📘 উলামা তলাবা > 📄 মানুষের বিপর্যয়ের কারণ জ্ঞান হতে আল্লাহর নামের বিচ্ছিন্নতা

📄 মানুষের বিপর্যয়ের কারণ জ্ঞান হতে আল্লাহর নামের বিচ্ছিন্নতা


সুধী! এখানে উপস্থিত হতে পেরে আমি আনন্দে আপ্লুত। আমি অনুমানও করতে পারিনি যে, যে ভবনের ভিত্তি আমার হাতে স্থাপিত হয়েছিল সেই ভবন আজ এত উঁচু ও প্রশস্ত ভবনে পরিণত হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে আমি আমার প্রিয় সঙ্গী ও বন্ধুদেরকে মুবারকবাদ জানাচ্ছি।

আনন্দের কথা এই যে, সত্যপ্রিয়তা, গঠনমূলক চিন্তা-চেতনা এবং সমাজ ও জাতির চাহিদা ও দাবি পূরণের প্রেরণাই এখানকার প্রাণ ও মূল চালিকাশক্তি। জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ও চরম উন্নতি সত্ত্বেও বর্তমানে গোটা পৃথিবী ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কারও মাথার উপর উন্মুক্ত তরবারী আঘাতোদ্যত হলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনি।

বর্তমানে অর্থনৈতিক চরম উন্নতি ও বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার সত্ত্বেও সমগ্র মানবজাতি যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন তার কারণ আল্লাহর নাম থেকে জ্ঞানের বিচ্ছিন্নতা। আল্লাহর নামের সাথে জ্ঞানের সম্পর্কহীনতা। আল্লাহ তাআলা জ্ঞানকে তাঁর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ যে আয়াতটি প্রথমে অবতীর্ণ করেছিলেন তা হল-

اقرأ باسم ربك الذي خلق

আয়াতটি চিন্তা-ভাবনা ও গভীরভাবে উপলব্ধির দাবি রাখে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার জীবন নিয়ে চিন্তা করার, পরিবার-পরিজন সম্পর্কে চিন্তা করার, তার পরিবেশ ও সমাজ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ ও অবকাশ দান করেছেন। তবে এই সবকিছু হতে হবে তাঁর তত্ত্বাবধানে, তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী। তিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। এই বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল রাখতে হবে এবং এই বিশ্বাস যেন আমাদের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করে।

নিরক্ষর শহরে, নিরক্ষর নবীর উপর প্রথম যে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তা রাজ-রাজড়াদের দরবারেও তালাশ করে পাওয়ার মত নয়। যিনি কখনও লেখাপড়া করেননি তাকে বলা হল ইকরা (পাঠ কর)। যেন বলা হল যে, এখন যে জাতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে সে জাতি হবে শিক্ষিত জাতি, লেখাপড়ার জাতি। এই জাতির সম্পর্ক হবে জ্ঞানের সাথে। সেই সঙ্গে দিক-নির্দেশনাও দান করা হল যে, এই জ্ঞান হবে আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে নির্দেশনা অধিকাংশ জাতিই উপেক্ষা করে চলেছে। আল্লাহ বলেছেন- ইকরা (পাঠ কর)। কিন্তু শুধু পাঠ করাই যথেষ্ট নয়। শুধু 'পাঠ' কোন কাজে আসবে না। বরং নিছক পাঠ দ্বারা অর্জিত জ্ঞান ধ্বংস বয়ে আনবে, ধ্বংসাত্মক চিন্তা ও মনোভাবের সৃষ্টি করবে, মানুষের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা সৃষ্টি করবে, স্বজনপ্রীতি ও বন্ধুপূজার মনোভাব সৃষ্টি করবে, প্রবৃত্তি পূজার দিকে ধাবিত করবে।

যদি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লেখা হয় এবং সত্যান্বেষী দৃষ্টিতে ইতিহাস লেখা হয় আর তা লিখতে যেয়ে অনুসন্ধান করা হয় যে, মানবতার অধঃপতন ও মানবতার বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে কখন থেকে, তাহলে নিশ্চয়ই শিরোনাম লিখতে হবে এভাবে যে, যখন থেকে জ্ঞানকে আল্লাহর নাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, আল্লাহর নাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জ্ঞান চলেছে স্বাধীন পথে তখন থেকেই শুরু হয়েছে মানবতার বিপর্যয়। বিপর্যয় শুরু হয়েছে তখন, মানুষ যখন তাঁর নাম বিস্তৃত হয়ে, তাঁকে অস্বীকার করে বরং বিদ্রোহ করে একথা বলেছে যে, এই জগতের কোন সৃষ্টিকর্তা নেই অথবা সৃষ্টিকর্তা থাকলেও তিনি এই জগতের মালিক নন ও পরিচালক নন, তিনি শুধুই সৃষ্টিকর্তা, প্রশাসক নন। জগত যেন শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত তাজমহল, যা নির্মাণ করাটাই ছিল শুধু শাহজাহানের কাজ। এরপর এর তত্ত্বাবধান ও পরিচালনের দায়িত্ব আর তার হাতে নেই। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কাঠামো মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। মানুষ যা চাইবে তাই করবে, এতে তাঁর বলার কিছু নেই।

বন্ধুগণ! এই দুনিয়া তাজমহল নয়, কুতুব মিনারও নয়; বরং এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্মিত কারখানা, তিনিই এককভাবে এই দুনিয়া পরিচালনা করছেন।

الا له الخلق والامر

সৃষ্টি তাঁরই, শাসনও তাঁরই।

আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এবং প্রকৌশল ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন প্রয়োজন ছিল আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়া। আর এই কাজ তাদের দ্বারাই সম্ভব, যাদের বুনিয়াদ রচিত হয়েছে আল্লাহর নামের উপর। এই ইতিহাসে সমৃদ্ধ হয়েই যাদের যিন্দেগীর সূচনা হয়েছে।

এই উম্মতের ইতিহাস শুরু হয়েছে আসমানী ওহীর মাধ্যমে, উম্মী নবীর পথ-নির্দেশনা ও তাঁর পয়গামের মাধ্যমে। এই উম্মতের বুনিয়াদ রচিত হয়েছে জ্ঞানের সাথে সর্বদা আল্লাহর নামের সম্পৃক্ততার উপর। আজ ইউরোপ ও আমেরিকার যে করুণ দশা তা তাদেরই সৃষ্ট। বর্তমানে সমগ্র দুনিয়ার মোড়লীপনা তাদের হাতে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা সহ সর্বক্ষেত্রে তাদের মোড়লীপনার একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজমান। আল্লাহর নামের সাথে জ্ঞানের যে সম্পর্ক ছিল তারা তা ছিন্ন করে দিয়েছে। প্রয়োজন ছিল জ্ঞানকে আল্লাহর নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে চলার। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, তাঁর ছত্রছায়ায় জ্ঞানের অগ্রসরতার। তাঁর নামের বরকতও তার সাথে থাকার। তাহলেই নানা শাখা-প্রশাখাসহ আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আমাদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ড, গঠনমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ, আমাদের বিদ্যাপীঠগুলো, গবেষণাগারগুলো হত উপকারী ও কল্যাণকর। আল্লাহর শোকর যে, ক্ষুদ্র পরিসরে ও স্থানীয় পর্যায়ে হলেও বর্ণিত পথে আমরা এক কদম অগ্রসর হলাম। আমাদের এ পদক্ষেপ অত্যন্ত বরকতময়। আমি আমার সহকর্মী ও বন্ধুবর্গকে মুবারকবাদ জানাচ্ছি, যাঁরা এই পদক্ষেপের সাথে সম্পৃক্ত। আলহামদুলিল্লাহ উন্নতির সমূহ নিদর্শন আমাদের সামনে দৃশ্যমান। এই সুযোগে আমি আল্লামা ইকবালের একটি কবিতাংশের দ্বিতীয় পংক্তি আবৃত্তি করছি-

আমাকে নির্দেশ রয়েছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঘোষণা দানের।

সুধী! কম্পিউটার বিভাগ উদ্বোধন করার সুযোগ দান করে আপনারা আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমার স্বীকার করতে কুণ্ঠা নেই যে, এর পূর্বে কম্পিউটার সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। আমি লেখাপড়ার মানুষ। আমার সম্পর্ক কিতাব ও কলমের সাথে। আমি যখন কম্পিউটারের কী-বোর্ডে আঙ্গুল রাখলাম তখন সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় কিছু চিত্র ভেসে উঠল। তখন আমার মস্তিষ্কে এই কথা উদিত হল যে, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা তো মানুষকে, বিশেষত মুসলমানকে কম্পিউটারই বানিয়েছিলেন। তার মধ্যে সকল বিষয় সৃষ্টিগতভাবে গচ্ছিত রাখা আছে। সকল গুণ ও উৎকর্ষের আকর সে। প্রয়োজন ছিল শুধু আঙ্গুল চাপনের। তাহলেই তার সকল সুপ্ত গুণের বর্হিপ্রকাশ ঘটত। সে আঙ্গুল হল নবীকে চেনার আঙ্গুল। যুগের দাবি চেনার আঙ্গুল। সমাজ ও জাতির প্রয়োজন সমাজ ও জাতির চাহিদা পূরণের আঙ্গুল। এ এমন আঙ্গুল, যা জাতিকে গতি সৃষ্টি করে। জাতিকে মনযিলে মকসুদে, অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। এই আঙ্গুলের ব্যবহার হোক আর মানবতার চিত্র স্পষ্ট হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সকল মানুষ তো দূরের কথা মুসলমানরাও আজ আর কম্পিউটার রূপে থাকেনি। মুসলমানদের মধ্যে এই চেতনা, এই উপলব্ধি নেই যে, আমরা কোন কাজে আদিষ্ট। আমাদেরকে কী পান করানো হয়েছে। আমাদের মাঝে কোন বিষয়ের বিস্তৃতি ঘটেছে।

আজ কম্পিউটার যে কাজ করছে সেই কাজ করা উচিত ছিল মুসলমানদের। যখনই ইলাহী নির্দেশ সামনে আসে, যখনই শরীয়তের নির্দেশ শোনানো হয়, যখনই সমাজের ও জাতির প্রয়োজন ব্যক্ত করা হয় তখনই প্রয়োজন ছিল নিজের মধ্যকার সুপ্ত প্রতিভা ও চেতনাকে আঙ্গুল চাপনে জাগরূক করে তোলা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, নিজের চেতনাকে জাগ্রত করতে আঙ্গুল চাপনের কাজ আর হচ্ছে না। সুতরাং মানুষ নামক কম্পিউটারটি নিষ্ক্রিয় হয়েই রয়ে গেল।

যে প্রতিষ্ঠানটিতে দাঁড়িয়ে আমি কথা বলছি এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উচিত এই চেতনা ও অঙ্গীকার, এই সংকল্প ও দৃঢ়তা, এই সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া যে, আমরা শুধু শাস্ত্রীয় জ্ঞানই শিক্ষাদান করব না, বরং শাস্ত্রীয় জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ পরিচিতির জ্ঞানও শিক্ষাদান করব। যে জ্ঞান আমরা দান করব তার সঙ্গে যুক্ত করে দেব আল্লাহ পরিচিতির জ্ঞান, তাঁর অস্তিত্ব স্বীকারকরণের জ্ঞান। তিনি যে জগতের সৃষ্টিকর্তা, অপার কুদরতের অধিকারী, তাঁকে সন্তুষ্ট করাই যে আসল ও সর্বাধিক প্রয়োজনীয় কাজ ও জীবনের লক্ষ্য, নবীগণের আনীত বার্তার প্রতি শুধু বিশ্বস্ত থাকাই নয়, বরং সে অনুযায়ী আমল করা, জীবন পরিচালনা করাই প্রকৃত দায়িত্ব- এই উপলব্ধি জাগ্রত করে দেওয়া। আজ পৃথিবীতে জ্ঞানচর্চার সাথে এই সকল বিষয়ের সংশ্রবহীনতাই সমূহ বিপর্যয়ের কারণ। আজ আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে জীবনের নানাবিধ উপকরণের পর্যাপ্ত উপস্থিতি সত্ত্বেও মূল লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার কারণ আর কিছু নয়, কারণ শুধু জ্ঞানের সাথে উপরিউক্ত বিষয়াবলীর সংশ্রবহীনতা। যার কারণে মানবতার সেবা ও সুরক্ষার পরিবর্তে মানবতার বিপর্যয়ই শুধু বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এক সফরে ওয়াশিংটনে বিভিন্ন স্থানে আমাকে বক্তৃতা করতে হয়েছিল। একদিন ইসলামী সেন্টারে বক্তৃতা করতে হল। আমি পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করিনি। মনে করলাম অনুষ্ঠানের শুরুতে কারী সাহেব কুরআনুল কারীম থেকে যে আয়াত তেলাওয়াত করবেন তার আলোকেই কথা বলব। কারী সাহেব সূরা কাহ্ফ থেকে একটি অংশ তেলাওয়াত করলেন। অংশটিতে বলা হয়েছে যে, এক বাগানের মালিক বলেছিল, আমার মনে হয় না যে, এই বাগান কখনও ধ্বংস হয়ে যাবে। (সুরা কাহফ ৩৫)

কথাটি সে বলেছিল অত্যন্ত ঔদ্ধত্য সহকারে এবং অহংকার থেকে। তার এক সঙ্গী ছিল মুমিন। সে তাকে বলল-

যখন তুমি বাগানে প্রবেশ করলে তখন একথা কেন বললে না যে, আল্লাহ যা চান তাই হয়, আল্লাহর দেওয়া শক্তি ব্যতীত কোন শক্তি নেই। (সূরা কাহফ ৩৯)

আয়াত্তির সূত্র ধরে আমি বললাম, আমেরিকাতে সবকিছু আছে। কিন্তু মা-শা-আল্লাহ আল্লাহ যা চান তাই হয়- একথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার লোক নাই। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, আজ আমেরিকা সবকিছু করে, পরোপকারও করে। কিন্তু এর প্রতিদান স্বরূপ কৃতজ্ঞতাটুকুও তারা পায় না। সারা পৃথিবীতে তাদের কর্মকাণ্ডের কোন ফল প্রকাশ পাচ্ছে না। পৃথিবীর নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, একের প্রতি অপরের বিশ্বাস ও আস্থা, একের প্রতি অপরের শ্রদ্ধাশীলতা এসবের কিছুই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। তার কারণ তাদের কর্মকাণ্ডে আন্তরিকতার অভাব। ঈমান ও ইহতিসাবের অভাব। ঈমানী উত্তাপ ও ঈমানী আলোড়নবিহীন কর্মকাণ্ডের পরিণাম এইরূপই হয়।

আমি বলছি যে, আজ আমেরিকায় সকল নেয়ামত বিদ্যমান, আরাম-আয়েশের সকল উপকরণ বিদ্যমান, শান্তির সকল উপকরণ বিদ্যমান কিন্তু প্রকৃত যে শান্তি লাভের প্রয়োজন ছিল সেই শান্তি লাভ হচ্ছে না। কারণ সেখানে মা-শা-আল্লাহর চেতনা নাই, আল্লাহ যা চান তাই করেন- এই বিশ্বাস নাই। আমরা চাই এরূপ প্রতিষ্ঠান আরও প্রতিষ্ঠিত হোক কিন্তু তা হোক মা-শা-আল্লাহর ছায়াতলে, আল্লাহর নামের আশ্রয়ে। জ্ঞান ও আল্লাহর নাম একসাথে চলুক।

আমি আজ স্পষ্টরূপে বলছি- যদিও কথাটি বলার প্রয়োজন ছিল অতি বড় প্লাটফর্মে তবুও আমাদের এই ক্ষুদ্র মজলিসে কথাটি বলছি যে, যত দিন জ্ঞান ও আল্লাহর নাম জুটি না বাঁধবে, জ্ঞানের সাথে আল্লাহর নাম সম্পর্কযুক্ত না হবে তত দিন এই জ্ঞান দুনিয়ার উপকার সাধন নয় বরং দুনিয়ার ধ্বংস সাধন করবে, দুনিয়া অগ্রসর হবে ধ্বংস অভিমুখে, দুনিয়ার আত্মহননের পথ হবে উন্মুক্ত। জ্ঞানের সাথে আল্লাহর নামকে সম্পৃক্ত করা না হলে কাঙ্ক্ষিত সামাজিক নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, পারস্পরিক আস্থা ও সহানুভূতি ইত্যাদি বিষয়গুলো কখনও অর্জিত হবে না।

আমি আল্লাহর শোকর আদায় করছি এবং আপনাদের সামনে ব্যক্ত করছি যে, আলহামদুলিল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই বুনিয়াদ ও মৌলিক নীতির উপরই। আমার বিশ্বাস ও প্রত্যাশা যে, প্রতিষ্ঠানটি সর্বদা এই ভিত্তির উপরই অবিচল ও অটুট থাকবে। প্রতিষ্ঠানটি চলবে দ্বীনের ছায়ায়, দ্বীনী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঙ্গে নিয়ে, মানবতার কল্যাণকে সাথে নিয়ে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপ করেছেন, যে মর্যাদায় তাদেরকে ভূষিত করেছেন সেই দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং সেই মর্যাদার উপলব্ধি ধারণ করে এই প্রতিষ্ঠানটি চলবে। এইরূপ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আজ তীব্র। আল্লাহর নিকট দুআ করি, যেন এইরূপ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা উন্নতির শীর্ষ সোপানে উপনীত হয়। শুধু এইরূপ কারিগরি প্রতিষ্ঠান নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ে প্রাইমারী স্কুল পর্যন্ত সকল প্রতিষ্ঠানেই আল্লাহর নাম বিদ্যমান থাকা জরুরী।

জরুরী আল্লাহর নামের আলো বিদ্যমান থাকা, তাঁর নির্দেশনা বিদ্যমান থাকা। আল্লাহর নামের প্রতি সমীহ থাকা। শুধু সমীহ নয় বরং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ হতে হবে। এরূপ না হওয়ার কারণেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ সত্ত্বেও নিরাপত্তা ও শান্তি অর্জিত হচ্ছে না এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা মানব সমাজের যটুকু উপকার হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ দ্বীন ও ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন। আমার কথা আমি এখানেই শেষ করছি এবং আপনারা আমাকে যে সম্মান দান করেছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। দুয়া করি প্রতিষ্ঠানটিকে জীবন্ত রাখেন এবং উন্নতি দান করেন।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 আলেমগণের সর্বাপেক্ষা বড় দায়িত্ব আধুনিক যুগের সন্দেহবাদী ব্যক্তিদের হৃদয়ে প্রশান্তি স্থাপন

📄 আলেমগণের সর্বাপেক্ষা বড় দায়িত্ব আধুনিক যুগের সন্দেহবাদী ব্যক্তিদের হৃদয়ে প্রশান্তি স্থাপন


প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! পৃথিবীর ইতিহাসের একটি বড় অংশ যথাযথ সংরক্ষিত হয়েছে এবং সে ইতিহাস নির্ভরযোগ্যও বটে। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক যুগের ইতিহাস সংরক্ষিত হয়নি। পৃথিবীর সব ইতিহাসই যদি সংরক্ষিত হত, প্রাগৈতিহাসিক যুগের নবুওয়াতের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি যদি গুরুত্বারোপ করা হত অথবা বিভিন্ন যুগে অবতীর্ণ আসমানী সহীফা যদি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হত, ঐ সকল সহীফা নাযিলের প্রেক্ষাপট এবং তার বাহকগণ ঐ সকল সহীফার আলোকে যেভাবে মানবজাতিকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন, তাদের সঙ্গে দ্বীনের পরিচয় ঘটিয়ে বিশুদ্ধ জীবনাচারে অভ্যস্ত করেছেন তা যদি সংরক্ষিত হত তাহলে এটা প্রমাণ করা যেত যে, প্রত্যেক যুগে প্রেরিত নবী, তাঁদের নবুওয়াত, তাঁদের আনীত বার্তা, তাঁদের কর্মধারা ও দায়িত্বের সাথে গভীর ঘনিষ্ঠতা ও সামঞ্জস্য ছিল তৎকালীন যুগের প্রয়োজন, তৎকালীন যুগের মানবজাতির ত্রুটি-বিচ্যুতি, তাদের চিন্তাধারা, তাদের জীবনের জ্ঞানগত ও কর্মগত, বিশ্বাসগত ও চরিত্রগত বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার।

বর্তমানে আমাদের নিকট ইতিহাসের যে নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার ও রেকর্ড সংরক্ষিত আছে এবং কুরআন মাজীদের মাধ্যমে আমরা যে আলো ও নির্দেশনা পাই তা দ্বারা আমাদের এই দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়। এর কিছু দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়।

হযরত ইবরাহীম (আ.) যে যুগে প্রেরিত হয়েছিলেন সে যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তৎকালীন যুগের মানব সমাজ তাওহীদের বিশ্বাস বিবর্জিত হয়ে নিকৃষ্ট পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। মনুষ্য মর্যাদা ও সাম্যের ধারণা তৎকালীন মানবসমাজে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছিল। আল্লাহর সঙ্গে প্রেম ও ভালবাসার সম্পর্ক কার্যত বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দাওয়াতের মাধ্যমে যে নব যুগের, যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছিল তা এখনও চলছে এবং সত্যিকারার্থে তাঁর দাওয়াত ছিল তাঁর পূর্ববর্তী যুগ ও তাঁর পরবর্তী যুগের মধ্যকার ভেদরেখা। আমি কোন এক বক্তৃতায় যেমনটা বলেছি যে, পৃথিবীতে যে দুটি ধারা যুগ পরস্পরায় চলে আসছে সে দুটি ধারার জন্য যদি কোন নাম তালাশ করা হয়, তাহলে দুটি নাম আমরা পাব। এক. ইবরাহীমিয়্যাত, দুই. বারহামিয়্যাত (ব্রাহ্মণ্যবাদ)। আমি নুন অক্ষরটিকে (বাংলায় ণ') ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছি, যাতে মানুষ ভুল না বোঝে। এই দুটি ধারা হাজার হাজার বছর ধরে চলছে। প্রথম ধারাটি বিশুদ্ধ তাওহীদের ধারা। এই ধারায় নিহিত রয়েছে মনুষ্য মর্যাদার পুনরুদ্ধার ও নবায়ণ। এই ধারার সাথে সম্পৃক্ত আল্লাহ তাআলার প্রেম ও ভালবাসা, আল্লাহতে লীনতা ও তন্ময়তা।

এই কারণে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনা প্রসঙ্গে তাওহীদের আলোচনা এসেছে বার বার। কোন কোন রুকুর পুরোটা জুড়েই বিশেষত সূরা ইবরাহীমের শেষ রুকুর আয়াতসমূহে বিশুদ্ধ তাওহীদ, আল্লাহর সাথে অপরিমেয় সম্পর্ক, তাঁর প্রেম ও ভালবাসা, তাঁর জন্য নিবেদিত প্রাণ হওয়ার বিষয় আলোচিত হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনে এই সবকিছুর প্রমাণ মেলে তৎকর্তৃক প্রাণাধিক পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর মধ্যে। আল্লাহ তাআলা যার সত্যতা তুলে ধরেছেন এই ভাষায়-

يَا إِبْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ

হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছ। আর আমি এইভাবেই সৎকর্মশীলদেরকে বিনিময় প্রদান করে থাকি। এটা ইবরাহীমী দ্বীনের বৈশিষ্ট্য, ইবরাহীমী মেযাজ ও ইবরাহীমী দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য।

এরপর হযরত সুলাইমান ও দাউদ (আ.)-এর যুগের আগমন ঘটল। যুগটি ছিল রাজ-রাজত্বের ও শিল্প-কারিগরির উৎকর্ষের যুগ। এইজন্য আল্লাহ তাঁদের আলোচনায় বিশেষভাবে সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বের কথা আলোচনা করেছেন।

رَبِّ هَبْ لِى مُلْكًا لَّا يَنْۢبَغِى لِاَحَدٍ مّিনْۢ بَعْدِى

হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন আমার পরে যা অন্য কারও জন্য শোভনীয় না হয়। (সূরা সোয়াদ ৩৫)

আরও বলেছেন-

فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيْحَ تَجْرِىْ بِاَمْرِهٖ رُخَآءً حَيْثُ اَصَابَ

'আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হত যেখানে সে পৌছাতে চাইত।' (সূরা সোয়াদ ৩৬)

এরপরে আলোচনা করা হয়েছে জীনদের সম্পর্কে। আল্লাহ তাআলা কীভাবে তাদেরকে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর বশীভূত করে দিয়েছেন সেই আলোচনা। হযরত দাউদ (আ.) প্রসঙ্গে আলোচনায় তাঁর জন্য লোহাকে কীরূপ নরম করে দেওয়া হয়েছিল সেই আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে-

وَ اَلَنَّا لَهُ الْحَدِيْدَ

'এবং আমি তার জন্য নরম করে দিয়েছি লোহাকে।'

এ থেকে বোঝা যায় যে, সেই যুগটি ছিল শিল্প ও কারিগরি বিদ্যার বিস্তৃতি ও উন্নতির যুগ। এরপর আমাদের সামনে আসে ইউনানী যুগ। এই যুগকে বলা হয়- দর্শন, গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উৎকর্ষের যুগ। হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম ও তাঁর নবুওয়াতের প্রকাশ ঘটেছিল ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে। হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে বিশেষভাবে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি মৃতকে জীবিত করছেন, অসুস্থকে সুস্থ করছেন। হযরত ঈসা (আ.)-এর মসীহী কারিশমা এবং তাঁর জন্য আসমান থেকে খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার উল্লেখ কুরআনুল কারীমে বিবৃত হয়েছে। তাঁর হাতে পর্যাপ্ত মুজিযা প্রকাশের ঘটনা আমরা জানি।

মোটকথা হযরত ঈসা (আ.)-এর যুগের পরিবেশ ও সমাজের সাথে তাঁর হাতে প্রকাশিত মুজিযাসমূহের বেশ মিল ও সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু ইলাহী বিবেচনা খাতামুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য এমন এক যুগ নির্বাচিত করেছে যে যুগ সর্বক্ষেত্রে মানবজাতির উন্নতির যুগ। জীবনের ব্যাপ্তি, জীবনের সকল শাখা-প্রশাখায় মানুষের বিচরণ, মানুষের সমূহ চাহিদা ও সমস্যা এবং সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে মানুষের গভীর সম্পৃক্ততার যুগ। যেহেতু তিনি ছিলেন শেষ নবী, তাঁরই শিক্ষা ও আদর্শকে যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে সেহেতু মানব জীবন ও মানবজাতির জন্য প্রয়োজন ছিল তাদের মধ্যে সুপ্ত আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাকে, শক্তি ও সামর্থ্যকে এবং সফলতার সকল উপকরণকে, তাদের সকল যোগ্যতাকে উজাড় করে দেওয়ার। তাঁর পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নতুন যুগের আগমন ঘটবে না। শেষ নবীর যুগই নিরবচ্ছিন্নভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকবে। অতএব মানুষকে তার বুদ্ধি ও প্রতিভার, তার উপলব্ধি ও জ্ঞানের এবং শক্তি ও সামর্থ্যের প্রয়োগ ঘটাতে হবে পরিপূর্ণরূপে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের ন্যায় মহাগ্রন্থ আপনাদেরকে দান করেছেন। যে কুরআন ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনাহীন দৃষ্টান্ত, যার নজীর কোন মানুষের পক্ষে উপস্থাপন করা অসম্ভব। আরববাসী কবিতা ও সাহিত্যে শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করেও তারা এই কুরআনের অনুরূপ কিছু রচনা করতে পারেনি। অপর দিকে কুরআনুল কারীমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তৃতির এরূপ অমিত সম্ভাবনা সুপ্ত রাখা হয়েছে এবং এরূপ সূক্ষ্ম নির্দেশনা ও ইঙ্গিত তাতে গচ্ছিত রাখা হয়েছে যে, যখনই মানুষের জ্ঞান গবেষণা- চাই তা যে কোন ক্ষেত্রে হোক না কেন, চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হবে তখন তা তার সম্ভাবনাকেই শুধু প্রমাণ করবে না বরং তার বাস্তবতাকে নির্দেশ করবে।

বলতে জ্ঞানের যে মাহাত্ম্য ও বিশালতা ও তার অসীমতা তুলে ধরা হয়েছে তা শুধু কুরআনুল কারীমেই পাওয়া যায়। এর অনিবার্য ফল বের হয় এই যে, এই উম্মতের আঁচলকে জ্ঞানের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই উম্মত জ্ঞান ও বুদ্ধিচর্চা হতে, চিন্তা ও গবেষণা হতে, রচনা ও লেখনী হতে কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না। বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। এটা কুদরতে ইলাহীর ফায়সালা যে, এই উম্মতের অভিযাত্রা, তাদের কর্মতৎপরতা, তাদের রুচি ও ঝোঁক এবং তাদের সফলতা জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ত থাকবে।

সুধী! আমার এই দাবির সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহী। প্রথম যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল তার সূচনা হয়েছিল اقরা 'পাঠ কর' শব্দ দ্বারা।

যদি পৃথিবীর বড় বড় বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী-গুণীকে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করা হত যে, দীর্ঘ পাঁচশত বৎসর পর ওহী অবতরণের মাধ্যমে আকাশ ও পৃথিবীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হতে যাচ্ছে এবং মানুষকে আসমানী বার্তা, ঐশী পয়গাম দান করা হচ্ছে, বলুন তো এই প্রথম বার্তার সূচনা হতে পারে কোন শব্দ বা কোন বাক্য দ্বারা? আমি অকাট্য দাবি করে বলতে পারি যে, তাদের মস্তিষ্কে বিভিন্ন রকম সব শব্দ এবং বিভিন্ন রকম সব বাক্য উদিত হত। কেউ বলত, প্রথম ওহীর সূচনা হওয়া উচিত এই বাক্য দ্বারা-

اعرف نفسك 'নিজেকে চেন।' কারণ মানুষ তখন আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছিল, নিজের উৎসের সন্ধান তারা হারিয়ে ফেলেছিল। কেউ বলত, প্রথম ওহীর সূচনা হওয়া উচিত এই বাক্য দ্বারা-

اعبد ربك 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর।' কেননা তখন মানুষ পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল, বিশুদ্ধ ইবাদত বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। কেউ বলত, এইরূপ, কেউ বলত ঐরূপ। কিন্তু কেউ বলত না যে, اقরা 'পাঠ কর' -এই শব্দ দ্বারা ওহীর সূচনা হওয়া উচিত। কারণ যার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে তিনি নিজে নিরক্ষর। তিনি যে জাতির মাঝে প্রেরিত হয়েছেন সেই জাতিও নিরক্ষর। আল্লাহ তাআলা বলেন-

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ 'তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্য হতে।' ইয়াহুদীরাও তাঁকে উম্মী বলত। যে দেশে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন সে দেশটি ছিল উম্মী বা নিরক্ষর দেশ। যে শহরে ওহী নাযিল হচ্ছিল সেই শহর তথা মক্কায় প্রচুর অনুসন্ধানের পর সাক্ষর ব্যক্তি হয়তো পাওয়া যেত দুই-চারজন, এর বেশি নয়। লেখাপড়া জানা ব্যক্তির জন্য পৃথিবীতে বহু শব্দের ব্যবহার প্রচলন রয়েছে। লেখাপড়া জানা ব্যক্তিকে বলা হত কাতেব। কলম দ্বারা লিখতে পারাটাকেই মনে করা হত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ গুণ। যেন লিখতে পারাটা এক মহা দুঃসাধ্য কর্ম।

আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে জ্ঞান আত্মস্থ করার এবং জ্ঞানের সব দাবি পূরণের যে অসাধারণ যোগ্যতা ও দক্ষতা দান করেছেন এবং এই উম্মতের সাথে জ্ঞানের যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন তাকে আমরা এক কথায় চুম্বক বলে ব্যক্ত করতে পারি। এ কারণেই প্রতি যুগে জ্ঞানের সাথে এই উম্মতের সম্পর্ক অটুট রয়েছে এবং এই কারণেই প্রত্যেক যুগে এই উম্মত নতুন নতুন জ্ঞানী-গুণী, নতুন নতুন শাস্ত্রজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ ও জিনিয়াস ও প্রতিভা জন্ম দিয়েছে।

যত দিন জ্ঞানের অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে তত দিন সমূহ জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি হতে থাকবে। চাই তা সভ্যতা সংক্রান্ত হোক কিংবা জ্ঞান সংক্রান্ত হোক কিংবা বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সমাজনীতি সংক্রান্তই হোক। দ্বীন ও শরীয়তের আলোকে সেই সকল জিজ্ঞাসার জবাব প্রদানও অব্যাহত থাকবে, উদ্ভুত সকল সমস্যার সমাধান দানও অব্যাহত থাকবে। উদাহরণস্বরূপ আমরা সাহাবায়ে কেরাম, ইমাম চতুষ্টয় এবং উম্মতের অন্যান্য মুজতাহিদগণকে পেশ করতে পারি। এটাকে নিছক আকস্মিক কোন ঘটনা বলা যায় না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সজীব মস্তিষ্কের অধিকারী ও প্রতিভাবান এরূপ ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, যাঁরা রোম ও ইরানের ন্যায় উন্নত সভ্যতার অধিকারী সাম্রাজ্যের মোকাবেলা করতে এরূপ যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, যার কোন দৃষ্টান্ত অন্য কোন ধর্ম উপস্থাপন করতে পারবে না। তদ্রূপ ইমাম চতুষ্টয় ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এরূপ প্রতিভাবান আইনবিদ ছিলেন যে তাঁরা জীবন ও দ্বীনের মৌল নীতিমালার মধ্যে সঙ্গতি বিধান করতে এরূপ অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন, যা না রোমীয়দের মধ্যে পাওয়া যায়, না ইরানীদের মধ্যে, না ইউনানীদের মধ্যে, না অন্য কোন জাতির মধ্যে। তাঁরা ছিলেন স্ব-যুগের সর্বাধিক প্রতিভাবান ব্যক্তি। তাঁদের কীর্তি শত শত বৎসর যাবৎ দীপ্যমান ও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাঁদের কীর্তির সঠিক মূল্যায়ন আজ কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

যখন ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞান আরবী ভাষায় অনূদিত হল তখন তা ইলম ও জ্ঞান চর্চাকারীদের মধ্যে যে কিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা আজ আর কেউ অনুমানও করতে পারবে না। ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সামনে মানুষ তখন হয়ে পড়েছিল বুদ্ধি-বিভ্রান্ত। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনা তখন এক রকম ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকাকে মানুষ গর্বের বিষয় বলে মনে করত। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী, সাইয়েদ আবদুল কাদের জিলানী, ইমাম গাযযালী, মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী, শায়খ মঈনুদ্দীন চিশতী, হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখ প্রতিভাবান ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাদের নিজ নিজ যুগে সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা যুগের স্রোত ও গতিকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে যুগকে দিয়েছিলেন বিশুদ্ধ গতি ও স্রোত। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তারা মোকাবেলা করেছিলেন ভ্রান্ত ইউনানী জ্ঞান-বিজ্ঞানের এবং সমূহ বিপদ থেকে দ্বীনকে করেছিলেন নিরাপদ।

যুবক শ্রেণীর মন-মস্তিষ্ককে সমূহ সন্দেহ ও সংশয়ের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে নতুনভাবে তাদের মন ও মস্তিষ্কে ঈমান ও ইয়াকীনের ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

১৮৫৭ সালের পর ইংরেজ-সংস্কৃতি ও আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ঠিক একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাবে এরূপ প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েছিল যে, সরাসরি দ্বীনকে অস্বীকার না করলেও দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান ও সংশয়যুক্ত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন যুগের অটল ঈমানের অধিকারী পরিবার সমূহ থেকে জন্ম নেওয়া মাশায়েখ ও সুফীগণের অবস্থাও ছিল এইরূপ যে, যদি তাঁদের পিতা-মাতার বিশেষ তত্ত্বাবধান তাঁদের প্রতি না থাকত এবং তাঁরা যদি বুযুর্গদের সংসর্গ লাভ না করতেন, বুযুর্গদের সতর্ক দৃষ্টির অধীনে যদি তাঁরা প্রতিপালিত না হতেন, তাহলে চিন্তা ও বিশ্বাসগত ইরতিদাদ ও বিচ্যুতি ব্যাপক আকার ধারণ করত এবং গোটা হিন্দুস্তান এই ইরতিদাদের শিকার হয়ে যেত।

আল্লাহ তাআলা যদি তাঁর করুণায় ঠিক সময় মতো যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ না করতেন, তাহলে তিনিই জানেন এই দেশের মুসলমানদের অবস্থা কী রূপ হত। এটা শুধু হিন্দুস্তানের বৈশিষ্ট্য নয়, যখনই ইসলামী ইতিহাসের দীর্ঘকালীন সময়ে এই ধরণের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তখনই আল্লাহ তাআলা এরূপ কিছু ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যাঁরা দ্বীনের সাথে এই উম্মতের সম্পর্ক অটুট রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন এবং সফলতা লাভ করেছেন। এই ধারা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকা প্রয়োজন, থাকা উচিত।

আমাদের দায়িত্ব হল- এই ধারাকে অব্যাহতভাবে চলমান রাখা। আমি আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দকে বলতে চাই, কোন জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন বড় আলেম ও লেখক ও গবেষক সৃষ্টি হয়ে যাওয়া যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠান এমনকি দ্বীন ও মাযহাবও ইতিহাস দ্বারা চলে না। বরং তা চলে এই ধারা অব্যাহতভাবে গতিমান থাকার দ্বারা। কোন কর্মসূচী ও আন্দোলন কোন একজন গবেষক ও চিন্তাবিদ সৃষ্টি করে দিল কিংবা একজন বড় লেখকের জন্ম দিয়ে দিল- শুধু এতটুকুই যথেষ্ট নয়।

এটা স্মরণে রাখতে হবে যে, যখন নিজেদের পূর্বসূরীদের কীর্তি নিয়ে শুধু গর্ব করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়, তখন নিজেদের চিন্তাশক্তি অথর্ব ও অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। নিছক পূর্বসূরীদের কীর্তিচর্চা মানুষের কর্মদক্ষতা ও চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। জনৈক আরব কবি অতি চমৎকারভাবে এই সত্যকে ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন-

الهي بني تغلب عن كل مكرمة قصيدة قالها عمر و بن كلثوم

'বনু তাগলিবকে বিরোচিত কোন কৃতিত্ব, বড় কোন বিজয় অর্জন করতে এবং বড় কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধার সৃষ্টি করেছে শুধু একটা বিষয়। আর তা হল, তারা শুধু আমর ইবনে কুলছুম রচিত কাসিদা আবৃত্তি করে এবং তাতেই তারা বিভোর থাকে।' এই রোগ কোন প্রতিষ্ঠানেও সৃষ্টি হতে পারে, কোন দলের মধ্যেও সৃষ্টি হতে পারে। দলের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা দলের মধ্যকার কোন বিখ্যাত ব্যক্তির রচনা, গবেষণা তাঁর উন্নত ও উচ্চ চিন্তা-চেতনা দলের জন্য গর্বের বিষয় হল। দল তাই নিয়েই শুধু গর্ব করতে থাকল। কিন্তু এ দ্বারা কাজ চলবে না। দল হোক, প্রতিষ্ঠান হোক, মাদরাসা হোক বরং বলতে পারি পুরো জাতি হোক কারও জন্যই এরূপ পূর্ব ইতিহাস নিয়ে শুধু গর্ব করলে চলবে না।

একথা বলাতে কোন লাভ নেই যে, এই জাতি গাযযালী, ইবনে তাইমিয়াহ ও শাহ ওয়ালীউল্লাহর ন্যায় ব্যক্তিত্ব উপহার দিয়েছে। এই বললে চলবে না যে, আমরা অমুক অমুক নগর ও জনপদ আবাদ করেছি। সমরকন্দ, বোখারা, গ্রানাডা, আশবিলিয়াহ ও দিল্লীকে আমরা আবাদ করেছি, সমৃদ্ধ করেছি। বরং প্রয়োজন প্রত্যেক যুগেই ঐরূপ ব্যক্তিত্বের জন্মলাভ অব্যাহত থাকা। প্রয়োজন স্ব-স্ব যুগের চিন্তাগত ও বিশ্বাসগত অস্থিরতার অনুসন্ধান, এর কারণ নির্ণয় এবং তদনুযায়ী যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। দ্বীনী আদর্শ ও শিক্ষাকে, দ্বীনের মৌল নীতিমালা সমূহকে বাস্তব জীবনের ঘটনাবলী ও কার্যক্রমের সাথে, জীবনযাত্রায় উদ্ভুত সমস্যাসমূহের সাথে সঙ্গতি বিধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ। প্রত্যেক যুগে ইসলামী আইনের মর্যাদাকে সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করণ।

আল্লামা ইকবাল তাঁর এক চিঠিতে লিখেছেন, এই যুগে সবচেয়ে বড় মুজাদ্দিদ সেই ব্যক্তি যে অন্যান্য আইনের উপর ইসলামী আইনের উচ্চতা ও মর্যাদাকে সুপ্রমাণিত করবে। আল্লামা ইকবাল ষাট বৎসর পূর্বে যে কথা বলেছিলেন তা আজ এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ইসলামী শরীয়ত বিশেষত পারিবারিক বিধি-বিধানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা। ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য, তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য ইসলামী বিধি-বিধানই যে সর্বোত্তম উপায় তা প্রমাণ করা।

আমরা আমাদের প্রিয় ছাত্রবৃন্দের উদ্দেশ্যে বলব যে, তারা কঠোর অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দ্বীনী ইলমে পাণ্ডিত্য অর্জন করুক। অতঃপর আধুনিক জিজ্ঞাসা সম্পর্কে অবহিত হোক এবং দ্বীনের আলোকে সেগুলোর সমাধান দান করুক।

দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামা গর্বিত যে, প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরীর ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন, আলোকিত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিত্বের সাথে এবং 'সীরাতুন নবী'র লেখক আল্লামা শিবলী নুমানীর ন্যায় ধর্মতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও সীরাত রচয়িতার সাথে।

বাস্তবতা হল, আজ পর্যন্ত ইলমী ও দ্বীনী বিষয়ে লেখনী ধারণ এবং ইলমী ও দ্বীনী বিষয়কে কার্যকর ও প্রভাব বিস্তারকারী রূপে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আমার জানা মতে আল্লামা শিবলী নুমানীর পদ্ধতি ও ধরণ অপেক্ষা উত্তম কোন পদ্ধতি ও ধরণ হতে পারে না। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে সাইয়েদ সুলাইমান নদভী, আবদুস সালাম নদভী প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের ন্যায় ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এতটুকু তো যথেষ্ট নয়। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, আপনারা এই জাতীয় জলসায় শুধু তাঁদেরই নাম উচ্চারণ করতে বাধ্য হন, নতুন কোন নাম এই তালিকায় সংযুক্ত করতে পারেন না। এটা এই প্রতিষ্ঠানের অধঃগতি ও অবক্ষয়ের প্রমাণ এবং গোটা জাতির জন্য শঙ্কার বিষয়। এটা কত বড় দুঃখের কথা যে, কোন ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত মানে উত্তীর্ণ নতুন কোন ব্যক্তি সৃষ্টি হচ্ছে না।

কোন কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এখানকার অবস্থাও অভিন্ন। সেখানেও এখন জ্ঞান গবেষণা ও চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানের মত ব্যক্তিত্বের অভাব। এ রকম কোন ব্যক্তি নেই যিনি ইউরোপ আমেরিকায় লেখাপড়া করা নতুন প্রজন্মকে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার উপকরণ সরবরাহ করতে পারেন। এমন কোন পুস্তিকা বা গ্রন্থ নেই, যাতে দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক জিজ্ঞাসা ও সমস্যার জবাব ও সমাধান দান করা হয়েছে। জ্ঞান গবেষণা ও ভাষার মান নিম্নমুখী ও নিতান্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেসব পুস্তিকা আছে তা নির্দিষ্ট দল ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, নির্দিষ্ট মত ও পথ কেন্দ্রিক। তাতে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা মূলত নির্দিষ্ট দল, নির্দিষ্ট মত ও পথের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সেসব পুস্তিকা লিখিত হয়েছে। এই অবস্থা বড় ভয়াবহ। যে আলেমগণের দায়িত্ব ছিল যুবক শ্রেণীর আস্থা ও বিশ্বাসকে ইসলামের পক্ষে সুসংহত করা, যাদের দায়িত্ব ছিল ইসলামের সত্যতা ও চিরন্তনতা প্রমাণ করা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের প্রয়োজনীয়তা ও কল্যাণকারিতা প্রমাণ করা তাঁরা এখন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে লিপ্ত। এটা বড় সর্বনাশা ব্যাপার। যদি এই উম্মতের মধ্যে দ্বীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নেককার মুত্তাকী ব্যক্তি উপস্থিত থাকে তবুও উপরিউক্ত প্রয়োজন সব সময়ই অবশিষ্ট থাকবে।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা অপরিহার্য

📄 দ্বীনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করা অপরিহার্য


সুধী! আমি আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

يا أيها الذين امنوا قوا أنفسكم وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلئِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

হে ঐ সকল ব্যক্তিগণ, যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর ঐ আগুন থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন এবং তারা তা-ই করে যা তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়। (সূরা তাহরীম ৬)

সুধী! আমি আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আয়াতটি আপনাদের সামনে এর পূর্বেও অনেকে তেলাওয়াত করে থাকবেন। আপনাদের নিজেদের তেলাওয়াতের সময়ও আয়াতটি আপনাদের দৃষ্টিতে পড়ে থাকবে। অবশ্য কোন বিষয় বার বার সামনে আসা সত্ত্বেও অনেক সময় তা গভীর দৃষ্টিতে ও মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখা হয় না। আপনি একই রাস্তায় বার বার আসা-যাওয়া করে থাকেন, রাস্তাটির উভয় পার্শ্বে অনেক সাইনবোর্ড টানানো থাকে আপনি সেগুলোকে বার বার দেখেও থাকেন। কিন্তু আপনি নিজেই চিন্তা করুন এ সকল সাইনবোর্ডের কতটিকে আপনি মনোযোগ সহকারে দেখেছেন এবং তাতে কী লেখা আছে তা মনে রেখেছেন? আপনাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, বলুন তো এসব সাইনবোর্ডের মধ্যে কয়টি সাইনবোর্ড গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংক্রান্ত? আপনাদের মধ্যে কম লোকই তা বলতে পারবে।

আয়াতটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং চমকে দেওয়ার মত। কোন জিনিস বার বার সামনে আসলে অনেক সময় তা সাধারণ ও মামুলী বিষয় বলে গণ্য হতে থাকে- তা না হলে আয়াতটি এতই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী যে, আমি অনুরোধ করতাম এবং জোর দিয়ে বলতাম যে, আয়াতটি দেয়ালে দেয়ালে স্পষ্ট অক্ষরে লিখে রাখা হোক। সাইনবোর্ড আকারে লিখে মসজিদে মসজিদে টানিয়ে দেওয়া হোক।

আল্লাহ তাআলা বলছেন, হে ঐ সকল লোক, যারা নিজেরা ঈমান এনেছ- يا أيها الذين امنوا -এর মধ্যকার امنوا শব্দটি অতীতকাল বাচক ক্রিয়াপদ। প্রতিটি শব্দ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। কুরআন মাজীদের কোন শব্দের ব্যবহারই যথেচ্ছাচার-নির্ভর নয়, অপরিকল্পিত নয়। এটা কবিতা কিংবা কাব্যগ্রন্থ নয়। এর প্রতিটি শব্দই তাৎপর্যপূর্ণ। أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ হে মুমিনগণ! বা أَيُّهَا الْمُسْلِمُونَ হে মুসলমানগণ বলা যেত, কিন্তু তা বলা হয়নি। বলা হয়েছে يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا হে ঐ সকল লোক, যারা ঈমান এনেছ قُوا أَنْفُসَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّাসُ وَالْحِجَارَةُ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর ঐ আগুন থেকে যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। আয়াতটিতে প্রথম সম্বোধন যাদেরকে করা হয়েছে তাঁরা ছিলেন মুসলমান, তাঁরা ছিলেন সাহাবী। কুরআন অবতরণের সময় কালে যাঁরা ছিলেন বর্তমান। তাঁরাই ছিলেন আয়াতের সম্বোধনের প্রধান লক্ষ্য। এমনিতে তো কিয়ামত পর্যন্ত যে সকল মানুষ জন্ম নেবে তাদের সকলেই এই আয়াতের সম্বোধনের লক্ষ্য। কিন্তু প্রথম লক্ষ্য তাঁরাই যাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে ঈমান এনেছেন। যাঁরা সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিশ্চয়ই ঐ সকল সাহাবীও ছিলেন, যাঁরা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যাঁরা হুদায়বিয়াতে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রাসুলের হাতে হাত রেখে ইসলামের জন্য জীবন দানের শপথ করেছিলেন। যাঁদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُবָايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا

'আল্লাহ তো মুমিনগণের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়আত গ্রহণ করল এবং তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি অবগত হলেন; ফলে তাদের উপর তিনি নাযিল করলেন প্রশান্তি এবং তাদেরকে পুরস্কার দান করলেন আসন্ন বিজয়।' (সূরা ফাতহ ১৮)

যাদেরকে স্থায়ী সনদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এইরূপ সনদপ্রাপ্ত উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীগণও ছিলেন আলোচ্য আয়াতের সম্বোধনের লক্ষ্য। নিশ্চয়ই আশারায়ে মুবাশশারা বিল জান্নাহ সাহাবীগণও এই সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বড় বড় সাহাবীগণ।

এখন আমি আপনাদের নিকট প্রশ্ন করি, কোন ব্যক্তি কি জেনে-শুনে তার সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে আগুনে নিক্ষেপ করে কিংবা আগুনে ঝাঁপ দিতে দেয়? তাহলে এই আয়াতে যে বলা হল, হে ঐ সকল লোক, যারা নিজেরা ঈমান এনেছ তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর- এর অর্থ ও তাৎপর্য কী?

আপনারা কি ইতিহাসে এরূপ কোন ঘটনার কথা পাঠ করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে আগুনে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেছিল কিংবা তাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজন আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছিল, আর তারা নিশ্চুপ বসে বসে তামাশা দেখছিলেন? তাহলে কেন তাদের উদ্দেশ্যে এই কথা বলা হল যে, হে ঐ সকল লোক, যারা ঈমান এনেছ তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর? এটা কি বিনা প্রয়োজনে বলা হয়েছে? এটা কোন আগুন ছিল? কবে এই ঘটনা ঘটেছিল যে, মুসলমানদের সন্তান ও পরিবার-পরিজন আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হয়েছিল আর মুসলমানরা আরামের ঘুম ঘুমাচ্ছিল, তাদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল না, ফলে আল্লাহ তাদেরকে সচেতন করতে ওহী নাযিল করলেন, আর তাতে সকলে চমকে গেল, সচেতন হল এবং নিজেদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে চেষ্টা করল? বলাবাহুল্য, এইরূপ ঘটনা কখনও ঘটেনি। তাহলে এই আয়াতের মর্ম ও তাৎপর্য কী?

আয়াতটির মর্ম এছাড়া আর কিছুই নয় যে, তোমরা তোমাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে এরূপ বিষয় থেকে এরূপ কাজ-কর্ম থেকে রক্ষা কর, যার পরিণতি হবে তাদের জাহান্নামে প্রবেশ। কোন মানুষ নিজ সন্তান বা পরিবার-পরিজনকে আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হতে দেখলে তাকে রক্ষার চেষ্টা না করে পারে না। কিন্তু শঙ্কার বিষয় শুধু একটাই যে, মানুষ জানে না কোন্ কর্মে, কোন্ কারণে আগুনে জ্বলতে হয়। সুতরাং আয়াতের মর্ম দাঁড়াল এই যে, ঐসব আমল থেকে তাদেরকে রক্ষা কর, যা আগুনে প্রবেশের কারণ হয়। ফিকহের পরিভাষায় ঐসব আমলকে বলা হয়, আসবাবে মুআদ্দিয়াহ (কোন কিছুতে উপনীতকারী কারণ)। অর্থাৎ ঐ সকল কারণ যা কোন পরিণামের দিকে ধাবিত করে। ফিকাহ বিদগণের মতে ঐসব কারণ ও পরিণাম প্রকারান্তরে একই বিষয়। উদাহরণ স্বরূপ কেউ যদি এমন ঔষধ কাউকে পান করায়, যা মৃত্যু ডেকে আনে তাহলে এই ঔষধ প্রদান হত্যার সমার্থক হবে। কেননা সে এরূপ কারণ অবলম্বন করেছে, যার ফলে মৃত্যু অনিবার্য। আইনও তাকে হত্যাকারী বলেই সাব্যস্ত করবে এবং চিকিৎসকরাও তাকে হত্যাকারী বলে সাব্যস্ত করবে।

এখন আমি আপনাদের নিকট আরজ করছি যে, বর্তমান পরিস্থিতি এইরূপই। সন্তানদেরকে দ্বীনী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাদেরকে ন্যস্ত করা হচ্ছে ধর্মহীন শিক্ষার পরিবেশে। ঐ সকল লোকের ইচ্ছা ও মর্জির উপর তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যে শিক্ষার উপর পরকালীন মুক্তি নির্ভরশীল, পয়গম্বরগণের আনীত যে শিক্ষা না থাকার পরিণতি হল ঈমানহারা হওয়া শিশুদেরকে সেই শিক্ষাদানের ব্যাপারে যাদের ন্যূনতম দায়িত্ববোধ নেই এবং যারা ঐ শিক্ষাদানের উপযুক্তও নয়। দেখার বিষয় হল তাহলে এই বিষয়টা সন্তানদের জন্য কিভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে? বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শুধু ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা নয়; বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা দ্বীন ও তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শগত শিক্ষাব্যবস্থা। বৃটিশ শাসনামলের শিক্ষাব্যবস্থাও ছিল ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা। তৎকালীন পাঠ্য পুস্তকে কুকুর-বিড়ালের কাহিনী থাকত। আমাদের অনেকেই তৎকালীন যুগে ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তৎকালীন যুগের ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ্য পুস্তক ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসে কোন বিরূপ প্রভাব বিস্তার করত না, ঐসব পাঠ্যপুস্তক দ্বারা সৃষ্ট কোন বস্তুর প্রতি দাসত্ব মনোভাব সৃষ্টি হত না এবং এই জগতে কোন মাখলুকের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার ধারণাও সৃষ্টি হত না। সেই সময়কার পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষার্থীরা বাঘ, ভালুক, শিয়াল, নেকড়ে আর বিড়াল-কুকুরের কাহিনী ও গল্প পাঠ করত। বাড়ী থেকে যেরূপ মানসিকতা নিয়ে পাঠশালায় যেত সেই মানসিকতা নিয়েই ঘরে ফিরে আসত। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারী সিলেবাসভুক্ত পাঠ্যপুস্তকে আকীদা-বিশ্বাসের উপর প্রভাব বিস্তারকারী সমূহ উপাদান, গল্প ও আলোচ্য বিষয়াদি বিদ্যমান থাকে। আকীদা-বিশ্বাস বিনষ্টকারী উপাদানে যতটুকু ঘাটতি থাকে শিক্ষকগণ তা পূর্ণ করে দেন। শিক্ষার্থীদেরকে সম্মিলিতভাবে কিছু কাজ এইরূপ করতে হয়, যা তাওহীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দেখুন, রাস্তা এরূপ ঢালু যেখানে ঠিকমত পা জমে না। এরূপ ঢালু রাস্তায় কোন বালক সাইকেল চালাচ্ছে। সামনে গভীর বড় গর্ত রয়েছে। সাইকেলের ব্রেকও ঠিকমত কাজ করছে না। পিতা বসে বসে দেখছেন কিন্তু তাকে বাধা দিচ্ছেন না। অথচ তিনি জানেন যে, তার ছেলের সাইকেলটির ব্রেক ঠিকমত কাজ করে না, তিনি এটাও জানেন যে, সাইকেল চালিয়ে ঐ রাস্তায় গেলে তার ছেলের জীবন রক্ষা পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। এমতাবস্থায় আপনারা কি বলবেন না যে, পিতাই ছেলেটিকে ঐ গর্তে নিপতিত করে তার জীবন ধ্বংস করেছে?

তাহলে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা ঈমান কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে যদি সন্তানের জন্য দ্বীনী শিক্ষার ভিন্ন কোন ব্যবস্থা না করা হয় (যাকে আমরা সাইকেলের ব্রেকের সঙ্গে তুলনা করতে পারি)? স্কুলে বাচ্চারা যা পাঠ করে এবং যা শিক্ষা লাভ করে তার সংশোধনের ব্যবস্থা না করা হয়? যদি বাচ্চাকে ঈমানী ও তাওহীদী ব্যবস্থা দেওয়া হয়, প্রভাতকালীন অথবা সান্ধ্যকালীন মক্তবে প্রেরণ করা হয়, দ্বীনী আলোচনা সভায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, পিতা-মাতা নিজেরাও তাদেরকে দ্বীনের উপদেশ দান করে, উৎসাহব্যঞ্জক ও দ্বীনী অনুপ্রেরণা মূলক ভাল ভাল কিসসা-কাহিনী তাদেরকে শোনানো হয়, ঘরের পরিবেশও দ্বীনের অনুকূল হয়, তবে তো এসব এক প্রকার ব্রেকের কাজ করবে। পক্ষান্তরে এসব যদি না হয় তাহলে আপনি যেন আপনার সন্তানদেরকে কানে কানে বলে দিলেন যে, স্কুলে শিক্ষা লাভ করা সব বিষয়ই মেনে নেবে। হাঁ আপনি আপনার সন্তানদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন আর তার জন্য দ্বীনী শিক্ষার ভিন্ন কোন ব্যবস্থা করলেন না, তবে তার কানে যেন এই কথাই বলে দেওয়া হল যে, স্কুলের সব বিষয়ই মেনে নেবে। আপনি যেন আপনার সন্তানদেরকে একপ্রকার উৎসাহ দান করলেন ইসলাম বিরোধী সব কথা মেনে নিতে। তার দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন না, মহল্লায় কোন মক্তবও চালু নেই, দ্বীনী পুস্তকাদিও সে পাঠ করে না তাহলে আপনি বলুন আপনার উদ্দেশ্যে কি বলা হয়নি قوا انفسكم واهليكم نارا তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর?

লাক্ষ্ণৌতে মহিলাদের একটি মাহফিলে আমি একজন মমতাময়ী মায়ের গল্প বলেছিলাম। সুশিক্ষিতা ঐ মা একবার একটি আপ্যায়ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। অন্য মহিলারা মহিলাটিকে বেশ অস্থির, বিষণ্ণ ও চিন্তিত দেখতে পেল। তারা দেখল যে, কোন কথায় মহিলাটির মন বসছে না। অনেক দিন পর সকলেই একত্রিত হয়ে আনন্দ-ফুর্তির কথাবার্তা বলছে কিন্তু ঐ মহিলা কোন কিছুতেই আনন্দ পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে- যেন তার মন-মস্তিস্ক অন্য কোথাও পড়ে আছে। অন্যরা তাকে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার বোন! শরীর খারাপ? মনে কোন বেদনা আছে কি? অনেক জিজ্ঞাসার পর মহিলাটি বলল, না এসব কিছুই নয়। আসলে আমি ঘরে আমার শিশুটিকে রেখে এসেছি। এদিকে রান্নাঘরের দিয়াশলাইয়ের কৌটাটা সামলে রেখে আসিনি। ফলে আমার খুব আশঙ্কা হচ্ছে আমার বাচ্চা না পাছে দিয়াশলাই থেকে কাঠি বের করে আগুন জ্বালিয়ে নেয়। সঙ্গিনী মহিলারা বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন! আপনার বাচ্চার বয়স কত? মহিলাটি জবাব দিল- এই বছর দুয়েক হবে। দেখুন, বাচ্চা দিয়াশলাইয়ের বাক্স খুলতে জানে কি জানে না, যদি জানে তবে দিয়াশলাইয়ের কাঠির বারুদ যুক্ত দিক দিয়ে ঘষা দেবে কি উল্টো দিক দিয়ে ঘষা দেবে এই উভয় রকম সম্ভাবনাই বিদ্যমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও মা বিচলিত হয়ে পড়েছেন। তার কল্পনায় ভেসে উঠছে তার বাচ্চা খেলতে খেলতে সেখানে গেল। দিয়াশলাইয়ের কৌটা খুলল। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বের করে দিয়াশলাইয়ের বারুদযুক্ত পাশে কাঠির বারুদযুক্ত দিক দিয়ে ঘষা দিল। ফলে আগুন জ্বলল আর তার বাচ্চার কাপড়ে আগুন লেগে গেল। এইসব কিছু দূর সম্ভাবনার বিষয় হলেও মমতাময়ী মা এই সম্ভাবনাযুক্ত শঙ্কাকেই নিশ্চিত মনে করে বিচলিত হয়ে পড়ছে।

দ্বীন পরিপন্থী পরিবেশে দ্বীন ও ঈমান বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কি জীবন নাশের সম্ভাবনা অপেক্ষা গুরুতর নয়? আপনাদের যে বাচ্চারা স্কুলে লেখাপড়া করছে আপনি কি তাদেরকে কোন দিন শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছেন যে, তাওহীদ কী? নিজেদের শহর ও মহল্লায় দ্বীনী মক্তব প্রতিষ্ঠার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। না ঘরে দ্বীনী পরিবেশ আছে, না মহল্লায়। এই অবস্থায় তাদের দ্বীন ও ঈমান কিভাবে সংরক্ষিত হবে? স্কুলের ব্যাপারে কী বলব, আরবী মাদরাসাগুলোর অবস্থাও এই দাঁড়িয়েছে যে, যে সকল শিশুরা এখানে আসছে তারাও ঐসব মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ, আমাদের শৈশবে যেসব বিষয়ে কোন মুসলমান শিশুর অজ্ঞ থাকার কল্পনাও আমরা করতে পারতাম না।

এই অবস্থার পরিণতি কী হবে? পরিণতি হবে এই যে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম দ্বীন সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ থেকে যাবে। উর্দু পড়তে পারবে না। বর্তমানে অবস্থা এই যে, ঐহিত্যের অধিকারী একটি বড় মাপের তিব্বীয়া কলেজের এক ছাত্রকে বলা হল একটি প্রবন্ধ লিখতে। ধারণা করা হল যে, যেহেতু তিব্বিয়া কলেজের পাঠ্যপুস্তক সব আরবী, ফার্সী ও উর্দু ভাষায় রচিত সেহেতু সে প্রবন্ধটি কমপক্ষে উর্দুতে লিখবে। কিন্তু দেখা গেল যে, সে হিন্দীতে তা লিখে এনেছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ছেন অথচ উর্দু লিখতে জানেন না? উত্তরে সে বলল, আমাদেরকে হিন্দীই পড়ানো হয়েছে। তো বলছিলাম যে, নতুন প্রজন্মের ব্যাপারে আমাদের আশঙ্কা অমূলক নয়, বাস্তবও বটে। দ্বীনের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ, মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে অজ্ঞ, আমাদের অন্তরে আল্লাহ ও রাসূল সম্পর্কে যে বিশ্বাস বিদ্যমান সে সম্পর্কে অজ্ঞ প্রজন্ম যথারীতি সৃষ্টি হয়ে গেছে। একজন মুসলিম ছাত্রকে সীরাত সম্পর্কে একটি রচনা লিখতে বলা হলে, সে তা হিন্দিতে লিখল এবং পাঠ করল উর্দু উচ্চারণে। শব্দ তো উর্দু কিন্তু Script ও বর্ণমালা হিন্দির।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক আর্নল্ড টয়েনবি লিখেছেন, এখন কোন জাতিকে ধ্বংস করতে তাদের গ্রন্থাগারে আগুন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু Script তথা তাদের ভাষার হস্তলিপি ও বর্ণমালা পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট। এর দ্বারা ঐ জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে তাদের সম্পর্ক বিনষ্ট হয়ে যাবে, তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। এরপর তাদেরকে যে দিকে ইচ্ছা সেদিকে পরিচালিত কর। যে জিনিস জাতিকে তার অতীত ও ঐতিহ্যের সাথে, তার মতাদর্শ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ সৃষ্টি করে তা হল ঐ জাতির Script তথা হস্তলিপি ও বর্ণমালা। হস্তলিপির পরিবর্তন হল তো জাতিরও পরিবর্তন হল। ভারতে তাই হচ্ছে। দলগত বিভেদে লাভ কিছুই হয় না, দেশের বদনাম হয়। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন যদি হয়ে যায়, তাহলেই আমাদের সর্বনাশের জন্য যথেষ্ট। আজ থেকে ষাট বৎসর পূর্বে মরহুম আকবর এলাহাবাদী বলেছেন-

শায়খ মরহুমের কথাটি আজ আমার খুব মনে পড়ে হৃদয় বদলে যাবে শিক্ষা বদলে গেলে।

আমাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিছু সময় লাগবে। ত্রিশ-চল্লিশ বৎসরের মধ্যে এরূপ এক প্রজন্মের সৃষ্টি হবে যাদের নিকট কুফর ও ঈমানের পার্থক্য, তাওহীদ ও শিরকের পার্থক্য, আকীদা-বিশ্বাসের পার্থক্য এসব কিছুই নিরর্থক বলে মনে হবে।

মুসলমান পিতা-মাতা তাদের সন্তানের ক্যারিয়ার ক্ষতি হবে আশঙ্কায় সন্তানদেরকে মাতৃভাষা উর্দু লেখায় না, পড়ায় না। তাদের দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। তাদের ক্যারিয়ারের সাথে এগুলো কি সাংঘর্ষিক? একজন মুসলমানের চেতনা তো এরূপ দৃঢ় হওয়া উচিত যে, যদি সে কোনভাবে বুঝতে পারে, তার সন্তানের ভাগ্যে ইসলাম নেই কিংবা খোদা না করুন সে মুসলমান থাকবে না তবে সে দুআ করবে, হে আল্লাহ! আমার এই সন্তানকে ভালোয় ভালোয় উঠিয়ে নাও। মুসলমানের শান এটাই।

একজন মহিলা সাহাবীয়া ছিলেন। নাম ছিল খানসা (রাযি.)। কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর হৃদয় ছিল কোমল। তিনি তাঁর মৃত দুই ভাইয়ের শোকগাথা রচনা করে সব সময় বেদনার্ত হৃদয়ে তা আবৃত্তি করতেন। বলা যায় যে, কোন ভাষায় নারী কর্তৃক রচিত শোকগাথার এত বড় ভাণ্ডার আর নেই। এই কোমল হৃদয়ের অধিকারিণী নারী একটি জিহাদ উপলক্ষ্যে তাঁর এক সন্তানকে ডাকলেন এবং বললেন, বৎস! তোমাকে আমি এই দ্বীনের জন্যই লালন-পালন করে বড় করেছি। যাও, আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়ে দাও। অতঃপর দ্বিতীয়জন, তৎপরে তৃতীয়জনকে ডেকেও অনুরূপ কথা বললেন। যখন তাদের সকলের শহীদ হওয়ার সংবাদ তাঁর নিকট আসল তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন,

'ঐ আল্লাহর শোকর, যিনি আমাকে সম্মানিত করেছেন তাদের শাহাদাতের মাধ্যমে।'

ঈমানের শান এটাই। ইসলামের জন্য সবকিছুই কুরবান করতে প্রস্তুত হওয়া। জিজ্ঞাসা একটাই। তা হল এই প্রজন্মকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে। কিভাবে মুসলমানরূপে তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা যাবে। সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সাধনের প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনী শিক্ষারও সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আজ এই পর্যন্তই। আল্লাহ আমাদেরকে কাজ করার তাওফীক দিন। আমীন!

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

📘 উলামা তলাবা > 📄 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার গুরুত্ব ও উপকারিতা: কুরআন ও ইসলামী শিক্ষার আলোকে

📄 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার গুরুত্ব ও উপকারিতা: কুরআন ও ইসলামী শিক্ষার আলোকে


اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ وَالصَّلٰوةُ وَالسَّلَامُ عَلٰی سَيِّدِ الْاَنْبِيَآءِ وَالْمُرْسَلِيْنَ وَعَلٰى اٰلِهٖ وَاَصْحٰبِهٖ اَجْمَعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِاِحْسَانٍ وَدَعٰی بِدَعْوَতِهِمْ اِلٰی يَوْমِ الدِّيْنِ- اَمَّا بَعْدُ

فَاعُوْذُ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ بِসْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَاَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ فِيْهِ بَاْسٌ شَدِيْدٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللّٰهُ مَنْ يَّنْصُرُهٗ وَرُسُلَهٗ بِالْغَيْبِ- اِنَّ اللّٰهَ قَوِیٌّ عَزِيْزٌ

উপস্থিত সুধীবৃন্দ! এই মজলিসে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিগণ যেমন আছেন তেমনি দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত সম্মানিত উলামায়ে কেরামও আছেন। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আমার অন্তরে এই ধারণা রয়েছে যে, আমাদের সম্মানিত শ্রোতাবৃন্দের বিশেষত উলামায়ে কেরামের মস্তিষ্ক কখনও এই দিকে হয়তো ধাবিত হয়নি যে, কুরআন মাজীদেও শিল্প ও কারিগরি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে এবং ঐ সকল দক্ষ ব্যক্তিদের সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে, যাঁরা সমকালীন যুগে কারিগরি বিদ্যা দ্বারা নির্মাণমূলক কাজ করেছেন এবং জনগণের সেবা করেছেন এবং মানবতাকে ও নিজের সম-বিশ্বাসী লোকদেরকে রক্ষা করেছেন। বিষয়টি খুব স্বল্প সংখ্যক লোকের মস্তিষ্কেই জাগ্রত হয়েছে। আমি এইমাত্র আপনাদের সামনে কুরআন মাজীদের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেছি-

وَاَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ فِيْهِ بَاْسٌ شَدِيْدٌ وَّমَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللّٰهُ مَنْ يَّنْصُرُهٗ وَرُسُلَهٗ بِالْغَيْبِ- اِنَّ اللّٰهَ قَوِیٌّ عَزِيْزٌ

'আমি অবতীর্ণ করেছি লোহা, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। এটা এজন্য যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দেন কে প্রত্যক্ষ না করেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।' (সূরা হাদীদ ২৫)

আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ প্রকাশ করে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, আমি নাযিল করেছি লোহা। প্রথমে লক্ষ্য করুন, কথাটি ব্যক্ত করতে অন্য কোন শব্দও ব্যবহার করা যেত। উদাহরণ স্বরূপ خلقنا 'আমি সৃষ্টি করেছি' শব্দটি ব্যবহার করা যেত। কিন্তু নাযিল করেছি শব্দটি দ্বারা বিশেষত্ব ও গুরুত্ব প্রকাশ পায়। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কুদরত ও অনুগ্রহের উপাদানও বস্তুটির সাথে যে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত তা প্রকাশ পায়। আপনারা জানেন, শুধু প্রযুক্তি নয় বরং স্থাপত্য, শিল্প ও কারিগরি, যুদ্ধ ইত্যাদি প্রায় সকল ক্ষেত্রে লোহা এক কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কোন শিল্প ও কারিগরি জগত লোহা ব্যতীত চলতে পারে না।

বিংশোর্ধ খনিজ ধাতব পদার্থের মধ্য থেকে সবকিছুকে বাদ দিয়ে কুরআন একমাত্র লোহার উল্লেখ করেছে। বলেছে- انزلنا الحديد এবং আমি নাযিল করেছি লোহা, তাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি। লোহা আল্লাহ তাআলার রবুবিয়াত গুণের প্রকাশস্থল। লোহা শুধু তরবারি তৈরির জন্য নয়, নয় শুধু বন্দুক ও তার গুলি তৈরির জন্য; বরং فيه باس شديد ومনাفع للناس তাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহুবিধ উপকারিতা ও কল্যাণ। যাঁরা আরবী সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তাঁরা জানেন- অনির্দিষ্ট বাচক শব্দ ব্যাপকতার অর্থ প্রদান করে। বলা হয়েছে, منافع للناس তাতে রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। অনির্দিষ্ট বাচক শব্দ ব্যবহার করে কল্যাণের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির ইঙ্গিত করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা তাঁর এক নবী হযরত দাউদ (আ.) প্রসঙ্গে বলেছেন- وعلمنه صنعة لبوس لكم لتحصنكم من بأسكم 'আর আমি তাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ করতে, যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে।' (সূরা আম্বিয়া ৮০)

আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আ.)-এর জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলেন। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে- وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ أَنِ اعْمَلْ سَبِغَاتٍ وَقَدْرٍ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

'আমি তার জন্য লোহাকে করে দিয়েছিলাম নরম। (এবং বলেছিলাম) তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈয়ার কর এবং বুননে পরিমাপ রক্ষা কর।' (সূরা সাবা ১০-১১)

অর্থাৎ লোহাকে তাঁর জন্য এরূপ করে দিয়েছিলাম, যাতে তিনি তা দ্বারা ইচ্ছা মাফিক সহজেই বর্ম ইত্যাদি তৈরি করতে পারেন। ধ্বংসাত্মক কাজে নয় বরং নির্মাণ ও গড়ার কাজে যেন লোহাকে তিনি ব্যবহার করতে পারেন।

হযরত দাউদ (আ.) নয় বরং কুরআনুল কারীম হযরত সুলাইমান ইবনে দাউদ (আ.)-এর প্রসঙ্গেও আলোচনা করেছে। জীন জাতিকে তাঁর সেবকরূপে নিয়োজিত করার কথা বিবৃত করেছে। বলেছে- وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانِ كَالْجَوابِ وَقُدُورٍ رَاسِيَاتٍ

'তাঁর প্রতিপালকের আদেশক্রমে জীনদের কতক তাঁর সম্মুখে কাজ করত। তাদের মধ্যে যে আমার আদেশ অমান্য করে তাকে আমি জ্বলন্ত অগ্নি-শাস্তি আস্বাদন করাব। তারা নির্মাণ করত সুলাইমানের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রাসাদ, ভাস্কর্য, হাউজ সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেগ।' (সূরা সাবা ১২-১৩)

এ থেকে বোঝা যায়, জীনরা শিল্প ও কারিগরী কার্যাবলী সম্পাদন করত। হযরত সুলাইমান (আ.) যা চাইতেন সেই অনুযায়ী তারা কাজ করত। নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী তারা কিছু করত না। সুতরাং স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, তারা ধ্বংসাত্মক কোন কাজ করত না। কারণ নবীর নির্দেশনা অনুযায়ী যেহেতু কাজ হত নিশ্চয়ই তা মানুষের কল্যাণের জন্যই হত। এ থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ প্রদত্ত পদার্থ ও শক্তিকে তাঁর মর্জি মাফিক এবং নবী কর্তৃক আনীত পয়গামের দাবি অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। সমগ্র জগতের জন্য মহাবিপদ হল এই সকল বস্তু ও শক্তিকে ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক (DESTRUCTIVE & PASSIVE) লক্ষ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বলেছেন- يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ

তারা তার জন্য তাই করত যা সে (সুলাইমান আ.) চাইত। তারা স্বাধীন ছিল না। যা তারা চাইত তাই করতে পারত না। মানুষের উপর আক্রমণ করা, ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হওয়া, দেশকে পয়মাল করে দেওয়া -এ সবের কিছুই তারা করতে পারত না।

আমার শুধু ধারণা নয় বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা হল এই যে, মুসলমানরা অতীতে কারিগরি ও শিল্প ক্ষেত্রে কী পরিমাণ উন্নতি লাভ করেছিল আর আধুনিক যে জগতকে উন্নত জগত বলা হয়, বিজ্ঞান-সমৃদ্ধ জগত বলা হয়, তাতে মুসলমানদের অংশীদারিত্ব (Contribution) কতটুকু- এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের ইতিহাসকে খুব কমই অধ্যয়ন করা হয়েছে।

উদাহরণ স্বরূপ একটি কথা বলি। দর্শনে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। একটি কিয়াস বা অনুমাননির্ভর যুক্তি। যাকে বলা হয় অবরোহ বা deductive logic। দ্বিতীয়টি হল ইস্তিকরা (استقراء) যাকে বলা হয় inductive Logic বা যুক্তির আরোহ পদ্ধতি। এটা এক ঐতিহাসিক সত্য এবং স্বীকৃত বাস্তবতা যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও স্থাপত্য কলার সূচনা ও উন্নতি যুক্তিশাস্ত্রের এই আরোহ পদ্ধতিরই অবদান। ইউরোপে সায়েন্স ও বিজ্ঞান এবং তার সমূহ শাখা-প্রশার বিকাশ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ ও আবিষ্কারের যুগ তখন থেকেই শুরু হয়েছে যখন তারা কিয়াস তথা deductive logic এর পরিবর্তে ইস্তিকরা তথা inductive logic কাজে লাগাতে শুরু করেছে। আর যুক্তির এই পদ্ধতি ও এর মূলনীতিসমূহ আরবদের দান। আরব হতে স্পেনের পথ বেয়ে তা ইউরোপে এসেছিল।

প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও লেখক Gustave Lebon লিখেছেন, 'মানুষ নিরীক্ষণ পর্যবেক্ষণ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি আরোহ যুক্তি (Inductive logic) সম্পর্কে বলে থাকে যে, তা ফ্রান্সিস বেকনের উদ্ভাবন। কিন্তু আজ এটা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, এই পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে আরবদের সৃষ্টি।'

কিয়াস বা অবরোহ হল আপনি একটি বিষয়কে সত্য বলে ধরে নিলেন এবং বললেন, অমুক বস্তুতে এই গুণ রয়েছে। এরপর সমজাতীয় সব বস্তু সম্পর্কে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, এই সকল বস্তুতেও ঐ গুণ রয়েছে। যুক্তিবিদ্যার এই পদ্ধতিটি দুনিয়ার সব দর্শন এমনকি ইউনানী দর্শনের উপরও জেঁকে বসেছিল। ইউনানী দর্শনের আলোচনা উঠলেই যুক্তিবিদ্যার এই পদ্ধতির দিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাস্তিষ্ক ধাবিত হয় যে, তারা এই ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল। আমাদের এখানেও যে মানতেক (যুক্তিবিদ্যা) ও দর্শন পড়ানো হয়, তা ইউনানী দর্শনকেন্দ্রিক।

ইসতিকরা বা আরোহ অনুমান হল কার্য থেকে কারণ অনুমান। একাধিক বস্তুকে নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করে সবগুলোর মধ্যে যে সাধারণ গুণ (Common Factors) পরিলক্ষিত হয় তাকে মূল ধরে অন্য বস্তুতেও সেই গুণের উপস্থিতি অনুমান করা।

ইউরোপের যে সকল ঐতিহাসিক বিজ্ঞান ও ইউরোপের উন্নতি সম্পর্কে ইতিহাস লিখেছেন তাদের সকলেই একমত যে, ইউরোপের উন্নতি এবং তার বিশ্ব-বিস্তারী প্রযুক্তিগত বিজয়, আবিষ্কার ও উন্নতির মূল ভিত্তি হল ইসতিকরা বা আরোহ অনুমান। আর এটা সবাই জানে যে, এই বিদ্যার মূলনীতিসমূহ স্পেন থেকে আমদানীকৃত। স্পেন থেকে যদি তা ইউরোপে আমদানী না হত তাহলে ইউরোপ উন্নতি করতে পারত না।

আপনি দেখলেন যে, পানির মধ্যে এই গুণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আপনি অতি তড়িঘড়ি একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন এবং অপর বস্তুর ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করলেন। এটাই কিয়াস বা অবরোহ অনুমান। অনেক সময় এতটুকুও দেখা হয় না বরং নিজের ধারণা থেকে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এরপর সব বস্তুকে ঐ সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত করা হয় এবং ঐ সব বস্তুতে ঐ সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করা হয়, এটাকেই বলে কিয়াস। কিন্তু এটা যথার্থ নয়। আসল বিষয় ইসতিকরা বা অনুসন্ধান, নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে তড়িঘড়ি না করা। বরং বস্তুসমূহকে দেখা, নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা, তার বৈশিষ্ট্যকে দেখা, তার আচরণকে দেখা ও পর্যবেক্ষণ করা। গাছকেও দেখবেন, পাতাকেও দেখবেন, ভূমি দেখবেন অন্যান্য বস্তুসমূহকেও দেখবেন, পর্যবেক্ষণ করবেন, পরীক্ষা করবেন। অতঃপর দেখবেন এইসব বস্তুর মধ্যে Common Factors বা সাধারণ গুণ কী? এরপর মূলনীতি প্রস্তুত করবেন ও সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। যুক্তি বিজ্ঞানের এই পদ্ধতিই ইউরোপকে নতুন আলোর, নতুন পথের সন্ধান দান করেছে এবং নতুন এক ক্ষেত্র দান করেছে এবং বিজ্ঞানের উন্নতি সেই দিন থেকেই শুরু হয়েছে। যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন, মানুষের যেমন জন্মদিন থাকে তদ্রূপ বিজ্ঞানের জন্মদিন কোনটি? তবে আমি বলব, যে দিন ইসতিকরা বা যুক্তিবিজ্ঞানের আরোহ অনুমান পদ্ধতিকে ইউরোপ গ্রহণ করে নিয়েছে এবং স্পেন থেকে তা অর্জন করেছে সেই দিন।

তদ্রূপ যে এলাকাকে মা-ওরাউন্নাহর বলা হয়, বোখারা-সমরকন্দ ইত্যাদি শহর যে এলাকায় অবস্থিত সেখানে বড় বড় জ্ঞানী-গুণী, দার্শনিক, গবেষক ও আবিষ্কারক সৃষ্টি হয়েছেন। শায়খ ইবনে সীনা প্রণীত 'আল-কানুন' দেখুন। আজও তা সমভাবে সমাদৃত। আজও তা থেকে জ্ঞান আহরণ করা হচ্ছে। তাঁর বিস্তৃত নিরীক্ষণ ও গভীর পর্যবেক্ষণ, তাঁর প্রজ্ঞা ও মেধা দেখে বিস্মিত হতে হয় যে, কিভাবে তিনি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের কার্যাবলী ও বৈশিষ্ট্যাবলী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী বিভিন্ন রোগ চিহ্নিত করেছিলেন এবং তার চিকিৎসা সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন! ঠিক একইভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইসলামী বিশ্বের উন্নতি এরূপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, ইউরোপের জন্য যা ভিত্তি রচনা করে দিয়েছিল। এই কথাটি একটি বড় ভ্রান্তি ও অজ্ঞতাপ্রসূত যে, মানবজাতির উন্নতি, বিজ্ঞানের উন্নতি এবং বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট শাস্ত্র ও বিদ্যার উন্নতির সূচনা হয়েছে ইউরোপে এবং ইউরোপ ছিল এসবের প্রথম শিক্ষক। এটা বক্রদৃষ্টি ও গোঁড়ামী প্রসূত তথ্য। আল্লাহ আমাকে স্পেন ভ্রমণের সুযোগ দান করেছেন। স্পেনের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত, টলেটোলা থেকে গ্রানাডা পর্যন্ত সফর করেছি। আমি আলহামরা প্রাসাদ দেখেছি, কর্ডোভার মসজিদ দেখেছি, সেখানকার অন্যান্য স্থাপনা এবং পুরাতত্ত্বের নিদর্শনসমূহ দেখেছি। আপনি দেখলে বিস্মিত হবেন যে, সেই যুগে স্থাপত্য কলায় এত উচ্চ স্তরে মানুষ কিভাবে পৌঁছে গিয়েছিল? বিশ্বাস করতে কঠিন হয় যে, এসব স্থাপনা এভাবেও নির্মাণ করা যায়! এখানে আল বেরুনীর ন্যায় ব্যক্তি জন্মলাভ করেছেন। তিনি ভারতে এসেছিলেন। তাঁর লিখিত ইতিহাসে স্বীকার করা হয়েছে যে, অনেক সূত্র ও দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভাবক তাঁরাই।

এটা মনে করা উচিত নয় যে, এক বিদআতের প্রচলন দান করা হচ্ছে। হয়তো অনেককে এ থেকে বিরত রাখা হবে। এজন্য আমি দ্বীনী পরিভাষাতেই বলছি যে, এটা বিদআত নয় বরং আমি মনে করি যে, এটা মুসলমানদের এক প্রাচীন রীতির প্রচলন দান এবং মৃত রীতিকে পুনরায় জীবন দান। মুসলমানদের জন্য বর্তমানে এটা অপরিহার্য। এইসব ক্ষেত্রেও মুসলমানরা এক সময় অগ্রসর ছিল। আমি যেহেতু অনবরত সফর করতে থাকি এবং বিভিন্ন শিক্ষিত মহল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেয়ে থাকি এবং হিন্দুস্তানেই শুধু নয়; হিন্দুস্তানের সংলগ্ন দেশগুলোতেও আমার সফর হয়েছে একাধিকবার। সেহেতু এসব সফরের কারণে আমার অভিজ্ঞতা এই যে, মুসলমানদের মস্তিষ্ক সাহিত্য ও কাব্য-কবিতায় ব্যস্ত থাকে বেশি। তাদের মস্তিষ্ক এই জাতীয় বিষয় চর্চার দিকে অধিক ধাবিত হয়। এইজন্য কেউ কেউ এ রকমও বলে যে, মুসলমান তো ব্যস ঐ সকল বিষয় চর্চা করতে ভালবাসে যেসব বিষয় অপেক্ষাকৃত লঘু, যাতে আনন্দ উপভোগ করা যায়, স্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু যেসব বিষয় কিছুটা কঠিন, কষ্টকর এবং ধৈর্য ও স্থৈর্যের দাবি করে অথবা যেসব বিষয় অর্জন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পড়ে, যা অপেক্ষাকৃত নিরানন্দের ও শুষ্ক বিষয় সেসব বিষয়ে তাদের মস্তিষ্ক খুব কমই চলে। অথচ কথাটা সত্য নয়। মুসলমানদের সম্পর্কে এরূপ ধারণা অন্যায় ধারণা বৈ নয়।

আমি খুব আনন্দবোধ করছি এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি যে, আমাদের শহরে এরূপ একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি শহরেই এইরূপ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা উচিত। কেননা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির, শিল্প ও কারিগরির এবং গবেষণা কর্মের বিভিন্ন শাখার গুরুত্ব এখনও অপরিসীম। অনুমান করা যায় যে, এই গুরুত্ব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাবে। আমরা ভারতে নিজেদের যোগ্যতাবলে ও স্বনির্ভররূপে মর্যাদাকর জীবন যাপন করতে সক্ষম হবো না, যতক্ষণ না আমরা এই সকল ক্ষেত্রে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারব। কমপক্ষে এই সকল বিষয়কে আমরা যতক্ষণ না কাজে লাগাতে পারব।

সুধী! এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকরণের জন্য আপনাদেরকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি এবং দুআ করছি আল্লাহ যেন প্রতিষ্ঠানটিকে উন্নতি দান করেন এবং অন্যত্র এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। দুআ করি এই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে মুসলমানদের যে বিচ্ছিন্নতা ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা যেন দূরীভূত হয়। আল্লাহ তাআলা যেন এইসব প্রতিষ্ঠান থেকে এরূপ উপযুক্ত ব্যক্তি তৈরি করে দেন, যারা মুসলিম সমাজের মূল্যবোধ ও মান, মুসলিম সমাজের মাকসাদ ও লক্ষ্যের হেফাযত করতে পারবে। এটা অনেক বড় সেবা হবে এবং ইসলামকে শক্তিশালী করার এক বড় অবলম্বন হবে। জীবনোপকরণ উপার্জনের সাথে সাথে তা হবে সমাজের জন্য প্রভূত কল্যাণকর।

ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00