📄 উপকারিত্ব গুণের সম্মোহনী শক্তি
আপনাদেরকে একটি মজার ঘটনা শোনাচ্ছি। ঘটনাটি শুনিয়েছেন লক্ষ্ণৌ শহরের একজন শীর্ষস্থানীয় ও নামজাদা ডাক্তার আবদুল হামিদ সাহেব মরহুম। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, পাণ্ডিত্য ও পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার কথা হিন্দু-মুসলমান সকলেই একবাক্যে স্বীকার করত। ভারত বিভক্তির পর বারাহবাক্বীর একজন বিত্তশালী, নামকরা ব্যবসায়ী হিন্দু তাঁকে বিদ্রূপের সুরে বলল, কী ব্যাপার ডাক্তার সাহেব! আপনি পাকিস্তানে গেলেন না? তিনি বললেন, না, আমি হিন্দুস্তানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আল্লাহ তাআলার কারিশমা! একবার ঐ হিন্দু ভদ্রলোক কঠিন রোগে আক্রান্ত হল। নানা রকম চিকিৎসা, বড় বড় ডাক্তারের পরামর্শ কোন কিছুতেই সে সুস্থতা লাভ করল না। অবশেষে হার স্বীকার করে সে ডাক্তার আবদুল হামিদ সাহেবের শরণাপন্ন হল। ডাক্তার সাহেব যখন তাকে দেখতে গেলেন এবং চিকিৎসা শুরু করলেন তখন বললেন, দেখুন, আমি যদি পাকিস্তান চলে যেতাম তাহলে কি আপনি আমাকে চিকিৎসার জন্য ডেকে পাঠাতে পারতেন? আল্লাহর কী কারিশমা! হিন্দু ভদ্রলোকটি এই ডাক্তার সাহেবের চিকিৎসাতেই আরোগ্য লাভ করে এবং তাকে চরম লজ্জা পেতে হয়।
আমার প্রিয় ছাত্রবৃন্দ। আমি আপনাদের হাজারো সমস্যার সমাধান একটাই মনে করি। তা হল আপনারা আপনাদের উপকারীত্ব ও যোগ্যতার স্বীকৃতি আদায় করে নিন। আপনারা প্রমাণ করুন যে, আপনাদের নিকট যে জ্ঞান ও আদর্শ রয়েছে তা দুনিয়ার কারও কাছে নেই। দুনিয়ার নিয়ম হল, যে পণ্য যে দোকানে পাওয়া যায় মানুষ তা ক্রয়ের জন্য সেই দোকানেই উপস্থিত হয়। একজন গুণী অপর গুণীর নিকট উপস্থিত হয়, যার নিকট লাভ করা যায় হৃদয়ের পরিতৃপ্তি, আত্মিক রোগের ঔষধ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ছিলেন হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের ইমাম। বাগদাদে তৎকালীন যুগের সকল মানুষের আকর্ষণের মধ্যমণি। কিন্তু তিনিও আত্মার খোরাক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে, রূহকে শক্তিশালী করতে ছুটে যেতেন বাগদাদের একজন হৃদয়-সম্পন্ন ছাহেবে দিল বুযুর্গের দরবারে। ইলম ও জ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাঁর সাথে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কোন সম্পর্ক ছিল না। একবার ইমাম সাহেবের এক ছেলে তাঁকে বলল, আব্বাজান! আপনি সেখানে গেলে আমাদের সকলের মাথা নীচু হয়ে যায়। লোকে নানা রকম কথা বলে। তিনি বললেন, বৎস! মানুষ যেখানে ফায়দা দেখে, লাভ দেখে সেখানেই যায়। আমি ঐ বুযুর্গের কাছে আমার কলবের ফায়দা পাই।
এই যে দরসে নিযামী, যা আজ কাগজের নোটের ন্যায় ব্যাপকভাবে বিভিন্ন দেশে চলছে তা মোল্লা নিযামুদ্দীন ফিরিঙ্গি মহল্লী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও বিন্যাসকৃত, যিনি ছিলেন উস্তাযুল উলামা, উস্তাযুল হিন্দ, আলেমকুল শিরোমনি। জ্ঞান গরিমায়, ইলম ও পূর্ণতায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও তিনি সাইয়েদ আবদুর রাজ্জাক বাঁসবী কাদেরীর মুরীদ ছিলেন- যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল প্রাথমিক স্তরের। স্তরের কিছু কিতাবাদি তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন। কথা বলতেন ঊধু অঞ্চলের পূরবী ভাষায়। মোল্লা নিযামুদ্দীন (রহ.) ঐ বুযুর্গের বাণীসমূহের একটি সংকলনও প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি যখন তাঁর নাম নিতেন তখন শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে তাঁর নাম নিতেন। এর কারণ আর কিছুই নয়। মোল্লা নিযামুদ্দীন নিজের জ্ঞান-গরিমার শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও নিজের মধ্যে একটা কিছুর অভাববোধ করতেন, যে অভাব তিনি পূরণ করতে পারতেন ঐ বুযুর্গের কাছে যেয়ে। মোল্লা নিযামুদ্দীন সকলের উস্তাদ ও গুরু ছিলেন। কিন্তু তাঁরও অন্বেষা ছিল এমন এক ব্যক্তিত্বের যেখানে যেয়ে তাঁর অনুভব হবে যে, তিনি কিছুই নন এবং এখনও তার অনেক কিছু জানার ও শেখার আছে।
হযরত মাওলানা আবদুল হাই বাড়হানাবী এবং হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ (রহ.)-এর নাম কে না জানে। হযরত মাওলানা শাহ আবদুল আজীজ (রহ.) প্রথম জনকে 'শায়খুল ইসলাম' এবং দ্বিতীয় জনকে 'হুজ্জাতুল ইসলাম' অভিধায় অভিহিত করতেন। তাঁরা দুইজন হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর হাতে বায়আত ছিলেন। অথচ সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সব স্তর অতিক্রম করতে পারেননি। দেওবন্দের প্রবীণ ব্যক্তিগণ বর্ণনা করেন, যখন সাইয়েদ সাহেব এখানে আগমন করতেন তখন উক্ত বুযুর্গদ্বয়ের অবস্থা এরূপ হত যে, সাইয়েদ সাহেব খাটে ঘুমিয়ে পড়তেন আর তাঁরা খাটের ডান পাশে ও বাম পাশে বসে থাকতেন। সাইয়েদ জাগ্রত হয়ে কিছু বললে তাঁরা সেই কথা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন এবং তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীর স্বাদ উপভোগ করতেন।
📄 নির্লোভ ও নির্মোহতার শক্তি ও সুফল
দ্বিতীয় গুণ হল নির্লোভ ও নির্মোহ গুণ। আল্লাহ-নির্ধারিত চিরন্তন রীতি হল, যে যাচনা করে লোকে তাকে ভয় করে। তার থেকে পলায়ন করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের হাত বন্ধ করে রাখে, প্রত্যাশা ও যাচনার হাত গুটিয়ে রাখে মানুষ তার পদাবনত হয়। তাকে কিছু গ্রহণ করার জন্য খোশামোদ করে। লোভহীনতা ও স্বার্থ পরিত্যাগের মধ্যে রয়েছে মানুষের প্রেম ও ভালবাসা আকর্ষণের ক্ষমতা। পক্ষান্তরে যাচনা ও কামনার মধ্যে রয়েছে লাঞ্ছনা ও অপমান। এও এমন এক চিরন্তন রীতি যুগের শত পরিবর্তন সত্ত্বেও যার কোন পরিবর্তন নেই। চতুর্থ শতাব্দীর ইতিহাস পাঠ করুন কিংবা অষ্টম শতাব্দীর ইতিহাস পাঠ করুন এই একই চিত্র দৃষ্টিগোচর হবে। সর্বত্র একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাবেন। এই চতুর্দশ শতাব্দীতেও আমরা ঐ একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি। বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন ইতিহাস এবং তাসাওউফের ইতিহাসে এই জাতীয় ঘটনাবলীতে পূর্ণ। আমি সেসব ঘটনাবলীর বিশদ বিবরণে যেতে চাচ্ছি না। এ ব্যাপারে আপনাদের নিজেদেরও অভিজ্ঞতা আছে। না থাকলেও আপনারা আপনাদের উস্তাদমণ্ডলী ও বুযুর্গদের নিকট তাঁদের উস্তাদ ও বুযুর্গগণের ঘটনাবলী নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন।
📄 চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জন করুন পৃথিবীর প্রীতিভাজন হোন
তৃতীয় ও শেষ বৈশিষ্ট্য হল, চূড়ান্ত গুণের অধিকারী হওয়া, স্বকীয়তা সৃষ্টি এবং কোন বিষয়ে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন। উলূমে আলিয়াহ তথা কুরআন, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের উচ্চতর জ্ঞান তো অনেক বড় বিষয়। উলূমে আলিয়া তথা প্রাথমিক ও সহায়ক কোন শাস্ত্রেও যদি দক্ষতা ও পূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় এমনকি এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন লিপিকারিতা ও নকলনবিসিতেও কেউ যদি পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে তাহলে তার পিছনেও ভাল ভাল আলেম ঘুরতে থাকে। বড় বড় লেখকগণ পর্যন্ত লিপিকার ও নকলনবিসদেরকে তোয়াজ করে, তাদেরকে খোশামোদ করে যেন তারা তাদের লিখিত কিতাবের নকল তৈরি করে ছাপার উপযুক্ত করে দেয়। কমপক্ষে ব্লক তৈরির জন্য মলাটের উপরে কিতাবের নামটা যেন লিখে দেয়। আপনি ইলম ও জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে যদি দেখেন যে, তিনি দরিদ্র ও বেকার জীবন কাটাচ্ছেন তাহলে বুঝবেন যে, তাঁর এমন কোন দুর্বল দিক রয়েছে বা এমন কোন দোষ ও সমস্যা রয়েছে, যার কারণে তাঁর শত যোগ্যতা ও দক্ষতা সত্ত্বেও তিনি বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। উদাহরণত বদমেজাজ, রাগীস্বভাব, মেযাজের দ্রুত পরিবর্তনশীলতা, অলসতা, কাজের প্রতি অনাগ্রহ, শিক্ষকতায় নিস্পৃহা, অনিয়মানুবর্তিতা, কারও কথা সহ্য না হওয়া, অল্পতেই চটে উঠা, চঞ্চলমতিত্ব, কোন কর্মক্ষেত্রে টিকতে না পারা এই জাতীয় কোন না কোন দোষ অবশ্যই পাবেন। যে দোষের কারণে শত যোগ্যতা ও দক্ষতা সত্ত্বেও তিনি সমাজ-বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করেন, কর্মহীন থাকেন। যোগ্যতা ও দক্ষতাকে কোন কাজে লাগাতে পারেন না। এই হচ্ছে অপরিহার্য চিরন্তন তিনটি শর্ত ও গুণ যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার চিরন্তন রীতি হল, যুগ যতই পরিবর্তিত হোক, যুগের সমাজ ও মানুষের মাঝে যতই মন্দ পরিবর্তন ঘটুক এই গুণ তিনটির মাঝে বহাল থাকবে মানুষের প্রেম ও ভালবাসা, তাদের সুদৃষ্টি আকর্ষণে যাদুকরী ক্ষমতা। আজ মাদরাসার শিক্ষার্থী, শিক্ষাসমাপনকারীদের প্রয়োজন শুধু এই তিনটি গুণ নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা, এই শর্ত তিনটি পূরণ করা। আল্লাহ তাআলা আপনাদের সহায় হোন।