাগাতে পারব।

সুধী! এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকরণের জন্য আপনাদেরকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি এবং দুআ করছি আল্লাহ যেন প্রতিষ্ঠানটিকে উন্নতি দান করেন এবং অন্যত্র এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। দুআ করি এই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে মুসলমানদের যে বিচ্ছিন্নতা ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা যেন দূরীভূত হয়। আল্লাহ তাআলা যেন এইসব প্রতিষ্ঠান থেকে এরূপ উপযুক্ত ব্যক্তি তৈরি করে দেন, যারা মুসলিম সমাজের মূল্যবোধ ও মান, মুসলিম সমাজের মাকসাদ ও লক্ষ্যের হেফাযত করতে পারবে। এটা অনেক বড় সেবা হবে এবং ইসলামকে শক্তিশালী করার এক বড় অবলম্বন হবে। জীবনোপকরণ উপার্জনের সাথে সাথে তা হবে সমাজের জন্য প্রভূত কল্যাণকর।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 জাতির অস্তিত্ব রক্ষা, শরীয়ত বাস্তবায়ন আন্দোলন ও ইসলামের বিজয় : কর্মধারা ও জাতীয় দায়িত্ব

📄 জাতির অস্তিত্ব রক্ষা, শরীয়ত বাস্তবায়ন আন্দোলন ও ইসলামের বিজয় : কর্মধারা ও জাতীয় দায়িত্ব


[১৯৮৭ ইংরেজী সনের ১৭ মার্চ হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত 'দ্বীনী শিক্ষা ও দ্বীনী দাওয়াত' বিষয়ক সম্মেলনে প্রদত্ত উদ্বোধনী ভাষণ।]

الحمد لله رب العلمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وخاتم النبيين محمد واله واصحابه اجمعين ومن تبعهم باحسان ودعى بدعوتهم الى يوم الدين - اما بعد!

সুধী! আমাকে এই সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণ প্রদানের জন্য নির্বাচিত করে আমাকে যে সম্মান আপনারা দান করেছেন তার জন্য আমি আপনাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। যে নিজের স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ নয় এবং আত্মপ্রতারণারও শিকার নয় এইরূপ সত্যপ্রিয় ব্যক্তির জন্য এই জাতীয় সম্মেলনের মূল্য ও মর্যাদা অনেক। এর মাধ্যমে এমন এক পরিবেশে সে নিজের হৃদয়ের আকুতি প্রকাশ করার এবং নিজের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ফলাফল বর্ণনার সুযোগ পায় যেখানে ধৈর্য সহকারে তার কথা শোনার মত শ্রোতা থাকে। অনেক সময় অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তারা তার কথা শুনে থাকে। আমার আশা করা উচিত যে, আমার সম্পর্কে আপনাদের অভিমত শুধু লৌকিক সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে নয় বরং তা আমার প্রতি আপনাদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। প্রত্যেকটি সূচনা অত্যন্ত নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে এবং সূচনার প্রভাব পড়ে গোটা বিষয়টির উপর। আল্লাহ তাআলা আমাকে আপনাদের আস্থার উপযোগী এবং দায়িত্ব পালনের উপযোগী বলে প্রমাণ করুন। আমীন।

প্রিয় ও সম্মানিত সুধী! আল্লাহ তাআলা তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে, তাঁর ইচ্ছা ও ইরাদা অনুযায়ী আমাদের ও আপনাদের জন্য যে যুগ ও পরিবেশ নির্বাচিত করেছেন তা অত্যন্ত নাজুক, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হল, এই যুগ, এই পরিবেশ, এই দেশ ও এই সমস্যা সঙ্কুল সময়ের জন্য প্রয়োজন ছিল কোন বড় মাপের যুগ সংস্কারকের। সংস্কার ও পুনর্গঠনের ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসেবেই শুধু নয়, একজন নগণ্য লেখক হিসাবেও আমি আপনাদের সামনে বলছি যে, বাস্তবিক আপনারা ও আমরা যে যুগ ও পরিবেশ পেয়েছি, আমরা যেসব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, এ যুগের যে সূক্ষ্ম অথচ নিষ্ঠুর সঙ্কেত উপলব্ধি করা আমাদের জন্য জরুরী সে সবের জন্য প্রয়োজন ছিল আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী ও দৃঢ়চেতা কোন যুগ সংস্কারকের। এটা আমার অতিশয়োক্তি নয়। সত্যই এই যুগ ছিল হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানীর উপযোগী। হাকীমুল ইসলাম হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহর সৃজনশীল যোগ্যতা ও তাঁর সংস্কারমূলক দৃঢ়তার উপযোগী। হযরত সাইয়েদ আহমদ ও হযরত ইসমাঈল শহীদদ্বয়ের আত্মমর্যাদাবোধের, তাঁদের দৃঢ়তার, তাঁদের দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার উপযোগী। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় বর্তমান যুগ ও তার চ্যালেঞ্চের জন্য, বর্তমান যুগের সমূহ সমস্যার মোকাবেলার জন্য আমাদেরকেই নির্বাচিত করা হয়েছে।

ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ এটা প্রবল পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহর নির্বাচন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 ভাষা ও সাহিত্যের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

📄 ভাষা ও সাহিত্যের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা


[আঞ্জুমান আল ইসলাহ খোর্দ, রওয়াকে সুলাইমানীর উদ্বোধনী অধিবেশন ১৪১৩ হিজরীর ২১ শে জিলকদ তারিখে হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর সভাপতিত্বে সুলাইমানিয়া হলে অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে হযরত মাওলানা (রহ.) এই ভাষণটি প্রদান করেন। ভাষণে ছাত্রদেরকে নিজেদের মধ্যে বক্তৃতা ও বয়ানের যোগ্যতা সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করেন।]

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ وَخَاتَمِ النَّবিِّينَ مُحَمَّদٍ وَالِهِ وَأَصْحَابِهِ أَজْمَعِينَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ - أَمَّا بَعْدُ

প্রিয় ভ্রাতৃবৃন্দ ও দারুল উলূমের ছাত্রবৃন্দ!

আঞ্জুমানে আল-ইসলাহের এই দ্বিতীয় শাখায় আসতে পেরে এবং প্রিয় ছাত্রবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাত করতে পেরে আমি সত্যি খুব আনন্দিত। আল-ইসলাহ প্রকৃতপক্ষে মনের কথা প্রকাশের যোগ্যতা সৃষ্টির ক্ষেত্র। যে যোগ্যতা বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে যুগ ও দ্বীনের চাহিদা পূরণ করতে পারে। দ্বীনের উপর যে আক্রমণ চলছে তার জবাব দিতে সক্ষম হয় এবং শিক্ষিত শ্রেণীর মস্তিষ্কে ইসলামের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস দৃঢ় করতে পারে। কারণ শিক্ষিত শ্রেণী ক্রমশ ইসলামের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। গতকাল 'আন-নাদী আল আরাবী'র মজলিসে আমি বলেছিলাম যে, আল্লাহ তাআলা স্বয়ম্ভর, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। না তার কোন উপকরণাদির প্রয়োজন আছে, না অন্য কোন শক্তির। শরীরী, অশরীরী কোন বস্তুর তিনি মুখাপেক্ষী নন।

কুরআনের একাধিক জায়গায় আল্লাহ তাআলা ভাব প্রকাশের যোগ্যতাকে মহা নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এই যোগ্যতার প্রভাব বিস্তারী শক্তির কথা বর্ণনা করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ: আল্লাহ তাআলা বলেছেন- نزل به الروح الأمিন على قلبك لتكون من المنذرين

'বিশ্বস্ত আত্মা (তথা জিবরাঈল) এটা নিয়ে অবতরণ করেছেন তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার।' (সূরা শুআরা ১৯৩)

আল্লাহ তাআলার জাত ও সিফাত- সত্ত্বা ও গুণাবলীর মর্যাদা হিসেবে এতটুকু বলাই যথেষ্ট ছিল যে, 'যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এরপর বলেছেন-

بلسان عربي مبিন যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। অর্থাৎ এমন ভাষায় যা হবে চিত্তাকর্ষক, হৃদয়গ্রাহী এবং হৃদয় ও মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তারকারী, মানুষের অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টিকারী।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ 'আমিই এটাকে আরবী ভাষায় কুরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি।' (সূরা ইউসুফ ২)

عربيا শব্দটি যুক্ত করার হেতু কী? শুধু انا انزلناه قرانا বলাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যেহেতু কুরআনের প্রথম সম্বোধন আরবদের উদ্দেশ্যে এবং তাঁরাই হবেন দ্বীনের প্রতি প্রথম আহ্বানকারী দল এই কারণে আল্লাহ তাআলা কুরআনের জন্য শুধু আরবী ভাষাই চয়ন করেননি বরং বলেছেন عربی مبین। মানব সৃষ্টির নেয়ামতের কথা যেখানে উল্লেখ করেছেন সেখানেও আল্লাহ তাআলা এই ভাব-প্রকাশ-যোগ্যতার নেয়ামতের কথা বলতে ভোলেননি। এরূপ বলা তো বেয়াদবী। বরং বলা উচিত, ঐ নেয়ামতের উল্লেখ পরিহার করেননি। বলেছেন-

الرحمن - عَلَّمَ القرآن - خَلَقَ الْإِنْسَانَ - عَلَّمَهُ الْبَيَانَ 'দয়াময় আল্লাহ। তিনিই কুরআন শিক্ষাদান করেছেন। তিনিই মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই শিক্ষাদান করেছেন ভাব প্রকাশের।'

প্রথমে মানুষ সৃষ্টির কথা বলেছেন। অতঃপর বললেন, তিনিই মানুষকে ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা দান করেছেন। মানুষ যাতে নিজের কথাকে হৃদয়গ্রাহী করে, স্পষ্ট করে ব্যক্ত করতে পারে তার যোগ্যতা দান করেছেন। তো এটা একটা শক্তি, একটা যোগ্যতা। এই যোগ্যতা ও শক্তিকে প্রত্যেকেই নিজ নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। নিজে গোমরাহ এবং অপরকে গোমরাহীর পথে আহ্বানকারী ব্যক্তি যদি এই যোগ্যতা ও শক্তি লাভ করে তাহলে সে অপরকে গোমরাহকরণের কাজে এই যোগ্যতা ও শক্তি ব্যবহার করে, জাহেলিয়াতের দিকে মানুষকে আহ্বানের জন্য সে এই যোগ্যতাকে কাজে লাগায়। আকীদা ও বিশ্বাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, চরিত্র ও আচার-আচরণ সহ মানব-সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে সে এই যোগ্যতার দ্বারা প্রভাব বিস্তার করে। বিশ্ব-ইতিহাসে এইরূপ ঘটনা ও এইরূপ যুগ বারবার এসেছে। শক্তিশালী লেখনী চলে গিয়েছে ঐ জাতীয় ব্যক্তিদের হাতেই। লেখনী তো সকলেই ধারণ করতে পারে কিন্তু প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিশালী লেখনী তাদের হাতে চলে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তারা লাভ করেছে যাদুকরি ভাষা, সম্মোহনী বক্তৃতাশক্তি। ফলে এরূপ সাহিত্য জন্মলাভ করেছে, যা গোটা সমাজকে করেছে সম্মোহিত, প্রভাবিত। গ্রীক ইতিহাস পাঠ করলে আপনি জানতে পারবেন, গ্রীক সাহিত্যের ভূমিকা ছিল সেক্ষেত্রে সর্বাধিক।

যে সাহিত্য ছিল ধর্মহীনতা সৃষ্টিকারী সাহিত্য। সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টিকারী সাহিত্য। প্রবৃত্তিপূজার সাহিত্য। সেগুলোকে রযমনামা (যুদ্ধগাথা) বা শাহনামা বলে। গ্রীক শাহনামা আরবী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। স্বয়ং খ্রিস্টানরা এর অনুবাদ করেছে। আপনি যদি গ্রীক শাহনামা পাঠ করেন তাহলে জানতে পারবেন, সেখানকার ধর্মহীনতার একটি বড় কারণ ছিল এই যে, ভাষা ও লেখনী তাদের হাতে চলে গিয়েছিল যাদের মধ্যে ছিল না কোন আল্লাহ-ভীতি। ছিল না মানব-প্রেম, ছিল না পরকালের হিসাব-নিকাশের ভয়। তারা ছিল প্রবৃত্তি-পূজারী। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। আপনারা জানেন, গোটা ইউরোপ তাদের জালে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের পাতা ফাঁদে ফেঁসে গেছে। 'গীবন'-এর প্রসিদ্ধ ও বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ For Open Empire পাঠ করুন অথবা ডরপিয়ারের Conflict Between Religion and Science (ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাত) পাঠ করুন। প্রসঙ্গত বলছি যে, আমি আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ-র নিকট ঋণী। আমি 'আল-ইসলাহ'র প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ আমি যখন এখানে লেখাপড়া করতাম এবং শিক্ষা সমাপনের শেষের দিকে আমার উপযোগিতা অনুযায়ী এখানে শিক্ষাদানেরও কিছু দায়িত্ব অর্পণ করা হল তখন গ্রন্থটির আমার প্রয়োজন পড়েছিল। আমি ইংরেজী জানতাম। বেশ পরিশ্রম করে ইংরেজি শিখেছিলাম। ফলে ইংরেজী ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদি পড়তে পারতাম এবং বুঝতাম। অবশ্য গ্রন্থখানির অনুবাদও হয়েছে। মাওলানা যফর আলী খান গ্রন্থখানির চমৎকার অনুবাদ করেছেন। অনূদিত গ্রন্থখানি 'মারেকায়ে মাযহাব ও সায়েন্স' নামে প্রকাশিত হয়েছে। অনূদিত গ্রন্থখানিও আমি আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ থেকে পেয়েছিলাম। তদ্রূপ History of European Morals (ইউরোপীয় সভ্যতার ইতিহাস) গ্রন্থখানিও আমার প্রয়োজন ছিল। সেটিও আমি 'মুসলমানদের অধঃপতনে বিশ্ব কী হারালো' (মাযা খাসিরাল আলাম বিনহিতাতিল মুসলিমিন) লিখতে যেয়ে এই উভয় গ্রন্থ থেকে আমি পর্যাপ্ত সহায়তা লাভ করেছি।

উভয় গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটির অনুবাদ করেছেন মাওলানা যফর আলী খান সাহেব, আর দ্বিতীয়টির মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী সাহেব। দুইজনই অত্যন্ত যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য অনুবাদক। আমি 'আল-ইসলাহ'র প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি চাই 'আল-ইসলাহ'র এই বৈশিষ্ট্য অটুট থাকুক। মানুষ যেন রচনা, সংকলন ও গবেষণাকর্মে আল-ইসলাহ দ্বারা উপকৃত হতে পারে। এই পর্যায়ে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, আপনারা সর্বদা গ্রন্থ সংগ্রহের প্রতি দৃষ্টি রাখবেন। লক্ষ্য রাখবেন, সাম্প্রতিককালে কোন কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হল, কোনগুলো শুধু ছাত্র নয় শিক্ষকবৃন্দেরও অধ্যয়ন করা উচিত। আমি স্বীকার না করে পারছি না যে, আল-ইসলাহ'র সংগৃহীত গ্রন্থাদি দ্বারা শিক্ষকবৃন্দও উপকৃত হতেন।

আল-ইসলাহ বিনোদনের কোন ক্ষেত্র নয়। সংবাদপত্র পাঠের জন্য আল-ইসলাহ নয়। সংবাদপত্র তো সর্বত্রই পাওয়া যায়। আল-ইসলাহ অগভীর ও ভাসা ভাসা জাতীয় পুস্তিকা পাঠেরও জায়গা নয়। এরূপ পুস্তিকা বর্তমানে বিভিন্ন প্রদেশের প্রায় প্রতিটি মাদরাসা, প্রতিটি আঞ্জুমান ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। আল-ইসলাহের গ্রন্থাগারে ঐ জাতীয় গ্রন্থ থাকা উচিত, যা দ্বারা মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তার গঠন হতে পারে। যা দ্বারা লেখক, গবেষক ও দ্বীনের দাঈগণ উপকৃত হতে পারেন। যে গ্রন্থগুলো আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতজনদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারে। এই জাতীয় গ্রন্থ সংগ্রহ দ্বারা আল-ইসলাহের কল্যাণকারিতা বৃদ্ধি পাবে, আল-ইসলাহের পরিষেবা হবে ব্যাপক ও বিস্তীর্ণ। প্রসঙ্গত আমি দায়িত্বশীল ও নাদওয়াতুল উলামার নাজেম হিসাবে স্পষ্ট ভাষায় বলছি যে, এর জন্য নাদওয়াতুল উলামার ইহতিমাম ও নিষামত উভয়েই আপনাদেরকে সহায়তা ও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। আপনারা গভীর দৃষ্টির অধিকারী ব্যক্তিদের পরামর্শে চিন্তা জাগানিয়া, তথ্য সমৃদ্ধ, পথনির্দেশক গ্রন্থাদির তালিকা প্রস্তুত করুন। অতঃপর আপনাদের বাজেট না কুলালে আমি প্রকাশ্যে ঘোষণা করছি যে, দারুল উলুম আপনাদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। যা বলছিলাম যে, বর্তমান কালে বলার যোগ্যতা- চাই তা লেখনীর মাধ্যমে হোক কিংবা বক্তৃতার মাধ্যমে- আরও অধিকতর ধারালো হয়েছে। শুধু ধারালো হয়েছে বললে ভুল হবে, বরং আল-ইসলাহের নাজেম সাহেব যেমনটা কিছুক্ষণ পূর্বে বললেন এবং যা বহু পূর্বে আমি বলেছি যে, বর্তমানে ইয়াহুদীদের মেধা আর খ্রিস্টানদের শক্তি এক সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। অথচ পৃথিবীতে যে দুটি ধর্মের মধ্যে সর্বাধিক বিরোধ ও সংঘাত হতে পারে তাহল খ্রিস্টধর্ম ও ইয়াহুদীধর্ম। কারণ খ্রিস্টধর্মের মৌলিক বিশ্বাস হল, হযরত ঈসা মসীহ (আ.) আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর ইয়াহুদী ধর্মে বিশ্বাসীরা তাঁকে অবৈধ সন্তান রূপে তাঁর প্রতি অপবাদ আরোপ করে। যা খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তির জন্য বরদাশত করা কঠিন। কিন্তু খ্রিস্টান জাতি বিষয়টি বেমালুম ভুলে গেছে। এমনকি ইয়াহুদীদের এই জঘন্য অপরাধকে খ্রিস্টানদের প্রধান পোপ ক্ষমা করে দিয়েছে। তো বর্তমানে এই ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান জাতির সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আর এর জন্য তারা Fundamentalism শব্দটি ব্যবহার করছে।

বস্তুত সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা ও ব্রিটেনের ন্যায় পরাশক্তিগুলো এবং ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা ধারণা করেছে যে, এখন তাদের জন্য যদি কোন হুমকি থেকে থাকে এবং তাদের প্রচণ্ড বিরোধী যদি কেউ থাকে, তাহল ইসলাম ও মুসলমান। এজন্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদগারের উদ্দেশ্যে একটি শব্দ ব্যবহার করছে তা হল Fundamentalism বা মৌলবাদ। এক্ষেত্রে ইয়াহুদী মেধা ক্রিয়াশীল। প্রাচীন আদর্শবাদী, সত্যপন্থী ইত্যাদি পরিভাষাই মুসলমানদের জন্য যথার্থ ছিল। কিন্তু তারা এক্ষেত্রে Fundamentalist-এর পরিভাষা ব্যবহার করছে। তারা শব্দটিকে এরূপভাবে চিত্রিত করছে যে, এখন কোন মুসলমানের জন্য নিজেকে Fundamentalist বা মৌলবাদী বলে দাবি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ একজন প্রকৃত ধার্মিকের জন্য Fundamentalist বা মূলের অনুসারী হওয়া অতি জরুরী। কারণ প্রকৃত ধার্মিকের অর্থই হল, যে ব্যক্তি দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি ও আদি অকাট্য নির্দেশাবলীতে বিশ্বাসী ও তার অনুসারী। খ্রিস্টান হলে ইনজিলে, মুসলমান হলে আল্লাহ তাআলার আখেরী কালাম কুরআন মাজীদের যাবতীয় বক্তব্যাদিতে দৃঢ় বিশ্বাসী হতে হবে। কিন্তু বর্তমানে Fundamentalist শব্দটি নিন্দার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং নিন্দার্থে শব্দটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আরব দেশসমূহেও শব্দটিকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহ কি দু' সপ্তাহ পূর্বে আমার নিকট একটি পত্র এসেছে। যেখান থকে এসেছে সেখানকার আমীরের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি আমাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকেন। লণ্ডনে তাঁর ও আমার এক সঙ্গে অবস্থানের সুযোগ ঘটেছিল। তিনি তাঁর এক বক্তৃতায় তাঁর দেশের কিছু সড়কের নামকরণ আমার নামে করেছেন বলে বলেছেন। আন্তর্জাতিক বড় এক সংস্থায় আমরা দুইজন একত্রে কাজও করেছি। তো তাঁর পক্ষ থেকে আমার নামে এই মর্মে পত্র এসেছে যে, 'মুতাশাদ্দিদীন বা কট্টরপন্থীদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? আমরা আরও কিছু আলেম, গবেষক ও চিন্তাবিদের নিকটে তাঁদের অভিমত জানার জন্য পত্র প্রেরণ করেছি। কট্টরপন্থীদের ব্যাপারে অভিমত। আরবী ভাষায় এদেরকে বলা হয়- متطرفين বা চরমপন্থী। আসলে Fundamentalist-এর অর্থ হল مبদئين বা মৌলবাদী। দ্বীনের মৌলিক ও আদি বিশ্বাসসমূহে যারা বিশ্বাসী এবং মূলের অনুশীলনের ক্ষেত্রে যারা আপোসহীন। তো দ্বীনের মৌলিক ও আদি বিশ্বাসকে নিন্দার দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। অথচ বর্তমান বিশ্বের সমস্ত বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা ও নষ্টের মূল কারণ হল, কোন মৌলিক নীতি-নৈতিকতায় বিশ্বাস না থাকা। সর্বত্র শুধু প্রবৃত্তি-পূজার জয়-জয়কার। সকলেই চায় শুধু প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করতে, শুধু স্বার্থ উদ্ধার করতে। তাতে যদি স্বতঃসিদ্ধ চারিত্রিক ও আদর্শিক নীতিমালা লঙ্ঘিত হয় তবুও কিছু যায় আসে না। যদি সমগ্র মানবতা পিষ্ঠ হয়, গোটা সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবুও কিছু যায় আসে না, নিজের স্বার্থ উদ্ধার হলেই হল। এটাকেই বলে নীতি-নৈতিকতাহীনতা। এটাই আজ গোটা বিশ্বকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, যে কোন সময় কিয়ামত সংঘটিত হতে পারে। আসল কিয়ামত তো আল্লাহ তাআলাই সংঘটিত করবেন। আমি বলছি তার পূর্বে অন্য এক কিয়ামতের কথা। এই কিয়ামত যে কোন সময় এবং বারবার আসতে পারে। দেখুন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এক ধরনের কিয়ামত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও এক ধরনের কিয়ামত ছিল। বিশ্বযুদ্ধ আবার হতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের তুলনায় অধিকতর ভয়াবহতা নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন ও জার্মান একে অপরের প্রতিপক্ষ ছিল। পরে উভয় দেশের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল অপরাপর কিছু শক্তি। তখন পারমাণবিক বোমা ছিল না। এখন পারমাণবিক বোমা অস্তিত্ব লাভ করেছে। সুতরাং ভয়াবহতা ও ব্যাপকতায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রথম দুটি বিশ্ব যুদ্ধকে ছাড়িয়ে যাবে। আর তা হবে নীতি-নৈতিকতাহীনতা, প্রবৃত্তিপূজা ও অবাধ স্বাধীনতার কুফলজনিত কারণে। ওদের লজ্জা করে না। ওরা মৌলবাদ নামে নতুন পরিভাষার জন্ম দিয়েছে। অথচ সারা বিশ্বের বর্তমান অস্থিরতা ও নষ্টের কারণ তা-ই যা আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম।

ظَهَرَ الْفَسَاد في البر والبحر بما كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

'জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষেরই কৃতকর্মের দরুন। যাতে তাদেরকে তিনি তাদের কোন কোন কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে পারেন, যাতে তারা ফিরে আসে।' (সূরা রূম ৪১)

কুরআন মাজীদের এই আয়াতটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। তাহলে বুঝতে পারবেন যে, সেই কৃতকর্ম আর কিছু নয়। তাদের কৃতকর্ম হল কোন নীতি ও আদর্শের তোয়াক্কা না করা, প্রবৃত্তির দাসত্ব অবলম্বন, অবাধ স্বাধীনতা ভোগ এবং যে কোন মূল্যে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের অভ্যাস।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা যাকে ভোগ সম্পদের দম্ভ বলে আখ্যাতি করেছেন। বলেছেন,

كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ بَطِرَتْ مَعِيشَتَهَا

'কত জনপদের বাসিন্দাদেরকে আমি ধ্বংস করেছি, যারা তাদের ভোগ সম্পদের দম্ভ করত।' (সূরা কাসাস ৫৮)

আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, বর্তমান যুগ ও বর্তমান যুগের বিশ্ব মহা সঙ্কটে নিপতিত। এই সময়ে আপনাদের জন্য যেটা প্রয়োজন তা হল পারস্পরিক মত বিনিময়ের যোগ্যতা অর্জন, লেখালেখির যোগ্যতা অর্জন, বিভিন্ন ধরনের জনসমাবেশে সমাবেশ উপযোগী বক্তৃতা প্রদানের যোগ্যতা অর্জন। যোগ্যতা বলতে এতটুকু নয়, যতটুকু আজ থেকে পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে যথেষ্ট ছিল। শুধু এতটুকু নয় যে, আপনি কোন মিলাদ-মাহফিল কিংবা সীরাত মাহফিলে কিছু বলে দিলেন, কোন আঞ্জুমানের প্ল্যাটফর্ম থেকে কিছু বলে দিলেন, নেক উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত কোন জলসায় কিছু কথা রাখলেন। ইসলামের বিরুদ্ধে বর্তমানকালের ষড়যন্ত্র তো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রটি যতটা ব্যাপ্ত ততটাই গভীর ও সূক্ষ্ম। এর কুফল সুদূরপ্রসারী। রেডিও, টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ সকল গণ-প্রচার মাধ্যমগুলোর কুৎসিত ঐক্য এক্ষেত্রে লক্ষণীয়। সকলের বক্তব্য একটাই। তাহল Fundamentalist এর মোকাবেলা করতে হবে। অর্থাৎ কোন মৌলিক আদর্শ বলতে কিছু থাকবে না। কোন বাধা-বন্ধন থাকবে না। মন যা চায় তাই করা যাবে।

গ্রীক একটি দর্শনের নাম ছিল লজ্জাতিয়াত। এর অর্থ ভোগবাদিতা। সেই দর্শনের মূল বক্তব্য ছিল, যাতে আনন্দ লাভ হয় তাই করা উচিত। বর্তমান ইউরোপ ঐ একই মানসিকতা লালন করে। গোটা ইউরোপের চিন্তা-চেতনা ভোগবাদী চিন্তা- চেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে। অবশ্য ভোগ ও আনন্দকে তারা আরও ব্যাপকতর বলে চিন্তা করে। শুধু রসনাতৃপ্তি ও উদরপূর্তির আনন্দ নয়, শুধু যৌন লালসা চরিতার্থের আনন্দ নয়, বরং চিত্তের আনন্দ। হীন রাজনৈতিক আনন্দ, হিংস্র বিজয়ের আনন্দও এই চিত্তের আনন্দের অন্তর্ভুক্ত। ফলে তা আরও ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করেছে। গ্রীক ভোগবাদী দর্শন এই পর্যায় পর্যন্ত উপনীত হতে পারেনি। সেই সুযোগই তার হয়নি। ইউরোপের ভোগবাদী দর্শন অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

Fundamentalism নিয়ে কথা বলছিলাম। আরব ও উপসাগরীয় দেশসমূহেও এই আওয়াজ উঠেছে যে, চরমপন্থীদের মোকাবেলা করতে হবে। তাদেরকে দমন করতে হবে। চরমপন্থী বলে তারা ঐ সকল ব্যক্তিকে বোঝায় যারা সমাজকে ইসলামী অনুশাসনের আদলে গড়ে তুলতে চায়। যারা চায়, মানুষের মধ্যে আল্লাহভীতি, পরকালভীতি ও হিসাব-নিকাশের ভীতি সৃষ্টি হোক। সমাজের প্রতিটি সদস্য একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোক, প্রত্যেকেই অপরের অধিকার রক্ষা করুক।' শরীয়তের ফৌজদারী দণ্ডবিধি যেমন রজম, বেত্রাঘাত, চোরের হস্তকর্তন ইত্যাদি তো অনেক দূরের বিষয়। যেসব বিধি-বিধান দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়নযোগ্য সেই সব বিধি-বিধান যারা বাস্তবায়ন করতে চায় তাদেরকেই বলা হচ্ছে চরমপন্থী। দেশের সরকার তাদের ব্যাপরে ভীত। ঐসব দেশের পত্র-পত্রিকায় সরকারের এই অহেতুক ভীতি প্রকাশ পাচ্ছে। যেমনটা আমার নিকট প্রেরিত পত্র দ্বারাও তা পরিস্ফুট। আমার নিকট প্রেরিত পত্রের ভাষার ধরণ দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, তারা ঐসব লোকের বিরুদ্ধে আমার দ্বারা কিছু লিখিয়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমার ফতওয়া চায়। যেন তারা প্রচার করতে পারে যে, প্রসিদ্ধ আলেম, গবেষক, লেখক, অমুক ও তমুক গুণের অধিকারী শায়খ আবুল হাসান আলী নদভীও চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে বলেছেন।

আমেরিকা ও ব্রিটেনেও Fundamentalist বলে ঐ সকল লোককেই বোঝানো হচ্ছে যারা ধর্মের দৈনন্দিন অনুশাসনগুলোকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে চায়। তাদের বিরুদ্ধে নানা প্রকার অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

এইসব সঙ্কটকে সামনে রেখে আপনাদের এগুতে হবে। সিনেমা দেখা, অবৈধ খেলাধুলা, অপব্যয় ইত্যাদি বিষয়গুলো মন্দ ও গুনাহের কাজ। কিন্তু এইসব গুনাহের কাজ পরিহার করতে উপদেশ দিলেন আর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল তা নয়। গোটা সমাজের সংস্কার প্রয়োজন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে যে ঘুণ ধরেছে তা বিনাশ করতে হবে। 'অল-ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ডের একজন রোকন হিসেবে আমি আপনাদেরকে বলব যে, সমাজ-সংস্কারের কাজ আপনাদেরকে করতে হবে। সমাজকে সংশোধনের দাওয়াত দিতে হবে। জায়গায় জায়গায় মাদরাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মসজিদে মসজিদে মক্তব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পূর্ব কালের ন্যায় কোন কোন বাড়িতেও শিশু শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিশুরা আসবে। কুরআন মাজীদ পড়তে শিখবে। বিশুদ্ধ উচ্চারণে কালিমা পড়তে শিখবে। শিরক ও তাওহীদের মাঝে পার্থক্য কী তা জানবে। নববী সীরাত সম্পর্কে কিছুটা ওয়াকিফহাল হবে। এই দায়িত্ব আপনাদেরকেই পালন করতে হবে। আরও একটি বড় দায়িত্ব আপনাদের গ্রহণ করতে হবে। তাহল ইসলামের বিরুদ্ধে আধুনিক ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা। এর জন্য আপনাদেরকে বাস্তবানুগ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

যে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে আমেরিকা বিশেষভাবে মরিয়া হয়ে লেগেছে, যে ষড়যন্ত্রের পিছনে ইয়াহুদী মেধা ও খ্রিস্টানদের অর্থ ও অস্ত্রশক্তি একযোগে কাজ করে যাচ্ছে, তাহল সারা বিশ্ব থেকে আকীদা-বিশ্বাসকে, ঈমানকে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে, দ্বীনের কঠোর অনুশীলনকে, পরকাল ভীতিকে উচ্ছেদ করা। এসব বিষয়কে তারা Fundamentalism নামে আখ্যায়িত করে অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, এসব প্রাচীন ধ্যান-ধারণা, বস্তাপচা বাসি মতাদর্শ। এগুলোকে পরিহার করতে হবে। তাদের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আপনাদেরকে সেইভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

আমি আঞ্জুমানে আল-ইসলাহকে শুধু বক্তৃতা প্রশিক্ষণ ও লেখনী প্রশিক্ষণের বিভাগ বলে মনে করি না। আমি মনে করি এটি নাদওয়াতুল উলামার লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম। আর তা হল আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীকে সংশয়মুক্ত করা, তাদের মধ্যে ইসলামের প্রতি আস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত আরব দেশগুলোতে ইসলাম অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন।

আল-জাযাইরে কী হচ্ছে? সেখানে সরকার ও দ্বীনদার শ্রেণীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। সরকারের অভিযান না ইসরাঈলের বিরুদ্ধে, না ইউরোপিয়ান কোন শক্তির বিরুদ্ধে, না দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। তাদের অভিযান চলছে নেহায়েত দ্বীনদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে, দ্বীন-প্রিয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। যারা চায়, সেখানে আল্লাহর কালিমা সমুন্নত হোক, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ হোক সর্বাধিক পালনীয়, গুনাহ সমূহ থেকে মানুষ আত্মরক্ষা করুক, ফরযসমূহ আদায় করুক। আল-জাযাইরে এসব বিষয়ের উচ্চারণও অপরাধ বলে বিবেচিত হচ্ছে। অনবরত সংবাদ আসছে যে, আজ সেখানে এতজন দ্বীনদার শহীদ হয়েছে। অমুক দিন এতজন শহীদ হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের ঢেউ পূর্ব দিকেও অগ্রসর হচ্ছে। পাকিস্তান এই ষড়যন্ত্রে নিপতিত হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। সম্প্রতি পাকিস্তানে যে পরিবর্তন হয়েছে, নওয়াজ শরীফকে অপসারণ করা হয়েছে, এর পিছনে আমেরিকার হাত আছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের নিহত হওয়ার ঘটনায় এবং বাদশাহ ফয়সালের নিহত হওয়ার ঘটনাতেও আমেরিকার হাত ছিল।

তাদেরকে হত্যার কারণ হল, মুসলিম কোন দেশে এমন কোন ব্যক্তি যেন ক্ষমতায় না থাকে যে ব্যক্তি দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যত নির্মাণে স্বাধীনচেতা, দ্বীনের মৌলিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী, ইসলামের সত্যতায় বিশ্বাসী, দ্বীনের অনুশাসন মেনে চলতে আগ্রহী। এ এক গভীর ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে হবে এবং আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীকে সংশয়মুক্ত করতে হবে, ইসলামের চিরন্তনতা ও সর্বকালীনতার প্রতি তাদের বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিতে হবে যে, ইসলাম সর্ব যুগকে সাথে নিয়ে চলতে পারে, সর্ব যুগেই ইসলাম নেতৃত্ব দান করতে পারে।

আধুনিক পাঠ্যক্রম ও ইউরোপ থেকে আমদানীকৃত শিক্ষা পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হল, তা ইসলামের প্রতি আস্থাকে বিনষ্ট করে দেয়। তা মানুষের মাঝে এই ধারণার জন্ম দেয় যে, ইসলাম এক সময়ে কল্যাণকর কিছু কাজ করেছে, কিছু ভাল অবদান রেখেছে। উদাহরণ স্বরূপ নারীদেরকে কিছুটা অধিকার দিয়েছে, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবরস্থ করার রীতিকে উচ্ছেদ করেছে, মদ নিষিদ্ধ করেছে ইত্যাদি। কিন্তু সে যুগ ছিল অনুন্নত। বর্তমান বিশ্বের উন্নত যুগে ইসলাম অচল। ইসলাম এই যুগকে সঙ্গ দেওয়ার যোগ্যতা রাখে না। এটাই এই ফেতনার মূল কথা যে, ইসলাম বর্তমান যুগকে সঙ্গ দেওয়ার যোগ্যতা ধারণ করে না। আপনাদেরকে প্রমাণ করতে হবে যে, ইসলাম শুধু সঙ্গ দিতে পারার যোগ্যতা রাখে তাই নয় বরং এই অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার এই যুগকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র ইসলাম। ইসলামই পারে এই যুগকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে, এই যুগকে শান্তিময় করে তুলতে। আপনাদেরকে এজন্য জ্ঞান-গরিমাসহ সর্বদিক দিয়ে পূর্ণ প্রস্তুত হতে হবে। এক্ষেত্রে অধ্যয়নের জন্য শিক্ষকবৃন্দ কিছু গ্রন্থ নির্বাচন করে দিতে পারেন। আমরা মাওলানা মাসউদ আলম সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিলাম। কোন কোন সময় শিক্ষার্থীদের জন্য কোন কোন গ্রন্থ অধ্যয়ন উপযোগী হবে তাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলাম। একজন দায়িত্বশীলকে আল-ইসলাহের গ্রন্থাগারে এক ঘণ্টার জন্য উপস্থিত থাকারও ব্যবস্থা করেছিলাম। যাতে ছাত্ররা তাঁর নিকট থেকে অধ্যয়নের জন্য গ্রন্থ নির্বাচনের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে। ছাত্ররা তাঁর নিকট যেয়ে জিজ্ঞেস করতে পারে যে, আমি অমুক শ্রেণীর ছাত্র, আমার জন্য কোন্ গ্রন্থটি প্রথমে উপযুক্ত বলে দিন। বলে দিন, ইতিহাসের অধ্যয়ন কোথা থেকে শুরু করা উচিত। সীরাতের কোন্ কিতাবটি পাঠ করব। এই দুইটি ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম। আমরা মনে করি এই দিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

প্রিয় ছাত্রবৃন্দ!

আমি কথা না বলার জন্য ওজর পেশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনাদের ভালবাসা ও একাগ্রতার কারণে এবং আল্লাহ তাআলা আপনাদের দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কাজ নেবেন বলেই হয়তো আপনাদের সামনে দীর্ঘ আলোচনা করে ফেললাম এবং আমার চিন্তাগুলো বিস্তারিত আকারে বললাম। অবশেষে আবার ঐ কথার পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, আঞ্জুমানে আল-ইসলাহকে আপনারা নিছক বক্তৃতা প্রশিক্ষণ ও লেখনী প্রশিক্ষণ গ্রহণের জায়গা বলে মনে করবেন না। এখান থেকে আপনারা ঐ সম্পদ ও শক্তি আহরণ করবেন, যা দ্বারা আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে যারা মেধাবী, ইন্টেলেকচুয়াল শ্রেণীর তাদেরকে আপনারা সংশয়মুক্ত করতে পারেন। ইসলামের প্রতি তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন।

ইন্দোনেশিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলামের প্রতি আস্থা বিনষ্টকারী জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা আমেরিকা, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের ঐক্যবদ্ধ ষড়যন্ত্র। ইসলামী অনুশাসন অনুযায়ী জীবন যাপনকারীদেরকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে চরমপন্থী ও মৌলবাদী নামে। তাদেরকে বলা হচ্ছে পশ্চাদগামী। ফলে একজন শিক্ষিত ব্যক্তিও নিজেকে ইসলামের কঠোর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করছে। আপনাদেরকে এই কাজ করতে হবে। সকলের সামনে বুক উঁচিয়ে, চোখে চোখ রেখে বলতে হবে হাঁ আমরা Fundamentalist এবং একজন Fundamentalist-ই পারে দুনিয়াকে মহা বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।

Fundamentalism নাই বলেই বিশ্বের এই সঙ্কটাপন্ন অবস্থা। কোন মূলনীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, জীবনের কোন মাপকাঠি নেই, সীমারেখা নেই। আছে শুধু প্রবৃত্তি পূজা, স্বার্থ উদ্ধারের মানসিকতা, ক্ষমতার মোহ, রাজনৈতিক হানাহানি। অতএব আপনারা নিজেরা প্রস্তুত হোন অপরকেও প্রস্তুত করুন। আমি আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি। আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আপনাদেরকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি। কারণ এই মাহফিলে কিছু বরকতময় ব্যক্তিত্ব উপস্থিত আছেন। আমাদের প্রিয় মাওলানা আবদুল করীম সাহেব আছেন, যিনি হিন্দুস্তানে কুরআনের একজন বড় ভাষ্যকার। মাওলানা মুজিবুল্লাহ সাহেব নদভীও উপস্থিত আছেন, যিনি একটি বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন এবং লেখালেখিও করে থাকেন। আপনাদের অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দও উপস্থিত আছেন। এইসব ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চয়ই বরকতজনক হবে।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের সকলকে তাঁর সত্য দ্বীনের খেদমতের জন্য কবুল করে নিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

টিকাঃ
১. মিসরের জামাল আবদুন নাসেরের কথা বোঝানো হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00